Home তোমাদের গল্প মিমি -মুনাওয়ার শাহাদাত

মিমি -মুনাওয়ার শাহাদাত

মিমির বয়স এখন পাঁচ। আজ তার আব্বু বিদেশ থেকে দেশে ফিরছেন। তাই আজ মিমির খুশি যেন ধরে না। সে মায়ের ডাকার আগেই সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে রান্নাঘরে মায়ের পাশে এসে দাঁড়ায়।
মা বললেন, ‘কিরে আজ ঘুম থেকে ডাকার আগেই উঠে গেলি! রাতে বুঝি ভালো ঘুম হয়নি।’
মিমি বলল, ‘হুম, ঠিক বলেছো মা। ঘুম আসবেই বা কিভাবে! আজকে যে আমার আব্বু আসছে!’
: ‘হয়েছে, আর পাকামো করতে হবে না! ফ্রেশ হয়ে নাস্তা খেয়ে নাও। আমি টেবিলে নাস্তা দিচ্ছি।’ নাস্তা খেয়ে মিমি মাকে বলল, ‘আম্মু আমাকে তাড়াতাড়ি তৈরি করে দাও না! বড় মামাতো এক্ষুনি চলে আসবে। তুমি কি ভুলে গেছো! কাল রাতে বড় মামা কী বলেছিল! ঘড়ির দিকে তাকাও। নয়টা বাজতে আর মাত্র বিশ মিনিট বাকি। মামা বলেছে, গাড়ি নিয়ে এখানে এসে আর এক মিনিটও অপেক্ষা করবেন না।’ মিমির আম্মু তার অবস্থা দেখে মুচকি হেসে বললেন, ‘মিমি, তুমি কি এয়ারপোর্টে গোসল না করেই চলে যাবে? তুমি আগে বাথরুমে গিয়ে গোসল করে এসো, তারপর আমি তোমায় তৈরি করে দিচ্ছি।’
মিমি গোসল সেরে আসতে আসতে মামা এসে উপস্থিত। মামা, মা-মেয়ে দু’জনকে একটা হালকা ঝাড়ি দিয়ে নাস্তা করতে করতে মিমিকে তার মা নতুন জামা পরিয়ে মাথায় বেণী বেঁধে তৈরি করে ফেলে। ততক্ষণে মামার রাগ অনেকটা কমে গেছে। মামা মিমিকে দেখে বলল, ‘বাহ্ আজ আমার ভাগ্নিকে তো পরীর মতো লাগছে। দেখবে তোমাকে তোমার বাবা চিনতেই পারবে না।’ মিমি বলল, ‘মামা আব্বু আমাকে চিনবে কেমন করে, তিনি তো আমার জন্মের আগেই বিদেশ চলে গেছেন। তিনি আমাকে তো কোনোদিন দেখেননি!’ মামা মিমির কথা শুনে বললেন, ‘তাই তো।’ মিমির আম্মু বলল, ‘হয়েছে হয়েছে মামা ভাগ্নির আর ঢঙ করতে হবে না। এবার রওনা হন। না হয় আবার লেট হয়ে যাবে।’ মিমির আব্বু তার মাকে তাদের সাথে এয়ারপোর্ট যেতে বলেছিল কিন্তু তিনি যাবেন না বলে দিয়েছেন। এখন মামাও রওনা দেয়ার সময় সেধে ছিলেন তিনি সবার যাওয়ার দরকার নেই বলে তাদেরকে আল্লাহ হাফেজ বলে বিদায় দিয়ে ঘরের কাজে মন দেন। তার আজ অনেক কাজ।
এত্ত বড় একটা মাইক্রোবাসে ড্রাইভার, মিমি এবং তার বড় মামা ছাড়া আর কেউ নেই। মিমির মায়ের জন্য খারাপ লাগছে। মামা মাকে এতো করে সাধলো মা রাজি হয়নি। মা এলে মিমির অনেক ভালো লাগতো!
মিমি হঠাৎ আনমনা হয়ে গেল। সে ভাবনার জগতে প্রবেশ করে ভাবতে লাগলো, ‘বাবাকে সে আজ প্রথমবারের মতো দেখবে। মনের ভেতর এক অন্যরকম আনন্দ খেলা করতে লাগলো। মনে মনে বিড় বিড় করে বলল, ‘কাল থেকে আর মিতু, ঋতু ও জিতুরা আমাকে আব্বু নেই বলে ক্ষেপাতে পারবে না! তাদের দেখিয়ে দেবে শুধু তাদের নয় মিমিরও আব্বু আছে।’ কথাগুলো ভাবতে ভাবতে এতটা পথ অতিক্রম করে কখন যে মিমিদের গাড়ি এয়ারপোর্ট র্পৌছে গেছে সে টেরই পায়নি। আমরা এয়ারপোর্ট পৌঁছে গেছি মিমি এবার নেমে পড়ো।’ এ কথা শুনে যেন সে সম্বিত ফিরে পেল।
