Home গল্প বন্ধু বটে -আবদুল ওহাব আজাদ

বন্ধু বটে -আবদুল ওহাব আজাদ

সরাপপুর লঞ্চঘাট।
লঞ্চঘাটে লোকে লোকারণ্য। কয়দিন পরই ঈদ।
শহর থেকে গ্রামের দিকে লোকজন আসতে শুরু করেছে। কেউ যানজটের ঝুঁকি এড়াতে অগ্রিম এসেছে। সরাপপুর বাজারটাও এখন জমজমাট মনে হয়। অনেক রাত অবধি লোকজন থাকে। কেউ কেউ থাকে প্রিয়জনের অপেক্ষায়। এই লঞ্চে বুঝি সে এলো, না হলে পরবর্তী লঞ্চ এভাবেই অনেক রাত হয়ে যায়।
খোকা ফলের ঝুড়ি গলায় ঝুলিয়ে লঞ্চঘাটে হেঁকে যায়, ‘ভালো কমলা, আঙ্গুর পাবেন স্যার আপেল পাবেন কাশ্মিরি আপেল।’
খোকার কথা শুনে কেউ কেউ আবার কমলার গায়ে হাত দিয়ে বলে,
‘বাড়িতে অসুস্থ রোগী আছে, কমলা টক হবে না তো?’
খোকা জোর গলায় বলে,
‘কমলা টক হলে কাল লঞ্চঘাট থেকে টাকাটা ফেরত নিয়ে যাবেন।’
হ্যাঁ, ঐতো একটা লঞ্চ আসছে।
লঞ্চঘাটে এসে ভিড়তেই যাত্রীরা বাক্স পেটরা নিয়ে নামতে শুরু করে। এ সময় খোকার অনেক ফল বিক্রি হয়। আজও অনেক কাটতি, ফল থাকলে হয়তো আরো অনেক কাটতি হতো, আজ ঘাটে যথেষ্ট লোকের ভিড়। কিছুক্ষণের মধ্যে ‘মুক্ত বাংলাদেশ’ নামের লঞ্চখানা ঘাটে এসে থামে। লঞ্চ থেকে তক্তা নামিয়ে দেয়া হয় যাত্রীদের নামার জন্য। খোকা দৌড়ে আসে ফলের ঝুড়ি নিয়ে। হঠাৎ চোখ পড়ে রেজার দিকে, পুরনো দিনের বন্ধু সে, সাথে রেজার আব্বা, আম্মা আছেন। রেজা নামতে ভয় পাচ্ছে। তক্তাখানা পা দিয়ে চেপে ধরে বলল, ভয় পেয়ো না বন্ধু তুমি পড়বে না এই দ্যাখো আমি তক্তাখানা পা দিয়ে ধরে রেখেছি।
রেজার আব্বা আম্মা অবাক হয়, তারা বলাবলি করতে থাকে হয়তো ফল বিক্রির জন্য ছেলেটি এমন করছে।
কাঠবিড়ালির মত সন্তর্পণে নামে রেজা, খোকা রেজার গায়ে হাত বুলিয়ে বলে,
‘ভালো আছো বন্ধু!’
রেজার চিনতে কষ্ট হয় খোকাকে, তাই খানিকটা আমতা আমতা করেই রেজা বলেÑ
‘তুমি খোকা না?’
‘হ্যাঁ বন্ধু আমি খোকা; এখন ব্যবসা করি। এই দেখো না কত রকমের ফল আমার ঝুড়িতে। এখন ভালো আছি বন্ধু, আর আমাকে আগের মতো ভিক্ষা করতে হয় না।
রেজার মনে পড়ে পুরনো দিনের কথা, আজ থেকে প্রায় তিন চার বছর আগের কথা…
রেজা সেবার ঈদে শহর থেকে গ্রামে এসেছে। মলিন মুখ খোকার গায়ে ময়লা ছেঁড়া কাপড় চোপড়, মাথায় চুল উসকো-খুসকো, দেখে মনে হয় কতদিন তেল পড়েনি।
রেজা দেখলো একটা অপরিচিত ছেলে তার দিকে তাকিয়ে আছে, রেজা অভয় দিয়ে বলল,
‘তুমি কিছু বলবে?’
‘হ্যাঁ আমায় কিছু ভিক্ষে দেবেন।’
‘আমার কাছে তো দেয়ার মত তেমন টাকা পয়সা নেই। আচ্ছা কাল সকালে তুমি আমার গ্রামের বাড়িতে এসো, নদীটা পার হলেই আমাদের গ্রাম, আর আমার নাম রেজা, আমার আব্বার নাম, সেলিম মাহমুদ এসো কিন্তু!
‘আচ্ছা!’
পরদিন সকালে খোকা যথাসময়ে পৌঁছালো রেজাদের বাড়িতে, রেজা বলল,
তুমি এসেছ তাহলে?
খোকা বলল,
ঐ যে আপনি আসতি বলিলেন।
অপরিচিত একটি ছেলের কণ্ঠস্বর শুনে বাইরে বেরিয়ে এলেন সেলিম সাহেব। দেখলেন গত দিনের সেই ছেলেটি সেলিম সাহেব বললেন, ‘এই ছেলে তোমার কী চাই?’
‘ভিক্ষে করি সাহেব দু’দশ টাকা যদি দেন।’
‘ভিক্ষে করো কেন? যে কোন একটা ব্যবসা করলে তো পারো।’
ব্যবসা করতি হলিতো অনেক পুঁজি দরকার টাকা পাবো কনে সাহেব।
