Home গল্প অনিকদের দাদু -রুমান হাফিজ

অনিকদের দাদু -রুমান হাফিজ

বছরের শেষ দিক এলেই অনিক অপেক্ষা করতে থাকে কখন দাদু আসবেন। আর দাদু আসা মানেই তো গ্রাম থেকে নিয়ে আসা কত্ত কিছু, সাথে দাদুর গল্পের ঝুলি তো আছেই! একমাত্র দাদুর কাছ থেকেই গল্প শুনতে পারে অনিক। দাদু ছাড়া আর কে গল্প শুনাবে? দাদুর মতো করে এরকম দারুণ সব গল্প আর কেউ কি বলতে পারবে?
অনিকদের দাদু গ্রামেই থাকেন, গ্রামের একটা প্রাইমারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। চাকরির মেয়াদ সেই কবে শেষ হয়েছে তবুও দাদু বিনা বেতনে স্কুলে পড়িয়েই যাচ্ছেন। বারবার অনিকদের আব্বু দাদুকে পড়ানো বাদ দিয়ে গ্রাম ছেড়ে চলে আসতে বলেছেন। শিক্ষকতা করতে করতে পেশাটা যে দাদুর নেশায় পরিণত হয়েছে। তিনি কি ছেড়ে আসতে পারেন? অনিকদের আব্বু প্রবাসী। আর আম্মু শহুরে একটা স্কুলে শিক্ষকতা করছেন। আম্মুর স্কুলে অনিক আর একমাত্র ছোট বোন তাসরিনও পড়ে। তাসরিন সবেমাত্র এক ক্লাস পড়েছে আর অনিক চতুর্থ শ্রেণীতে।
বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হওয়ার একদিন পর যথারীতি দাদু চলে এলেন। দাদুকে পেয়ে অনিক কি যে খুশি! তার সাথে সঙ্গী হয়েছে ছোট বোন তাসরিনও। এর আগে দাদু এলেও তাসরিন তেমন বুঝত না কারণ সে ছোট ছিল। এবার তাসরিনও বুঝতে পারছে তার দাদু এসেছেন। সারাক্ষণ দাদুর সাথেই আছে তারা। দাদু আসার পর থেকে দুই ভাইবোনের মধ্যে সেকি মিল! তা না হলে, দু’জনের একসাথে হওয়া মানেই একটা কিছু ঘটে যাওয়া। এ নিয়ে বেশ বেগ পোহাতে হতো আম্মুকে। হয়তো গেইম খেলা নিয়ে ঝগড়া কিংবা টিভি রিমোট নিয়ে কাড়াকাড়ি। এক কথায় সব কাজেই তাদের মধ্যে মতপার্থক্য। কিন্তু দাদু আসার পর থেকে এসবের কিছুই নেই। দু’জনের এই মিল দেখে অনিকদের আম্মুও তো বেশ খুশি। এখন গেম খেলা কিংবা টিভি দেখা ওসবের কি সময় আছে? তাদের মধ্যে সব থেকে বড় আনন্দের উপকরণ দাদু বিদ্যমান! দাদুকে পেয়ে টিভি কিংবা গেম খেলার কথা প্রায় ভুলেই গেছে দু’জন।
প্রতিদিন সন্ধ্যার পর দাদু তাদের দু’জনকে নিয়ে বসেন। ক্লাসের বই কিংবা অন্য কোনো বই নিয়ে সেখান থেকে গল্পের মতো করে তাদের অনেক কিছুই বলেন দাদু। গল্পে গল্পে নতুন অনেক কিছুই শেখা হয়ে যায় তাদের। দাদু তাদেরকে তার জীবনে ঘটে যাওয়া বাস্তব ঘটনাগুলোই গল্পের আকারে বলেন। গল্প শুনায় অনিক বেশ মনোযোগী হলেও তাসরিন মাঝে মধ্যে এদিক সেদিক নড়াচড়া করে বসে। দাদু তাসরিনকে তার কোলে বসিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে আরোও গল্প বলেন। দাদুর গল্পে তাসরিন কখন যে ঘুমের রাজ্যে হারিয়ে যায়, তা টেরই পান না দাদু। গল্পের আসর শেষ করে সবাই একসাথে খেতে বসেন। খাবার মুখে দিয়ে দাদু বললেন, “আচ্ছা বৌমা, ওদেরকে নিয়ে বেশি দূরে নয় কাছাকাছি কোথাও ঘুরে এলে কেমন হয়?”
