Home খেলার চমক মুশফিক কেন সব দায় তার? হাসান শরীফ

মুশফিক কেন সব দায় তার? হাসান শরীফ

গত তিন বছরে এমন অনেক ঘটনাই ঘটেছে, তার একটিকেই অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে বাংলাদেশ টেস্ট দলের অধিনায়ক পদ থেকে মুশফিকুর রহীমকে সরিয়ে দেয়া যেত। কিন্তু এবার দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে যা ঘটেছে, তা বোধকরি বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে নজিরবিহীন। তার অধিনায়কত্ব কেড়ে নেয়ার বিষয়টা খোদ ক্রিকেট বোর্ডের ভেতর থেকেই এসেছে। ফলে ক্রিকেটপ্রেমী বাংলাদেশের মানুষ শোচনীয় পরাজয়ের লজ্জা ভুলে অধিনায়ক বিতর্কে নজর দিয়েছে। অবশ্য মুশফিকও ছেড়ে কথা বলেননি। বরং বলটা বোর্ডের দিকেই ঠেলে দিয়েছেন।
কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকায় গিয়ে কী এমন হয়েছিল যাতে করে সিরিজের মধ্যেই তার অধিনায়কত্ব নিয়ে প্রশ্ন করা হতে লাগল? সিরিজ শেষ হওয়ার পরও তো এ নিয়ে আলোচনা করা যেত। সেটাই তো হতো সবার জন্য শোভন।
এটা ঠিক, দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে সিরিজে তার কয়েকটি সিদ্ধান্ত সবাইকে হতবাক করেছে। দুই টেস্টেই টসে জিতে তিনি ম্যাচ তুলে দিয়েছেন প্রতিপক্ষের হাতে ব্যাট করার সিদ্ধান্ত না নিয়ে। পচেফস্ট্রম ও ব্লুয়েমফন্টেইনের যে দুই মাঠে খেলা দু’টি হয়েছে, তাতে টসে জয়ী দল প্রথমে ব্যাট করতে চাওয়াটাই স্বাভাবিক। প্রথম কিছু সময় ফাস্ট বোলারদের একটু ধৈর্য নিয়ে মোকাবিলা করতে পারলে বাকি সময়টা সাবলীলভাবে রানের চাকা সচল রাখা যায়। সুযোগ পেয়ে স্বাগতিক দলের ব্যাটসম্যানেরা সেটাই করেছেন।
কিন্তু টস জিতে খেলা প্রতিপক্ষের হাতে দিয়ে দেয়ার আরো অনেক উদাহরণ বাংলাদেশ অনেকবারই করেছে। কিন্তু সিরিজের মধ্যেই বোর্ডের পক্ষ থেকে তা নিয়ে প্রকাশ্যে তীব্র সমালোচনা কতটুকু মার্জিত হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্নই থেকে যায়। পুরো দায় তার ওপরই চাপানো হয়েছে। মাঠে টেলিভিশনের সামনে মুশফিকই যেহেতু সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছেন, দায় তারই। তবে নেপথ্যের কথাগুলো তো আলোচনাই হয়নি।
তামিম ইকবাল, সাকিব হাসানদের অনুপস্থিতিতে ব্যাটিং লাইন আপের ওপর আস্থা রাখতে পারেননি। আবার বোলাররাও আস্থার প্রতিদান দিতে পারেননি। মেহেদী হাসান মিরাজ, মোস্তাফিজুর রহমানররা এত দ্রুত ফিকে হয়ে যাবেন, কেউ সম্ভবত ভাবতে পারেননি।
আবার কোচ-অধিনায়কের সব পরিকল্পনাই যে সবসময় কাজে লাগবে সেটা আশা করা একটু বেশিই হয়ে যায় না? প্রথম ম্যাচের পর সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেছিলেন, কোচ পরামর্শ দিয়েছিলেন, বোলারদের কাছাকাছি না রেখে ফিল্ডারদের ডিপে রাখতে। সেটা খুবই খারাপ হয়েছে বাংলাদেশের জন্য।
