Home সায়েন্স ফিকশন মিশন টু আয়রনম্যান -মহিউদ্দিন আকবর

মিশন টু আয়রনম্যান -মহিউদ্দিন আকবর

[সপ্তম ও শেষ পর্ব]

ভয়াল যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে রিসোলেটিং প্রভিন্সের অগ্রবর্তী বাহিনীর বম্বারগুলো ছুটছে।
বিস্তৃত বলয় সৃষ্টি করে তীব্রগতিতে বম্বারগুলো আয়রনম্যানের ব্ল্যাকহোলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
দুই স্তরের অগ্রবর্তী বাহিনীর নেতৃত্বে আছেন এলিয়ন জেনারেল রাফসান হাদিসা। এদিকে আলাদা আলাদা ফটোবায়োনিক ব্যারেলগান অ্যাসেম্বল করা সুপারস্পেসশিপে ছুটছেন রিসোলেটিং প্রভিন্সের প্রধানবিজ্ঞানী ডিকেটর দারুদ গোরিয়ান বার্দে এবং মানববিজ্ঞানী আসিফ আরমান। আরমানের স্পেসশিপে আছে তার ভাগনে খুদে বিজ্ঞানী সাদিত। কেবিনক্রু হিসেবে আছে রোবোক্যাপ্টেন জুরিয়ান হাসারা এবং রোবোসার্জেন্ট আইমান দারদা।
সর্বমোট পাঁচস্তরে সজ্জিত রিসোলেটিং প্রভিন্স বাহিনীর সুপারবম্বার ও সুপারস্পেসশিপগুলো মহাজগতের মহাবিস্ময় নিয়ে একে একে ঘন সালফার, মিশমিশে কালো কার্বন, বর্ণিল মিথিলিন এবং গ্রাভিটিঅ্যাস কালারের হিলিয়াম গ্যাসের প্রাণঘাতী মেঘস্তর পেরিয়ে দিগন্তবিস্তৃত ফায়ারওয়ের ওপর দিয়ে দল বেঁধে ছুটে চলছে। প্রতি সেকেন্ডে প্রায় দশ ‘মাকদিস’ স্পিডে চলছে বম্বারের ঝাঁক। পেছনে সমতা বজায় রেখে ছুটছে মিস্টার বার্দে ও আরমানদের সুপারস্পেসশিপগুলো।
সর্বশেষ স্তরে আছে প্রোটোপ্লাজম লাইট সমৃদ্ধ একঝাঁক শাটেল স্পেসশিপ। এগুলো রোবোক্রুদের পরিচালনায় সামনের পাঁচ স্তরের সাথে সমতা রেখেই প্রচণ্ড গতিতে ছুটে চলছে।
এভাবে এক লাখ ‘মাকদিস’ উড়ে চলার পর মানববিজ্ঞানী আসিফ আরমানের গ্রিনসিগন্যাল পেয়ে চোখের পলকেই সুপারবম্বারগুলো দু’ভাগে ভাগ হয়ে যায়। কিন্তু এর একভাগ হ্যালোজেন স্তর পেরোতেই আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ডুয়ান্ট-৯৯ ব্লাস্টার-মিসাইলের হামলায় ছিন্নবিচ্ছিন্ন অবস্থায় পড়ে। তাতেও রিসোলেটিং প্রভিন্সের অগ্রবর্তী বাহিনীর তেমন ক্ষয়ক্ষতি হয় না। বিশেষ করে ওগুলোর মাঝে কারো প্রাণ হারানোর কোনো প্রশ্নই আসে না। কেননা, প্রত্যেকটি বম্বারই চলছে স্বয়ংক্রিয় সেন্সেটিভ ডিভাইসের মাধ্যমে। শত্রুপক্ষের মিসাইলের আঘাতে ডজনখানেক বম্বার সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হলেও সেটা আবার শত্রুপক্ষের জন্য বুমেরাং হয়ে গেছে।
রিসোলেটিং প্রভিন্সের একেকটা বম্বার বিধ্বস্ত হওয়া মানেই তাতে ফিডার করা পটাশিয়াম কার্বোনেট গ্যাসে পূর্ণ দু’টি করে দৈত্যকায় সিলিন্ডার ব্রাস্ট হয়ে যাওয়া। তাতে আয়রনম্যানের কুচক্রী মাকড়সা বিজ্ঞানীর ল্যাবরেটরির প্রতিরক্ষাব্যূহ একেবারে ধ্বংসের মুখে।
