Home গল্প সোনালি দিনের প্রত্যাশা -আলতাফ হোসাইন রানা

সোনালি দিনের প্রত্যাশা -আলতাফ হোসাইন রানা

মুমুদের পড়ার ঘরের জানালাটা খুললেই চোখ পড়ে ঐ ঘাস ফড়িংয়ের মাঠটার দিকে। শিশুদের কোলাহল আর হই চই রিনিঝিনি শব্দের মতো প্রায়শ কানে আসে। জোড়া কয়েক শিশুকে সব সময়ই মাঠটার মধ্যে খেলতে দেখা যাবেই। এদিক ওদিক তিড়িং বিড়িং নেচে বেড়ায় ঘাস ফড়িং। কেউ ফড়িং ধরার জন্য চুপি চুপি পা ফেলে। কেউবা ছুটোছুটি করে বল নিয়ে। বিকেল হলে পরিবেশ আরো সুন্দর হয়ে ওঠে।
মাঠের পশ্চিম পাশে সুনিবিড় ছায়াঘেরা শাল আর মেহগনি গাছগুলোর মাঝে মুমুদের বাড়ি। বাড়ির পেছনে বেশ কিছু দূর ছোট্ট নদী কীর্তনখোলা। ছোট্ট মেয়ের মতো রিনিঝিনি শব্দে নাচতে নাচতে সারাক্ষণ ছুটে চলে। পাশে নলখাগড়ার ঝোপ। শীতে ওখানে কাছিম রোদ পোহায়।
মুমুদের বাড়ির সামনে যে ফুলের বাগান রয়েছে, রঙবেরঙের প্রজাপতি সেখানে ডানা মেলে উড়ে বেড়ায়। শাল গাছগুলো যেনো ইচ্ছে করেই চারদিক থেকে নীলাভ-ধূসর বিশাল বাঁধ দিয়ে বাড়িটিকে ঘিরে রেখেছে।
মুমু তার খরগোশ ছানাটি কোলে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে ফুলের বাগান ঘেঁষে একেবারে মাঠটার কাছে গিয়ে থামে। মাঠের শিশুরা তখন বিচিত্র খেলায় মেতে ওঠে। কেউ কেউ খেলা বাদ দিয়ে দাঁড়িয়ে চেয়ে থাকে গোলাপের পাপড়ির মতো সুন্দর ছোট্ট মেয়ে মুমু এবং তার সাদা ফুটফুটে খরগোশ ছানাটির দিকে। মুমু ওটাকে নিয়ে রোজ বিকেলে মাঠে খেলতে আসে। মুমু ছানাটি কোল থেকে ছেড়ে দিলে মাঝে মাঝে ছুটোছুটি করতে করতে বাগানে ঢুকে পড়ে। বাগানে ঢুকেই খরগোশ ছানাটি ঘাসে গা ডুবিয়ে শুয়ে পড়ে কিংবা বন গোলাপের ঝোপের নিচে গিয়ে লুকিয়ে পড়ে। ডালিম দানার মতো চোখ। দুষ্ট দুটো চোখে চোখ পড়তেই ছানাটি পালাতে চেষ্টা করে। বেশি দূর যেতে পারে না। মুমু ছানাটি কোলে তুলে নেয়।
মুমুর মনে পড়ে একবার বাবার সাথে সবাই মিলে বন বিভাগের পুরো এলাকা দেখার জন্য ঘুরতে বেরিয়েছিল। বনের মাঝে মাঝে ফাঁকা জায়গায় আলোর ঝলমলে সবুজ প্রফুল্ল যেনো উজ্জ্বল ফুলে ফুলে। এই সময়টা বাগানে এমনিতেই ভালো লাগে। ফুটন্ত ফুলে ঘাস সুন্দর বর্ণ বৈচিত্র্য ধারণ করেছে। বাতাসে ভাসছে সুগন্ধি ঘাসের অপূর্ব ঘ্রাণ। আর আকাশে উঁকি মারছে গ্রীষ্মের ¯িœগ্ধ সূর্য। উজ্জ্বল আলোয় ভাসিয়ে দিচ্ছে পুরো বাগান। সত্যি যেনো চারপাশে অপরূপ সুন্দরের সমারোহ। রঙ বাহারি প্রজাপতিরা ঘুরে ঘুরে ওড়ে মুমুর চোখের দৃষ্টি সীমানায়। দু-একটি গাছে কৃত্রিমভাবে খড়কুটো দিয়ে বোনা বড় মৌচাক। তাতে মৌমাছি উড়ছে গুনগুন করছে, কী একটা প্রাণী দেখে মুমু হঠাৎ চিৎকার দিয়ে ওঠে-বাবা! দ্যাখো, দ্যাখো, কী সুন্দর একটা কি যেনো দৌড়ে যাচ্ছে।
