Home তোমাদের গল্প মায়ের ভালোবাসা -রুমান হাফিজ

মায়ের ভালোবাসা -রুমান হাফিজ

বাবা বিদেশ যাওয়ার পর থেকে নেহালের প্রতি মায়ের দেখা- শোনার দায়িত্ব আরেকটু বেড়ে গেলো। অসুস্থ শরীর নিয়ে এক্ষেত্রে দাদুও কম যান না। বিছানায় শুয়ে শুয়ে একমাত্র নাতির খবর নিতে থাকেন সবসময়। জরুরি কাজ ছাড়া বাইরে কোথাও খুব একটা যেতে দেন না নেহালকে। কিন্তু নেহালের এতে খুব খারাপ লাগে। খুব রাগ হয় বাবার ওপর। কেন যে তিনি চলে গেলেন বিদেশে। নেহাল কি আর বুঝে তার বাবা কি জন্য দেশ ছেড়ে বিদেশে পাড়ি দিয়েছেন। ব্যবসায় বিশালাকারে লোকসান হওয়ার পর কোন উপায়ান্তর না দেখে শেষ সম্বল ক্ষেতের জমিটুকু বিক্রি করে কিছুটা ঋণ পরিশোধ করেন। তবুও বাকি থাকে আরোও অনেক। দেশে থেকে আর ব্যবসা করা এবং ক্ষতি পুষিয়ে নেয়া সম্ভবপর নয় ভেবে পাড়ি জমান বিদেশে। নেহাল বাবাকে জড়িয়ে ধরে খুব কেঁদেছিল সেদিন। নেহালের কান্না দেখে পাশে দাঁড়ানো কেউই চোখের পানি আটকে রাখতে পারেন নি।
আজ দু’মাস হতে চলল নেহালের আব্বু বিদেশে যাওয়ার। একদিন পরপর ফোন করে সবার সাথে কথাবার্তা বলেন। প্রথম একমাস কাজ না পেলেও এখন মোটামুটিভাবে কাজ পাচ্ছেন। কয়েকদিন আগে প্রথমবারের মতো টাকা পাঠান নেহালের আব্বু। মায়ের সাথে করে টাকা আনতে যায় নেহাল। টুকটাক খরচ করে নেন সেদিন। দাদুর জন্য ঔষধ আর নেহালের জন্য নতুন জামা কিনে দিলেন। পছন্দমত জামা কিনতে পারায় এখন নেহাল খুব খুশি। স্কুলে যাওয়ার সময় নতুন কাপড়টাই পরে যায় নেহাল। এবার ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ছে। নিয়মিত স্কুলে যাওয়া নেহালের একটা বিশেষ গুণ। যার ফলে ভালো রেজাল্টের তালিকায় নেহালের নাম সবসময়ই স্থান পায়।
শুক্রবার দিন স্কুল বন্ধ। সকালবেলা আম্মুর কাছে নেহাল আবদার করে সে আজ স্কুল মাঠে খেলতে যাবে। অন্য স্কুলের ছাত্ররা খেলতে আসবে। তাদের সাথে খেলা হবে। কিন্তু আম্মু তাকে না যাওয়ার জন্য বলেন। নেহাল নাছোড়বান্দা সে যাবেই যাবে। আম্মু তাকে অনেকভাবে বুঝালেন। দেখো নেহাল, তুমি খেলতে যাবে ঠিক। তবে সেখানে অনেকেই খেলতে আসবে তাদের সবাই কি ভালো? কেউ তোমার সাথে লেগে গেলে তখন কে তোমাকে সাহায্য করবে? তা ছাড়া তোমার আব্বু বাড়িতে নেই, আমাকেই সেজন্য টেনশন করতে হবে। আমার ভালো আব্বুটা যেও না, কেমন!
