Home গল্প অনুবাদ গল্প ক্যাম্পিং বার্নার্ড ম্যাকটার হ -অনুবাদ : হোসেন মাহমুদ

ক্যাম্পিং বার্নার্ড ম্যাকটার হ -অনুবাদ : হোসেন মাহমুদ

বসন্তের সুন্দর সকাল। স্নোমোবাইল নিয়ে বেরিয়েছিল ব্র্যাডলি। কিন্তু কপাল খারাপ। বরফের চোরা গর্তে পড়ে অচল হয়ে গেছে সেটা। এ বরফের রাজ্যে তা ঠিক করার উপায় নেই। একা একা হাঁটছিল ব্র্যাডলি। কোথায় পা ফেলছে সেদিকে লক্ষ রাখছিল আর ভাবছিল কেন সে একা ক্যাম্পিং করতে এলো। আর তখনি সিলের শ্বাস নেয়ার একটা গর্তে পড়ে যায় সে। উপরে ওঠার চেষ্টা করতে গিয়ে দেখল, সহজ নয়। বেশ কয়েকবার চেষ্টার পর সে উঠে আসে ওপরে। এখন তার দুঃখ হচ্ছে যে কেন সে বসন্তের এমন সুন্দর একটা দিনে ক্যাম্পিং করতে এলো।
আগের দিন পরিকল্পনাটি করেছিল ব্র্যাডলি। ছুটির দিন দু’টি ক্যাম্পিং ও সিল শিকারে কাটাবে সে। একা। একা এ জন্য যে সপ্তাহান্তে তার পরিবারের প্রায় সবাই কাজে ব্যস্ত থাকে বা কোথাও বেড়াতে যায় নয়তো পরের সপ্তাহে দীর্ঘ ক্যাম্পিংয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নেয়। তার মা অবশ্য তাকে একা ক্যাম্পিংয়ে যেতে নিষেধ করেছিলেন। ব্র্যাডলির ব্যাপারে উদ্বিগ্ন ছিলেন তিনি। কারণ স্নোমোবাইল ভেঙে যেতে পারে বা সে খারাপভাবে আহত হতে পারে। তাছাড়া শিকার বা ক্যাম্পিংয়ের অভিজ্ঞতাও তার অল্পই।
তার সম্পর্কে মায়ের এ আস্থার অভাবে খুব অপমানিত বোধ করে ব্র্যাডলি। বলে-
: দেখ মা, আমি একটু একাকী থাকতে চাই। আমার মাথার ভেতরে বহু রকম চিন্তা ঘোরাফেরা করে। গত মাসে যে সব ঘটনা ঘটেছে সেগুলো নিয়ে ভেবে দেখতে হবে আমাকে। সে জন্য কমপক্ষে তিন দিন সময় চাই।
: ওসব বাদ দে তো বাবা। তার বদলে আগামী সপ্তাহে আমাদের সাথে চল তুই। আমরা ক্যাম্পিংয়ে যাচ্ছি।
: না, তোমাদের সাথে অনেক মানুষ যেতে চাইবে। আমার হৈ-হল্লা ভালো লাগে না। তোমরা যাচ্ছ যাও, আমি আমার মত যাবো।
মা ছেলের একগুঁয়েমির কথা জানেন। তারপরও আরো দু-একবার তাকে বোঝানোর চেষ্টা করলেন। লাভ হলো না। হাল ছেড়ে দিয়ে তিনি বললেন-
: ঠিক আছে, তোমাকে একা যেতে দিতে পারি এ শর্তে যে জরুরি প্রয়োজন এমন সব জিনিস তোমাকে সাথে নিতে হবে। যেমন রেডিও যাতে আমাদের সাথে যোগাযোগ থাকে, সারভাইভাল ইকুইপমেন্ট ও খাবার।
রাজি হয় ব্র্যাডলি।
স্নোমোবাইলের জন্য তেল আর রান্নার জন্য কোলম্যান স্টোভ কিনতে গিয়ে তার ভাই চার্লির কাছে ধরা খেল সে-
: কী ব্যাপার? কোথায় যাচ্ছিস তুই?