মুমুর বাবা এক পলক দেখতেই প্রাণীটা পালিয়ে গেলো। ওটা হরিণ। দশ শিংঅলা হরিণ। বনের সবচেয়ে অভিজাত প্রাণী। বাবা মুমুকে বুঝিয়ে বললেন।
বিচিত্র বর্ণের কাঠঠোকরা এখান থেকে ওখানে উড়ে লাফিয়ে যাচ্ছিল। কতক্ষণ যে মুমু সেদিকে তাকিয়ে ছিল মনে নেই।
লাল ঝুঁটিঅলা বন মোরগ দেখে তো বায়নাই ধরে বসলো-আমাকে একটা লাল ঝুঁটির পাখি ধরে দিতে হবে।
আমি খাঁচায় পুষবো।
বাবা কতো করে বোঝালেন ওটা পাখি নয়, বন মোরগ, ধরা যাবে না। দেখো না কেমন ছুটে ছুটে পালাচ্ছে। কোনো কথাই শুনবে না মুমু। বন মোরগ পাখি তার চা-ই চাই।
শেষ পর্যন্ত খরগোশ দেয়ার লোভ দেখিয়ে শেষ রক্ষা। এখন যে খরগোশ ছানাটি নিয়ে মুমু খেলা করে সেবার ঘুরতে গিয়েই ছানাটির বাবা-মাকে নিয়ে এসেছিল।
মুমু এখন খরগোশগুলো নিয়েই সারাক্ষণ খেলায় মেতে থাকে। তাদের ঠিক মতো খাওয়ানো, শরীর পরিষ্কার করে দেয়া, আদর করাতেই যেনো তার আনন্দ। খরগোশগুলোর জন্য বড় ভাইয়াকে বলে চিলেকোঠায় ছোট্ট করে দুটো ঘর করে দিয়েছে। সকালের সোনালি রোদে যখন খরগোশগুলো আড়মোড়া ভেঙে খড় আর বিচালির ওপর এসে বসে মুমু তখন কতগুলো দুধ কলমি এনে ওদের সামনে ছড়িয়ে দেয়। দুধ কলমি খাবার হিসাবে খরগোশরা খুব পছন্দ করে। ছানাটির কুটকুট করে খাওয়া আর পিট্পিট্ করে ডালিম দানার মতো চোখ দুটোর চাওয়া দেখে মুমুর সাথে রুমু ঝুমু দু’জনেই খুশিতে নেচে ওঠে।
মুমুদের বাড়িটি সবুজ লাল ও ছাই রঙের ছাদে ছাওয়া গুড়ি কাঠের ছাই রঙা। মুমুর বাবা যখন বন বিভাগের চাকুরে ছিলেন তখন এমন সুন্দর বাড়িটি করেছিলেন। গেলো বছর বাবা কি একটা বড় অসুখে মারা গেলেন। মুমুরা চার ভাই-বোন। ছোট আরো দু’বোন। রুমু আর ঝুমু। বড় ভাই রাজু। বাবা মারা যাওয়ার পর বন বিভাগের বড় সাহেবকে বলে মুমুর বড় ভাই একটা চাকরি পায়। এতে কষ্ট হলেও তাদের অভাব কিছুটা দূর হয়। আয়ের উৎস হলেও ভাইয়ের সামান্য আয়ে সংসার ঠিকমতো চলে না। কাপড়, খেলনা নিয়ে রুমু আর ঝুমুর সাথে মুমুর প্রায়ই ঝগড়া বাধে। মুমুর এসব ভালো লাগে না। মুমু সারাক্ষাণ ভাবে, বার বার ভাবে, কবে বড় হবে। তাড়াতাড়ি বড় হওয়ার তার খুব ইচ্ছে পড়াশোনা করে বড় হবে। অনেক বড়। পড়াশোনাতেও মুমু ভালো। সব বিষয়ে তার ভালো দখল রয়েছে। আই কিউতে স্কুল শিক্ষকরা মুমুকে যখন জিজ্ঞেস করে- বড় হয়ে তুমি কি হতে চাও। মুমু সোজা উত্তর দেয়- পাইলট হবো। বিমান চালাবো। পৃথিবীর সব দেশ ঘুরে ঘুরে দেখবো।