ওদিকে রিসোলেটিং প্রভিন্সের অগ্রবর্তী বাহিনীর দ্বিতীয় অংশ আয়রনম্যানের স্কাই ফাইটারদের সাথে তুমুলভাবে লড়ে চলেছে। দুই পক্ষেরই ক্ষতি হচ্ছে ব্যাপকভাবে। কেউ কাউকে ছাড় দেবার পাত্র নয়। যদিও রিসোলেটিং প্রভিন্সের ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে- কিন্তু তাদের বম্বারে ফিডার করা সিলিন্ডারগুলো ফেটে হাজার হাজার কিলোমিটার এলাকাজুড়ে উচ্চ তাপমাত্রার পারমাণবিক অগ্নিকুণ্ড সৃষ্টি করেই চলেছে। ফলে এরই মধ্যে বিপর্যয় দেখতে শুরু করেছে আয়রনম্যান বাহিনী। ভয়াল পরিস্থিতির কারণে তারা আত্মরক্ষামূলক পিছু হটারও সুযোগ পাচ্ছে না। তাদের প্রতিটি ফাইটিং শাটেল কমপক্ষে তিনজন করে পাইলটকে হারাচ্ছে। পক্ষান্তরে ড্রোন প্যাটার্নের বম্বার হবার কারণে রিসোলেটিং প্রভিন্সের অগ্রবর্তী বাহিনীকে একজন পাইলটও হারাতে হচ্ছে না।
মোবাইল স্যাটেলাইটের মাধ্যমে সার্বিক পরিস্থিতি নজরদারি করে যাচ্ছেন মিস্টার বার্দে এবং আসিফ মামা। হঠাৎ মনিটরস্ক্রিনে একটা ইনটেনসিটি মার্ক লক্ষ করে আসিফ মামার মুখটা হাঁ হয়ে যায়। তিনি পরিষ্কার বুঝতে পাচ্ছেন- দাউদাউ করে জ্বলে ওঠা ল্যাবরেটরির ম্যাগনেটিক ফটক পেরিয়ে দিগন্ত বিস্তৃত একটা ঘূর্ণায়মান মাকড়সার জাল অগ্নিবলয়ের বাইরে ছুটে চলেছে। জালটির ঠিক মধ্যবিন্দুতে কোনো একটা বস্তু জালকে শক্তভাবে আঁকড়ে আছে। মামার আর বুঝতে বাকি থাকে না, আক্রমণের ধকল সামলাতে না পেরে খোদ মাকড়সা বিজ্ঞানী পালাচ্ছে। তিনি অগ্রবর্তী বম্বারদের এটি ক্ষুদ্র ইউনিটকে সমারসল্টিং পদ্ধতিতে আক্রমণ চালিয়ে জালটিকে আটকাবার নির্দেশ দেন।
সাথে সাথে অগ্রবর্তী বাহিনীর একটি ইউনিট শত্রুপক্ষের মিসাইলের আঘাতে ধ্বংস হয়ে ডিগবাজি খেতে খেতে পড়ার মতো সমারসল্টিং পদ্ধতিতে মাকড়সা বিজ্ঞানীর ইলেকট্রিক নেটের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। কিন্তু নেটের উচ্চতাপের কারণে সবক’টি বম্বারই চোখের পলকে পুড়ে ছাই হয়ে যায়। তবে তাতেও কাজের কাজ হয়েছে। বম্বারগুলোর পটাশিয়াম কার্বোনেট গ্যাসে পূর্ণ দৈত্যকায় সিলিন্ডারগুলো ফেটে গিয়ে পারমাণবিক তাপে মাকড়সা বিজ্ঞানীর নেটটাকে এমনভাবে গলিয়ে পেঁচিয়ে ফেলে যে, তার মাঝ থেকে মাকড়সা বেরিয়ে আসার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়ে ছটফট করতে থাকে।
মামা প্রস্তুত হয়েই ছিলেন। জালটি সম্পূর্ণ গলে তরল হয়ে যাবার আগেই তিনি মিস্টার বার্দেকে তার স্পেসশিপ থেকে গোনাড অণুতরঙ্গের বিকিরণ ছড়িয়ে দিতে বলেন। মিস্টার বার্দেও তার স্পেসশিপ ঘুরিয়ে পরমাণু তাপে গলতে থাকা ইলেকট্রিক নেটের ওপর গোনাড বিকিরণ ফায়ার করেন। ফলে মুহূর্তেই নেটটির গলনাঙ্ক জিরোতে নেমে আসে। অমনি জালটি একটি পেঁচানো শক্তপোক্ত খাঁচার মতো জমে গিয়ে মাকড়সা বিজ্ঞানীকে তার কেন্দ্রবিন্দুতে আটকে রাখে।
ব্যাস কেল্লা ফতে। বিজ্ঞানী আসিফ আরমানের নির্দেশ পেয়ে বায়োকপ্টার যোগে নেটটিকে রেকি করে টেনে নিয়ে আসে রোবোসার্জেন্ট। তারপর ক্রাফ্ট হ্যাংগারের মতো বায়োনিক রেকারে ঝুলিয়ে আপাতত তুলে রাখে স্পেসশিপের ভেকুয়াম কেবিনে।
এভাবে নিজের জালে নিজে আটকা পড়ে মাকড়সা বিজ্ঞানীর চিৎকার চেঁচামেচির শেষ নেই। আটকা পড়েও ঘন ঘন প্রতিশোধের হুমকি আর গালাগালে সবার কান ঝালাপালা। শেষমেশ কী আর করা? মামা বাধ্য হয়ে মাকড়সার চোখ বরাবর লেসারগানের একটামাত্র ফায়ার করেন। ব্যাস। বেটা একদম চুপ।