তড়িঘড়ি জবাব দেয় ব্র্যাডলি-
: আমি ইঙ্গনিরতালিক যাচ্ছি, নাত্তিয়াভিনিক (বড় সিল) ও কানগুক (ছোট সিল) শিকার করব।
: কিন্তু তুই একা যাচ্ছিস কেন? জিজ্ঞেস করে ভাই।
: সম্প্রতি যে সব ঘটনা ঘটেছে সেগুলো নিজের মত করে ভেবে দেখব বলে একা যাচ্ছি।
চার্লি খানিকক্ষণ তার সাথে তর্ক করে তাকে ব্রাডলি যেতে বলেনি কেন তা নিয়ে। শেষে বলে-
: আচ্ছা, এবার তুই একাই যা। কিন্তু পরের বার অবশ্যই আমাকে বলবি। আমি শিকারের সরঞ্জাম ছাড়া সাথে কিছুই নেবো না।
সম্মতি জানায় ব্রাডলি। তারপর বাড়ির দিকে রওনা হয় সে।
সব গোছগাছ করাই ছিল। মা’র কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে পড়ে সে। স্নোমোবাইল স্টার্ট দেয়। তার ক্যাম্পিং সাইট শহর থেকে ৯০ কিলোমিটার দূরে।
ঘণ্টাখানেক চলার পর একটু বিশ্রাম নেয়া আর এক কাপ চা খাবার জন্য থামে ব্রাডলি। ভালো পথ আর সিল দেখার জন্য চারদিকে সন্ধানী দৃষ্টি ফেলে। দূরে আরেকটি শিকার পার্টিকে দেখতে পায়। তবে পাত্তা দেয় না। খানিকটা সময় বিশ্রাম নেয়ার পর সে ভাবতে থাকে ইঙ্গনিরতালিকে গিয়ে ক্যাম্প করার পর কিভাবে শিকার করবে। সেখানে প্রচুর পরিমাণে বড় সিল পাওয়া যায়। তাছাড়া পরিবারের সাথে আগেও সেখানে ক্যাম্প করে থেকেছে সে।
চা খাওয়ার পর জিনিসপত্রগুলো সাপ্লাই বক্সের মধ্যে ঢুকিয়ে ক্যামোটিকে (স্নোমোবাইলে সাথে জোড়া দেয়া মালামাল রাখার স্লেজ) রাখে ব্রাডলি। রওনা হয় ইঙ্গনিরতালিকের দিকে। তার চোখ সিল ও তাদের শ্বাস নেয়ার গর্ত খুঁজতে থাকে। অনেকগুলো গর্ত চোখে পড়ে তার। ক্যাম্প করে পরে এসে দেখা যাবে এগুলো- ভাবে সে।
ক্যাম্পিং সাইটে পৌঁছে যায় ব্রাডলি। তাঁবু খাটানো হয়ে গেলে আগে পানি ফুটিয়ে চা খায়। ম্যাট্রেস বিছায় তাঁবুর ভেতরে। তারপর মাকে রেডিওতে জানায় যে সে নিরাপদেই ক্যাম্প সাইটে পৌঁছেছে।
খাবার পর্ব সেরে সিল শিকারের জন্য প্রস্তুত হয় সে। কিছু শিকারের সরঞ্জাম ক্যামোটিকে তোলে। শ্বামোবাইলে তেল ভরে নেয়। তারপর যেখানে সিল ও তাদের শ্বাস নেয়ার গর্ত দেখেছিল, সে স্থানের দিকে রওনা হয়। কাছাকাছি পৌঁছতেই একটি সিল দেখতে পায়। সিলটির দিকে এগোয়। এ সময় বাবার কথা মনে পড়ে তার। তিনি তাকে শিখিয়েছিলেন কী করে বিরক্ত না করে ঘুমন্ত সিলের কাছে পৌঁছনো যায়। সে কথা মাথায় রেখে সিলটাকে গুলি করার দূরত্বে পৌঁছে যায় সে। .২২৩ ক্যালিবারের রাইফেল তুলে নেয় হাতে, তারপর গুলি করে সিলের মাথার ডান দিকে। গুলিবিদ্ধ সিলটি কয়েকবার ওলট পালট খেয়ে পড়ে যায় কাছের একটি শ্বাস নেয়ার গর্তে। সেখান থেকে তাকে তুলে এনে নিজের মনেই বলে ব্রাডলি-
