Home খেলার চমক হ্যাটট্রিকের নানা কথা -হাসান শরীফ

হ্যাটট্রিকের নানা কথা -হাসান শরীফ

হ্যাট থেকে হ্যাটট্রিক

বিশ্বে জনপ্রিয়তার দিক থেকে ফুটবলের চেয়ে ক্রিকেট অনেক পেছনে। তবে অন্তত একটি ব্যাপারে ফুটবল কিন্তু ক্রিকেটের কাছে চিরঋণী। সেটা হলো হ্যাটট্রিক। ফুটবলে প্রায়ই আমরা হ্যাটট্রিকের কথা শুনি। সেটা কিন্তু এসেছে ক্রিকেট থেকে। ক্রিকেট মাঠেই প্রথম হ্যাটট্রিক কথাটি চালু হয়। হ্যাটট্রিক শব্দটির সঙ্গে একটি টুপির (হ্যাট) কাহিনী মিশে আছে। ক্রিকেটাররা তো মাথায় হ্যাট নিয়েই খেলেন। খুব কম খেলাতেই হ্যাট মাথায় নিয়ে খেলে। বল করার আগে হ্যাটটি আম্পায়ারের কাছে জমা রাখেন বোলাররা। এই হ্যাট থেকেই কিন্তু ‘হ্যাটট্রিক’ কথাটির উদ্ভব হয়েছে। তা-ও হয়ে গেছে দেড় শ’ বছরের বেশি। ১৮৫৮ সালের কথা। ইংল্যান্ডে কাউন্টি দল সারে খেলছে এক প্রদর্শনী ম্যাচ। সারের এইচ এইচ স্টিফেনসন বিপক্ষ দলের তিন ব্যাটসম্যানকে পরপর তিন বলে আউট করে দিলেন। ফ্যান ও আয়োজকেরা চাঁদা তুলে তাকে উপহার দিলেন একটি হ্যাট বা টুপি। এই হ্যাট নিয়ে তিনি সবাইকে অভিবাদন জানালেন। এই হ্যাট থেকেই বর্তমানে ‘হ্যাটট্রিক’ কথাটির উদ্ভব। পরে ফুটবল, হকি ইত্যাদি খেলাও শব্দটি গ্রহণ করে। শব্দটি ছাপানো হরফে আত্মপ্রকাশ করে আরো ১০ বছর পর।

কতজন কতবার?
২০১৭ সালের আগস্ট পর্যন্ত টেস্ট ক্রিকেটে মোট ৩৯ জন ৪৩ বার, একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ৩৭ জন বোলার মোট ৪২টি, টি-২০ ক্রিকেটে চার বোলার চারটি হ্যাটট্রিক করেছেন।
টেস্ট ক্রিকেটে হ্যাটট্রিকের দিক থেকে ইংল্যান্ডের বোলারেরা সব থেকে এগিয়ে আছেন। তাদের ১৪ জন এই কৃতিত্ব প্রদর্শন করেছেন। এরপর অস্ট্রেলিয়ানদের ১১ জন, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, পাকিস্তানি বোলারদের চারজন আছেন। বাংলাদেশ টেস্ট ক্রিকেটের নবীনতম সদস্য হলেও হ্যাটট্রিকের দিক থেকে তুলনামূলক এগিয়ে আছে। ভারত, শ্রীলঙ্কা ও নিউজিল্যান্ডের মতো দু’বার হ্যাটট্রিক পেয়েছে বাংলাদেশী বোলাররা। এ দিক থেকে তারা এগিয়ে আছে দক্ষিণ আফ্রিকা, জিম্বাবুয়ের চেয়ে।
আর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে হ্যাটট্রিককারীদের তালিকায় সবচেয়ে এগিয়ে আছেন পাকিস্তানের ওয়াসিম আকরাম। তিনি দু’টি করে মোট চারটি হ্যাটট্রিক করেন।