এরই মধ্যে তুমুল তারকাযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে আয়রনম্যান আর রিসোলেটিং প্রভিন্সের বাহিনীর মাঝে। অগ্রবর্তী বাহিনী আয়রনম্যানের বাহিনীকে তাড়া করতে করতে ঘোর অন্ধকারের মাঝেই ব্ল্যাকহোলে ঢুকে পড়েছে। ফলে নিজেদের মাঝে সেমসাইড হয়ে বেশ কয়েকটি বম্বার ধ্বংস হয়ে গেছে। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে বম্বারগুলোর পটাশিয়াম কার্বোনেট গ্যাসে পূর্ণ দৈত্যকায় সিলিন্ডারগুলো ফেটে কোনোরকম অগ্নিগোলকই সৃষ্টি হচ্ছে না। পারমাণবিক রেডিয়েশন ছড়ানো… সে তো পরের কথা।
মিস্টার বার্দে উদ্বিগ্ন হয়ে আসিফ মামাকে নক করেন। মামা সাথে সাথে তাদের পেছনে পেছনে ধাবমান প্রোটোপ্লাজম লাইট সমৃদ্ধ শাটেল স্পেসশিপগুলোকে সামনে এগিয়ে যাবার নির্দেশ দিলেন। চোখের পলকেই শাঁ শাঁ করে স্পেসগুলো প্রোটোপ্লাজম লাইট জ্বালিয়ে ব্ল্যাকহোলে ঢুকে পড়লো। মুহূর্তে আলোর বন্যায় ভেসে গেলো আয়রনম্যানের বহু সাধনায় গড়া কৃত্রিম ব্ল্যাকহোল রাজ্যপাট।
কিন্তু আয়রনম্যানও বিন্দুমাত্র ছাড় দিতে নারাজ। সে তার সর্বশক্তি দিয়ে রুখে দাঁড়ালো। লাখ লাখ কিলোমিটার বিস্তৃত রাজ্যসীমায় খইয়ের মতো ফুটতে শুরু করেছে তার বাহিনীর মিসাইলগুলো। এরই পাশ কাটিয়ে সুকৌশলে আয়রনম্যান বাহিনীকে পরাস্ত করতে করতে রিসোলেটিং প্রভিন্স বাহিনীর অধিকাংশ বম্বারই শেষ। এখন শেষ উপায় অবশিষ্ট বম্বার আর তাদের সাথে থাকা পারমাণবিক ফটোবায়োনিক ব্যারেলগানই ভরসা।
এরই মধ্যে ব্ল্যাকহোল রাজ্যে শুরু হয়ে গেলো আরেক তাণ্ডব। হঠাৎ করে ব্ল্যাকহোলের এক প্রান্তে আয়রনম্যানের রাজপ্রাসাদ প্রতিরক্ষায় স্থাপিত ক্রোমোস্ফিয়ার করোনা ভয়াল গর্জনসহ দাউদাউ করে জ্বলে উঠলো। এটা কয়েক হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ একটা ফায়ারওয়ে। এটা যে কিভাবে নির্মাণ করা হয়েছে এবং এতদিন নেভানো অবস্থায় রাখা হয়েছে- তা ভেবেই কূলকিনারা করতে পারছে না মিস্টার বার্দে। মনে হচ্ছে আসিফ আরমান মামাও এ নিয়ে মহাচিন্তিত।
কিন্তু ঘাটে এসে তরী ডুবলে তো আর চলবে না। তাহলে আমও যাবে আবার ছালাও যাবে। শেষে নিজেদেরই একেবারে ধ্বংসের শেষসীমায় পৌঁছে যেতে হবে। এখন উপায়? মিস্টার বার্দে আর ভাবতে পারেন না।
আসিফ মামা প্রচণ্ডভাবে গর্জে ওঠেন। মিস্টার বার্দেকে বলেন- আর কোনো দিকে তাকানোর সুযোগ নেই। ঝুঁকি নিয়ে হলেও ক্রোমোস্ফিয়ার করোনাকে ক্রস করে যেতে হবে। হয় সফলতা, না হয় মৃত্যু। তবুও বসে থাকার সময় নেই। বি-কুইক।
যেমনি ডিসিসন, তেমনি অ্যাকশন। চোখের পলকেই পুরো কমান্ড চলমান অবস্থান থেকে উপরের দিকে উঠে গেলো। এতে ফল হলো দু’টি। একেতো আয়রনম্যান বাহিনীর মিসাইলের রেঞ্জের বাইরে উঠা হলো, দ্বিতীয়ত ফায়ারওয়ে পেরিয়ে যাওয়াও সম্ভব হলো। কিন্তু বিপদ যখন আসে তো ছেঁড়া তসবিহর দানার মতো টপাটপ পড়তেই থাকে। সে অবস্থাই হলো বার্দে বাহিনীর।
ক্রোমোস্ফিয়ার করোনাকে অতিক্রম করে আসার পর প্রায় এক শ’ ‘মাকদিস’ নিচে নিমে এসে আক্রমণের দিকে নজর দেয়ার আগেই আয়রনম্যানের আর্টিলারি ডিভিশনের অতিরিক্ত মিসাইল নিক্ষেপের মোকাবেলায় বার্দে বাহিনীর জেনারেল রাফসান হাদিসা তার সুপারস্পেসশিপসহ উড়ে গেলেন। এবং বলতে গেলে সকলের চোখের সামনেই তিনি চিরবিদায় নিলেন।
