Home দেশ-মহাদেশ এশিয়া ও ইউরোপের সেতু তুরস্ক -মুহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম

এশিয়া ও ইউরোপের সেতু তুরস্ক -মুহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম

তুরস্কের সরকারি নাম তুরস্ক প্রজাতন্ত্র, তুর্কি ভাষায় তুর্কিয়ে জুম্হুরিয়েতি। তুরস্ক পূর্ব ইউরোপের একটি রাষ্ট্র। যদিও তুরস্কের প্রায় পুরোটাই এশীয় অংশে পর্বতময় আনাতোলিয়া বা এশিয়া মাইনর উপদ্বীপে পড়েছে। তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারা আনাতোলিয়াতেই অবস্থিত। তুরস্কের বাকি অংশের নাম পূর্ব বা তুর্কীয় থ্রাস এবং এটি ইউরোপের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে অবস্থিত। এই অঞ্চলটি উর্বর উঁচু নিচু টিলাপাহাড় নিয়ে গঠিত। এখানে তুরস্কের বৃহত্তম শহর ইস্তাম্বুল অবস্থিত। সামরিক কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তিনটি জলপথ মার্মারা সাগর, বসফরাস প্রণালী ও দার্দানেল প্রণালী এশীয় ও ইউরোপীয় তুরস্ককে পৃথক করেছে। এই তিনটি জলপথ একত্রে কৃষ্ণসাগর থেকে এজীয় সাগরে যাওয়ার একমাত্র পথ তৈরি করেছে।
তুরস্ক মোটামুটি চতুর্ভুজাকৃতির। এর পশ্চিমে এজীয় সাগর ও গ্রিস; উত্তর-পূর্বে জর্জিয়া, আর্মেনিয়া ও স্বায়ত্তশাসিত আজারবাইজানি প্রজাতন্ত্র নাখচিভান; পূর্বে ইরান; দক্ষিণে ইরাক, সিরিয়া ও ভূমধ্যসাগর। তুরস্কের রয়েছে বিস্তৃত উপকূল, যা দেশটির সীমান্তের তিন-চতুর্থাংশ গঠন করেছে। তুরস্কের ভূদৃশ্য বৈচিত্র্যময়। দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তর-পশ্চিমে উর্বর সমভূমি। পশ্চিমে উঁচু, অনুর্বর মালভূমি। পূর্বে সুউচ্চ পর্বতমালা। দেশের অভ্যন্তরের আবহাওয়া চরমভাবাপন্ন হলেও ভূমধ্যসাগরের উপকূলীয় অঞ্চলের আবহাওয়া মৃদু।
এশিয়া ও ইউরোপের মিলনস্থলে অবস্থিত বলে তুরস্কের ইতিহাস ও সংস্কৃতির বিবর্তনে বিভিন্ন ধরনের প্রভাব পড়েছে। গোটা মানবসভ্যতার ইতিহাস জুড়েই তুরস্ক এশিয়া ও ইউরোপের মানুষদের চলাচলের সেতু হিসেবে কাজ করেছে। নানা বিচিত্র প্রভাব থেকে তুরস্কের একটি নিজস্ব পরিচয়ের সৃষ্টি হয়েছে এবং এই সমৃদ্ধ সংস্কৃতির প্রভাব পড়েছে এখানকার স্থাপত্য, চারুকলা, সঙ্গীত ও সাহিত্যে। গ্রামীণ অঞ্চলে এখনও অনেক অতীত ঐতিহ্য ও রীতিনীতি ধরে রাখা হয়েছে। তবে তুরস্ক বর্তমানে একটি আধুনিক, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। এখানকার অধিকাংশ লোকের ধর্ম ইসলাম এবং ভাষা তুর্কি। তুরস্কের ৯৬.৫ শতাংশ নাগরিক ইসলাম ধর্মাবলম্বী, শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ খ্রিস্টান এবং ৩.২ শতাংশ অন্যান্য ধর্মাবলম্বী।