“হ্যাঁ আব্বা বেশ ভালো হবে।” অনিকদের আম্মু দাদুর কথায় একমত পোষণ করে বললেন।
পরদিন বিকেল বেলা দাদু, অনিক, তাসরিন আর তাদের আম্মুকে নিয়ে গেলেন গাজীপুরে অবস্থিত পার্কে। পার্কে এসে ভাইবোন কী যে খুশি! অনিক বারবার দাদুকে এটা ওটা প্রশ্ন করছে। দাদুও অনায়াসে তা বলে দিচ্ছেন। অনিকের প্রশ্নে বিরক্ত হয়ে আম্মু বকা দিতে গেলে দাদু বাধা দেন। সেইসাথে বিভিন্ন জিনিস দেখিয়ে সেটার সাথে একেকটা গল্পও জুড়ে দিচ্ছেন দাদু। এই পার্কে আছে হাতি-ঘোড়া, বাঘ-ভাল্লুক, কুমির, ময়ূর ইত্যাদি নানা জাতের প্রাণী। বেশ ভালোই লাগছে তাদের। একবার চানাচুরওয়ালা দেখে তাসরিন বায়না ধরে সে চানাচুর খাবে। শুনেই দাদু বললেন, সর্বনাশ! তাসরিন দাদু আগে কি আমি বলি নাই, বাইরে খোলা কোন কিছু খেতে নেই? এতে নানারকম অসুখবিসুখ হতে পারে। দাদুর কথা শুনে তাসরিন বলল, আচ্ছা দাদু আর কখনোই বলবো না।
দাদুর সাথে নাওয়া খাওয়া, বেড়াতে যাওয়া, গল্প শুনা সব মিলিয়ে কিভাবে যে সময়গুলো পার হয়ে যাচ্ছে। জানুয়ারি মাস শুরু হতেই দাদু আবার গ্রামে চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। দাদু চলে যাবেন এ কথা শুনার পর থেকে অনিক আর তাসরিনের সে কি কান্না। কাঁদতে কাঁদতে একদম পাগল প্রায়। আদরের নাতি-নাতনীদের অবস্থা দেখে দাদু তো বেশ চিন্তায় পড়ে গেলেন। এদিকে অনিকদের আম্মুও তো এ নিয়ে চিন্তিত, দাদুর সাথে এতদিন ওরা যেভাবে ছিল তিনি চলে গেলে ওদেরকে সেভাবে কে রাখবে? সব কিছু তো আগের মতোই অগোছালো হয়ে যাবে! বিষয়টা নিয়ে দাদুর সাথে তিনি খোলামেলা আলোচনা করলেন। অনিকদের আব্বুও জানতে পেরে উক্ত বিষয়ে দাদুর সাথে কথা বলেছেন। ছেলে-বৌমার অনুরোধ আর অনিকদের অবস্থার কথা চিন্তা করে দাদু সম্মতি দিলেন। প্রিয় নাতি-নাতনীদের ছেড়ে তিনি কি আর দূরে থাকতে পারেন?
অনিক আর তাসরিন যখন শুনতে পেলো দাদু তাদের ছেড়ে আর চলে যাবেন না। সবসময় তাদের সাথেই থাকবেন। তখন ভাইবোনের খুশি আর দেখে কে! খুশিতে দাদুকে জড়িয়ে ভাইবোনের এত্তগুলো চুমু খেতে দেখে দাদু তো রীতিমতো অবাক! হাসিমাখা মুখে দাদু তখন বললেন, আরে আরে এসব করছটা কী?

SHARE

Leave a Reply