নিজেদের অজান্তেই মিস্টার বার্দে, আসিফ মামা আর ভাগনে সাদিতের চোখ ফেটে বেরিয়ে এলো নোনা পানির ঝরনা। মামা আরও শক্ত হয়ে বসলেন। দাঁতে দাঁত চেপে মিস্টার বার্দেকে বললেন- কুইক অ্যাটাক। নো কমপ্রোমাইজ।
ব্যাস শুরু হয়ে গেলো পারমাণবিক ফটোবায়োনিক ব্যারেলগানের বেপরোয়া ফায়ারিং। দেখতে দেখতে পতন হতে চললো আয়রনম্যানের রাজ্যের।
কিন্তু না। হঠাৎই কোত্থেকে রিসোলেটিং প্রভিন্স থেকে অপহরণ করে আনা পরিবারগুলোকে ‘এলিয়ন-ঢাল’ হিসেবে প্রাসাদের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে আয়রনম্যান। ইনভিজুয়াল আল্ট্রাসাউন্ড সিস্টেম থেকে গমগমে কণ্ঠে বেশ অহঙ্কারের সাথে এই প্রথমবারের মত স্বয়ং আয়রনম্যানের হুঙ্কার ভেসে এলো। পরিষ্কার ভাষায় আয়রনম্যান জানিয়ে দিলো- ওরে অপদার্থ বিজ্ঞানী বার্দে! তোরা দুনিয়া থেকে মানববিজ্ঞানীকে হায়ার করে এনেছিস আমাকে শায়েস্তা করতে! তাই তো? ওদিকে আবার মাকড়সা বিজ্ঞানীকে আটক করেছিস বটে! আর আমাদের হাতে থাকা ক্ষেপণাস্ত্রগুলোও ফুরিয়েছে বটে! কিন্তু, তার আবিষ্কার করা প্রযুক্তি এখন আমার হাতে। আমরা এরইমধ্যে তা প্রয়োগ করেছি তোদের বংশধরদের ওপর। দেখ-দেখ, চোখ খুলে ভালো করে দেখে নে। আমার প্রাসাদের চারপাশে এখন ওরাই আমাকে রক্ষা করবে। ওরা এখন আর তোদের মত এলিয়ন নেই। ওরা আমাদের অক্সিরাইবো মোশনের ক্যারিশমাতে একেকটা পরমাণুবোমা ঠেকানো আয়রনম্যান। মন-মানসিকতায়ও আমারই মত কঠিন-পাষাণ। হা:… হা:… হা:….. যদি আর বাড়াবাড়ি করিস তো তোদের বংশধরদের ওপর দিয়েই যুদ্ধটা চালিয়ে যা। তোরাই তোদের বংশধরদের মেরে সাফ করে ফেল। হা:… হা:… হা:…..
আয়রনম্যানের কণ্ঠের আওয়াজগুলো একেকটা তীরের ফলার মতো তীক্ষè হয়ে মানববিজ্ঞানী আরমান মামা এবং এলিয়নবিজ্ঞানী বার্দের কানে প্রবেশ করতেই মামা দাঁতে দাঁত চেপে কটমট শব্দ তুলে কিছুটা বিরক্তি প্রকাশ করলেন। কিন্তু আয়রনম্যানের কথাগুলোর জবাব দেয়ার কোনো পথ খুঁজে পেলেন না। তাৎক্ষণিকভাবে মিস্টার বার্দের সাথে ডিভাইজ কানেক্ট করে জানতে চাইলেন- আচ্ছা মিস্টার বার্দে! আয়রনম্যানের কণ্ঠের আওয়াজ তো আমরা স্পষ্টই শুনলাম। আপনাদের হাতে এ ধরনের কোনো সিস্টেম নেই? যাতে আমাদের কথাগুলো ওই ব্যাটার কানেও পৌঁছে দেয়া যায়?
মিস্টার বার্দে জানালেন- আসলে এটা কোনো সিস্টেম নয়। এলিয়নরা চাইলে শত কিলোমিটার দূর থেকেও আমাদের কানে কথা পৌঁছে দিতে পারে। এটা আমাদের একটা অলৌকিক ক্ষমতা। তুমি শুধু বলো, আয়রনম্যানের চ্যালেঞ্জের জবাব কি দেবে? আমি দোভাষীর মতো তোমার কথা ওর কানে পৌঁছে দিচ্ছি।
মিস্টার বার্দের কথায় আশ্বস্ত হয়ে মামা কিছু একটা ভাবলেন। তারপর মুচকি হেসে বললেন- আয়রনম্যানকে জানিয়ে দিন- আমরা নিজেদের বংশধরদের দিকে আর তাকাতে চাই না। ওরা যদি সত্যি আয়রনম্যানে রূপান্তরিত হয়ে গিয়ে থাকে তো, আমরা ওদের সমূলে শেষ করে দিয়েই তোমাকে আটক করবো।
মামার কথা শুনে মিস্টার বার্দে হায় হায় করে উঠলো- সেকি কথা বলছো মিস্টার আরমান? তাহলে আর এতো ভয়াল যুদ্ধ বাধালাম কাদের জন্য। আমরা যদি আমাদের বংশধরদের ফিরিয়েই নিতে না পারি….
