Home গল্প গোঁফওয়ালা ছেলেধরা -কামরুল আলম

গোঁফওয়ালা ছেলেধরা -কামরুল আলম

মিশুকে লোকটি চকোলেট অফার করলো। মিশু হাত বাড়িয়েই পরে আবার কী যেন ভেবে গুটিয়ে নিলো হাত। সেই সাথে ধীরে ধীরে পেছন দিকে সরতে লাগলো। লোকটির মুখে ইয়া বড়ো গোঁফ। মাথার অর্ধেকটা চুলে ভরা, অর্ধেক খালি। শ্রাবণ মাস চলছে। বর্ষাকালেও তীব্র গরম পড়েছে ক’দিন যাবৎ। আজকেও উচ্চতাপমাত্রা। কড়া রোদে ঘাম ঝরছে লোকটির শরীরে। বিশেষ করে মাথার তালু থেকে তেলের মতো ঘামের ফোঁটাগুলো দেখতে খানিকটা ঘিন্নাই লাগছে মিশুর।
মিশু পড়ে ক্লাস ফাইভে। এবারই তার পিইসি ফাইনাল পরীক্ষা। এ পরীক্ষায় পাস করার পর তাকে শহরে পাঠিয়ে দেবেন তার বাবা-মা। শহরের কোনো ভালো স্কুলের হোস্টেলে থেকেই পড়ালেখা করতে হবে তাকে। মিশু লোকটি থেকে অনেকটা দূরে সরে গেছে এতক্ষণে। লোকটি ছেলেধরা নয়তো? ভাবতেই গা শিউরে উঠলো ওর। মা বলেছেন, ছেলেধরা প্রথমে চকোলেট বা যে কোনো খাবার অফার করে। এই চকোলেটেই হয়তো ওষুধ মেশানো ছিল। মিশু যদি চকোলেট গ্রহণ করে খেয়ে ফেলতো হয়তো এতক্ষণে অজ্ঞান হয়ে যেত সে। আর ছেলেধরাটি তাকে নিয়ে চলে যেত! আর ভাবতে পারছে না সে। দ্রুতবেগে বাড়ির দিকে ছুটে চললো।
গ্রামের বড় সড়ক থেকে মিশুদের বাড়িতে যেতে খানিকটা কাঁচা একটি সরুপথে হাঁটতে হয়। এটা ওদের বাড়ির নিজস্ব রাস্তা। অন্যান্য বাড়ি মূল সড়কের পাশে হলেও মিশুদের বাড়ি সড়ক থেকে একটু দূরে। ক্লাস টু পর্যন্ত মিশুকে এ পথটি পর্যন্ত একা যেতে দিতেন না মিশুর বাবা আহসান হাবীব। কিন্তু এখন ও বড় হয়ে গেছে ধরে নিয়ে একলা স্কুলে বা গ্রামের বাজারে অবাধে চলাচলের সুযোগ করে দিয়েছেন। সরুপথটি পেরিয়ে নিজ বাড়ির পুকুরপাড়ে পৌঁছে গেছে মিশু। এ সময় ভূত দেখার মতোই চমকে উঠলো সে। তার সম্মুখে দাঁড়িয়ে সেই ছেলেধরাটি। এই গোঁফওয়ালা লোকটি যেন তাদের বাড়ি থেকেই বেরিয়ে আসছে! এটা কী করে সম্ভব? সে তো লোকটিকে বাজারের পশ্চিম পাশে রেখেই এসেছে। লোকটি মিশুর পথ আগলে দাঁড়ালো।
‘কে আপনি? আমার পথ আটকাচ্ছেন কেন?’ গলায় জোর দিয়ে চিৎকার করতে করতে বললো মিশু। লোকটি ভয় পেয়ে দ্রুত পথ ছেড়ে দিল। তারপর হনহন করে বেরিয়ে গেল বাড়ি থেকে। মিশু দ্রুত তাদের ঘরে গিয়ে ঢুকলো। হাঁপাতে লাগলো সে। মিশুর মা চিৎকারের কিছু অংশ শুনতে পেয়ে ঘর থেকে বের হয়েছিলেন। মিশুকে হাঁপাতে দেখে আঁতকে উঠলেন তিনি। ‘কী হয়েছে বাবা আমার?’ জানতে চাইলেন।
‘মা, একটা লোক আমাকে মানে ছেলেধরা আমাকে নিতে এসেছিল…।’
‘বলিস কি? তুই কিভাবে বুঝলি ও ছেলেধরা?’
