Home গল্প অ্যাবাউট টার্ন -মোহাম্মদ লিয়াকত আলী

অ্যাবাউট টার্ন -মোহাম্মদ লিয়াকত আলী

– ডাইরেক্ট ঢাকা, ডাইরেক্ট ঢাকা, সিটিং সার্ভিস।
– হেলপারের হাঁকডাকের সাথে কুমিল্লার পদুয়া বাজার বাইপাস পয়েন্ট ঢাকা-চাঁদপুর রুটের একটি বাস ব্রেক করে। চারজন নামে ও তিনজন ওঠে। ওঠার সময় একজন মন্তব্য করে :
– ডাইরেক্ট ঢাকা হলে এখানে থামলি কেন?
– গেলে প্যাচাল না পাইরা উইঠা পড়েন। থামিনি, স্লো করছি।
এখানো তিনজন যাত্রী দাঁড়িয়ে আছে সিটিং সার্ভিসে। সিটিং সার্ভিসে দু’-চারজন দাঁড়িয়ে থাকা এখন কোন দোষণীয় ব্যাপার নয়। সামনের সারিতে একজন মহিলা বসা। মাসুদের নিকট চেহারাটা পরিচিত মনে হচ্ছে। পাশে দাঁড়িয়ে কয়েক দফা আড়চোখে তাকায় সে। মহিলাটিও বিষয়টি টের পান।
ইলিয়টগঞ্জ এলে মহিলার পাশে বসা লোকটা নেমে যায়। এই সুযোগে সিটটা দখল করে মাসুদ। আর একবার তাকায় চেহারার দিকে।
হেলপার আরেক দফা হাঁক দেয়-
– ডাইরেক্ট ঢাকা, সিটিং সার্ভিস।
স্লো রানিং অবস্থায় লাফিয়ে ওঠে দুইজন যাত্রী। দাঁড়ায় মাসুদের গা ঘেঁষে। প্রতিবাদী মাসুদ প্যাসেঞ্জারকে কিছু না বলে হেলপারকে জিজ্ঞেস করে,
– তোদের সুপার লোকাল সিটিং সার্ভিস আর কতক্ষণ এমন বিরতিহীন চলবে?
– না, স্যার। দাউদকান্দি পার অইলেই ডাইরেক্ট ঢাকা। আর থামাথামি নেই।
– দাউদকান্দির পরে আর ওঠার প্যাসেঞ্জার পাইবি কই? তাই ডাইরেক্ট? দুই নম্বর ব্যবসা আর কত করবি?
– না স্যার, লাভের লাভ কিছুই নেই। খালি খালি পাবলিকের গালি খাই। সামনের মাসতে পুরাপুরি বিরতিহীন কইরা দিমু।
– কে বিশ্বাস করবে তোদের? সিটিংয়ের নামে চিটিংবাজি সবাই বুঝে।
– সামনে সাইনবোর্ড লাগায় দিমু “আল্লাহর কসম বিরতিহীন। হাফ পাস নেই। মানুষ এখনো আল্লাহকে বিশ্বাস করে।”
হেলপারকে ছেড়ে মাসুদ এবার মনোযোগ দেয় পাশের মহিলার দিকে।
– স্যরি ম্যাডাম, আপনার কি কোনো যমজ বোন আছে?
– হোয়াট ননসেন্স? টিভিতে সস্তা নাটক সিনেমা দেখে রাস্তা ঘাটে যমজ ছেলেমেয়ে খোঁজেন নাকি? বাস্তবে লাখে এক ফ্যামিলিতেও যমজ নেই।
– আমাকে অতো ফালতু লোক মনে করবেন না। ঐ সব নাটক ফাটক আমি দেখি না। আপনাকে চেনা মনে হচ্ছে, তাই জিজ্ঞেস করলাম।
– আমার কোনো যমজ বোন টোন নেই। লোকে বলে আমার চেহারা ঠিক আমার মায়ের মত। এখন মা বুড়ি হয়ে গেছেন। পঁচিশ-ত্রিশ বছর আগে দেখতে ঠিক আমার মতো ছিল। তখন হয়তো মাকে দেখেছেন।
– দাঁড়ান দাঁড়ান।
– সিট থাকতে দাঁড়াবো কেন?
– দাঁড়ান মানে দাঁড়ানো নয়। আমাকে একটু ভাবতে দেন।
– দিলাম, ভালো করে ভাবেন।
– আপনার বাড়ি কি মতলব?
– হ্যাঁ, মতলব। কিন্তু আপনার মতলবটা কী?
– আমার কোনো মতলব নেই। ঠিক মিলে গেছে।
– কী মিলে গেছে?
– আমার অনুমান মিলে গেছে। আপনার মার নাম কি সুরাইয়া?
– হাউ ওয়ান্ডারফুল! আপনি আমার মায়ের নাম জানলেন কী করে? আপনার বাড়িও কি মতলব?
– জিনা, আমার বাড়ি ঢাকা। জীবনে কখনো মতলব যাইনি।
– তা হলে মাকে চিনেন কী করে?