মামা আরও শক্ত কণ্ঠে বললেন- আমি যা বলেছি তাই হবে। আগে তো কথাটা আয়রনম্যানকে জানিয়ে দিন।
মিস্টার বার্দে মামার কণ্ঠের দৃঢ়তা দেখে কথা বাড়াতে উৎসাহ পেলেন না। তিনি কেবল ‘ওকে দিচ্ছি’। বলেই নিজ কাজে মনোনিবেশ করলেন। তাতে চমৎকার ফলাফল পাওয়া গেলো। আয়রনম্যান ভড়কে গিয়ে জানিয়ে দিলো- আসলে ওরা ওদের মতোই আছে। ওরা কেউই আয়রনম্যানে পরিণত হয়নি। বরংতো তোমরা আমার প্রাসাদের দরবার হলে এসে আমার সাথে একটা আপসরফা করতে পারো।
আয়রনম্যানের প্রস্তাবটা পেয়েই মামা সর্বোচ্চ সতর্কতার সাথে পুরো সুপারস্পেস কমান্ডকে তিন স্তরে আয়রনম্যানের প্রাসাদ ও প্রাসাদ এলাকার চারপাশটা ঘিরে ফেলার নির্দেশ দিলেন। তারপর অগ্রবর্তী হিসেবে এলিয়েন রোবোসার্জেন্টকে বায়োকপ্টারে সবার আগে আয়রনম্যানের প্রাসাদে প্রবেশের আদেশ করলেন।
আদেশ পেতে দেরি। কিন্তু রোবোসার্জেন্ট তা বাস্তবায়নে পলক ফেলার সময়টুকুও নিলো না। সে উড়ে গিয়ে পাঁচ মিনিটের মধ্যেই খবর নিয়ে এলো- পরিস্থিতি আমাদের অনুকূলে। আয়রনম্যান তার সভাসদদের নিয়ে দরবার হলে অপেক্ষা করছে।
ব্যাস, মিস্টার বার্দে, রিসোলেটিং প্রভিন্সের কাউন্টার জেনারেল এবং ভাগনে সাদিতকেসহ পারমাণবিক ফটোবায়োনিক ব্যারেলগানধারী বিশাল এক স্কোয়াড সাথে নিয়ে মামা প্রথমেই সামনাসামনি হলেন রিসোলেটিং প্রভিন্স থেকে তুলে আনা এলিয়নদের। তাদের সবারই করুণ অবস্থা। তারপরও সবাই মৃদু হাসিমাখা মুখে বার্দে বাহিনীর সদস্যদের স্বাগত জানালো। তাদের পেছনে আয়রনম্যানের পরমাণু অস্ত্রধারীরা প্রায় নিষ্ক্রিয় হয়ে দাঁড়িয়ে। মনে হচ্ছে পরিস্থিতির কারণে ওরা অনেকটাই বিব্রত।
সামনে এগোতে এগোতেই আরমান মামা মিস্টার বার্দেকে নিম্নস্বরে বললেন- দরবার হলে আপনারাই আলোচনা শুরু করবেন। আমি সুবিধামত স্থানে বসবো। আপনাকে আমার পাশে না বসলেও চলবে। তবে সবসময় সতর্ক থাকবেন যে কোনো পরিস্থিতির জন্য।
মামার কথায় মিস্টার বার্দে মাথা ঝুঁকিয়ে সায় দিতে দিতেই অদ্ভুত আকার-আকৃতিতে গঠিত আয়রনম্যানের দরবার হলে ঢুকে পড়লেন। কিন্তু দরবার হলে পা রেখেই আরমান মামা অবাক হয়ে গেলেন একটা বিষয় লক্ষ করে। আয়রনম্যান যে সিংহাসনে বসে আছে সেটির তিন দিকে দাউদাউ করে আগুন জ্বলছে। আর তার লেলিহান শিখা দরবার হলের ছাদ অবধি সাপের ফণার মত দুলে দুলে ফস ফস শব্দ তুলে দ্যুতি ছড়াচ্ছে। আয়রনম্যানের সামনে রাখা একটা অগ্নিকুণ্ডলী থেকেও একইভাবে লেলিহান শিখা উপরের দিকে উঠছে।
তারই সামনে একটা গ্যালভানাইজং লোহার টেবিল বেশ চকচক করছে। টেবিলটার দু’পাশের একপাশে বসেছে আয়রনম্যানের সভাসদ। অপর পাশে আসন নিতে হলো মিস্টার বার্দে এবং তার দলবলকে। আরমান মামা এমন একটা আসন বেছে নিয়ে বসলেন, যেন- কোনাকুনিভাবে আয়রনম্যান তার নজরে আসে।
আয়রনম্যানই শুরু করলো আলোচনা। সে বেশ অহংকারের সাথে মুখ খুললো- আমরা বেকায়দায় পড়ে তোমাদের সাথে আলোচনায় বসেছি বটে। তবে এ কথা ভাববার কোনো কারণ নেই যে, আমরা এখন তোমাদের কাছে আত্মসমর্পণ করবো। এখনও আমার যে ক্ষমতা আছে তাতে, তোমাদের নিপাত করে দিয়ে তবেই নতুন করে অভিযানে নেমে পড়তে পারি। এরই মধ্যে তোমাদের সব কলাকৌশল আমার জানা হয়ে গেছে। তোমাদের সাথে আসা মানববিজ্ঞানী তো আমার কাছে একটা নস্যিমাত্র। ওর সাথে আমার কথা বলার প্রয়োজন মনে করছি না। শুধু মিস্টার বার্দে! হ্যাঁ, মিস্টার বার্দে তুমি একটা কথা কান পেতে শুনে রাখো…
আয়রনম্যান পরবর্তী কথা বলার আগেই তার সভাসদদের শরীর থেকে নিজ নিজ পোশাকগুলো জ্বলে পুড়ে খুলে খুলে পড়তে লাগলো। আর ওদের শরীরগুলো অনেকটা আস্তে আস্তে খর্বকায় হতে লাগলো। প্রত্যেকেই চিৎকার করে কিছু বলতে চাইছে কিন্তু কারও মুখ দিয়ে টুঁ শব্দটি পর্যন্ত বের হচ্ছে না। অবস্থা দেখেই আয়রনম্যান যা বোঝার বুঝে নিয়ে এক লাফে সিংহাসন ছেড়ে লাফিয়ে পড়লো বিশাল আকৃতির গ্যালভানাইজিং টেবিলের ওপর। কিন্তু আসিফ আরমান মামা প্রস্তুত হয়েই ছিলেন। তিনি তার চোয়াল শক্ত করে উঠে দাঁড়িয়েই নিঃশব্দে কিসব পড়তে শুরু করলেন, অমনি সভাসদদের মতো অবস্থা শুরু হয়ে গেলো আয়রনম্যানেরও। সে ধপ্পাস করে পড়ে গেলো টেবিলের ঠিক মাঝখানটায়। আর ধীরে ধীরে খর্বকায় হতে লাগলো…।
আরমান মামা এবার লাফ মেরে টেবিলের ওপর উঠে আয়রনম্যানের একেবারে কাছে বসে তার গায়ে জোরে জোরে ফুঁক দিতে লাগলেন। তাতে দেখতে দেখতে আয়রনম্যান জ্বলে পুড়ে একরত্তি ছাই হয়ে গেলো। ওদিকে তার সভাসদরাও জ্বলে পুড়ে ছাই!
