Home নিবন্ধ হারিয়ে যাওয়া তিনটি শিশু-কিশোর পত্রিকা -ড. আশরাফ পিন্টু

হারিয়ে যাওয়া তিনটি শিশু-কিশোর পত্রিকা -ড. আশরাফ পিন্টু

একটি পত্রিকা মানবমননে ব্যাপক ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের প্রতিভা বিকাশ ও মানসগঠনে শিশুতোষ পত্রিকার গুরুত্ব অত্যধিক। আমাদের বাংলাভাষা ও সাহিত্যে সংবাদপত্রের ইতিহাস খুব বেশি দিনের নয়। ভারতবর্ষে ১৭৮০ খ্রিস্টাব্দের ২৯-এ জানুয়ারিতে প্রথম ছাপার অক্ষরে যে সংবাদপত্রটি প্রকাশিত হয় তার নাম- ‘বেঙ্গল গেজেট’। ১৮১৮ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিল মাসে জন ক্লার্ক মার্শম্যান কর্তৃক প্রকাশিত হয় ‘মাসিক দিগদর্শন’। শিশুসাহিত্যিক খগেন্দ্রনাথ মিত্র ‘দিগদর্শন’-কে শিশুতোষ পত্রিকা বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, ‘এইখানিই বাংলার প্রথম কিশোর পাঠ সাময়িক বলে আমরা মনে করি।’
আমার স্মৃতিতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা-উত্তর তিনটি শিশু-কিশোর মাসিক পত্রিকা চিরভাস্বর হয়ে আছে। পত্রিকা তিনটি হলো : মাসিক সপ্তডিঙা, মাসিক ময়ূরপঙ্খী ও মাসিক সাম্পান। পত্রিকা তিনটি ১৯৮০ খ্রিস্টাব্দে যাত্রা শুরু করে এবং ১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দের জুন মাসে এদের অকাল মৃত্যু ঘটে। মাত্র ৬ বছরকাল পত্রিকা তিনটি জীবিত ছিল; এই ৬ বছরেই এগুলো শিশু-কিশোরদের বিশেষ করে মফস্বলের শিশু-কিশোরদের মনে দারুণ প্রভাব ফেলে এবং তাদের সাহিত্যচর্চায় উদ্বুদ্ধ করে।
তিনটি বিভাগীয় শহরের ইসলামি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র থেকে পত্রিকাগুলো প্রকাশিত হতো। খুলনা থেকে প্রকাশিত হতো মাসিক সপ্তডিঙা, রাজশাহী থেকে প্রকাশিত হতো মাসিক ময়ূরপঙ্খী এবং চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত হতো মাসিক সাম্পান। ঐ সময় বা এর আগে পরে রাজধানী ঢাকা ব্যতীত কোনো বিভাগীয় শহর থেকে কোনো মাসিক শিশু-কিশোর সাহিত্যপত্রিকা প্রকাশিত হতো না। যার দরুন মফস্বলের শিশু-কিশোরদের কাছে পত্রিকাগুলো অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। আর এ তিনটি পত্রিকার মধ্যে একমাত্র ‘সপ্তডিঙা’-ই ঢাকার পত্রিকাগুলোর সাথে পাল্লা দিয়ে ইংরেজি মাসের প্রথম সপ্তাহে প্রকাশিত হতো। এমনকি ইসলামিক ফাউন্ডেশন ঢাকা (কেন্দ্র) থেকে প্রকাশিত ঐতিহ্যবাহী পত্রিকা ‘সবুজ পাতা’ও তখন অনিয়মিতভাবে প্রকাশিত হতো। ঐ সময় ঢাকা থেকে আরো কিছু বিখ্যাত শিশু-কিশোর মাসিক বের হতো (এখনো বের হয়)। এগুলো হলো : শিশু, নবারুণ, ফুলকুঁড়ি, কিশোরকণ্ঠ ইত্যাদি। এসব জনপ্রিয় পত্রিকাগুলোর সারিতে ‘সপ্তডিঙা’ও স্থান করে নিয়েছিল।
‘সপ্তডিঙা’ (১৯৮৪) পত্রিকাতেই আমার প্রথম লেখা প্রকাশিত হয়। এর পর অন্যান্য শিশু-কিশোর পত্রিকাতে লেখা প্রকাশিত হতে থাকে। তবে সপ্তডিঙার সাথে যেন আমার আত্মিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। বলতে দ্বিধা নেই, ওই পত্রিকাতে বেশি লেখা ছাপা হওয়ার কারণেই হয়ত এমনটি হয়েছিল। আজ যারা প্রতিষ্ঠিত কবি, লেখক ও শিশুসাহিত্যিক তাদের মধ্যে অনেকেই তখন সপ্তডিঙায় লিখতেন। এদের মধ্যে- আবু সালেহ, সাজজাদ হোসাইন খান, মোশাররফ হোসেন খান, ফারুক নওয়াজ, ওবায়দুল গণি চন্দন, শাহ আলম বাদশা, টিপু কিবরিয়া প্রমুখ উল্লেখযোগ্য।
দুঃখের বিষয়, বাংলাদেশের শিশু-কিশোর পত্রিকাগুলোর আলোচনায় এ তিনটি পত্রিকা স্থান পায়নি। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায়, ‘আমাদের শিশু-কিশোর পত্রিকা ও কিশোরকণ্ঠ’ প্রবন্ধটির কথা। নিজামুল হক নাইমের লেখা এ প্রবন্ধটিতে অনেক অজনপ্রিয় ও অনিয়মিতভাবে প্রকাশিত শিশু-কিশোর মাসিকের আলোচনা এসেছে কিন্তু সেখানে সপ্তডিঙা, ময়ূরপঙ্খী কিংবা সাম্পানের নাম নেই। যাই হোক, এ তিনটি পত্রিকা তৎকালীন সময়ে আমাদের শিশু-কিশোরদের ইসলামি মূল্যবোধ ও সাহিত্য-সংস্কৃতির মানসগঠনে যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। হ

SHARE

Leave a Reply