Home গল্প সাদীর মা হলো রিয়াদের মা -আবদুল হালীম খাঁ

সাদীর মা হলো রিয়াদের মা -আবদুল হালীম খাঁ

সাদী আর রিয়াদ। দুই ভাই। রিয়াদ ছোট। বয়স চার। সাদী বড়। বয়স আট। দুই ভাই সারাদিন এক সাথে খেলে। আর এটা ওটা নিয়ে ঝগড়াও করে। তবুও কেউ কাউকে ছাড়ে না।
এ ওর গায়ে একটু থুথু দেবে কিংবা চিমটি দেবে। আর যায় কোথায়। শুরু হয়ে যাবে খামচাখামচি। তারপর কিলাকিলি। রিয়াদ ছোট। জোর কম। জোর কম হলে কী হবে ও যে নাছোড়বান্দা। কিছুতেই হার মানে না।
সাদী দৌড়ে সরে গেলে রিয়াদ ওর পিছে পিছে ছোটে। গিয়ে একটা ঢিল দেবে। তা না দিতে পারলে কাঁদতে কাঁদতে ঘরে গিয়ে আলনা থেকে সাদীর শার্ট প্যান্ট টেনে ফেলে দেবে মাটিতে। টেবিলের ওপর রাখা বইগেুলো ছিঁড়ে ফেলবে। কলম ভেঙে ফেলবে।
রিয়াদের বয়স কম হলেও দুষ্ট কম নয়। দুষ্টের সেরা। কিন্তু ওকে দুষ্ট বলা যাবে না। বললে আরেক বাড়তি বিপদ। যে দুষ্ট বলবে তাকেই বল্লার মতো ধরে ফেলবে ছুটে গিয়ে। তাকে কিল দেবে। মাথার চুল টেনে ছিঁড়বে। আর প্রতিবাদ জানাতে থাকবে আমাকে দুষ্ট বললি ক্যান? আমাকে দুষ্ট বললি ক্যান?
তখন ওকে শান্ত করার উপায় হলো ভুল স্বীকার করা। এবং কিছু কিনে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়া। বলতে হবে- না, তুমি দুষ্ট নও। তুমি ভালো খুব ভালো। দুষ্ট হলো সাদী। বার বার ওকে ভালো বললে শান্ত হবে এবং শেষে খিলখিল করে হাসবে।
আমি লিখতে বসলে রিয়াদ আমার টেবিলের কাছে এসে কাগজপত্র টানবে। কলম ধরবে। বলবে দাদু কলমটা দাওতো আমি লিখি। যদি বলি, দুষ্টমি করো না দাদু। একটু সরো। আর রক্ষা নেই।
আমার বইপত্র টেনে ফেলে দিয়ে কলম ধরে বলবে: আমাকে দুষ্ট বললে ক্যান? দুষ্ট বললে ক্যান? বলে কান্না শুরু করবে। যেনো আমি ওকে খুব মেরেছি।
আমি এখন ভুল স্বীকার করতে বাধ্য হই। বলি দাদু আমার ভুল হয়ে গেছে। তুমি খুব ভালো। তুমি খু-উ-ব ভালো। আজ তোমাকে বাজার থেকে ভালো একটা জিনিস এনে দেবো।
কী এনে দেবে?
দেবো একটা কিছু
এখনই দাও।
পরে দেবো।
না, না, এক্ষুনি।
এখন যে লিখতে বসেছি।
পরে লিখবে।
আর কতক্ষণ কথা কাটাকাটি করা যায়। আমাকে হার মানতেই হয়। বন্ধ হয়ে যায় আমার লেখাপড়া। বাড়ির পাশে রাস্তায় দোকান। বলি এইতো আমি দোকানে যাচ্ছি। তোমার জন্য বাদাম আর চকোলেট নিয়ে আসছি। ও বলবে আমি তোমার সঙ্গে যাবো।
তোমার যেতে হবে না।
না, আমি যাবো, যাবো যাবোই
আচ্ছা চলো।
দোকানে গিয়ে যা ওর মনে ধরবে তাই চাইবে। একটা কেক নেবে। একটা অরেঞ্জ। বোম্বে সুইটস, একটা বাঁশি, একটা খেলনা বল নেবে। আর একটা রঙিন বেলুন দেখিয়ে বলবে, ওটা দাও।
কী যে বিপদ!