: যাক, এ বছরের প্রথম সিলটা শিকার করতে পেরেছি।
সিলটিকে ক্যামোটিকে টেনে তোলে সে। এ সময় তার মনে পড়ে যায় বাবা তাকে সিল ও অন্যান্য প্রাণী শিকারের শিক্ষা দিয়েছেন। সিলটিকে ভালো করে বেঁধে সে রওনা হয় ক্যাম্পের দিকে।
সিলের চামড়া ছাড়ায় ব্রাডলি। সূর্যতাপ থেকে রক্ষা করতে ছালটি রেখে দেয় ক্যামোটিকের নিচে। সবটা মাংস একটি ব্যাগে ভরে। খানিকটা নিয়ে রান্না করে। পেট ভরে খাওয়ার পর শুয়ে পড়ে সে। অনেক নাত্তিয়াভিনিক ও কানগুক শিকারের কথা ভাবতে ভাবতে এক সময় ঘুমিয়ে যায়।
সকালে উঠে প্রথমে কফি খাওয়ার জন্য পানি ফুটিয়ে নেয় ব্রাডলি। তারপর নাশতা সারে। এবার বেরোবে সে। দিনের কী অবস্থা দেখার জন্য বাইরে আসে। শিকারের জন্য খুবই ভালো আবহাওয়া দেখে তার মনও ভালো হয়ে যায়। স্নোমোবাইলে তেল ভরার পর ব্যাকপ্যাকে কিছু খাবার ও গুলি ভরে সেটা কামোটিকে রেখে শক্ত করে বাঁধে। এবার আরেকটি জরুরি কাজ আছে। রেডিওতে মাকে জানায় যে শিকারে যাচ্ছে সে। ফিরতে সন্ধ্যা হবে।
প্রায় ঘণ্টাখানেক গাড়ি চালানোর পর একটি শ্বাস নেয়ার গর্ত দেখতে পায় ব্রাডলি। এখানে নাত্তিয়াভিনিক থাকার লক্ষণ খোঁজে সে। কিছু সাদা পশম। সিলদের চামড়া ঘন ধূসর রঙে পরিবর্তিত হওয়ার আগে শরীরের সব সাদা পশম ঝরে পড়ে। অথবা শ্বাস নেয়ার আরো কিছু গর্ত। আরো গর্ত খুঁজে পায় সে। এখানে নাত্তিয়াভিনিক আছে বলে নিশ্চিত হয়। একটি শ্বাস নেয়ার গর্ত বেছে নিয়ে সিলের আসার অপেক্ষা করতে থাকে। অল্পক্ষণ পরই পানিতে ছলাৎ শব্দ ওঠে। সিল এসে গেছে। হাতে একটি হুক নিয়ে তৈরি হয় ব্রাডলি। সিলটি শ্বাস নেয়ার জন্য পানির ওপরে মাথা তুলত্ইে সেটিকে হুকে গেঁথে ফেলে। নিয়ে আসে গর্তের বাইরে। ছাল ছাড়িয়ে সব মাংস ব্যাগে ভরে ক্যামোটিকে রাখে। তারপর হাত পরিষ্কার করে আরেকটা সিল শিকারের জন্য তৈরি হয়।
খানিকটা পথ পাড়ি দেয়ার পর হঠাৎ করে থেমে যায় স্নোমোবাইল। সে গাড়িটা স্টার্ট দেয়ার জন্য খানিকক্ষণ চেষ্টা করে, পারে না। টুল বক্স বের করে সে। খুলে ফেলে ইঞ্জিন। দেখে, পিস্টন ভেঙে গেছে। তার কাছে স্পেয়ার নেই। ভীষণ খারাপ হয়ে গেল ব্যাপারটা। স্নোমোবাইল ছাড়া এখানে কারো পক্ষে চলাফেরা করা অসম্ভব। এখন হেঁটে ক্যাম্পে ফেরা ছাড়া তার উপায় নেই। তাই অচল স্নোমোবাইল রেখে ক্যাম্পের দিকে হাঁটতে শুরু করে সে। ক্যাম্পে পৌঁছতে তাকে ৩০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হবে। একে হাড় কাঁপানো ঠান্ডা, তার ওপর পুরো এলাকা বরফের চাদরে ঢাকা। ছোট ক্যামোটিকটা টেনে নিতে হচ্ছে তাকে। এটা এক বাড়তি ঝামেলা। ২০ মিনিট হাঁটার পর সে এত ক্লান্ত হয়ে পড়ে যে ক্যামোটিকটা আর টেনে না নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। পয়েন্ট ২২৩ রাইফেলটা হাতে নিয়ে হাঁটতে থাকে সে।
