Home দেশ-মহাদেশ সভ্যতার সূতিকাগার ইরাক -মুহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম

সভ্যতার সূতিকাগার ইরাক -মুহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম

ইরাক পশ্চিম এশিয়ার একটি দেশ। পুরাতন নাম মেসোপটেমিয়া। সরকারি নাম ইরাক প্রজাতন্ত্র। আরবিতে জুমহুরিয়াত আল-ইরাক। এদেশের সীমান্তে রয়েছে উত্তরে তুরস্ক, পূর্বে ইরান, দক্ষিণ-পূর্বে কুয়েত, দক্ষিণে সৌদি আরব, দক্ষিণ-পশ্চিমে জর্দান এবং পশ্চিমে সিরিয়া। ইরাক বিশ্বের ৫৮তম বৃহত্তম দেশ। বাগদাদ দেশটির রাজধানী ও বৃহত্তম শহর। ইরাকের আয়তন ৪ লাখ ৩৭ হাজার ৭২ বর্গ কিলোমিটার (এক লাখ ৬৮ হাজার ৭৫৪ বর্গ মাইল)। জনসংখ্যা ৩ কোটি ৮১ লাখ ৪৬ হাজার ২৫ জন। জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রতি বর্গ কিলোমিটারে ৮৩ জন। প্রধান জাতিগত গ্রুপ হলো আরব (৭৫-৮০%) ও কুর্দি (১৫-২০%)। অন্যান্যরা হলো আসিরীয়, তুর্কি, শাবাকি, ইয়াজিদি, আর্মেনীয়, ম্যান্ডিয়ান, সারকাসীয় ও কওলিয়া। সরকারি ভাষা আরবি ও কুর্দি। এদেশের প্রধান ভাষা আরবি, কুর্দিভাষী ১৫ শতাংশ এবং অন্যান্য ৫ শতাংশ। জনগণের শতকরা ৯৯ ভাগ মুসলিম (৫৫-৬০ শতাংশ শিয়া এবং ৪০ শতাংশ সুন্নি)। অন্যান্য ধর্মের মধ্যে রয়েছে খ্রিষ্টধর্ম, ইয়ারসান, ইয়াজিদি, ম্যান্ডিয়ান ইত্যাদি।
পারস্য উপসাগরের উত্তর প্রান্তে ইরাকের ৫৮ কিলোমিটার (৩৬ মাইল) দীর্ঘ একটি ছোট উপকূল রেখা আছে। এ ছাড়া দেশটি মেসোপটেমীয় পাললিক সমভূমি, জাগরোস পর্বত শ্রেণীর উত্তর-পশ্চিম প্রান্ত এবং সিরীয় মরুভূমির পূর্বাংশ পরিবেষ্টন করে আছে। ইরাক প্রধানত মরুভূমি নিয়ে গঠিত, তবে দজলা ও ফোরাতের মধ্যবর্তী অববাহিকার ভূমি উর্বর। এই দু’টি প্রধান নদী ইরাকের মধ্য দিয়ে দক্ষিণ দিকে বয়ে গিয়ে পারস্য উপসাগরের কাছে শাতিল আরবে গিয়ে পড়েছে। নদীগুলো প্রতি বছর প্রায় ৬ কোটি ঘনমিটার পলি বদ্বীপে বয়ে নিয়ে আসে। দেশটির উত্তরাঞ্চল পর্বতময়। সর্বোচ্চ পর্বতের নাম চিকাহ দার, যার উচ্চতা ৩,৬১১ মিটার। পারস্য উপসাগরে ইরাকের উপকূলের কাছের অঞ্চলগুলো এক সময় জলাভূমি ছিল, তবে ১৯৯০-এর দশকে এগুলোর পানি নিষ্কাশন করা হয়।
দজলা ও ফোরাতের মধ্যবর্তী অঞ্চল ঐতিহাসিকভাবে মেসোপটেমিয়া নামে পরিচিত এবং প্রায়ই সভ্যতার সূতিকাগার হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এখান থেকেই মানবজাতি প্রথম পড়া-লেখা, আইন তৈরি এবং উরুক নামক সুসংগঠিত সরকারের অধীনে নগরীতে বসবাস শুরু করে। উল্লেখ্য, উরুক থেকে ইরাক শব্দের উৎপত্তি হয়। খ্রিষ্টপূর্ব ৬ষ্ঠ সহ¯্রাব্দ থেকে এই অঞ্চল পরপর বেশ কয়েকটি সভ্যতার আবাসভূমি ছিল। ইরাক এককালে আক্কাদীয়, সুমেরীয়, আসিরীয় এবং ব্যাবিলনীয় সা¤্রাজ্যের কেন্দ্র ছিলো। এটি মেডিয়ান, আচিমেনিদ, হেলেনিস্টিক, পার্থিয়ান, সাসানিদ, রোমান, খোলাফায়ে রাশিদুন, উমাইয়াদ, আব্বাসীয়, মঙ্গল, সাফাবিদ, আফশারিদ ও উসমানীয় সা¤্রাজ্যেরও অংশ ছিল।