– কাউকে চেনার জন্য মতলব যেতে হয় নাকি? আপনার মা কখনো ঢাকায় ছিল না?
– দাঁড়ান, দাঁড়ান।
– এবার আমি দাঁড়াব?
– একটু ভাবতে দেন।
– ভাবেন।
ভাবতে ভাবতে গাড়ি সায়েদাবাদ পৌঁছে গেছে।
– ভাবা শেষ হয়েছে? নাকি আরো ভাববেন। এখন নামতে হবে। নেমে টাউন সার্ভিসে আমি বাড্ডা যাবো।
– আমিও বাড্ডা যাবো। অনেকবার ঢাকায় এসেছি, কখনো বাড্ডা যাইনি। ডিটেইলস ঠিকানা আছে। ঠিকানা মিলিয়ে সব সময় লোকেশন খুঁজে পাওয়া যায় না। আপনার সাথে গেলে হেলপ হবে।
– মহিলাকে পথ দেখিয়ে মাসুদ সিটি সার্ভিস স্ট্যান্ডের কাছে নিয়ে যায়।
– আসেন, বাস দাঁড়িয়ে আছে। ঐ সালসাবিল পরিবহনে যাবো।
বাসে উঠতে উঠতে মহিলাটি বলে,
– সুন্দর নাম। আরবি শব্দ।
বসতে বসতে মাসুদ বলে,
– আরো অনেক সুন্দর সুন্দর টাউন সার্ভিস আছে ঢাকায়। লাব্বায়েক, বোরাক, রবরব, আলিফ, নুরে সাদী, আল মদীনা। জাবালে নুর।
– সুন্দর সুন্দর ইসলামী নাম। মুসলমানদের দেশে এসব নামই মানান সই।
– শুধু ইসলামী নাম নয়। টিভি চ্যানেলের মত একুশ, বায়ান্ন, একাত্তর পরিবহন চালু হয়েছে। নাইন, টুয়েন্টি ফোর এখনো চালু হয়নি। থাক পরিবহন ডিকশনারি নিয়ে আলোচনা করে লাভ নেই। আপনার মার কথা জিজ্ঞেস করেছিলাম। আপনি ভাবতে চাইছিলেন। ভেবেছেন?
– হ্যাঁ, হ্যাঁ, শোনেছি আমার মা আমাদের জন্মের আগে ঢাকায় ছিলেন দাদা-দাদীর সাথে। সেখানেই লেখাপড়া করেছেন। এখন সেখানে আমার এক মামা থাকেন। আমি সেখানেই যাচ্ছি।
– হানড্রেড পার্সেন্ট মিলে গেছে। বাড্ডা হাইস্কুলে আপনার মা আমার ক্লাস মেট ছিল। আপনার মামাকেও আমি চিনি। বাড়ি বাসস্ট্যান্ডের কাছেই। হেঁটেই যাওয়া যাবে।
মহিলাটির পার্সের মোবাইল ফোনটা বেজে ওঠে। দ্রুত বের করে কল রিসিভ করেন।
– হ্যালো, হ্যাঁ মা, ঢাকায় পৌঁছে গেছি। বাড্ডার বাসে উঠেছি। বাসে এক আংকেলের সাথে দেখা হয়েছে। তিনি নাকি তোমার সাথে স্কুলে পড়েছেন। একটু কথা বলবে?
মাসুদ এতক্ষণ ফোনালাপ শুনছিল। এবার মোবাইল সেটটা এগিয়ে দেন মহিলা।
– নিন, মার সাথে কথা বলুন।
ত্রিশ বছর পর ক্লাসমেটের সাথে কথা বলবে। গলাটা ঝেড়ে কেশে নেয় মাসুদ।
– হ্যালো, আমি মাসুদ বলছি। বাড্ডা হাইস্কুলের সেই মাসুদ, ফারুক, মঞ্জুর কথা মনে আছে?
– দাঁড়াও, দাঁড়াও মাসুদ। তোমার সাথে অনেক কথা আছে। নাম্বারটা টুকে রাখ। বাড়ি গিয়ে এই নাম্বারে কল দিও। বাস থেকে নেমেতো দু’জন দু’দিকে চলে যাবে। এত কথা বলার সময় পাবো না।
– তুমি বলতে থাক। যথেষ্ট সময় পাবে। কুমিল্লা থেকে ঢাকা এসেছি দেড় ঘণ্টায়। সায়েদাবাদ থেকে বাড্ডা যেতে লাগবে দু’ঘণ্টা। ঢাকা শহরের যানজট সম্পর্কে তোমার কোন আইডিয়া নেই। চাকার ওপর ঢাকাবাসীর দিন কাটে। কী এমন কথা? বলতে অনেক সময় লাগবে?
– নয় বছর এক সাথে পড়েছি, খেলেছি। ত্রিশ বছর পর দেখা। সময় লাগবে না?
– দেখা! মোবাইলেতো ছবি নেই। দেখা হলো কই? শুধু শোনা হলো।
– ঐ হলো। দেখা আর শোনা একই কথা। আচ্ছা, শাহাবুদ্দিন স্যারের কথা মনে আছে?