আরমান মামা স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে বললেন- আলহামদুলিল্লাহ। আমাদের অভিযান শেষ। এবার আয়রনম্যানের রাজপ্রাসাদ তুলে নিয়ে আমরা ছুটবো রিসোলেটিং প্রভিন্সের দিকে। এই অভিশপ্ত ব্ল্যাকহোল রাজ্যে আর এক সেকেন্ডও নয়।
মামার কাণ্ডকারখানা আর প্রস্তাব শুনে মিস্টার বার্দেই শুধু নয়- তার পুরো কমান্ড বিস্ময়ে থ হয়ে গেছে। তারপরও মিস্টার বার্দে আরও অবাক হয়ে জানতে চাইলো- এই রাজপ্রাসাদ আমরা তুলে নিয়ে যাবো!
আরমান মামা টেবিলের ওপর থেকে ফ্লোরে নামতে নামতে বললেন- নয় তো কী! তোমাদের উভয় গোষ্ঠীকেই আমি চিনে ফেলেছি। ওদের আর তোমাদের মাঝে পার্থক্য কেবল বিশ্বাস ও সৎকর্মে। হাজার হাজার বছর আগে যেমনি তোমাদেরই পূর্বপুরুষদের একজন যেমনি চোখের পলকে রানী বিলকিসের সিংহাসন তুলে এনে আমাদের নবী হযরত সোলাইমান আলাইহিস সালামের করতলে পৌঁছে দিয়েছিলো, আজ তোমাদের বংশধরদের মাঝে এমন কাউকে সে দায়িত্ব দিতে পারো। আর নাহলে সবাই মিলে চেষ্টা তো করে দেখ। নিশ্চয় তোমাদের সে শক্তি হবে আশা করছি।
মামার কথার মর্মবাণী বুঝে নিতে মিস্টার বার্দের এবার আর বেগ পেতে হয় না। সে ধরা পড়ে যাওয়া আসামির মত তোতলাতে তোতলাতে বললো- ঠিক ঠিক আছে, তাই হবে। আজ আমাদের অভিযানের ফলে আমাদের বংশের যারা মুক্ত হয়েছে তাদের ওপরই এই দায়িত্ব অর্পণ করছি। তবে তাদের নেতৃত্বে থাকবে রোবোসার্জেন্ট। আর আমরা এখন ফিরে যাবো আমাদের রিসোলেটিং প্রভিন্সের মহাবাদশাহের দরবারে।
দেখতে দেখতে আল্ট্রাসনিক গতিতে পুরো সুপারস্পেসশিপ স্কোয়াড উড়ে চলে রিসোলেটিং প্রভিন্সের দিকে। একে একে ঘন সালফার, মিশমিশে কালো কার্বন, বর্ণিল মিথিলিন এবং গ্র্যাভিটিঅ্যাস কালারের হিলিয়াম গ্যাসের প্রাণঘাতী মেঘস্তর পেরিয়ে দিগন্ত বিস্তৃত ফায়ারওয়ে পেরিয়ে তারা এসে হাজির হয়ে যায় রিসোলেটিং প্রভিন্সের মহাবাদশাহের দরবারে। মহাবাদশাহ প্রস্তুত হয়েই ছিলেন। পুরো ঘটনা শোনার জন্য তার যেন আর তর সইছে না। মহাবাদশাহের আগ্রহের প্রতি লক্ষ রেখে প্রধানবিজ্ঞানী ডিকেটর গোরিয়ান বার্দে মহাবাদশাহকে অভিযানের শুরু থেকে শেষ অবধি বিস্তারিত জানালেন।
সব শুনে মহাবাদশাহ এবার মানববিজ্ঞানী আরমান মামার দিকে তাকিয়ে বললেন- আশ্চর্য! অতিশয় আশ্চর্য। আয়রনম্যানের শেষ পরিণতিটা যে কেমন জাদুকরীভাবে ঘটে গেলো তার মোজেজা কিন্তু আমি এখনও বুঝতে পারছি না।
মামা মুচকি হেসে দৃঢ়তার সাথে জবাব দিলেন- না না, এখানে কোনো জাদুকরী ব্যাপার ছিলো না। এখানে কার্যকর ছিলো মহান আল্লাহ তায়ালার কালাম। আমি যখন আয়রনম্যানের প্রকৃত আত্মপরিচয় বুঝে ফেললাম তখনই একটা আধ্যাত্মিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম। মিস্টার বার্দেকে আলোচনার দায়িত্ব দিয়ে আমি একটা সুবিধাজনক স্থানে আসন নিয়ে বিসমিল্লাহ বলে আল কুরআনের বিশেষ বিশেষ আয়াত পাঠ করে ওদের প্রতি ঘন ঘন দম করতে লাগলাম। একে বলা হয় ‘মঞ্জিল’ পাঠ। প্রকাশ্যে যেসব ‘বদ’ শয়তানিতে লিপ্ত হয়, তাদের সমূলে বিনাশ করতে ‘মঞ্জিল’ এক মহারক্ষাকবচ। একজন আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ ও বিশ্বাসী হিসেবে নিশ্চয়ই আপনি তা উপলব্ধি করতে পারছেন ওহে মহাবাদশাহ।
মামার কথা শুনে এলিয়নদের মহাবাদশাহ আরও অবাক হয়ে জানতে চাইলেন- আচ্ছা হে মানববিজ্ঞানী! রোবোটের পোশাকের আচ্ছাদনে আমাদের এলিয়নরা যে ভিন্ন কোনো প্রাণী, সেটা তুমি জানলে কেমন করে?