হাঁটতে হাঁটতে অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিল ব্রাডলি। সিলের শ্বাস নেয়ার এক গর্তে পড়ে যায় সে। ভিজে যায় তার পোশাক। এমনিতেই প্রচন্ড ঠান্ডা, তার ওপর ভেজা কাপড়। তার কোনো ধারণাই ছিল না যে ঠান্ডা এত ভয়ঙ্কর হতে পারে। কিছুক্ষণের জন্য থামে ব্রাডলি। ভেজা জামাকাপড় খুলে ফেলে যতটা সম্ভব পানি নিংড়ে ফেলে চেষ্টা করে একটু শুকানোর। তারপর আবার হাঁটতে থাকে সেগুলো পরে। শরীর গরম রাখার জন্য জগিং করে ও মাঝেমধ্যে বিশ্রাম নিয়ে অবশেষে ক্যাম্পে ফেরে সে। বিরাট ঝুঁকি সৃষ্টি হয়েছে। তাই দেরি না করে সাহায্য চেয়ে মেসেজ পাঠায় সে রেডিওতে। এখন শুধু সাড়ার অপেক্ষা।
ভোর ৪টা বাজে। পরিবার বা অন্য কারো কাছ থেকেই সাড়া আসেনি। আশঙ্কা চেপে বসে মনে। এক কাপ চায়ের জন্য একটু পানি গরম করা বা একটু সিলের মাংস রাঁধার জন্য কিছু কাঠের জন্য এদিক ওদিক তাকায় সে। পেয়ে যায়। আগুন জ্বালিয়ে এক কাপ চা তৈরি করে খেয়ে নেয়। তারপর সিলের খানিকটা মাংস নিয়ে রান্না বসায়। মাংস রান্না হতে সময় লাগবে। এ সময় সে রেডিওতে তার মা বা শহরের আর কারো সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করে। ইঙ্গনিরতালিকের কাছাকাছি জায়গায় তার স্নোমোবাইল অচল হয়ে গেছে। তাকে এখান থেকে উদ্ধার করতে হবে। কিন্তু কারো সাড়া মেলে না। মনটা খারাপ হয়ে যায়। মাংসটা রান্না হয়ে গেছে। খেয়ে ঘুমাতে যায় সে। সকালে উঠে ক্যামোটিকটা নিয়ে আসতে হবে।
ঘুম থেকে জেগে আরেকবার সে চেষ্টা করে রেডিওতে যোগাযোগের। পায় না কাউকে। কী আর করা। এখন ক্যামোটিকটা ফিরিয়ে আনতে হবে ক্যাম্পে। কারণ তার ভেতরে জরুরি সব জিনিসপত্র আছে। বহু সময় পর ক্যামোটিকের কাছে পৌঁছে ব্রাডলি। প্রথমেই স্টোভটা বের করে পানি ফুটিয়ে চা বানায়। এ মুহূর্তে ভীষণ ভালো লাগে তার চা-টুকু। এ সময় তার মাথায় চিন্তা ঢুকে পড়ে। সে যদি রেডিওতে কারো সাথে যোগাযোগ করতে না পারে তাহলে সে বাড়ি ফিরবে কি করে? চা খাওয়া শেষ করে স্টোভ ক্যামোটিকে ঢোকায় স্টোভ। তারপর সেটা নিয়ে ক্যাম্পের ফিরতি পথ ধরে।