প্রথম হ্যাটট্রিক
টেস্ট ক্রিকেটে প্রথম হ্যাটট্রিক করার গৌরব অর্জন করেন অস্ট্রেলিয়ার ফ্রেডরিক স্পোফর্থ। ১৮৭৯ সালে তিনি মেলবোর্নে ইংল্যান্ডের ভার্নন রয়াল, ফ্রান্সিস ম্যাকিনন ও টম এমেটকে আউট করে ইতিহাস গড়েন। বোলার হিসেবে তিনি যে কতটা সার্থক ছিলেন (তাকে বলা হতো দ্য ডেমন বোলার), তা তার সাফল্য-চিত্র দেখলেই বোঝা যায়। তিনি ১৮টি টেস্ট খেলে ৯৪টি উইকেট নিয়ে ক্যারিয়ার শেষ করেন। এই মেলবোর্নেই কিন্তু ইতিহাসের প্রথম টেস্ট ও একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচ হয়েছিল। সেখানেই হয় প্রথম হ্যাটট্রিক। সেটি ছিল ইতিহাসের তৃতীয় টেস্ট।
একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে হ্যাটট্রিক করার প্রথম কৃতিত্ব অর্জন করেন পাকিস্তানের জালালউদ্দিন। ১৯৮২ সালে তিনি হায়দ্রাবাদে (পাকিস্তানের) অস্ট্রেলিয়ার রডনি মার্শ, ব্রুশ ইয়ার্ডলি ও লসনকে আউট করেন। সেই থেকে একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পাকিস্তানি ক্রিকেটারদের হ্যাটট্রিকের ছড়াছড়ি দেখা যায়।
টোয়েন্টি-২০ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রথম হ্যাটট্রিকটি হয় বাংলাদেশের বিপক্ষে। ২০০৭ সালের প্রথম বিশ্বকাপে সুপার এইট পর্বে অস্ট্রেলিয়ার ব্রেট লি এই কৃতিত্ব অর্জন করেন। তিনি সাকিব আল হাসান, মাশরাফি মর্তুজা ও অলোক কাপালিকে আউট করেন।

মজার হ্যাটট্রিক
ওয়েস্ট ইন্ডিজের কোর্টনি ওয়ালশের হ্যাটট্রিক করার ঘটনাটি বেশ মজার। তিনি দুই ওভারে নয়, দুই ইনিংসে হ্যাটট্রিকটি করেছিলেন। ১৯৮৮-৮৯ সিরিজে ব্রিসবেনে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম ইনিংসের শেষ ব্যাটসম্যান হিসেবে টনি ডডিমেডকে আউট করেছিলেন। দ্বিতীয় ইনিংসের প্রথম দু’বলে তিনি মাইকেল ভেলেত্তা এবং গ্রেম উডকে আউট করেন। ফলে হয়ে যান হ্যাটট্রিকের মালিক। দুই ইনিংসে মিলে ওয়েস্ট ইন্ডিজের জারমেইন লসনও হ্যাটট্রিক করেছেন। তিনি ব্রিজটাউনে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে প্রথম ইনিংসের শেষ দুই বলে ব্রেট লি এবং ম্যাগগিলকে আউট করেছিলেন। দ্বিতীয় ইনিংসের প্রথম বলেই তিনি ল্যাঙ্গারকে আউট করে ওই কৃতিত্ব অর্জন করেন। এটি ছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজের মাটিতে প্রথম হ্যাটট্রিক।
তবে অস্ট্রেলিয়ার মার্ভ হিউজের ঘটনাটি ওয়ালশকেও ছাড়িয়ে গিয়েছিল। তিনি মোট তিন ওভারে দুই ইনিংসে হ্যাটট্রিক করেছিলেন। এ ধরনের ঘটনা আর কখনো ঘটবে কিনা সন্দেহ আছে। পার্থ টেস্টের দ্বিতীয় দিনে তিনি ওয়েস্ট ইন্ডিজের কার্টলি অ্যাম্ব্রোসকে অষ্টম ব্যাটসম্যান হিসেবে আউট করেন ৩৬তম ওভারের শেষ বলে। সতীর্থ টিম মে নবম উইকেটের পতন ঘটান গাস লোগিকে আউট করে। ৩৭তম ওভারের প্রথম বলেই তিনি ওয়েস্ট ইন্ডিজের দশম উইকেটের পতন ঘটান প্যাট্টিক প্যাটারসনকে আউট করে। ফলে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ইনিংসের সমাপ্তি ঘটে। দ্বিতীয় ইনিংসের প্রথম ওভারের প্রথম বলেই তিনি গর্ডন গ্রিনিজকে আউট করেন। ফলে সৃষ্টি হয় অনন্যসাধারণ এক হ্যাটট্রিকের। ওই তিনজনই এখন পর্যন্ত দুই ইনিংসে হ্যাটট্রিক করার গৌরব অর্জন করেছেন।