মামা মুচকি হেসে বললেন- জানতে পেরেছি রোবো এলিয়নদের আলাপ আলোচনা থেকেই। কিন্তু তা তখন তাদের কাউকেই বুঝতে দেইনি। এই প্রভিন্সে আমাকে নিয়ে আসার পর প্রথমেই যখন রোবো এলিয়নরা আমাকে জানালো- ‘আপনাদের তেমন কোনো আকার নেই। সে জন্য সাধারণত আমরা মানে মানুষ আপনাদের দেখতে পাই না। কেবল আপনাদের পোশাকের দিকটাই আমাদের নজরে আসে। যদিও আপনাদের কোনো আকৃতি নেই, তবে ইচ্ছা করলে আপনাদের জ্ঞাতি ভাইয়েরা কোনো না কোনো আকৃতি ধারণ করতে পারে। এই যেমন বাঘ, শিয়াল, হাতি, ঘোড়া, গরু, ছাগল, কুকুর, বিড়াল, সাপ, ব্যাঙ এমনকি তারা মানুষের আকারও ধারণ করতে পারে।’
এটা ছিলো এলিয়নের ছদ্মবেশে আপনাদের চেনার জন্য আমার প্রথম সূত্র।
আবার গ্রিনওয়েতে কোনো এক দুষ্টু এলিয়নের প্রতি বিরক্ত হয়ে রোবোসার্জেন্ট যখন বললো- ‘বদ জিনগুলোর অত্যাচারে আর বাঁচি না’। তখন পেয়ে গেলাম আপনাদের পরিচয়ের দ্বিতীয় সূত্রটি।
কিন্তু তখনও আমি চুপ করে ছিলাম। তারপর বিভিন্ন আলোচনা আর আয়রনম্যান এবং লোহা বিষয়ে আপনাদের সাথে আলোচনা আমাকে আরও সজাগ করেছে। বিশেষ করে ওহে মহাবাদশাহ! আপনার সাথে আলাপ করার সুযোগটি ছিলো আমার জন্য একটি চমৎকার সুযোগ। তা ছাড়া আপনার প্রধানবিজ্ঞানী ডিকেটর গোরিয়ান বার্দে, রোবোসার্জেন্ট এবং বার্নার্ড ম্যাশেলের সাথে আলাপ আলোচনায় পরিষ্কার বুঝে নিয়েছিলাম যে, এলিয়ন বেশে আয়রনম্যানের জ্ঞাতিগোষ্ঠী এবং আপনার রাজ্যের সবাই জাতিতে একই। শুধুমাত্র পার্থক্য হলো, আয়রনম্যানের জ্ঞাতিগোষ্ঠী মহান রাব্বুল আলামিনের প্রতি চরম অকৃতজ্ঞ, অবাধ্য এবং অবিশ্বাসী আর আপনারা হলেন মহান রাব্বুল আলামিনের প্রতি দৃঢ়ভাবে কৃতজ্ঞ। আমরা যাকে বলি পাক্কা ঈমানদার।
মানববিজ্ঞানী আরমান মামা এবং এলিয়নদের মহাবাদশাহ যখন কথা বলছিলেন, তখন উপস্থিত সভাসদরা পিনপতন নীরবতায় তাজ্জব হয়ে সব শুনছিলো। কারও মুখে একটা শব্দও ফুটছিলো না। কিন্তু খুদে মানববিজ্ঞানী সাদিত খানের আর তর সইছিলো না। ও রীতিমত কৌতূহল নিয়ে জানতে চাইলো- আচ্ছা মামা, তুমি কী এলিয়নদের আসল জাত পরিচয়টা একটু খুলে বলবে না? আকার ইঙ্গিতে কী সব বলে যাচ্ছ, আমি তার আগা-মাথা কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না।
ভাগনের কথায় বিজ্ঞানী মামা আসিফ আরমান একটু মুচকি হেসে বললেন- নিশ্চয়ই বলবো। আর তা স্পষ্ট করে বলতে গেলে আমাকে পবিত্র আল কুরআনের সাহায্য নিয়েই বলতে হবে।
সাদিত খান এবার বলতে গেলে ধৈর্যহারা হয়ে ওঠে। ও বলে- এতো ভণিতা না করে সোজাসুজি বলেই ফেলো তো।
মামা সাদিতের মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে প্রশান্ত মনে সুরেলা কণ্ঠে বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম পাঠ করলেন। কেমন একটা শীতল দৃষ্টি মেলে এলিয়নদের মহাবাদশাহ এবং তার সভাসদদের দিকে একপলক তাকালেন। তারপর শুরু করলেন, শান্ত কোমল কণ্ঠে তিলাওয়াত করতে লাগলেন আল কুরআনের ‘সূরা জিন’।
