Home ফিচার কাকের বাসা -মৃত্যুঞ্জয় রায়

কাকের বাসা -মৃত্যুঞ্জয় রায়

তুমি আমি যেমন ঘর বানিয়ে তার ভেতরে থাকি, কাকরাও তেমনি বাসা বানায়। ওরা কী দিয়ে বাসা বানায়? দেখার জন্য একদিন একটা কাককে লক্ষ করলাম। দেখলাম একটা মেয়ে কাক মাঠ আর পথ থেকে খড়কুটো একটা একটা করে ঠোঁট ফাঁক করে কুড়িয়ে নিচ্ছে ও ঠোঁট চেপে সেগুলো ধরে রাখছে। এভাবে তারা অন্য পাখির পালক, সুতো, সরু ডালপালা, কাচের ভাঙা চুড়ি, চশমার ভাঙা ফ্রেম- এক এক করে সব ঠোঁটে পুরে নিলো। আমার কৌতুহল ছিল, একটা ঠোঁটে নেয়ার পর আর একটা তুলতে গেলে আগেরগুলো ঠোঁট ফাঁক করার সাথে সাথে পড়ে যায় কি না! কিন্তু না, সেগুলো একটাও পড়ল না। ঠোঁটে বাসা বানানোর অনেক জিনিস জড়ো হলে কাকটা উড়াল দিলো। একটা নারকেল গাছের মাথায় গিয়ে বসল ও সেগুলো দিয়ে বাসা বানানো শুরু করলো। শেষ হলে আবার বাসা তৈরির জিনিস জোগাড়ে বেরিয়ে পড়ল। কিন্তু মর্দা কাকটা শুধু তাকিয়ে তাকিয়ে মেয়ে কাকটার কাজ দেখতে লাগল, হয়তো পাহারাও দিতে লাগলো। বোধ হয় ছেলে কাকটার একটু খারাপ লাগলো ওতে। তাই সেও উড়াল দিয়ে মাঠে নেমে পড়ল। মুখে দু’ টুকরো খড় নিয়ে সেও উড়াল দিলো কিন্তু তা আর বাসা পর্যন্ত পৌঁছল না, কা কা করে ডাকতেই সেগুলো মুখ থেকে খসে পড়ল। ছেলে কাকটা হয়তো মেয়ে কাকটাকে দেখাতে চেয়েছিল যে সেও তাকে আসলে সাহায্য করতে চায়। কিন্তু অবশেষে মেয়ে কাকটাই বাসা বানাল ও তার মধ্যে ডিম পাড়ল। ওদের ডিম আবার অন্য পাখিরা নষ্ট করে দেয়, খেয়ে ফেলে বা কোকিল নিজে বাসা না বানিয়ে কাকের বাসায় ডিম পেড়ে রেখে যায়। তাই কখনো কখনো কাকরা শত্রুদের বোকা বানাতে কিছু ভুয়া বাসা তৈরি করে। তবে কোনো ছেলে ও মেয়ে কাক জুটি বাঁধলে একজন না মরা পর্যন্ত তারা একসাথে থাকে। কিন্তু ওদের বেশির ভাগ বাচ্চা দু’ মাস বয়স হলেই মাকে ছেড়ে চলে যায়, আর কখনো তারা মায়ের কাছে ফিরে আসে না। যতদিন বাচ্চারা নিজেরা খাবার খুঁজে খেতে না শেখে ততদিন পর্যন্ত মা কাক খাবার খুঁজে এনে মুখে তুলে বাচ্চাদের খাওয়ায়।
কাকরা সাধারণত লোকালয়ের আশপাশেই থাকে। মানুষ যা যা খায়, কাকরাও তা খায়। কাকরা প্রায় এক হাজার রকমের খাবার খায়। মানুষদের ফেলে দেয়া আবর্জনা থেকে খাবার খুঁটে খায়। ফল ও পোকামাকড়ও খায়। একটা কাক ৩ ঘণ্টায় প্রায় ১০০টি ঘাসফড়িং খেতে পারে। খাওয়ার জন্য যেকোনো ভালো ক্রিকেটারের চেয়েও কাক ঠোঁট দিয়ে ভালো ক্যাচ ধরতে পারে। বিশ্বাস না হলে আকাশে এক টুকরো পাউরুটি ছুঁড়ে দেখতে পার। কাক ঠিকই তা মাটিতে পড়ার আগে লুফে নেবে ও তোমার দিকে বার বার তাকাবে, কখন তুমি আর এক টুকরো ওকে খেতে দাও। কাকদের গায়ে পশমের মধ্যে একধরনের পরজীবী পোকা হয়। এতে ওদের গা চুলকায়। কে ওদের ওষুধ দেবে ওগুলো মারার? এজন্য কাক নিজের ডাক্তারি নিজেই করে। এরকম পরজীবী কোন পোকা দেহে বাসা বাঁধলে কাক কিছু পিঁপড়া মেরে তা পারফিউমের মতো শরীরে ডলে দেয়। পিঁপড়ার দেহে থাকা ফরমিক এসিড তখন কাকের দেহের পোকাদের শায়েস্তা করে। এমনকি ওদের দেহে ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি হলে ওরা রোদেন করে সেই ঘাটতি পূরণ করে নেয়। কাকদের স্মরণশক্তি খুব ভালো, শব্দকে ওরা বেশ ভালোভাবে শনাক্ত করতে পারে। কিছু তোতা পাখি ছাড়া সব পাখির মধ্যে কাকের মস্তিষ্ক সবচেয়ে বড়। শত্রুর ভয়ে কাক কোথাও কোনো খাবার লুকিয়ে রাখলে আবার তা সহজে খুঁজে বের করতে পারে, নিজের বাসা চিনে ফিরতে পারে। তুমি যদি কখনো কাক পোষো ও তার কোনো নাম দাও। তবে সেই নাম ধরে ডাকলে ও তোমার কাছে আসবে। তুমি হয়তো বিশ্বাস করবে না যে কাক ছয় পর্যন্ত গুনতে পারে। কাকরা বেশ অনুভূতিপ্রবণ। ওদেরও আবেগ আছে। ওরা বিভিন্নভাবে তাদের আনন্দ, রাগ ও দুঃখ প্রকাশ করে। কাকরা আবার নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করে, কখনো কখনো মারামারি করে একটা কাক আর একটা কাককে মেরে ফেলে। রেগে গেলে কাকরা একটা ঈগলকেও মেরে ফেলতে পারে। পৃথিবীতে কম করে হলেও ৪৫ রকম বা প্রজাতির কাক আছে। আমাদের দেশে তুমি পাতিকাক আর দাঁড়কাক বেশি দেখবে। দাঁড় কাকগুলো বড় ও ডাকে খুব কর্কশ স্বরে। কাকরা খুব সাহসী। একই সাথে ওরা শেয়াল বা বাঘের সাথেও খাবার খেতে ভয় পায় না। কাক সাধারণত সাত বছর বাঁচে। বুনো কিছু কাক ১৪ বছর পর্যন্ত বাঁচতে পারে।

SHARE

Leave a Reply