তুরস্কের সরকারি ভাষা তুর্কি। এখানকার প্রায় ৯০% মানুষ তুর্কি ভাষায় কথা বলে। এ ছাড়াও এখানে আরও প্রায় ৩০টি ভাষা প্রচলিত। এদের মধ্যে আদিগে, আরবি, আর্মেনীয়, আজারবাইজানি, জর্জীয়, কুর্দি এবং রোমানি উল্লেখযোগ্য। আন্তর্জাতিক কর্মকাণ্ডে ইংরেজি ব্যবহার করা হয় ।
তুরস্কের আয়তন ৭ লাখ ৮৩ হাজার ৩৫৬ বর্গ কিলোমিটার (৩ লাখ ২ হাজার ৪৫৫ বর্গমাইল)। জনসংখ্যা প্রায় সাত কোটি ৯৮ লাখ ১৪ হাজার ৮৭১ জন। এদেশের মানুষের গড় আয়ু ৭৩.১৪ বছর : পুরুষ ৭০.৬৭ বছর ও মহিলা ৭৫.৭৩ বছর। ৬ থেকে ১৫ বছর বয়সী শিশুদের জন্য শিক্ষা বাধ্যতামূলক ও অবৈতনিক। শিক্ষার হার ৮৭.৪ শতাংশ : পুরুষ ৯৫.৩ শতাংশ ও নারী ৭৯.৬ শতাংশ। তুরস্কের নাগরিকদের তুর্কি বলা হয়।
তুর্কি সাহিত্য ও অন্যান্য রচনায় ইসলামি বিশ্বের ছাপ স্পষ্ট। তুর্কি সাহিত্যে পারসিক ও আরব সাহিত্যের প্রভাব লক্ষ করা যায়। এক সময় তুর্কি লোকসাহিত্যে ইউরোপীয় সাহিত্যের প্রভাব বেড়ে গেলেও এখন তা আবার ধীরে ধীরে কমছে। তুরস্কের সংস্কৃতি বৈচিত্র্যময়। গ্রিক, রোমান, ইসলামিক ও পশ্চিমা সংস্কৃতির মিশ্রণে তাদের একটি সঙ্কর সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। উসমানীয় সম্রাটদের সময় তুরস্কে পশ্চিমা সংস্কৃতি ভিড়তে থাকে এবং আজও তা দেশটিতে অব্যাহত আছে।
বহু শতাব্দী ধরে তুরস্ক ছিল মূলত কৃষিপ্রধান একটি দেশ। বর্তমানে কৃষিখামার তুরস্কের অর্থনীতির একটি বড় অংশ এবং দেশের শ্রমশক্তির ৩৪% এই কাজে নিয়োজিত। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে তুরস্কে শিল্প ও সেবাখাতের ব্যাপক প্রসার ঘটেছে, বিশেষত অর্থসংস্থান, পরিবহন এবং পেশাদারি ও সরকারি সেবায়। অন্য দিকে কৃষির ভূমিকা হ্র্রাস পেয়েছে। টেক্সটাইল ও বস্ত্র শিল্প দেশের রফতানির প্রধান উৎস। তুরস্কের মুদ্রার নাম লিরা।
অর্থনৈতিক রূপান্তরের সাথে সাথে নগরায়ণের হারও অনেক বেড়েছে। বর্তমানে তুরস্কের ৭৫% জনগণ শহরে বাস করে। ১৯৫০ সালেও মাত্র ২১% শহরে বাস করত। জনসংখ্যার ৯০% তুরস্কের এশীয় অংশে বাস করে। বাকি ১০% ইউরোপীয় অংশে বাস করে।
তুরস্কের ইতিহাস দীর্ঘ ও ঘটনাবহুল। প্রাচীনকাল থেকে বহু বিচিত্র জাতি ও সংস্কৃতির লোক এলাকাটি দখল করেছে। ১৯০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের দিকে এখানে হিটাইটদের বাস ছিল। তাদের সময়েই এখানে প্রথম বড় শহর গড়ে ওঠে। এরপর এখানে ফ্রিজীয়, গ্রিক, পারসিক, রোমান এবং আরবদের আগমন ঘটে। মধ্য এশিয়ার যাযাবর তুর্কি জাতির লোকেরা ১১ শ’ শতকে দেশটি দখল করে এবং এখানে সেলজুক রাজবংশের পত্তন করে। তাদের শাসনের মাধ্যমেই এই অঞ্চলের জনগণ তুর্কি ভাষা ও সংস্কৃতির সাথে মিশে যায়। ১৩ শ’ শতকে মোঙ্গলদের আক্রমণে সেলজুক রাজবংশের পতন ঘটে। ১৩ শতকের শেষ দিকে এখানে উসমানীয় সাম্রাজ্যের পত্তন হয়। এরা পরবর্তী ৬০০ বছর তুরস্ক শাসন করে এবং আনাতোলিয়া ছাড়িয়ে মধ্যপ্রাচ্য, পূর্ব ইউরোপ এবং উত্তর আফ্রিকার এক বিশাল এলাকাজুড়ে বিস্তৃতি লাভ করে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর সাম্রাজ্যটির পতন ঘটে।
