Home তোমাদের গল্প শর্ট পাঞ্জাবি -হযরত আলী

শর্ট পাঞ্জাবি -হযরত আলী

অনেক দিন ধরে ইচ্ছে যে একটা শর্ট পাঞ্জাবি কিনবো। একটা পাঞ্জাবি আছে তবে সেটা বড় লম্বা পাঞ্জাবি। সেটা আবার কেনার পাঁচ বছর হয়ে গেল। ওই একটা পাঞ্জাবি দিয়েই চলেছি, কিনতে চেয়েছি কিন্তু কেনা হয় না, মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। আজ এটা কাল ওটা লেগেই আছে, সে জন্য কেনার মনস্থ করা হয়। কিন্তু সমস্যা এসে বাগড়া দিলে সে ইচ্ছে দমে যায়। তবে এবার বলেছি যে যেভাবেই হোক একটা শর্ট পাঞ্জাবি কিনবই।
শর্ট পাঞ্জাবি আমার খুব পছন্দ। এখনো গায়ে ওঠেনি। লম্বা পাঞ্জাবি পরি কিন্তু শর্ট পাঞ্জাবি পরার একটা ইচ্ছে জেগে উঠেছিল, অনেক দিন, এর পর মাস, এমনকি দু-এক বছর কেটে গেছে। তবুও কেনা হয় না আমার শর্ট পাঞ্জাবি। মুখে বলে সান্ত¦না নেই, কিন্তু বাস্তবে আর কিনতে পারি না।
মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান হয়ে জন্মগ্রহণ করার কারণে ইচ্ছেগুলো ছোট ছোট। যাতে পূরণ করার চেষ্টা করা যায়। তবে চাওয়া পাওয়ার হিসাব মেলাতে গিয়ে দমে যায় ছোট ছোট ইচ্ছেগুলো। কেউবা শপিং মলে গিয়ে হাজার হাজার টাকার কাপড় ক্রয় করছে।
আর আমি সামান্য একটা দু’তিনশো টাকার পাঞ্জাবি কিনতে পারছি না। তবুও আক্ষেপ করি না। অল্পতে সন্তুষ্ট থাকার চেষ্টা করি আর আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করি।
হঠাৎ করে একদিন সেই দিনের অবসান হলো। রোজকার দিনের মত কাজকর্ম চলছে। রমজান মাস প্রায় শেষের দিকে। শেষ বিকেলের আগে যে যার মত আমরা আমাদের মাথা গোঁজার ছোট্ট কুটিরে শুয়ে আছি।
কিছুক্ষণ পর আপার ডাক শুনতে পেলাম, আমরা দুই ভাই একটি বোন ও মেজ, আমি ছোট। তাই ডাকার পরেই চলে গেলাম, গিয়েই প্রশ্নের সম্মুখীন হলাম।
আপা : তোর একটা পাঞ্জাবির দাম কত?
-একটু আশ্চর্য হয়ে গেলাম, হঠাৎ করে কেন আপু পাঞ্জাবির দাম জিজ্ঞেস করছে। আমার নিশ্চুপতা দেখে,
আপা : কিরে কথা বলছিস না কেন? পাঞ্জাবির দাম কত হতে পারে বল?
– পাঞ্জাবির দাম তো সঠিক জিজ্ঞেস করিনি টাকা নেই বলে।
তো দাম শুনে কি করবে এখন তো আর হাতে টাকা নেই যে কিনবো?
আপা : তোকে যেটা বলেছি তার উত্তর দে?
– কত আর হবে নিম্ন দামের মধ্যে নিলে তিনশত থেকে সাড়ে তিনশত টাকা লাগতে পারে। কোন দিন তো আর কেনা হয়নি? বলে আমি চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম।
দু-এক মিনিটের মধ্যে আপা আমার হাতে একটা পাঁচশত টাকার নোট দিল। আমি যেন নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। সেই মুহূর্তে আমি কিছুই ভাবতে পারিনি। এরপর বললো, শহরে গিয়ে একটি শর্ট পাঞ্জাবি কিনে আন। আমি বললাম টাকা কই পেলি, সে বললো তোকে যেটা করতে বলেছি, সেটা করে আয় তার পর শুনিস।
এক রাশ আনন্দ নিয়ে শর্ট পাঞ্জাবি কিনতে শহরের উদ্দেশ বের হলাম।
উপজেলা শহর থেকে আমাদের বাড়ির দূরত্ব প্রায় পনেরো কিলোমিটার। গ্রামাঞ্চল। যোগাযোগের মাধ্যম আমার বাইসাইকেলটা নিয়ে আঁকাবাঁকা পথ ধরে রওনা দিলাম শহরের উদ্দেশে। ঘণ্টাখানেকের সাইকেল যাত্রা শেষে অবশেষে শহরে এসে পৌঁছালাম। খুঁজতে লাগলাম পছন্দের সেই শর্ট পাঞ্জাবি, তবে সাধারণ রঙের জন্য খুঁজছিলাম অবশ্য পেয়ে গেলাম। আগেই বলা হয়েছিল দোকানদারকে যে ভাই হালকা দামের মধ্যে বের করেন। অবশ্য সেই অনুযায়ী বের করেছে। পছন্দ হলো একটা আকাশি রঙের পাঞ্জাবি। অতি সাধারণ, ডিজাইন নেই বললেই চলে। দাম চাইলো চারশত পঞ্চাশ টাকা।
আমি বললাম ভাই! বেচা দাম বলেন, অবশেষে দাম ঠিক হলো তিনশত পঞ্চাশ টাকা। দিলাম টাকা, জিনিসটা পছন্দ হয়েছে তাই নিলাম আর বেশি খুঁজলাম না। পাঞ্জাবি কিনতে পেরে মনটা খুশিতে ভরে গেছে। কেনার পালা শেষ এবার বাড়িতে ফিরলাম সন্ধ্যা ঘনিয়ে রাত নেমে এলো। এসে পৌঁছালাম বাড়িতে।
সবাইকে দেখালাম পাঞ্জাবিটা আমার পছন্দ তো সবার পছন্দ, আমিও খুশি, ওরাও খুশি।
এখন আপার কাছে জানতে চাইলাম টাকা কই পাইলি সত্যি করে বল।
তখন ও বললো যে ওর কলেজের উপবৃত্তির টাকা পেয়েছে সেই টাকা থেকে আমাকে পাঞ্জাবি কেনার টাকা দিয়েছে। কথাগুলো শুনতে শুনতে চোখ দু’টি ছল ছল করে উঠলো, ধীরে ধীরে চলে এলাম ওর ঘর থেকে আমার ঘরে। দু’ চোখ দিয়ে নীরবে কয়েক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। তবে সুখী এমন একটি বড় বোন পেয়ে।
আল্লাহর রহমতে এখন কেনার সামর্থ্য হয়েছে। তবে স্মৃতি মানুষের মনে তো আটকে থাকে। আজো আছে আপার দেয়া সেই আকাশি রঙের শর্ট পাঞ্জাবি, যতœ করে রেখেছি সেটা।

SHARE

Leave a Reply