তবে বোর্ডের সাথে মুশফিকের জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে আরো কিছু দিন আগে থেকে। চট্টগ্রামে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে দ্বিতীয় টেস্টের পর তিনি বলেছিলেন, উইকেটরক্ষকের পক্ষে ৪ নম্বর পজিশনে ব্যাট করা সম্ভব নয়। এতেও বোর্ডের অনেকে তার ওপর ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। মুশফিকের কথায় যে যুক্তি নেই, তা নয়। তাকে তিন তিনটি দায়িত্ব পালন করতে হয় : অধিনায়ক-উইকেটরক্ষক-ব্যাটসম্যান। খুব কম উইকেটরক্ষকই সফল অধিনায়ক হতে পারেন। ভারতের মহেন্দ্র সিং ধোনিরা ¯্রফে ব্যতিক্রম। অস্ট্রেলিয়ায় তো অঘোষিত বিধান আছে, উইকেটরক্ষকদের অধিনায়ক করা হবে না। কারণ প্রতিপক্ষের ব্যাটিংয়ের পুরোটা সময় তাকে মাঠে থাকতে হয়, প্রতিটি বলের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তাতে তীক্ষè মনোযোগী হতে হয়। একটু শিথিলতায় দলকে বিরাট মূল্য দিতে হয়। শ্রীলঙ্কার অর্জুনা রানাতুঙ্গাও বিষয়টা খোলাখুলি বলেছিলেন। তিনি উইকেটরক্ষক ছিলেন না। তবে জানিয়েছিলেন, অধিনায়ক হিসেবে মাঠে কাকে দিয়ে পরের ওভার বল করাবেন, ফিল্ডিংয়ে পরিবর্তন দরকার আছে কি না তা নিয়ে ভাবতে ভাবতে অনেক সময় ক্যাচ ফসকে যায়। মুশফিককে বাড়তি দায়িত্বও নিতে হচ্ছে। ফলে চাপটা আরো বেশি পড়ছে তার ওপর।
অবশ্য ২০১৪ সালেই মুশফিকের টেস্ট অধিনায়কত্ব চলে যেতে পারত। কিন্তু বিকল্প না থাকায় তিনি টিকে যান।
মাশরাফি মর্তুজা ওডিআই ক্যাপ্টেন হিসেবে দারুণ হলেও টেস্টে নন। ২০১৫ সালে আরেকবার মুশফিকের অধিনায়কত্ব বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছিল। সেবার ঢাকায় পাকিস্তানের বিপক্ষে দ্বিতীয় টেস্টে বাংলাদেশ হেরে গিয়েছিল ৩২৮ রানে। তবে ওডিআইয়ে বাংলাদেশের দুর্দান্ত জয়ের পর বিসিবি ইন-ফর্ম ব্যাটসম্যানকে হতোদ্যম করতে চায়নি।
মুশফিকের টেস্ট অধিনায়কত্ব সবচেয়ে অদ্ভুত অধ্যায়ে আসে গত বছর। কোচ চন্দিকা হাতুরাসিংহে তাকে পদত্যাগ করতে বলেছিলেন। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তৃতীয় টেস্টের তৃতীয় দিনের তৃতীয় সেশনে তামিম ইকবালের নেতৃত্বে বাংলাদেশ অল আউট করে দেয় ইংল্যান্ডকে। এই প্রথমবারের মতো ইংল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্টে জয় পেল বাংলাদেশ।
বাংলাদেশের জয়ে মাঠে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তামিম। কিন্তু তখনো আনুষ্ঠানিক অধিনায়ক কিন্তু মুশফিক। জয়টা কাগজে-কলমে তার হিসাবেই থাকে। তিনিও অধিনায়ক পদে টিকে যান।
বাংলাদেশ হয়তো ২০১৮ সালে নতুন অধিনায়ক পাবে। তিনি কে হতে পারেন? তামিম ইকবালের ফর্ম আছে। তিনি সিনিয়রও। সাকিব হাসানের টেস্ট ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত থাকাতেও তামিম এ ক্ষেত্রে এগিয়ে রয়েছেন। মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ আরেকটি আলোচিত নাম। তবে তার ফর্মে ওঠা-নামা তাকে কিছুটা পেছনে ফেলে দিয়েছে।
অধিনায়ক পদে পরিবর্তন হতেই পারে। মুশফিকও থাকতে না-ও চাইতে পারেন। কিন্তু এ নিয়ে যেভাবে প্রকাশ্যে কোন্দল শুরু হয়েছে, তা বাংলাদেশ ক্রিকেটর জন্য মঙ্গলজনক নয়। এমনিতেই টেস্টে বাংলাদেশ বেশ পিছিয়ে আছে। ওয়ানডে ক্রিকেটের মতো সাফল্য পেতে আরো অনেক দিন অপেক্ষা করতে হবে। এর মধ্যে প্রকাশ্য মতবিরোধ সৃষ্টি করতে পারে নতুন জটিলতা।

SHARE

Leave a Reply