১৯২৩ সালে উসমানীয় সাম্রাজ্যের তুর্কিভাষী এলাকা আনাতোলিয়া ও পূর্ব থ্রাস নিয়ে মুস্তাফা কামাল আতাতুর্কের নেতৃত্বে আধুনিক তুরস্ক প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা হয়।
সপ্তম শতকে আরবদের ইরান বিজয়ের পর কিছু কিছু তুর্কি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে এবং ইসলামি রাজ্যের মধ্যে বসবাস শুরু করে। দশম শতকে তুর্কিদের বেশির ভাগই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে। এদের মধ্যে সেলজুক তুর্কিরা উল্লেখযোগ্য। ১২৪৩ সালে সেলজুকরা মোঙ্গলদের কাছে পরাজিত হয়। এতে তুর্কি সুলতানদের ক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়ে। পরে প্রথম ওসমান ওসমানীয় সাম্রাজ্যের সূচনা করেন। তার বংশধররা পরবর্তী ৬০০ বছর শাসন করে। এ সময় তারা তুরস্কে পূর্ব ও পশ্চিমা সংস্কৃতির সমন্বয় ঘটলে ১৬ ও ১৭ শতকে তুরস্ক বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর দেশগুলোর একটি ছিল।
১৯১৪ সালে তুরস্ক অক্ষশক্তির পক্ষে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশ নেয় এবং পরাজিত হয়। ১৯১৮ সালের ৩১ অক্টোবর তুর্কি ও ব্রিটিশ প্রতিনিধিরা লেমনস দ্বীপের সমুদ্রবন্দরে অবস্থিত ব্রিটিশ নৌবাহিনীর ‘আগামেমনন’ জাহাজে যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে স্বাক্ষর করে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধে পরাজয়ের পর অটোমান সাম্রাজ্যের পতন ঘটে। খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে পড়ে তুরস্ক। খণ্ডিত তুরস্কের মূল ভূখণ্ডেই পরে গড়ে ওঠে আধুনিক তুরস্ক।
১৯৪৫ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি দেশটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যোগ দেয়। যুদ্ধের পর দেশটি জাতিসঙ্ঘে ও ন্যাটোতে যোগ দেয়। এ সময় থেকে তুরস্কে বহুদলীয় রাজনীতির প্রবর্তন হয়। তুরস্কে ৫৫০ আসনের একটি সংসদ আছে, যার সদস্যরা ৫ বছরের জন্য জনগণের ভোটে নির্বাচিত হন। সংখ্যাগরিষ্ঠ দল সরকার গঠন করে এবং সংসদ সদস্যরা রাষ্ট্রপতিকে ৫ বছরের জন্য নির্বাচিত করেন। রিসেপ তায়িপ এরদোগান দেশটির বর্তমান রাষ্ট্রপতি এবং বিনালি ইলদিরিম দেশটির বর্তমান প্রধানমন্ত্রী।
