Home নিবন্ধ নাফ নদীতে রোহিঙ্গা শিশুর ভাসমান লাশ -মুহাম্মদ নূরুল হুদা

নাফ নদীতে রোহিঙ্গা শিশুর ভাসমান লাশ -মুহাম্মদ নূরুল হুদা

রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর বর্বরতম নিষ্ঠুরতা নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। পশ্চিমা বিশ্ব মুখে কুলুপ এঁটেছে। রোহিঙ্গা মুসলিমরা একদিকে আর গোটা বিশ্ব অন্যদিকে এটাই এখনকার প্রতীয়মান বিষয়। আমরা স্বীকার করি বা না করি রোহিঙ্গা হত্যাযজ্ঞে কেউ উচ্চকিতভাবে সরব হইনি।
বার্মার সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক হাজার বছরেরও বেশি সময় যাবৎ। বাংলাদেশের পার্শ্ববর্তী আরাকান রাজসভায় বাংলাসাহিত্যের চর্চা হয়েছে মধ্যযুগে। মধ্যযুগের শ্রেষ্ঠ মুসলমান কবি সৈয়দ আলাওল, দৌলত কাজী প্রমুখ আরাকান রাজসভারই কবি। উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদের উত্থানের পর থেকে সেখানে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী ছাড়া অন্য ধর্ম, বর্ণ, ভাষাভাষীদের নাগরিক অধিকার ও মানবাধিকার হরণ করা হয়।
সেনাবাহিনী ও বৌদ্ধ মৌলবাদীদের বর্বরোচিত উৎপীড়ন থেকে জান বাঁচাতে রোহিঙ্গা মুসলমানরা দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নেয়। সেনাবাহিনী রোহিঙ্গা-অধ্যুষিত এলাকায় অব্যাহতভাবে অত্যাচার ও গণহত্যা চালাচ্ছে। পৃথিবীতে মানবাধিকার বলে যদি কিছু থেকে থাকে, তাহলে তার লেশমাত্র নেই রোহিঙ্গাদের জীবনে। রোহিঙ্গাদের অবস্থা খাঁচায় ঢোকানো বন্দী প্রাণীর মত। শুধু সেনাবাহিনী নয়, তারা উগ্র বৌদ্ধ মৌলবাদীদেরও নির্যাতনের শিকার। পশ্চিমা গণমাধ্যমের খবরেই জানা যাচ্ছে, রোহিঙ্গা গ্রামগুলোতে চাল, ডাল, আটা শুধু নয়, পানি পর্যন্ত দিচ্ছে না তারা।
মিয়ানমারের ‘আয়লান কুর্দি’Ñ নাফ নদীতে ভাসছে রোহিঙ্গা মুসলমানদের লাশ। এমন একটি কন্যাসন্তানের ভাসমান লাশের ছবি দিয়ে তুরস্কের অনলাইন প্রতিবেদনের শিরোনাম করেছে, ‘মিয়ানমারস আয়লান কুর্দি ড্রাউন্স ট্রায়িং টু রিচ বাংলাদেশ’। শিশুকন্যাটিকে নিয়ে তার পরিবার বাংলাদেশে পালিয়ে আসার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু নাফ নদীতে নৌকা ডুবে যায়। রোহিঙ্গা শিশুটির নাফ নদীতে ভাসমান লাশ গত বছর সিরীয় শিশু আয়লান কুর্দির কথা মনে করিয়ে দেয়। আয়লান তার পরিবারের সঙ্গে সাগর পাড়ি দিয়ে গ্রিসে পৌঁছানোর আগেই তার লাশ ভেসে ওঠে তুরস্কের সৈকতে। রোহিঙ্গা শিশুটির ভাসমান লাশ ফের রাখাইন অঞ্চলে রোহিঙ্গাদের গণহত্যার বেদনা মনে করিয়ে দেয়, এ ছবিটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে, আবেদন উঠেছে রোহিঙ্গাদের পাশে এসে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর অব্যাহত হত্যাযজ্ঞের বিরুদ্ধে বিশ্ববাসীকে দাঁড়ানোর।
এর আগে ২০১৩ সালে রাখাইন সৈন্যদের নির্যাতনের বলি হন মোহাম্মদ আয়াজ, যিনি ছিলেন একটি মসজিদের ইমাম। তিনি বর্ণনা করেছিলেন কিভাবে পাশবিক সৈন্যরা তার গ্রামের হাটে অন্তত তিন শ’ রোহিঙ্গার ওপর হত্যাযজ্ঞ চালায় এবং তার গর্ভবতী স্ত্রীকে হত্যা করে। গুলিবর্ষণের আগে তারা নারীদের গণধর্ষণ করে প্রায় তিন শ’ বাড়িঘর, বাজার, মসজিদ পুড়িয়ে দেয়। পৈশাচিক নির্যাতন থেকে নিস্তার পায়নি গ্রামের ছোট শিশুরাও।
মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা ৭০ বছর বয়সী রশিদ আহমদ জানান, ‘ছয় ছেলে, চার মেয়ে ও স্ত্রীকে নিয়ে তার সংসার। রয়েছে নাতি-নাতনীসহ অসংখ্য আত্মীয়স্বজন। রাখাইন রাজ্যে এবারের মতো এত ভয়াবহ ও বর্বর নির্যাতন তিনি এর আগে কখনও দেখেননি। তাই মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর হাত থেকে প্রাণ বাঁচাতে অন্যদের মতো তিনিও পালিয়ে এসেছেন নাইক্ষ্যংছড়ির জলপাইতলির নো-ম্যানস ল্যান্ডে। রশিদ আহমদ বলেন, আমার ছয় ছেলের মধ্যে তিনজনকে একসঙ্গে ধরে নিয়ে গেছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। আবুইয়া নামে এক নাতিকে চোখের সামনে গলা কেটে হত্যা করেছে তারা। এতে আমি দিশেহারা হয়ে পড়ি। কোনও উপায় না দেখে এক নাতির সহায়তায় এখানে আসি।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা যুগ যুগ ধরে নির্যাতিত ও নিপীড়িত। নিজ দেশে থেকেও স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারি না। নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত আমাদের এই রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী।’
মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের পরিকল্পিত গণহত্যা করে রাখাইন রাজ্যে বৌদ্ধদের পুরোপুরি প্রতিষ্ঠা করার উদ্যোগ নিয়েছে। হাজার বছরের রোহিঙ্গা জাতির ইতিহাসকে ধুলোয় মুছে দিতে গণহত্যার মতো মানবতাবিরোধী কাজ করছে জাতিসংঘের আহবানকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে। ফলে মিয়ানমারের সরকারি বিভিন্ন বাহিনীর হাত থেকে নির্মম নির্যাতন থেকে বাদ পড়ছে না মায়ের কোলের শিশু। মায়ের কোল থেকে শিশু ছুড়ে ফেলা হচ্ছে জ্বলন্ত আগুনে। পদদলিত করে দুই দিনের শিশু খুন করতে কুণ্ঠাবোধ করছে না তারা। নারী ধর্ষণ করছে গণহারে। এসব রোহিঙ্গাদের বেঁচে থাকার স্বপ্ন দিন দিন ফুরিয়ে আসছে। নির্বিচারে হত্যা, অগ্নিসংযোগ, নারী ধর্ষণ, লুণ্ঠনের শিকার হয়ে জীবন বাঁচাতে সহায় সম্পত্তি ফেলে মাথা গোঁজার ঠাঁই খুঁজছে সহায়হীন অসহায় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী। বাংলাদেশ সীমান্তের নাফ নদীর পাড়ে হাজার হাজার রোহিঙ্গা নারী ও শিশু জড়ো হয়েছে প্রাণ বাঁচাতে। আকাশের নিচে মাটির বিছানায় অন্ন-বস্ত্রহীন নিরুপায় হয়ে চেয়ে আছে একটু সহায়তা পাওয়ার আশায়। কোনো মা সন্তান হারিয়ে, কোনো শিশু মা হারিয়ে আর্তনাদ করছে। মায়ের বুকে দুধ না পেয়ে কোলের শিশু ক্ষণে ক্ষণে কেঁদে মাকে বলার চেষ্টা করছে। মায়েরা অসহায় হয়ে পড়েছেন। অসহায় হয়ে পড়েছে নারীদের মাতৃত্ব। বয়োবৃদ্ধের চোখে মুখে চরম হতাশার চিত্র। তাদের ছেলেমেয়ে ও নাতি-নাতনীদের চিন্তায় গাল বেয়ে চোখের পানি গড়িয়ে পড়ছে। সেনাবাহিনীর বর্বর সদস্যরা নারী-পুরুষ শিশুদের হত্যা করেই ক্ষান্ত হয়নি, তারা শিশুদের বুটের নিচে পিষে ফেলে নাড়িভুঁড়ি বের করে ফেলছে।
রোহিঙ্গাদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে বিশ্বে সোচ্চার প্রতিবাদ হচ্ছে। এক্ষেত্রে তুরস্ক, জাতিসংঘ, যুক্তরাজ্য এবং অন্যান্য মানবাধিকার সংগঠনগুলো তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে। হ

SHARE

Leave a Reply