Home উপন্যাস নিঝুম বনের বাসিন্দা -দেলোয়ার হোসেন

নিঝুম বনের বাসিন্দা -দেলোয়ার হোসেন

[গত সংখ্যার পর]

শাহ্জাদা অনেকটা সাহসে ভর করে এগিয়ে গেলো বনলতার সামনে। তারপর বললো, তোমার পরিচয় কি?
পরিচয় আমি জানি না।
এখানে আর কে থাকে?
আমার মা- আর আমার নানুভাই।
তাদের কাছে আমাকে নিয়ে যাবে?
না- সেখানে যেয়ো না। মা খুব রাগ করবে।
তোমার আব্বা?
আব্বা হুজুর কোথায় যে আছে- সে কথা মা আমাকে বলে না। আমরা একদিন আব্বা হুজুরের কাছে চলে যাবো। তুমি এখন যাও।
বলেই বনলতা এ পথ সে পথ করে কোথায় যে হাওয়া হয়ে গেলো- শাহ্্জাদা তাকে আর দেখতে পেলো না। শেষে সে ফিরে গেলো তার বজরায়। রাতে শাহ্জাদা একটুও ঘুমাতে পারলো না। সারাক্ষণ কেবল বনলতার মুখটা ভেসে রইলো তার অন্তরে-বাহিরে। এদিকে বনলতাও রাতভর এপাশ-ওপাশ করেই চলেছে।
তার মনে হতে লাগলো যে, এ মানুষটার মধ্যেই বুঝি আমার সব সুখ, সব শান্তি নিহিত রয়েছে। মনের মধ্যে শুধু ঐ মুখটাই ঘুরপাক খাচ্ছে। কাল কি সে আবার আসবে? যদি না আসে তা’হলে তাকে আমি কোথায় খুঁজে পাবো?
মা, মেয়ের এমন অবস্থা দেখে বললো, মাগো তোমার কি ঘুম আসছে না? পানি পিপাসা লাগছে?
এমনি ঘুম আসছে না মা।
ঠিক আছে আমি তোমার মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দেই, দেখো ঘুম এসে যাবে।
বনলতা আর কোনো কথা বললো না।
পরদিন ঠিক ঐ জায়গায় আবার দেখা হলো দু’জনার। শাহ্জাদা সাব্বির সেই সকাল থেকেই বনলতার অপেক্ষায় প্রহর গুনছিলো। দু’চোখ ভেঙে ঘুমও এসে যাচ্ছে, তবু চোখ দুটো রুমালে মুছে আবার চোখ রাখছে পথের দিকে। বনলতা বটতলায় আসতেই শাহ্জাদা সাব্বির বললো, বনলতা আমি কখন থেকে অপেক্ষা করে আছি।
বনলতা বললো, কেন?
তোমার কথা ভেবে সারারাত একটুও ঘুমাতে পারিনি।
আমিও ঘুমাতে পারিনি।
তোমার মাকে আমার কথা বলেছো?
না।
এদিকে সর্দার গাফ্ফার কিন্তু বনলতাকে ঠিকই চোখে-চোখে রেখেছে। সে ফিরে আসতেই দূর থেকে ছেলেটাকে দেখে তার বেশ ভালোও লাগতে লাগলো। তথাপি- সে আবার রণসাজে সেজে ওদের সামনে এসে দাঁড়ালো। হঠাৎ গরিলা দেখার মতো চমকে উঠলো শাহ্জাদা সাব্বির। সহ্সা তরবারি হাতে সে ফুঁসে দাঁড়ালো। তবে, শাহ্জাদা আজ একা। সর্দার ধীরে-ধীরে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে ছেলেটাকে দেখতে লাগলো। শাহ্জাদা বললো, কে তুমি?
বনলতা হেসে বললো, আমার নানাভাই।
সাব্বির মুহূর্তে অন্য এক মানুষ হয়ে গেলো।