সপ্তম শতাব্দীর মাঝামাঝি আরব ইসলামী বিজয়ের মধ্য দিয়ে ইরাকে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হয় এবং তখন এ দেশে আরবদের বিপুল সংখ্যায় আগমন ঘটে। ইসলামের চতুর্থ খলিফা হজরত আলী (রা) তার রাজধানী ইরাকের কুফায় স্থানান্তর করেন। আধুনিক ইরাকের কারবালায় ৬৮০ খ্রিষ্টাব্দের ১০ অক্টোবর (৬১ হিজরি সনের ১০ মর্হরম) কারবালা যুদ্ধ সংঘটিত হয়। উমাইয়া খেলাফতের ইয়াজিদ বাহিনীর সাথে ঐ যুদ্ধে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা)-এর দৌহিত্র হোসাইন ইবনে আলী, তার সমর্থকগণ ও আত্মীয়-স্বজন নিহত হন।
উমাইয়া খেলাফত আমলে ইরাক প্রদেশকে দামেস্ক থেকে শাসন করা হতো। অষ্টম শতাব্দীতে আব্বাসীয় খেলাফত আমলে বাগদাদ নগরীকে এর রাজধানী করা হয় এবং এরপর পাঁচ শ’ বছর ধরে আরব ও মুসলিম বিশ্বে এই নগরী ছিলো শীর্ষস্থানীয়। ইসলামের স্বর্ণযুগে বাগদাদ ছিলো শিক্ষার কেন্দ্র। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে মোঙ্গলরা এই নগরী ধ্বংস করে।
সেভরেস চুক্তির মাধ্যমে উসমানীয় সা¤্রাজ্য বিভক্ত হয়ে গেলে লিগ ও ন্যাশন্সের মাধ্যমে ১৯২০ সালে ইরাকের আধুনিক সীমানা চিহ্নিত করা হয়। ইরাককে মেসোপটেমিয়ার ব্রিটিশ ম্যান্ডেট হিসেবে যুক্তরাজ্যের কর্তৃত্বের অধীনে রাখা হয়। ১৯২১ সালে একটি রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা হয় এবং ইরাক রাজ্য ১৯৩২ সালের ৩ অক্টোবর ব্রিটেন থেকে স্বাধীনতা লাভ করে। ১৯৫৮ সালের ১৪ জুলাই রাজতন্ত্র উৎখাত করে ইরাকি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা হয়। আরব সোস্যালিস্ট বাথ পার্টি ১৯৬৮ সাল থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত ইরাক নিয়ন্ত্রণ করে। ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের আগ্রাসনের পর সাদ্দাম হোসেনের বাথ পার্টি ক্ষমতাচ্যুত হয় এবং ২০০৫ সালে বহুদলীয় পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ২০১১ সালে ইরাকে আমেরিকান উপস্থিতির অবসান ঘটে, কিন্তু ইরাকি বিদ্রোহ অব্যাহত থাকে এবং সিরীয় গৃহযুদ্ধের যোদ্ধারা দেশটিতে ছড়িয়ে পড়লে বিদ্রোহ আরো বৃদ্ধি পায়। ইসলামিক স্টেট অব ইরাক অ্যান্ড লেভান্টের যোদ্ধারা দেশটির বিশাল অংশ দখল করে এবং কুর্দিদের সার্বভৌমত্ব নিয়ে বিরোধও চলতে থাকে।