একটানা ১৫ কিলোমিটার হেঁটে থামে ব্রাডলি। একটু রেস্ট নেয়া দরকার। ক্যামোটিকের উপর বসে পড়ে সে। সে সময় একটি প্লেনের আওয়াজ কানে আসে তার। খুশিতে লাফিয়ে ওঠে সে। সেটা নিশ্চয়ই তার খোঁজে এসেছে। কিন্তু প্লেনটিকে খুঁজে পেতে কষ্ট হয় তার। তা এত ওপরে যে ধোঁয়া সৃষ্টি করে বা আর কোনোভাবে সেটাকে সঙ্কেত দেয়া সম্ভব নয়। তাই বৃথা চেষ্টা না করে ক্যামোটিকের ওপর বসে আরো কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেয় সে। ক্যাম্প এখনো ১৫ কিলোমিটার। ব্রাডলি হাঁটতে শুরু করে।
এক সময় একটা মেরু ভল্লুক দেখতে পায় ব্রাডলি। তার দিকেই আসছে ওটা। সে দাঁড়িয়ে পড়ে ক্যামোটিকের মধ্যে হুক বা হারপুন খুঁজতে থাকে। এ মেরু ভল্লুকগুলো খুবই হিংস্র ও ভয়ঙ্কর প্রকৃতির হয়ে থাকে। তাদের কবলে কোনো মানুষ পড়লে বাঁচা কঠিন। ক্যামোটিকের উপর বসে পড়ে সে। মনে মনে আশা করতে থাকে যে ওটা তার দিকে আসবে না। হঠাৎ তার সিলের মাংসের কথা মনে পড়ে। দ্রুত কিছু মাংস বের করে সে। ক্যামোটিক থেকে বেশ কিছটা দূরে রেখে দেয়। তারপর অপেক্ষা করতে থাকে কি ঘটে তা দেখার জন্য। মেরু ভল্লুকটি সিলের মাংসের গন্ধ পেয়ে সেদিকে এগিয়ে আসতে থাকে। মংসের দলা দেখতে পেয়ে খেতে শুরু করে তা। ব্রাডলি পাথরের মূর্তির মত ক্যামোটিকের উপর বসে থেকে তা দেখতে থাকে। মাংস খাওয়া শেষ করে ভল্লুকটি নাক উঁচু করে বাতাসে গন্ধ নেয়। তার হয়ত আরো মাংস খাওয়ার ইচ্ছে আছে। ব্রাডলির দিকে নয়, স্নোমোবাইলের দিকে এগোতে থাকে ভয়ঙ্কর জন্তুটা। তার মনে হয়, ভল্লুকটা সম্ভবত তার গন্ধ পায়নি। ব্রাডলি একচুল না নড়ে ঠায় বসে থেকে ভল্লুকটির গতিবিধি লক্ষ করে। অচল স্নোমোবাইলের কাছে গিয়ে প্রাণীটি আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। আরেক দিকে চলে যেতে থাকে সেটা।
ভল্লুকটি চলে যাচ্ছে। চোখের আড়াল না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করে ব্রাডলি। তারপর সে আবার হাঁটতে শুরু করে তার ক্যাম্পের দিকে। চলতে চলতে বারবার পেছনে ফিরে তাকায় সে। দেখে ভল্লুকটা পেছন পেছন আসছে কিনা। ঘণ্টাখানেক হাঁটার পর থামে সে। চায়ের তেষ্টা পেয়েছে। চা খেতে খেতে সতর্ক চোখে চারদিকে তাকায়। অবাক হয়ে দেখে, তার ক্যাম্প বেশি দূরে নয়। তড়িঘড়ি করে চা শেষ করে সরঞ্জাম ঢোকায় ক্যামোটিকে। তারপর আরো আধ ঘণ্টা হেঁটে পৌঁছে যায় ক্যাম্পে।
ঘড়ি দেখে ব্রাডলি। রোববার রাত ১০টা বেজে ৩৪ মিনিট। শহর বা ক্যাম্পিং করতে বাইরে থাকা কারো সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করে সে। একজনের সাড়া পায়। তার চেয়ে শহরের খানিকটা কাছে আছে সে। ব্রাডলি তাকে অনুরোধ করে সে যেন তার পরিবারের সাথে যোগাযোগ করে এবং তার স্নোমোবাইল অচল হয়ে যাওয়ার কথা জানিয়ে দেয়।
সেই অপরিচিত লোকটি জিজ্ঞেস করে-
: তুমি কি একা?