একখানা ৫ টাকার নোট খোকার হাতে ধরিয়ে সেলিম সাহেব ভেতরে চলে গেলেন।
খোকা টাকাটা হাতে ধরে বলল,
‘এই টাকায় কি ব্যবসা হয় সাহেব?’
রেজা তাকে কাছে ডেকে বসতে বলল। তারপর জিজ্ঞসা করলো,
‘কি নাম যেন তোমার?’
‘খোকা!’
‘তুমি খোকা আর আমি রেজা, আচ্ছা খোকা, ‘তুমি কত টাকা হলে ব্যবসা করতে পারবে?’
আমতা আমতা করে খোকা বলে,
‘তা অভাবে পাঁচ শ’ টাকা,’ খোকাকে বসতে বলে ভেতরে যায় রেজা তার টিফিন খরচ বাঁচানো পাঁচ শ’ টাকার একখানা নোট খোকার দিকে বাড়িয়ে বলে,
সত্যি তুমি ভিক্ষে ছেড়ে ব্যবসা করবে তো?
হ্যাঁ।
খোকা পাল্টা প্রশ্ন করে,
‘তার আগে বলো, তুমি আমায় এত টাকা দিলে কেন?’
রেজা হেসে বলে,
‘ও এই কথা, গরিবদের সাহায্য করতে হয়! বুঝলে তাহলে আল্লাহপাকও সন্তুষ্ট হন।’
‘আমাদের ক্লাসের মাওলানা স্যার বলেছেন, কোন গরিবকে সাহায্য করলে, তাকে বন্ধু ভাবলে আল্লাহ পাকও তাকে বন্ধু মনে করেন, তাই আমি তোমাকে বন্ধু মনে করে টাকাটা দিয়েছি তুমি আমার বন্ধু।’
‘বন্ধু?’
‘হ্যাঁ বন্ধু, বলো বন্ধু আর তুমি ভিক্ষে করবে না?’
ভিক্ষে করা খারাপ কাজ, ভিক্ষে করলে কেউ তাকে ভালোবাসে না। সবাই তাকে ভর্ৎসনা করে। চোখ দুটো ছলছল করে ওঠে খোকার। নোটখানা হাতে নিয়ে খোকা বলে, তুমি আমাকে টাকা দিলে, তোমার বাবা-মা তোমাকে বকবে না?
কে বকবে, আমি তো আমার টাকা দিয়েছি, আমি আমার টিফিন খরচ বাঁচানো টাকা তোমায় দিয়েছি। সপ্তাহখানেক গ্রামে আছি, পারলে দু’একবার দেখা করে যেও কেমন?
খোকা ঘাড় নেড়ে পথে নামে,
সেলিম সাহেব ছেলেকে ভর্ৎসনা করে বলেছিলেন, এই বয়সে অত দানবীর হওয়া ভালো নয়, সব কিছুর একটা সীমা থাকা দরকার। ছেলেটি যে তোমাকে চিট করেনি তার বা প্রমাণ কী?
রেজা ফিরে আসে আবার সরাপপুর লঞ্চঘাটে। বড় ভালো লাগছে খোকাকে দেখে, খোকা তার কথা রেখেছে।
খোকা ঝুড়ি থেকে একটা কমলালেবু আর কিছু আঙ্গুর নিয়ে রেজার দিকে বাড়িয়ে বলে, ‘এগুলো খাও বন্ধু।’
রেজা আপত্তি জানায়, তখন খোকা বলে, ‘কেউ কি বন্ধুর জিনিস ফিরিয়ে দেয়।’
অবশেষে খোকার দেয়া ফলগুলো সাদরে গ্রহণ করে রেজা। বিষয়টি সেলিম মাহমুদের চোখ এড়ালো না, তাঁরও মনে পড়ে যায় সেদিনের কথা।
রেজা বলল,
‘কাল একবার তুমি আমাদের বাড়িতে এসো বন্ধু।’
রেজা আব্বা-আম্মার পেছন থেকে খোকাকে ডাকলো।
‘বন্ধু শোনো?’
রেজা থমকে দাঁড়ায়।
খোকা পকেট থেকে পাঁচ শ’ টাকার একখানা নোট রেজার দিকে বাড়িয়ে বলে,
‘বন্ধু তোমার টাকাটা নাও।’
রেজা বলে,
‘ওটা তুমি রাখো বন্ধু, ওটা তো তোমায় আামি দিয়ে দিয়েছি।’
‘খোকা তবু নাছোড়বান্দা। বলে, না বন্ধু টাকাটা তুমি নাও।’
‘এবার সেলিম সাহেব মুখ খুললেন।’ ‘সেদিন আমি তোমায় ভুল বুঝেছিলাম সবাইকে যে এক পাল্লায় মাপতে নেই সেটিই আমি ভুলে গিয়েছিলাম, খোকা আমি তোমার ব্যবহারে মুগ্ধ, তুমি তোমার কথা রেখেছ। তাই আমি তোমার ব্যবহারে সষ্ট হয়ে আরো পাঁচ শ’ টাকা তোমায় দান করলাম, তুমি ব্যবসা করে অনেক বড় হবে। আমি তোমার জন্য প্রাণ খুলে দোয়া করি।’
সেলিম সাহেব টাকাটা এক রকম জোর করেই খোকার হাতে ধরিয়ে দিলেন। খোকার চোখে পানি। এ বুঝি তার আনন্দ অশ্রু! হ

SHARE

Leave a Reply