তারপর বলবে তুমিতো বাদাম চকোলেট কিনে দিতে চেয়েছই। কিনে দাও।
বিপদ কাকে বলে যদি বলি এতো সব একবারে নিয়ে কী হবে?
পরে নেবে।
না না এক্ষুনি নেবো।
নাছোড়বান্দা। না নিয়ে তো কোটই ছাড়বে না। খামাখা লোকজনের সামনে নাতিকে কাঁদালে লোকে কী বলবে। তাই লজ্জায় বলি আচ্ছা নাও।
বাড়ি এসে যদি বলি, এত সব কিছু কিনে আনলে, তোমার ভাই সাদীকে কিছু দাও।
না, ওকে কিছু দেবো না।
কোনো দেবে না? ও তোমার ভাই।
ও আমার সঙ্গে ঝগড়া করে। থুথু দেয়।
এই দুটো বাদাম দাও।
না না তা হলে আমি খাবো না।
বাড়িতে আমরা দু’জন প্রাণী। রিয়াদ, সাদী, ওদের মা-বাবা আর আমরা দু’জন। রিয়াদ যখন ঘুমিয়ে থাকে তখন মনে হয় এ বাড়িতে মানুষ নেই। কোনো সাড়াশব্দ শোনা যায় না। কিন্তু রিয়াদ যখন জেগে থাকে তখন মনে হয় এ বাড়িতে অনেক মানুষ। ও সব সময় কথা বলে হাসে। নানা রকম প্রশ্ন করে। ছোটাছুটি করে। আর ওর সাথে আমাদের কথা বলতে হয়।
ওটা ধরো না, ওদিকে যেও না। ওখানে ওঠো না, পড়ে যাবে। ওটা ধরো না, পড়ে ভেঙে যাবে।
ও কারো কোনো নিষেধ আদেশ মানে না। যত নিষেধ করা যাবে তত ওর গতিবেগ বেড়ে যায়। দুষ্ট তো ওকে বলা যাবেই না। আমি ওকে অনেক সময় ছেড়ে থাকতে চেষ্টা করি। কিন্তু ও তো আমাকে ছাড়ে না।
কখনো মনে মনে রাগ করি। আবার কখানো মনে মনে হাসি। কখনো ভাবি ওই তো আমাদের বাড়ির প্রাণ ও ছাড়া তো বাড়িটা মৃতপুরী। তাই ওর ন্যায় অন্যায় সব দাবিই আমি পূরণ করি।
সাদী বড়। তা ওর মাকে আমরা বাড়ির সবাই সাদীর মা বলে ডাকি। আত্মীয়স্বজন এবং পাড়া-প্রতিবেশী সবাই তাকে সাদীর মা বলে ডাকে। বাড়িতে কেউ এলে প্রথম ডাক দেয় সাদীর মা কি করো গো?
কেউ বলে এই বাড়িটা সাদীদের। কেউ বলে, এই পুকুরটা এই জমিটা সাদীদের, কেউ বলে সাদীদের গাছের আম খুব মিষ্টি। পাড়ায় কেউ কেউ গল্প করে সাদীর মায়ের নাম রিয়াদের মা বা রিয়াদের বাবা কেউ বলে না।
সেদিন রোববার। বোধ হয় এগারোটা বাজে। সাদী স্কুলে গেছে। রিয়াদকে দেখা যাচ্ছে না। উঠোনে নেই। এ ঘরে নেই। ও-ঘরে নেই, গেলো কোথায়? সাদীর মা রিয়াদ গেলো কোথায়? সাদীর দাদি জিজ্ঞেস করলো।
দেখছি না তো।
খুঁজে দেখো তো। একটু আগে তো এ ঘরেই ছিল।
দেখ তো রাস্তায় গেলো নাকি পুকুরের ঘাটে।
না, রাস্তায় নেই। পুকুরের ঘাটে নেই।
ও আল্লাহ! এতো তাড়াতাড়ি গেলো কই?