: হ্যাঁ।
: ঠিক আছে। আমি তোমার পরিবারের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করব এবং তাদের জানাব যে তুমি ভালো আছ। এদিকে শহরের সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ পার্টিকেও তোমার কথা জানিয়ে দিচ্ছি।
: ধন্যবাদ। আমি আমার পরিবারের সাথে তোমার যোগাযোগের অপেক্ষায় রইলাম। বলে ব্রাডলি।
একটু স্বস্তি বোধ জেগে ওঠে ব্রাডলির মধ্যে। আরো সিলের মাংস রান্নার ব্যবস্থা করে সে। আর অপেক্ষায় থাকে কখন তার পরিবার তার সাথে যোগাযোগ করে।
বেশি সময় যায়নি। রেডিও জীবন্ত হয়ে ওঠে। মা।
: ব্রাডলি, তুই কেমন আছিস বাবা? মায়ের গলায় প্রচন্ড উৎকণ্ঠা।
: আমি ভালো আছি মা। বেশি চিন্তা করো না।
: তুই গত রাতে যোগাযোগ করলি না কেন? তোকে বারবার বলেছি না কিছু হলে সাথে সাথে জানাবি?
: খুব চেষ্টা করেছি মা, তোমাদের কারো সাড়া পাইনি। একটা কথা মা।
ব্রাডলির মনের ভেতর মেরু ভল্লুকের কথাটি মাকে বলার জন্য ঘুরঘুর করছিল।
: কি কথা? বল তো শুনি।
ঘটনাটা বলে সে। মা বলেন-
: বলিস কি! খুব বাঁচা বেঁচে গেছিস। খুব সাবধানে থাকিস বাবা। আর যত তাড়াতাড়ি পারিস ফিরে আয়। আমরা তোর উদ্ধারের জন্য রেসকিউ পার্টি পাঠানোর ব্যবস্থা করছি।
ব্রাডলি বেশি করে সিলের মাংস রান্না করতে বসে। রেসকিউ পার্টির যারা আসবে তাদের তো কিছু খেতে দিতে হবে। বাবার শিক্ষার কথা মন পড়ে তার। বৈরী পরিবেশে ও সঙ্কটকালে কিভাবে বেঁচে থাকার চেষ্টা করতে হয় তা তিনি শিখিয়েছেন।
সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ টিম আসতে সময় লাগবে। ক্যাম্পের বাইরে এসে দাঁড়ায় ব্রাডলি। তার সাথে একটি ছোট বাইনোকুলার আছে। তা দিয়ে চারপাশে খুঁটিয়ে দেখে কোনো মেরু ভল্লুক আছে কিনা। না নেই। সে তাঁবুর ভেতরে ঢোকে মাংস রান্নার অবস্থা দেখার জন্য। এ সময় উত্তর দিকে থেকে একটি স্নোমোবাইল আসার আওয়াজ পায় সে। বাইনোকুলার হাতে আবার বেরিয়ে আসে সে বাইরে। একটি ¯েœামোবাইল আসছে। এখনো দূরে, এটা তবে রেসকিউ পার্টির নয়। আনন্দিত ব্রাডলি দৌড়াতে শুরু করে সেটার দিকে।
স্নোমোবাইলে দু’ জন মানুষ। একজন বয়স্ক। তাকে দেখে চিনতে পারে সে। তার বাবার বন্ধু। কিলুকিশাক। আরেকজনের নাম জর্জ, কিলুকিশাকের নাতি, তার সমবয়সী। তার বাবার কাছ থেকে তাকে উদ্ধার করার অনুরোধ পেয়ে তারা বেরিয়ে পড়েছেন তার খোঁজে। ব্রাডলিকে ক্যামোটিকে তুলে নিয়ে তার ক্যাম্পে চলে আসেন তারা। সবাই মিলে সিলের মাংস খেতে বসে।
: বা! তোমার রান্না তো বেশ ভালো। আরাম করে খেতে খেতে বলেন কিলুকিশাক।
: আরেকটু দেই?