প্রশাসনিক সুবিধার্থে তুরস্ককে ৮১টি প্রদেশে বিভক্ত করা হয়েছে। সব বিভাগ আবার সাতটি অঞ্চলে বিভক্ত। তবে এই সাতটি অঞ্চল কোনো প্রশাসনিক বিভাজন নয়। প্রতিটি প্রদেশ কয়েকটি করে জেলায় বিভক্ত। তুরস্কে মোট জেলা আছে ৯২৩টি। প্রতিটি প্রদেশের নামই সেই প্রদেশের রাজধানীর নাম। আর প্রতিটি প্রাদেশিক রাজধানী সংশ্লিষ্ট প্রদেশের কেন্দ্রীয় জেলা। সবচেয়ে বড় শহর ইস্তাম্বুল। এটি তুরস্কের বাণিজ্যিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রবিন্দু।
তুরস্ক দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ার আনাতোলিয়া উপদ্বীপের সম্পূর্ণ অংশ এবং দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের বলকান উপদ্বীপের দক্ষিণ প্রান্তের অংশবিশেষ নিয়ে গঠিত। ফলে ভৌগোলিকভাবে দেশটি একই সাথে ইউরোপ ও এশিয়ার অন্তর্ভুক্ত। আনাতোলীয় অংশটি তুরস্কের প্রায় ৯৭% আয়তন গঠন করেছে। এটি মূলত একটি পর্বতবেষ্টিত উচ্চ মালভূমি। আনাতোলিয়ার উপকূলীয় এলাকায় সমভূমি দেখতে পাওয়া যায়। তুরস্কের দক্ষিণ-ইউরোপীয় অংশটি ত্রাকিয়া নামে পরিচিত; এটি আয়তনে তুরস্কের মাত্র ৩% হলেও এখানে তুরস্কের ১০% জনগণ বাস করে। এখানেই তুরস্ক ও গোটা ইউরোপের সবচেয়ে জনবহুল শহর ইস্তাম্বুল অবস্থিত (জনসংখ্যা প্রায় ১ কোটি ১৩ লক্ষ)।
জাতিসঙ্ঘের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য তুরস্ক। এ ছাড়া ওইসিডি, ওআইসি, ওএসসিই, ইসিও, বিএসইসি, ডি-৮ এবং জি-২০ ইত্যাদি সংগঠনের সদস্য তুরস্ক। ২০০৮ সালের ১৭ অক্টোবর তুরস্ক ১৫১টি দেশের সমর্থন পেয়ে জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য নির্বাচিত হয়। তার এ সদস্যপদ ২০০৯ সালের ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হয়। এর আগেও তুরস্ক জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য ছিল ১৯৫১-১৯৫২, ১৯৫৪-১৯৫৫ এবং ১৯৬১ সালে। পশ্চিমাদের সাথে সম্পর্ক, বিশেষ করে ইউরোপের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখা তুরস্কের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম মূল লক্ষ্য। কাউন্সিল অব ইউরোপের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য তুরস্ক। দেশটি ১৯৫৯ সালে ইইসি’র সদস্য হওয়ার জন্য আবেদন করে এবং ১৯৬৩ সালে দেশটি সংস্থাটির সহযোগী সদস্যের মর্যাদা পায়। ১৯৮৭ সালে তুরস্ক ইইসি’র পূর্ণ সদস্যপদ পাওয়ার জন্য আবেদন করে। ১৯৯২ সালে ওয়েস্টার্ন ইউরোপীয় ইউনিয়ন এর সহযোগী সদস্যপদ লাভ করে। দেশটি ইইউ’র পূর্ণ সদস্যপদ লাভের জন্য ১৯৯৫ সালে একটি চুক্তি করে। এ চুক্তি অনুসারে ২০০৫ সালের ৩ অক্টোবর সমঝোতা শুরু হয়। তবে সে সমঝোতা এখনো শেষ হয়নি। ধারণা করা হচ্ছে গ্রিক সাইপ্রাসকে কেন্দ্র করে ইউরোপের অন্যান্য দেশের সাথে তুরস্কের যে বিরোধ তা শেষ না হওয়া পর্যন্ত সমঝোতা চলতেই থাকবে।

SHARE

Leave a Reply