– থাকবে না আবার? সাইজে লম্বা ছিল বলে আমরা আড়ালে লাম্বু স্যার বলতাম। পরীক্ষার প্রশ্ন আউট করার কারণে চাকরি গিয়েছিল।
– ঐ সব নিয়ে এখন কথা না বলাই ভালো। তিনি কিছুদিন আগে মারা গেছেন।
– মরে গেলেই সব শেষ হয় না। কিছু মানুষের কৃতকর্মের ফল অন্যকে সারা জীবন ভুগতে হয়। তুমিতো স্কুলের ফার্স্ট বয় ছিলে। ওয়ান থেকে নাইন পর্যন্ত সব ক্লাসে ফার্স্ট হয়েছো। শুধু নাইন থেকে টেনে ওঠার সময় বার্ষিক পরীক্ষার থার্ড হলে। ফার্স্ট হলো ফারুক, আমি সেকেন্ড আর তুমি থার্ড। তুমি খুব কেঁদেছিলে রেজাল্ট দেখে।
Ñ তাতে আমার কিছু হয়নি। বোর্ডে ঠিকই ফার্স্ট ডিভিশন পেয়েছি। স্কলারশিপ নিয়ে কলেজে ভর্তি হয়েছি।
– তোমার অনেক ক্ষতি হয়েছে। আর ক্ষতিটা করেছিলাম আমি। তোমার কি মনে আছে, একদিন আমি ক্লাসে একটা আন-কমন ইংলিশ রচনা মুখস্থ করছিলাম। তুমি বলেছিলে, এটাতো পরীক্ষায় আসবে না। খামাখা কষ্ট করছি। আমি বাজি ধরেছিলাম, এটাই পরীক্ষায় আসবে বলে। পরীক্ষায় ঐ আন-কমন রচনাটাই এসেছিল, জার্নি বাই বাস। তোমার কি একটুও সন্দেহ হয়নি, কিসের জোরে আমি বাজি ধরেছিলাম?
– আমি সরল সোজা মানুষ। অত কিছু ভাবিনি।
– কিন্তু আমি এখনো ভাবছি। তুমি আজও জান না, ঐ লাম্বু স্যার পরীক্ষার এক সপ্তাহ আগেই আমাকে পাঁচ বিষয়ের প্রশ্ন দিয়েছিলেন। আর ঐ ফারুক। যাকে আমরা লিলিপুট বলতাম। সাইজে খাটো হলেও হাত ছিল খুব লম্বা। টিফিন পিরিয়ডে আমাদের ও স্যারদের দামি দামি নাশতা খাওয়াতো। মোটা টাকা দিয়ে লাম্বু স্যারের মাধ্যমে এক সেট প্রশ্ন সেও ভাগিয়েছিল। চেয়ারম্যানের ছেলে বলে কথা। পরীক্ষায় ফার্স্ট হলো। তোমার জায়গাটা দখল করে নিলো। কেউ টেরই পেল না।
– তাতে আমার কোনো ক্ষতি হয়নি। স্কুলে ফার্স্ট হয়েছে। কিন্তু বোর্ডে কোনো রকম পাস করে প্রাইভেট কলেজে ভর্তি হয়েছিল। আর এগোতে পারেনি।
– মেয়েটা এতক্ষণ মনোযোগ দিয়ে ফোনালাপ শোনছিল। এবার সেটটা টান মেরে হাতে নেয়।
– স্কুল লাইফের কাহিনী চর্চা করতে করতে চার্জ শেষ। যথেষ্ট হয়েছে। আর দরকার নেই।
– ঠিক আছে। বাড্ডা এসে গেছি। এখনি নামতে হবে। আপনার মায়ের সাথে বকবক করতে করতেই জার্নি বাই বাস শেষ। আপনার সাথে কথা বলাই হলো না। আপনি কেন ঢাকায় এসেছেন?
– আমি এইচএসসি ক্যান্ডিডেট। কাল থেকে পরীক্ষা শুরু। গোপন সূত্রে খবর পেয়েছি, ঢাকায় কুমিল্লা বোর্ডের প্রশ্ন আউট হয়েছে। এক সেট প্রশ্ন কিনবো।
– ভালো চানতো এখনি মতলবে ফিরে যান। নইলে আপনাকে পুলিশে দেবো। প্রশ্নফাঁস চক্রের সাথে জড়িত সন্দেহ মামলা করবো।
– কেন? আমি আপনার কী ক্ষতি করেছি? আমি পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করলে আপনার সমস্যা কী? আমার সাথে শত্রুতা করছেন কেন? মায়ের ছোটকালের বন্ধু মনে করে গোপন তথ্যটা আপনার কাছে ফাঁস করলাম। আর আপনি আমার বারোটা বাজালেন।
– বারোটা বাজাইনি। আপনার ভালো করেছি। বাড়িতে যান ভালোভাবে প্রিপারেশন নেন। এমনিতেই ভালো রেজাল্ট করবেন। আপনার মায়ের প্রতিশোধ নিচ্ছি। যদি ভালো চান, অ্যাবাউট টার্ন, মতলবে ফিরে যান। নইলে খবর আছে।

SHARE

Leave a Reply