বউ শাশুড়ি দু’জনে খোঁজাখুঁজি শুরু করলো।
পেয়ারা বাদামি গাছে নেই। দক্ষিণের বাড়িতে নেই। উত্তরের বাড়িতে নেই।
কেউ দেখেনি রিয়াদকে। আজ কারো বাড়ি যায়নি রিয়াদ।
মা দাদির কলিজায় পানি নেই। হায়। ছেলে ধরায় তো নিয়ে গেলো না?
আবার সব ঘর ভালো করে খোঁজাখুঁজি শুরু হলো। খাটের নিচে আলমারির পেছনে। সাদীর পড়ার রুমে। টেবিলের নিচে। না, কোথাও নেই। কাচারি ঘরে এ পর্যন্ত দেখা হয়নি। ও ঘরে তিন দিন যাবৎ তো কেউ যায়নি। ও ঘরের দরজা জানালা বন্ধ। সাদীর মা সে ঘরের দিকে এগিয়ে গেল। দরজার সামনে গিয়েই তার চোখ হলো চড়ক গাছ। রিয়াদ টেবিলের ওপর পা তুলে চেয়ারে বসে আছে। মুখ ভীষণ ভার ।
সাদীর মা শাশুড়িকে ডাকা শুরু করলো,
আম্মা, আম্মা, দেখে যান।
কী গো?
দেখে যান।
সাদীর দাদি এগিয়ে এলো।
ঐ যে দেখুন কে।
সাদীর দাদি এগিয়ে এলো।
ঐ যে দেখুন। কে বসে আছে। বলেই সাদীর মা দৌড়ে গিয়ে ছেলেকে আদর করে বুকে জড়িয়ে ধরে বলতে লাগলো, বাবা আমার সোনা মানিক আমার। এখানে তুই চুপ কর বসে আছিস ক্যানরে? কী হয়েছে তোর? কেউ মেরেছে?
কেউ গালি দিয়েছে?
রিয়াদের মুখে কথা নেই।
কী বাবা কথা বলছিস না কেন?
তবু ওর মুখে কথা নেই।
বাবা আমার। সোনা মানিক আমার। কথা কও না ক্যান? কী হয়েছে?
এবার ব্যথা ভরা মন নিয়ে রিয়াদ জিজ্ঞেস করলোÑ আগে বলো তুমি কার মা? আমার না কি সাদীর? এ কথা জিজ্ঞেস করছিস ক্যানরে?
সবাই যে তোমাকে সাদীর মা বলে। তা হলে আমার মা কে? এই যে আমি তোর মা।
বাড়ির আর পাড়ার সবাই তোমাকে সাদীর মা বলে?
রিয়াদের মা বলে না ক্যান?
ছেলেকে আবেগে আদরে সোহাগে কোলে নিয়ে শাশুড়িকে শুনিয়ে বলতে লাগলো আমাকে আপনারা শুধু সাদীর মা সাদীর মা বলে ডাকুন ক্যান? আমি তো রিয়াদের মা রিয়াদের মা। এক শ’ বার রিয়াদের মা হাজার বার বলছি আমি রিয়াদের মা।
ভুল করে ফেলেছি তুমি রিয়াদের মা। রিয়াদের মা।
সেই দিন থেকে আমরা বাড়ির সবাই বলাবলি করে সাদীর মাকে রিয়াদের মা বলে ডাকা শুরু করলাম আবার। সাদীর মা এবার রিয়াদের মা হয়ে গেলো।

SHARE

Leave a Reply