Home গল্প স্কাই ফোর্স -হাসনাইন ইকবাল

স্কাই ফোর্স -হাসনাইন ইকবাল

আগামীকাল পরীক্ষা। ইমনের মাথায় এখন একটাই চিন্তা। যেভাবেই হোক রোল ১ তার চাই-ই। কিন্তু সমস্যা হলো তুলি। মেয়েটা মারাত্মক। গত বছর ইমনের আশা ছিলো রোল নম্বর ১ তারই হবে। তুলির জন্য পারলো না। তুলিই হলো প্রথম। আর ইমন হলো দ্বিতীয়। অবশ্য তুলিও ক্লাসে ভালো ছাত্রী হিসেবে পরিচিত। ইমনও কম না। সবগুলো টিউটোরিয়াল আর সেমিস্টারে ইমন তুলির সমান নম্বর পেয়েছে। দু-একটাতে বেশিও আছে। তা ছাড়া দ্বিতীয় টিউটোরিয়ালে তুলি গণিত পরীক্ষা দিতে পারেনি। সে সময় তুলির ভীষণ জ্বর ছিলো। ইমন তাদের বাসায় গিয়ে দেখেও এসেছে একবার।
যাক, এবার ইমনের ফার্স্ট হওয়া ঠেকায় কে? সন্ধ্যা হওয়ার সাথে সাথেই ইমন বই-খাতা নিয়ে টেবিলে বসে গেলো। সিলেবাস আগেই শেষ করা আছে। এখন শুধু রিভিশন দিতে হবে। রিভিশনে মগ্ন ইমন। হঠাৎ তার মনে হলো তার পেছনে কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে। তার নিঃশ্বাস ইমনের ঘাড়ে লাগছে। ইমন চট করে পেছন ফিরলো।
একটা বেঁটে মতো লোক ইমনের পেছনে দাঁড়ানো। মাথায় আর্মি কাটিং চুল। পরনে কালো শার্ট-প্যান্ট।
‘কে তুমি?’ প্রশ্ন করলো ইমন।
আমার নাম রাস্কেল।
রাস্কেল! প্রচন্ড হাসি পেলো ইমনের। রাস্কেল আবার মানুষের নাম হয় না কি? ওটা তো একটা গালি।
মানুষের হয় না; কিন্তু আমাদের হয়।
আমাদের আবার কারা? তোমরা মানুষ না?
না, আমি মানুষ না। আজ বিকেলে তুমি যে গেমস খেলেছো, আমি সেখানে বিমানের পাইলট ছিলাম। এই দেখো তোমার গুলি লেগে আমার হাতটা ছিঁড়ে গেছে। রাস্কেল ডান হাত উঁচু করে ইমনকে দেখালো।
হাতটা কব্জি থেকে কাটা। ক্ষতস্থান থেকে এখনো রক্ত ঝরছে। ইমনের দুঃখ হলো। মুখটা বিমর্ষ হয়ে গেলো। রাস্কেল বললো, দেখো, যুদ্ধের ময়দানে আমি হেরে গেছি। স্কাই ফোর্সে কেউ কখনো আমাকে হারাতে পারেনি। তুমি আমাকে হারিয়ে দিয়েছো। এখন আমি বাড়ি যেতে পারবো না।
কেন? বাড়ি যেতে সমস্যা কী?
আমাদের স্কাই ফোর্সের নিয়ম হলো কেউ যখন খেলায় হেরে যায় তখন তাকে বাসায় ফিরতে হলে লাইন গেম খেলতে হয়। লাইন গেমে যদি জিততে পারে তবেই তাকে বাসায় ফিরতে দেয়া হয়।
যদি হেরে যায়?
তাহলে তাকে মেরে ফেলা হয়। তোমার গুলিতে আমার ডান হাত ছিঁড়ে গেছে, আমি লাইন গেমে হেরে যাবো। তুমি আমাকে বাঁচাও। রাস্কেলের দু’চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে। ইমন কারো চোখে পানি দেখলে সহ্য করতে পারে না। তা ছাড়া তার জন্যই তো বেচারার এ অবস্থা। ইমন সিদ্ধান্ত নিলো যেভাবেই হোক সে রাস্কেলকে বাঁচাবে। তাই জিজ্ঞাসা করলো, আমি তোমাকে বাঁচাতে পারবো?
হ্যাঁ পারবে। তুমি আমার হয়ে লাইন গেম খেলে দেবে। সেখানে যদি তুমি জিততে পারো তবে আমি বেঁচে যাবো।
কিন্তু আগামীকাল যে আমার পরীক্ষা!
রাস্কেল আরো জোরে কাঁদতে কাঁদতে বললো, আমি মরে যাচ্ছি, আর তুমি তোমার পরীক্ষার চিন্তা করছো? তোমার জন্যই আমি মরতে বসেছি। অথচ আমার জন্য তুমি ত্রিশটা মিনিট নষ্ট করতে পারবে না, তোমরা এমনই স্বার্থপর! কথা শেষ করে রাস্কেল হু হু করে কাঁদতে লাগলো। ইমন বললো, ঠিক আছে বাপু, থামো থামো। আমি ত্রিশ মিনিটে তোমার লাইন গেম শেষ করে দিয়ে আবার পড়তে বসবো। কিন্তু আম্মু যে এখন কম্পিউটারে বসতে দেবে না!