তোমার নানাভাই?
হ্যাঁ।
কিন্তু …।
সর্দার গাফ্ফার বললো, যুবক তোমার সত্যিকারের পরিচয় বলো। আর আজই এখান থেকে চলে যাবে। তা না’হলে তোমার বজরায় কুড়াল মেরে টুকরো টুকরো করে ফেলবো আমি। আর আমার হাত থেকে কেউ বাঁচতে পারবে না।
শাহ্জাদা সাব্বির বললো, আপনি শান্ত হোন। আমি মুলতান নগরের শাহ্জাদা। বাদশাহ্ নওশাদ আমার পিতা। প্রতি বছর একবার আমি নদীপথে ভ্রমণে বের হই। এই বিশাল এবং নিঝুম জঙ্গলের দিকে আসিনি কখনো। দূর থেকে দূরবীনে দেখতে পেলাম হরিণ এবং বনলতাকে। খুব কৌতূহল জাগলো- তাই এখানে এসেছি।
সর্দার গাফ্ফার বললো, এই বিজন বনে আমরা আছি, এ কথা পৃথিবীর কেউ জানবে না, এটাই আমি চাই। তোমাকে তো আর এখান থেকে যেতে দেয়া যাবে না।
বনলতা ছাড়া আমিও যে একা ফিরে যেতে পারবো না নানাভাই।
সর্দার সে কথার কোন উত্তর না দিয়ে বনলতাকে বললো, নানাভাই ওকে নিয়ে তুই মায়ের কাছে যা। সেখানেই ওর বিচার হবে। বলেই সর্দার গাফ্ফার অলক্ষ্যে হাসতে হাসতে ঘোড়ার লাগাম টেনে ছুটে চললো বনের মাঝ দিয়ে।
বনলতা বললো, চল- মা তোমাকে কিচ্ছু বলবে না।
শাহ্জাদার মন জুড়ে তখন বন্যার মতো আনন্দ। নিজের ভিতরটা কেবলই এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। সে বললো, আমার কেমন ভয়-ভয় করছে। কথা শুনে বনলতা যেনো হেসে গড়াগড়ি খায় আর কি। সে হাসির ঝর্ণাধারায় সারা বন খুশিতে ঝিলমিলিয়ে উঠলো। বাতাস এসে ছন্দে-ছন্দে দোল দিয়ে গেলো গাছের শাখায় শাখায়। হাসি থামিয়ে চোখ বড় বড় করে বনলতা বললো- কিসের ভয় তোমার? মা তোমাকে মারবে? শাহ্জাদা সাব্বির মুগ্ধতায় ডুবতে ডুবতে বললো, বনলতা- তুমি আমাকে একেবারেই মেরে ফেলো না।
ও-আল্লাহ্ এ তুমি কেমন কথা বলো? তোমাকে আমি মেরেছি? নতুন মানুষ, আমি তোমাকে কখনও মারবো না। এ কথা বলতেই কেন যেনো বনলতার দু’চোখ ভরে উঠলো পানিতে।
এই অল্প সময়ের কথা চালাচালির মধ্যে অবুঝ বনলতার মন অজান্তে কোন অদৃশ্য সুধা গন্ধে এমন করে কেঁদে উঠলো তা শুধু দয়াময়ই জানেন।
ওদের দু’টিকে দেখা মাত্র মা গুলশান অবাক হয়ে চেয়ে থাকলো। এমন সময় সর্দার গাফ্্ফার এসে বললো, গুলশান ওদের দুটিকে কেমন সুন্দর লাগছে। আমিই ছেলেটাকে তোর কাছে আনতে বলেছি।
ছেলেটা কে বাবা?
সর্দার গাফ্ফার বললো, মুলতান নগরের শাহ্জাদা সাব্বির।