মিশু সম্পূর্ণ ঘটনা বললো। মা ও ছেলে দু’জনেই ভয়ে কম্পমান প্রায়। রাতের বেলা মিশুর বাবা ঘরে এলে ঘটনাটি জানালেন মিশুর মা। ‘কিন্তু মিশুর বর্ণনা অনুযায়ী গোঁফওয়ালা লোকটি মিশুর আগেই বাড়ির পুকুরপাড় অবধি এলো কী করে?’ বিড় বিড় করে বললেন মিশুর বাবা। পেশায় তিনি একজন ব্যবসায়ী। বাজারে বড়ো একটা শপিংমল রয়েছে তাঁর।
‘আমরাও তাই ভাবছিলাম।’
‘বাজার থেকে পেছন দিকে যে খালটা রয়েছে ওটা পার হয়ে ধানক্ষেতের মাঝ দিয়ে বাড়ির পেছন দিকে আসেনি তো লোকটি?’ বললেন মিশুর বাবা।
‘হয়তো বা তাই হবে।’ মুখে হাই তুলতে তুলতে বললেন মিশুর মা। কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়লেন তারা।
পরদিন সকালে মিশুকে স্কুলে নিয়ে গেলেন ওর বাবা। বললেন, ‘স্কুল ছুটি হলেও আমি না আসা পর্যন্ত তুমি বের হবে না।’ মিশু তাই করলো। মিশুর বাবা ওকে বাড়িতে পৌঁছে দিলেন। এভাবে নতুন করে ছেলেধরার ভয়ে প্রতিদিনই মিশুর বাবা ছেলেকে আনা নেয়ার কাজটি শুরু করে দিলেন। এর মধ্যেই ঘটে গেল ঘটনাটি। একদিন স্কুল ছুটির পর মিশুর বাবা আসতে দেরি হচ্ছিল। মিশুও স্কুল গেটে অপেক্ষা করতে লাগলো। এমন সময় দেখতে পেল সেই গোঁফওয়ালা লোকটি তাকে হাত ইশারায় কাছে ডাকছে। মিশু দ্রুত স্কুলের ভেতরে প্রবেশ করলো। স্কুলের ছেলেমেয়েরা চলে গেছে সবাই। কেবল দারোয়ান আর আয়ারা আছে। হেডস্যারও বের হওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। অন্যান্য স্যাররাও চলে গেছেন। মিশু কী করবে ভেবে না পেয়ে সোজা গিয়ে হেডস্যারের কক্ষেই প্রবেশ করলো। হাঁপাতে হাঁপাতে কোনোমতে উচ্চারণ করলো, ‘স্যার, ছেলেধরা!’
হেডস্যার মিহির কান্তি চৌধুরী ‘কই দেখি’ বলে স্কুল গেটের দিকে চললেন। মিশুও চললো স্যারের পিছু পিছু। তারা দু’জনে গিয়ে তো অবাক। সেই গোঁফওয়ালা লোকটিকে জড়িয়ে ধরেছেন মিশুর বাবা। ‘স্যার, বাবা ছেলেধরাটিকে ধরতে পেরেছেন’ বলে উল্লাস প্রকাশ করলো মিশু। ‘আপনি তাড়াতাড়ি পুলিশকে খবর দিন স্যার’ আবার বললো মিশু। হেডস্যার মিশুর কথায় কান না দিয়ে সামনে এগিয়ে গেলেন। ততক্ষণে আলিঙ্গন মুক্ত হয়েছে গোঁফওয়ালা লোকটি। সে বলছে, ‘ভাইজান, আমি আপনাদের অনেক খুঁজেছি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এটাই ভাগ্যে ছিল। আপনারা এই এলাকায় এসে বসবাস শুরু করেছেন কবে?’