এসব কথা শুনতে নারাজ নেহাল। তার একটাই কথা আজ তাকে খেলায় যেতেই হবে। এতো করে বুঝানোর পরও নেহাল বুঝতে চাইলো না দেখে আম্মু তখন নেহালকে হালকা মার দিলেন। এতেই ঘটলো বড় ঘটনা। মার খেয়ে কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি থেকে বের হয়ে যায় নেহাল। সেদিকে দৃষ্টি না দিয়েই কাজে মনোযোগী হয়ে পড়েন নেহালের আম্মু। স্কুল মাঠে সবার আগেই নেহাল পৌঁছে যায়। খেলা শেষ হয় বেলা দুইটার দিকে। সবাই যার যার বাড়ি চলে গেলেও নেহাল স্কুল মাঠেই থেকে যায়। আম্মুর প্রতি ক্ষোভ তার বৃদ্ধি পাচ্ছে। মনে মনে ভাবছে আর কখনো বাড়ি ফিরবে না। সকালবেলা কিছু না খেয়েই এসেছে এখন প্রায় শেষ বিকেল। পেটে ক্ষুধার মাত্রা বেড়েই চলছে। তবুও বাড়ি ফিরতে চাচ্ছে না নেহাল।
খেলতে গেছে ভেবে সারাদিন খুব একটা চিন্তা করেননি নেহালের আম্মু। বিকেল প্রায় শেষের দিকে হতে চলল এখনো আসছে না দেখে আম্মু খানিকটা চিন্তায় পড়ে গেলেন। এতক্ষণ হলো খেলা নিশ্চয় শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু নেহাল আসছে না কেন? মাথার মধ্যে নানা চিন্তা এসে ভিড় করতে থাকে। নেহাল খায়নি তাই আম্মুও এখনো খেতে বসেননি। দাদুকে খাইয়ে দিয়ে কেবল এসব নিয়ে ভাবছেন। দাদুও কয়েকবার জিজ্ঞেস করেছেন নেহালের কথা।
বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যা ছুঁই ছুঁই। নেহাল আসার কোনো খবর নেই। নেহালের কথা ভেবে নিজের অজান্তেই চোখ দিয়ে পানি পড়তে লাগলো। নিজের উপর ভীষণ রাগ হলো। কেন যে তিনি নেহালকে মারতে গেলেন। স্কুল বন্ধ ছিল, খেলতে যাওয়ার অনুমতি দিলেই কি এমন সমস্যা হতো!
তা হলে তো এরকম পরিস্থিতির সম্মুখীন হতো না।
চোখের পানি মুছে নিয়ে পাশের বাড়ির এক চাচাকে অনুরোধ করে নেহালকে খোঁজার জন্য। চাচা তখন পুরো গ্রাম ছাড়াও পাশের বাজারেও খোঁজ নিলেন কিন্তু কেউ কোথাও দেখছে বলে জানালো না। চাচার মাথায় হঠাৎ চিন্তা এলো নেহালের আম্মু যখন বলছে ও স্কুল মাঠে খেলতে গিয়ে আর ফিরে আসেনি, তাহলে একবার না হয় স্কুল মাঠটা দেখে আসি। হয়ত সেখানে থাকতে পারে। যেই ভাবা সেই কাজ। স্কুল মাঠে এসে তো চাচার ভাবনার পুরোপুরি প্রতিফলন ঘটলো। তার মানে নেহাল সারাদিন স্কুল মাঠেই ছিল!
চাচা নেহালকে কোলে করে বাড়িতে নিয়ে আসেন। আসা মাত্রই নেহালকে জড়িয়ে ধরে মায়ের সেকি কান্না! হৃদয় বিদারক পরিবেশের সৃষ্টি হয় তখন নেহালদের বাড়িতে। কান্নার মাত্রা দেখে মনে হচ্ছে যেন হারিয়ে যাওয়া ছেলেকে কতো বছর পর যে খুঁজে পেয়েছেন মা। মায়ের এই অবস্থা দেখে ছোট্ট নেহাল মনে মনে শপথ নেয় জীবনে আর কখনো মায়ের কথার অবাধ্য হবে না এবং মায়ের সাথে কখনো খারাপ আচরণ করবে না। চোখের পানি মুছতে মুছতে নেহালকে নিয়ে ঘরে ঢুকলেন মা।

SHARE

Leave a Reply