সঙ্গে সঙ্গে বনলতার মা চিৎকার দিয়ে বললো, না, বাবা- না। কোনো রাজা-বাদশার ছেলের সাথে আমার মেয়ের সম্পর্ক হবে না। ওকে তুমি এক্ষুনি এ বন থেকে তাড়িয়ে দাও। আর কোনদিন ও যেনো এখানে না আসে।
এমন অবস্থা দেখে সবাই হতভম্ব। সর্দার গাফ্ফার বললো, কেন মা? আমি তো এতদিন এই স্বপ্নই দেখে আসছি যে, আমার নানাভাই একদিন রাজরানী হবে।
চোখের পানি মুছতে মুছতে গুলশান আরা বললো, বনলতা ওর আব্বা হুজুরের স্নেহ পায়নি। আমি অনেক কষ্ট করে ওকে এতো বড় করেছ ওকে আমি আমার মত বনবাসী হতে দেবো না। রাজা-বাদশাহ্রা কেবল বিচারের নামে অবিচার করে।
সর্দার গাফ্ফার তখন বাঘের মতো গর্জে উঠে বললো, আজ তোকে সব খুলে বলতে হবে। যদি না বলিস, তা’হলে আমি বনলতাকে সাব্বিরের হাতেই তুলে দেবো।
গুলশান বললো, বাবা- তুমি একথা বলতে পারলে?
কেন পারবো না। ওর জন্ম থেকে আমি কি কোলে-পিঠে করে ওকে বড় করি নাই। আজ তোর আসল পরিচয় তোকে বলতেই হবে।
শেষে বাধ্য হয়েই মুখ খুললো গুলশান। বাবা তোমার বনলতা সাধারণ কেউ নয়। বিশাল এ রাজ্যের একমাত্র উত্তরাধিকারী। ওর বাবা- আমাকে দেখে মুগ্ধ হয়ে বিয়ে করেছিলো। কিন্তু রাজ-প্রাসাদে অন্য বেগম আর সেনাপতির ষড়যন্ত্রে বাদশাহ্্ অন্ধের মতো আমাকে বনবাসে পাঠালেন। পেটের সন্তানের কথাও একবার তিনি ভাবলেন না। জানি না- এতোদিনে তার কী হয়েছে। সত্য কোনদিন চাপা থাকে না। এতোদিনে হয়তো নিজের ভুল বুঝতে পেরেছেন বাদশাহ্। তার সন্তান আমি তার কাছেই ফেরত দিতে চাই।
সর্দার গাফ্ফার হুঙ্কার দিয়ে উঠলো।
তুই এসব কথা কেন আমাকে আগে বললি না। কোন রাজ্যের বাদশাহ্ সে, তার নাম বল। আমি এখনই যাবো। বনলতার মা বললো, বিজয় নগর রাজ্যের বাদশাহ্ তিনি। এখন আর সেখানে গিয়ে কাজ নেই বাবা।
এতক্ষণ সব কথা শুনে শাহ্জাদা সাব্বির বললো, নানাভাই- আপনি শান্ত হন। আমি আমার দেশে ফিরে গিয়ে আব্বা হুজুরকে সব কথা জানাবো। আব্বা হুজুর হয়তো ওখানকার সব খবর সংগ্রহ করতে পারবেন। তারপর আমি ফিরে এলে যা কিছু করা দরকার সবই করা যাবে। আম্মা আপনি আমাকে দেশে যাওয়ার অনুমতি দেন। আর আমার আব্বা হুজুর, আম্মা হুজুর এমনই মানুষ যে, বনলতাকে তারা মাথায় করে রাখবেন।
বনলতা বললো, তুমি আবার কবে আসবে? তোমাকে না দেখতে পেলে আমার খুব কষ্ট হবে যে!
মা বললেন, বাবা ওর কথায় তুমি কিছু মনে করো না। পাগলীটার জন্ম হয়েছে এই বনে। জন্মের পর বাইরের কোন মানুষকে সে দেখেনি। পৃথিবীটা যে কত সুন্দর, সে সব ও কিচ্ছু জানে না। (চলবে)

SHARE

Leave a Reply