‘সে অনেক কথা, চল্ বাড়ি চল্ আগে। মুক্তিযুদ্ধে বাবা শহীদ হওয়ার পর মা নানাবাড়ি চলে যান আমাকে নিয়ে। তখন আমরা তোকে অনেক খুঁজেছি। কেউ কেউ বলতো তুই নাকি ইন্ডিয়া গেছিস্ ট্রেনিং নিতে। আমরা তোর জন্য প্রতিদিন অপেক্ষা করতাম। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মায়ের হঠাৎ করে অসুখ হলো। মাকে অনেক চেষ্টা চিকিৎসা করেও বাঁচানো গেল না।’
‘মা বেঁচে নেই ভাইজান?’ ডুকরে কেঁদে উঠলো গোঁফওয়ালা লোকটি।
ওদের দু’জনের কান্না দেখে বুক ফেটে মিশুরও কান্না চলে এলো চোখে। হেডস্যারও চোখ মুছলেন রুমাল দিয়ে। মিশু তার বাবাকে বললো, ‘বাবা লোকটিকে তুমি চেন?’
‘হ্যাঁ চিনি বাবা, এই হচ্ছে তোর গোফরান চাচ্চু। যার কথা তোকে বলতাম।’
‘চাচ্চু! কিন্তু উনিই তো আমাকে সেদিন চকোলেট অফার করেছিলেন। আমি তো উনাকে ছেলেধরা ভেবেছিলাম!’
‘হো হো করে হেসে উঠলো গোঁফওয়ালা লোকটি। বললো, ‘তুমি দেখতে অবিকল আমার ভাইজান মানে তোমার বাবার মতো হয়েছো। আমি তোমাকে দেখে আমার ছোটবেলার সেই ভাইজানের কথা ভেবেই তোমার সঙ্গে খাতির জমাতে চেয়েছিলাম।’
‘কিন্তু আমাদের পুকুরপাড়ে…’
‘হ্যাঁ, পুকুরপাড়ে তোমার পথ আটকে দাঁড়িয়েছিলাম। এটা জিজ্ঞেস করতে চেয়েছিলাম, তোমার বাবার নাম কী? কিন্তু তুমি তো সেই সুযোগ…।’
‘ও ঠিকই করেছে গোফরান। এভাবে ছোট বাচ্চাদের লোভ দেখায় কিন্তু ছেলেধরা। ও তোকে ছেলেধরাই ভেবেছিল। আমরাও।’ গোঁফওয়ালা গোফরান ”াচ্চুকে কথা শেষ করতে না দিয়েই বললেন মিশুর বাবা। তারপর তারা বাড়ির দিকে পা বাড়ালেন। পথ আগলে দাঁড়ালেন স্কুলের হেডস্যার মিহিরকান্তি। তিনি বললেন, ‘তা হয় না। একজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধার দু’জন সন্তানকে এভাবে আমার স্কুলের সম্মুখ থেকে বিদায় দিতে পারি না। আমি আপনাদের কথাবার্তা শুনেছি আহসান সাহেব। আপনার ভাই একজন মুক্তিযোদ্ধা এবং তিনি ফিরে এসেছেন। শিগ্গিরই স্কুলে একটি অনুষ্ঠান করে তাঁকে সংবর্ধিত করা হবে। আজ এখনই আমার অফিসে আপনাদের চা নাশতার নিমন্ত্রণ। ‘আসুন’, বলে তিনি তাদেরকে নিয়ে স্কুলের দিকে হাঁটতে লাগলেন। হ

SHARE

Leave a Reply