মা-ভাই-বোন নিয়ে কোথাও বেড়াতে যেতে কার না ইচ্ছে করে। পয়সা খরচ হবে তাই মা তাকে কোথাও বেড়াতে নিয়ে যান না।
আজ নতুন বছরের প্রথম দিন। প্রতি বছরই এ দিনে মুমুরা আনন্দ করে। কিন্তু আজকের আনন্দটা তার কাছে অন্য রকম লাগছে। একেতো বছরের নতুন দিন। তার পর আবার এই দিনেই জন্ম হয়েছিল মুমুর। দুটো দিন এক সাথে পাওয়াতে মুমুদের বাড়িতেই যেনো আনন্দের বন্যা বইছে। লাল, নীল কিছু বেলুন দিয়ে বাড়ির ভেতরটা নিপুণ হাতে সাজিয়ে তুলেছে। বড় ভাইয়া মুমু ও তার ছোট বোনদের জন্য নতুন কাপড় ও খেলনা কিনে আনে। গতকাল ভাইয়া নতুন মাসের টাকা পেয়েছে। মুমু অনেকগুলো নতুন কড়কড়ে টাকা তার ভাইয়াকে গুনতে দেখে একপলক চেয়ে থাকে। মুমু তার বাবাকেও এমন করে টাকা গুনতে দেখেছে। ভাইয়া দেখলো মুমু তার দিকে হাসি হাসি মুখ করে তাকিয়ে আছে।
মুমুকে ডাক দেয় ভাইয়া-কি মুমু নিবি, আয় কাছে আয়। নতুন একটা পঞ্চাশ টাকার নোট মুমুর হাতে ধরিয়ে দিয়ে বাকি টাকাগুলো মায়ের হাতে তুলে দেয় বড় ভাইয়া। চকচকে নতুন টাকার নোট পেয়ে মুমু যেনো খুশিতে মাতোয়ারা। এর আগে পাঁচ বা দশ টাকার দু-একটা নোট পেলেও পঞ্চাশ টাকার নোট এটাই প্রথম। মনে একটা অজানা আনন্দ নিয়ে মুমু বেরিয়ে পড়ে ঘরের বাইরে।
পাশের বাড়ির সমবয়সী আনিকাকে পেয়েই ডাক দেয় মুমু- অ্যাই আনিকা দ্যাখ দ্যাখ, আজ না ভাইয়া আমাকে কতো সুন্দর একটা নতুন টাকা দিয়েছে। তোর আছে এমন নতুন টাকা?
আমার যে ভাই নাই। আনিকার শান্ত জবাব।
তাহলে তোকে কেউ এমন সুন্দর টাকা দেয় না বুঝি।
দেয়, আমার আব্বা আমাকে দেয়। তবে পঞ্চাশ টাকা না পাঁচ টাকা দেয়।
ঠিক আছে, তুই তো আমার স্কুলের বন্ধু।
ভাইয়াকে বলবো তোকেও একটা সুন্দর নতুন পঞ্চাশ টাকা দিতে হবে। কেমন?
আচ্ছা, আনিকা উত্তর দেয়।
এভাবেই হই চই আর আনন্দ করে পুরো দিনটি কাটিয়ে দেয় মুমু। রাতে মায়ের পাশে ঘুমাতে গিয়ে মুমু অজানা অনেক ভাবনায় পড়ে যায়। আগের কথাগুলোই আবার ভাবতে থাকে। অনেক বড় হবে। বিমান চালাবে। দেশে দেশে ঘুরে বেড়াবে। মা, ছোট বোনদের মুখে হাসি দেখবে। মুমু ভাবে এমন দিনগুলো তার কবে আসবে। ভোরের সূর্যের মতো তার জীবনে নতুন দিনগুলোর উদয় হবে। মুমু এখন সেই কাক্সিক্ষত সোনালি দিনের প্রত্যাশায় অপেক্ষমাণ।

SHARE

Leave a Reply