খুশি হয়ে জিজ্ঞেস করে ব্রাডলি।
মায়ের সাথে কথা বলে ব্রাডলি। কিলুকিশাকের কথা বলে। খুশি হন মা। বলেন-
: তাকে আমার আর তোর বাবার পক্ষ থেকে ধন্যবাদ জানা। আর হ্যাঁ, কখন রওনা হচ্ছিস তোরা?
: আজ তো সন্ধ্যা হয়ে গেছে। কাল সকালে রওনা হওয়াই ভালো হবে মনে হয়। তুমি চিন্তা করো না মা।
কিলুকিশাক তার কথা শুনছিলেন। রেডিও অফ হলে তিনি বললেন-
: ঠিক বলেছ। রাতটা এখানে কাটিয়ে সকালে রওনা হবো আমরা।
কিলুকিশাক ব্রাডলির কাছে তার গল্প শোনেন মনোযোগ দিয়ে। মেরু ভল্লুকের কথা শোনার পর বলেন, সিলের মাংসটা না দিলে ভয়ঙ্কর বিপদ হতো তোমার। এই প্রাণীগুলো এত হিংস্র যে তাদের সামনে পড়লে সাধারণত মানুষ বাঁচে না। যাক, স্রষ্টাকে ধন্যবাদ তোমার কিছু হয়নি। আর আমরা ফিরে যাওয়ার সময় তোমার অচল মোবাইলটাকে বেঁধে নিয়ে যাবো।
রাত ন’টার পর ঘুমাতে যায় তারা। গল্পের মধ্যে এক ফাঁকে উঠে গিয়ে তাদের দু’জনের জন্য তাঁবু খাটিয়ে এসেছে জর্জ।
মা-বাবাসহ পরিবারের সবাই ব্রাডলির জন্য অপেক্ষা করছিলেন। সে বাড়ি পৌঁছতেই খুশির রোল ওঠে। মা তাকে জড়িয়ে ধরে চুমু খান। অনেক প্রশ্নের জবাব দিতে হয় তাকে।
আনন্দের রেশ একটু থিতিয়ে এলে বাবা ও মা তার পাশে এসে বসেন। মা বলেন-
: তোমার জন্য একটা শাস্তির ব্যবস্থা করা হয়েছে।
: শাস্তি? একটু যেন ভয় পায় ব্রাডলি।
: হ্যাঁ, এর পরে শহর থেকে ৪০ কি মি-এর বেশি দূরত্বে ক্যাম্পিংয়ে যাওয়া চলবে না তোমার। এটা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত।
বাবার দিকে তাকায় সে। মাথা নেড়ে মায়ের সিদ্ধান্তের প্রতি সমর্থন দেন তিনি।
তার জন্য মা-বাবার উদ্বেগের গভীরতা উপলব্ধি করে সে। আস্তে করে বলে-
: ঠিক আছে মা। হ

লেখক : বার্নার্ড ম্যাকটারের জন্ম কানাডার বরফ ঢাকা অঞ্চল নুনাভুত-এ ১৯৮০ সালে। তিনি ইন্টারনেটে গল্প লিখে জনপ্রিয় হয়েছেন।

SHARE

Leave a Reply