ইরাকের বেশির ভাগ অংশে প্রায় গ্রীষ্মমণ্ডলীয় প্রভাবসহ গরম ঊষর আবহাওয়া বিরাজ করে। গ্রীষ্মে দেশের অধিকাংশ স্থানে গড় তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের উপরে উঠে যায় এবং প্রায়ই ৪৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যায়। শীতকালে তাপমাত্রা কদাচিৎ ২১ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করে এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তাপমাত্রা ১৫ থেকে ১৯ ডিগ্রির মধ্যে ওঠানামা করে। রাত্রিকালে তাপমাত্রা ২ থেকে ৫ ডিগ্রির মধ্যে নেমে যায়। ইরাকে বৃষ্টিপাত খুবই কম হয়। অধিকাংশ স্থানে বছরে ২৫০ মিলিমিটারের কম বৃষ্টি হয়। আর এই বৃষ্টিপাত হয় শীতকালে। গ্রীষ্মকালে বৃষ্টিপাত একেবারেই বিরল। তবে এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হলো দেশের প্রত্যন্ত উত্তরাঞ্চল। উত্তরের পার্বত্য অঞ্চলে শীতকালে কখনও কখনও ভারী বরফ পড়ে এবং এতে মাঝে মাঝে বন্যার সৃষ্টি হয়।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এবং রাজনৈতিকভাবে ইরাক জাতিসংঘ এবং আরব লিগ, ইসলামী সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি), জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন ও আইএমএফের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। ১৯টি গভর্নরেট ও একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল (ইরাকি কুর্দিস্তান) নিয়ে গঠিত ইরাক একটি ফেডারেল পার্লামেন্টারি প্রজাতন্ত্র। ইরাকের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম। সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে ইরাকের খুবই সমৃদ্ধ ঐতিহ্য রয়েছে এবং দেশটি তার প্রাক-ইসলামিক কালের সাফল্যগুলো উদযাপন করে থাকে। ইরাক তার কবিদের জন্যও সুপরিচিত। এদেশের চিত্রশিল্পী ও ভাস্কররা আরব বিশ্বে সেরা এবং কেউ কেউ বিশ্বমানের। ইরাকে কম্বল ও গালিচাসহ চমৎকার সব হস্তশিল্প পণ্য তৈরি হয়।
ইরাকে ফেডারেল পার্লামেন্টারি রিপাবলিক সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত। বর্তমান প্রেসিডেন্ট হলেন ফুয়াদ মাসুম এবং প্রধানমন্ত্রী হায়দার আল-আবাদি। পার্লামেন্টের নাম প্রতিনিধি পরিষদ। এদেশের মুদ্রার নাম ইরাকি দিনার।
ইরাক ১৯টি গভর্নরেট বা প্রদেশ নিয়ে গঠিত। গভর্নরেটগুলো জেলায় এবং জেলাগুলো উপজেলায় বিভক্ত। ইরাকি কুর্দিস্তান (ইরবিল, দহুক, সুলাইমানিয়াহ ও হালাবজা) হলো ইরাকের অভ্যন্তরে আইনগতভাবে সংজ্ঞায়িত একমাত্র অঞ্চল যার নিজস্ব সরকার এবং আধা-সরকারি সেনাবাহিনী পেশমারগা রয়েছে। ইরাকের ১৯টি গভর্নরেট বা প্রদেশ হলো দহুক, নিনেভেহ, ইরবিল, কিরকুক, সুলাইমানিয়াহ, সালাদিন, আল-আনবার, বাগদাদ, দিয়ালা, কারবালা, বাবিল, ওয়াসিত, নাজাত, আল-কাদিসিয়াহ, মেসান, মুসান্না, ধি কার, বসরা ও হালাবজা।

SHARE

Leave a Reply