রাস্কেল বললো, কম্পিউটারে বসতে হবে না, আমি গেম প্লেয়ার নিয়ে এসেছি। তুমি খেলতে থাকো, আমি দরজায় পাহারা দিচ্ছি। আম্মু আসার সময় তোমাকে এসে বলবো। তুমি তখন প্লেয়ারটা বইয়ের নিচে লুকিয়ে পড়তে থাকবে। আম্মু গেলে আবার শুরু করবে।
ইমন বইটা খোলা রেখেই খেলা শুরু করলো। লাইন গেমের সোলজারগুলো এলোমেলো হয়ে দৌড়াদৌড়ি করছে। ইমন তাদেরকে আটকানোর জন্য তাদের পিছু ছুটছে। এমন সময় রাস্কেল এসে বললো আম্মু আসছে। প্লেয়ারটা লুকিয়ে ফেলো। ইমন প্লেয়ারটা বইয়ের নিচে রেখে বই পড়তে লাগলো। আর রাস্কেল ঢুকলো খাটের নিচে। একটু পরে আম্মু এক গ্লাস দুধ নিয়ে এলো। ইমন দুধটুকু খেয়ে আবার পড়তে লাগলো। আম্মু খালি গ্লাস নিয়ে চলে গেলো। ইমন আবার প্লেয়ার বের করে খেলতে লাগলো। কতক্ষণ পরে ঝরনা আপু এলো ইমনের রুমে। রাস্কেলের চালাকিতে সেও কিছু জানতে পারলো না। এভাবে কতক্ষণ পরপর আব্বু আসে, আপু আসে, কাজের মেয়ে শেফালি আসে। কিন্তু কেউ কিছু টের পায় না। ইমন চুপিচুপি লাইন গেম খেলতে থাকে। খেলতে খেলতে কখন যে রাত দশটা বেজে গেছে ইমন টেরও পায় না।
তখন আম্মু এসে ইমনের দু’গালে দুটি চুমো দিয়ে বলে, আজ আর পড়তে হবে না। চলো, খেয়ে-দেয়ে ঘুমিয়ে পড়ো। ইমন কিছু না বলে খাটের নিচে তাকায়, রাস্কেল ইশারায় তাকে খেয়ে আসতে বলে। ইমন খেয়ে এসে বিছানায় শুয়ে পড়ে। আম্মু লাইট বন্ধ করে ডিম লাইট জ্বেলে চলে যায়।
কিছুক্ষণ পর রাস্কেল খাটের নিচে থেকে বেরিয়ে বলে, কই, গেম তো শেষ হলো না। ইমনের হাতে প্লেয়ারটা ধরিয়ে বলে, এই নাও, আর একটু পরেই শেষ হবে। ইমন শুয়ে শুয়ে খেলতে থাকে; কিন্তু খেলা আর শেষ হয় না। অবশেষে কখন যে ইমন ঘুমিয়ে পড়লো তা সে নিজেই জানে না।
সকালে আম্মুর ডাকাডাকিতে ইমনের ঘুম ভাঙে। আম্মু তাড়াতাড়ি ইমনকে গোসল করিয়ে নাস্তা খাইয়ে স্কুলে নিয়ে যায়। সাতটা থেকে ইমনের পরীক্ষা। কিন্তু তার চোখ থেকে এখনো ঘুমের রেশ কাটেনি। তা ছাড়া এখনো কিছুই রিভিশন দেয়া হয়নি তার। আম্মুকে তো আর সে কথা বলা যায় না। বাধ্য হয়ে ইমন আম্মুর সাথে স্কুলে যায়। পরীক্ষার হলে স্যার সবাইকে প্রশ্ন দিলে সবাই লিখতে থাকে। ইমনের চোখ জুড়ে ঘুম আসে। তাছাড়া কোনো প্রশ্নেরই পুরোপুরি উত্তর তার মনে নেই। তার পরেও লেখার চেষ্টা করে।
ইমনদের বারান্দায় খাঁচার ভেতর একটা মাছরাঙা পাখি। ইমন বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াতেই মাছরাঙাটা খাঁচা থেকে বেরিয়ে এসে ইমনের বাহুতে একটা ঠোকর দিলো। ইমন ব্যথা পেয়ে হাত দিয়ে জায়গাটা মালিশ করতে লাগলো। মাছরাঙাটা আরো জোরে ঠোকর দিতেই ইমনের ঘুম ভেঙে গেলো।
তুলি তার দিকে তাকিয়ে হাসতে হাসতে চাপা স্বরে বলছে, রাত্রে ঘুমাওনি বুঝি? পরীক্ষার হলের ভেতরে ঘুমাচ্ছো যে!
ইমন এদিক-সেদিক কলম খুঁজতে লাগলো। তুলি নিচ থেকে কলমটা কুড়িয়ে ইমনের হাতে ধরিয়ে দিলো, আর তখনই বাইরে ঢং ঢং করে ঘণ্টা বেজে উঠলো।

SHARE

Leave a Reply