মিমিকে গাড়িতে রেখে মামা জোহরের নামাজ পড়ে এসে মিমি ও ড্রাইভারসহ দুপুরের খাবারটা হোটেলে খেয়ে এয়ারপোর্টের যে ফটক দিয়ে বিদেশ থেকে স্বাগতরা ট্রলি ঠেলে বের হন, সেখানে এসে অপেক্ষা করতে লাগলেন!
কিছুক্ষণ পর একজন নারীর মাইকে একটি ফ্লাইট ল্যান্ডের ঘোষণা শুনে মামা বলল, ‘মিমি, তোমার আব্বু যে বিমানে আসছেন, সে বিমানটি এখন আকাশ থেকে নিচে অবতরণ করছে। অল্প সময়ের মধ্যেই বের হয়ে আসবেন।’
প্রায় পৌনে এক ঘণ্টা পরও মিমির আব্বু আসছেন না দেখে মিমি অধৈর্য হয়ে মামাকে বার বার জিজ্ঞেস করতে লাগল, ‘মামা আর কতক্ষণ? আব্বু এখনো বের হচ্ছেন না কেন?’
মামা ওকে সান্ত¡না দিয়ে বললেন, ‘এই তো একটু পরেই বের হবেন দেখ।’
তাদের চার চোখ প্রায় ঘণ্টাখানেক মূল ফটকপানে নিক্ষেপ করে রাখার পর মামা বলল, ‘মিমি, দেখ এই তো কালো সানগ্লাস পরে লাগেজ ওয়ালা ট্রলি ঠেলে বের হচ্ছেন তোমার বাবা।’ মিমি বহু প্রতীক্ষার পর তার স্বপ্নের বাবাকে দেখে আনন্দে কয়েক মুহূর্ত বাকরুদ্ধ হয়ে গেল! কী বলবে বুঝতে পারছিল না! ততক্ষণে আব্বু তাদের কাছে চলে এসেছে! মামার সাথে কুশল বিনিময়ের একপর্যায়ে মামা বলল, ‘এ হলো আমাদের মিমি।’ মিমি আস্তে করে আসসালামু আলাইকুম বলে লজ্জায় মামার পিছে মাথাটা লুকিয়ে রাখার ব্যর্থ চেষ্টা করতে লাগলো। আব্বু ওয়ালাইকুমুস সালাম বলে মিমির থুতনির নিচে হাত দিয়ে মুখটা উপরে তুলে বললেন, ‘আমার মা মনির বুঝি অনেক লাজ! সে তো অনেক বড় হয়ে গেছে দেখছি!’ এ কথা বলে মিমির আব্বু হাঁটু গেড়ে বসে নিজ সন্তান মিমিকে জীবনে প্রথমবারের মতো বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে আবেগে কাঁদতে লাগলেন। মিমি প্রথমে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে পরক্ষণে সেও কাঁদতে কাঁদতে আব্বুর চোখের পানি মুছে দিয়ে বলল, ‘আমাকে ছেড়ে আর কোথাও যাবে না, কথা দাও আব্বু! আমি তোমার জন্য অনেক কেঁদেছি!’ আব্বু নিজেকে সামলে নিয়ে মিমিকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে বলল, ‘না আম্মু তোমাকে ছেড়ে আমি আর কোথাও যাবো না। এই তো আব্বু এসে গেছে।’ মিমি তার আব্বুর গলা জড়িয়ে ধরে চোখ বন্ধ করে থাকলো।
মামা ততক্ষণে ড্রাইভারকে সাথে নিয়ে আব্বুর লাগেজটা গাড়িতে তুলে গাড়ির দরজা খুলে দাঁড়িয়ে আছেন। এবার মিমির আব্বু তাকে কোলে নিয়ে গাড়ির দিকে পা বাড়ালেন।

SHARE

Leave a Reply