অমনি অদ্ভুত সব ঘটনা ঘটতে শুরু হয়ে গেলো। এলিয়ন মহাবাদশাহ একলাফ মেরে সিংহাসন ছেড়ে দাঁড়িয়ে গেলেন। তার দেখাদেখি সভাসদরাও যার যার আসন ছেড়ে দাঁড়িয়ে থরথর করে কাঁপতে শুরু করলো। দেখতে দেখতে মহাবাদশাহের দরবার হল ডানে বামে এবং পেছন দিকে সম্প্রসারিত হতে লাগলো। সকল পর্যায়ের এলিয়নদের রোবোটির পোশাকসমূহ খুলে খুলে যার যার পায়ের সামনে পড়তে লাগলো। আর প্রত্যেক রোবোটিক পোশাকের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসতে লাগলো একেকটা আলোর ফোয়ারা। প্রত্যেকটি আলোর ফোয়ারা থেকে সুরেলা কণ্ঠে বেরিয়ে আসতে থাকলো কেবল একটিমাত্র আওয়াজ- সুবহানাল্লাহি ওয়াবিহামদিহি সুবহানাল্লাহিল আজিম।
দৃশ্য দেখে সাদিত খানিকটা ভড়কে গিয়ে মামার খুব কাছ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে মামার ডান হাতটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরলো। কিন্তু মামার কোনো ভাবান্তর নেই। তিনি সুরেলা কণ্ঠে তেলাওয়াত করেই চলেছেন।
সাদিত খান হঠাৎ পায়ের তলায় কেমন যেন সুড়সুড়ি অনুভব করে। ওর চোখের সামনের সকল দৃশ্যাবলি ঘোলাটে হয়ে যায়। মাথাটাও ঝিমঝিম করে ওঠে। সাদিত আর নিজেকে স্থির রাখতে পারে না। ও মামাকে প্রায় জাপটে ধরে চিৎকার করে ওঠে- মামা! মামা!! আমার পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গিয়ে বিশাল ভয়াল খাদের সৃষ্টি হয়েছে। আমি আর দাঁড়াতে পারছি না। আমি ভয়াল খাদের মাঝে পড়ে যাচ্ছি। আমাকে ধরো। শক্ত করে ধরো মামা….
অমনি মামা কুরআন তিলাওয়াত থামিয়ে সাদিতের কাঁধে ঝাঁকি দিতে দিতে বললেন- আহা! দিলি তো কুরআন তিলাওয়াতের মুডটাকেই নষ্ট করে। ফজর সালাত পড়ে অমনি যে আবার ঘুমিয়ে পড়লি, তো কী এমন স্বপ্নটা দেখে ভড়কে গেলি শুনি?
মামার কথায় সাদিত ধরমড়িয়ে উঠে মামাকে এবার সত্যি সত্যি জাপটে ধরে। চারপাশে তাকিয়ে দেখে, এ যে তাদের বাড়ি! মামার পাশে বিছানায় শুয়ে আছে সাদিত! তবুও তোতলাতে তোতলাতে বলে- সে কথা আর বলো না মামা!… তোমাকে নিয়েই আমি লোহার বারসহ এলিয়ন প্রভিন্সে চলে গেছি।… সেখানে লোহার বারকে স্বর্ণের বার বানানোর সূত্রটাও খুঁজে পেয়েছি।… আর এই খোঁজাখুঁজিতে দেখা পেয়ে গেলাম এলিয়নদের মহাবাদশাহ, এলিয়নদের প্রধানবিজ্ঞানী ডিকেটর গোরিয়ান বার্দে, রোবোসার্জেন্ট, বার্নাড ম্যাশেল, আয়রনম্যান, মাকড়সা বিজ্ঞানী, ব্ল্যাকহোল রাজ্য, মহাজাগতিক ভয়াল যুদ্ধ…. ওউফ… আমি আর ভাবতে পারছি না…।
মামা এবার সাদিতের মাথায় আলতো করে একটা চাটি মেরে বললেন- হুম বুঝেছি, ক’দিন ধরে লোহার বারকে কেমন করে স্বর্ণের বার বানাবি সেই ভাবনায় তোর মাথাটা একবারে গুলিয়ে গেছে। দু’দিন আগেও স্বপ্নের মাঝে কুড়িয়ে পেয়েছিলি গ্যালভানাইজিং লোহার বার…।
সাদিত মামার হাতটা আবারও চেপে ধরে অস্ফুট স্বরে কেবল উচ্চারণ করে- মামা!
মামা সাদিতের হাতটা নিজের হাত থেকে ছাড়িয়ে দিয়ে বললেন- ফজরের পর কুরআন না পড়ে ঘুমিয়েছিলি। টানা আড়াই ঘণ্টা ঘুমিয়েছিস। আজ তোকে আলাভোলা জিনে ভালোমতো পেয়ে বসেছিলো…। নির্ঘাত তোকে স্বপ্নে মাঝেই আরেক স্বপ্ন দেখিয়েছে। কল্পজগতে বেশ ভালোই কাটিয়েছিস। যা এখন হাত মুখ ধুয়ে পড়তে বসগে যা। ওদিকে স্কুলে যাবার সময়ও ঘনিয়ে এলো।
মামার কথার তোড়ে সাদিতের স্বপ্নের ঘোর কেটে যায়। আর কথা না বাড়িয়ে সাদিত অলস পায়ে ওয়াশরুমের দিকে এগিয়ে যায়। (সমাপ্ত)

SHARE

Leave a Reply