দ্রুততম হ্যাটট্রিক
ভারতের ইরফান পাঠান টেস্ট ক্রিকেটে দ্রুততম হ্যাটট্রিকটি করেন। টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে তিনি প্রথম ওভারেই হ্যাটট্রিক করার রেকর্ডও গড়েন। করাচিতে তিনি প্রথম ওভারের শেষ তিন বলে হ্যাটট্রিক করেন যথাক্রমে সালমান বাট, ইউনুস খান ও মোহাম্মদ ইউসুফকে আউট করে। প্রথম তিন বলে কোনো রান হয়নি। ফলে প্রথম ওভারে পাকিস্তান কোনো রান না করেই তিন উইকেট হারিয়ে ফেলে। এই হ্যাটট্রিক সত্ত্বেও ম্যাচটিতে ভারত শেষ পর্যন্ত ৩৪১ রানের বিশাল ব্যবধানে পরাজিত হয়। হ্যাটট্রিককারীর দলের এমন শোচনীয় পরাজয় সম্ভবত আর নেই।
শ্রীলঙ্কার নুয়ান জয়সার হ্যাটট্রিকটিও ছিল বেশ দ্রুত। ১৯৯৯ সালে হারারেতে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে তিনি দিনের দ্বিতীয় ওভারের প্রথম তিন বলেই যথাক্রমে গ্রিপার, মারে গুডউইন ও নিল জনসনকে আউট করেন। ফলে জিম্বাবুয়ে শূন্য রানে তিন উইকেট হারায়।

শিকার ও শিকারি
হ্যাটট্রিক করেছেন এবং হ্যাটট্রিকের শিকার হয়েছেন, এমন খেলোয়াড়ও আছেন চারজন। তারা হলেন ইংল্যান্ডের ড্যারেন গফ ও স্টুয়ার্ট ব্রড, অস্ট্রেলিয়ার শেন ওয়ার্ন এবং শ্রীলঙ্কার নুয়ান জয়সা। ১৯৯৪ সালে মেলবোর্নে ওয়ার্নের ট্রিপলের অংশ হওয়ার পর তিনি নিজেই ১৯৯৯ সালে সিডনিতে হ্যাটট্রিক করেন। আর ওয়ার্নকে হ্যাটট্রিকের শিকার করেন ভারতের হরভজন সিং ২০০১ সালে কলকাতায়। অন্যদিকে জয়সা ১৯৯৯ সালে হারারেতে তার নিজের প্রথম ওভারে (ম্যাচের দ্বিতীয় ওভার) হ্যাটট্রিক করেন। কিন্তু ২০০২ সালে লাহোরে তিনিই আবার পাকিস্তানের মোহাম্মদ সামির শিকার হন। আর ব্রড ২০১০ সালের নভেম্বরে ব্রিজবেনে অস্ট্রেলিয়ার পিটার সিডলের হ্যাটট্রিকের (টেস্ট ইতিহাসের ৩৮তম) শিকার হন। এক বছরের মধ্যে তিনি নিজেই ট্রেন্টব্রিজে ভারতের বিরুদ্ধে হ্যাটট্রিক (ইতিহাসের ৩৯তম) করেন।

অভিষেকেই হ্যাটট্রিক
হ্যাটট্রিক খুব সহজ কাজ নয়। তার ওপর অভিষেক টেস্টে? আরো কঠিন কাজ। সেই কঠিন কাজটিও কিন্তু একজন, দু’জন নয়, তিন তিনজন করে ফেলেছেন। তারা হলেন : ইংল্যান্ডের মিডিয়াম পেসার মরিস অ্যালম (১৯৩০), নিউজিল্যান্ডের অফস্পিনার পিটার প্যাথেরিক (১৯৭৬) ও অস্ট্রেলিয়ার পেসার ড্যামিয়েন ফ্লেমিং (১৯৯৪)।

ছয় বলে ছয়টি!
টেস্ট, একদিনের আন্তর্জাতিক বা টোয়েন্টি-২০ ক্রিকেটে এখনো কেউ ডবল হ্যাটট্রিক তথা ছয় বলে ছয়জনকে আউট করতে পারেননি। তবে প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে একটি রেকর্ড আছে। কাউন্টি ক্রিকেটে ১৯০৭ সালে লর্ডসে সমারসেটের বিরুদ্ধে মিডলসেক্সের বিরুদ্ধে এই অনন্যসাধারণ হ্যাটট্রিকটি করেন এ ট্রট।

SHARE

Leave a Reply