Home প্রচ্ছদ রচনা হারিয়ে গেছে বাংলার ঐহিত্যবাহী বাহন পালকি -আবদাল মাহবুব কোরেশী

হারিয়ে গেছে বাংলার ঐহিত্যবাহী বাহন পালকি -আবদাল মাহবুব কোরেশী

প্রাচীনকালে ব্যবহৃত চাকাবিহীন এক প্রকার বাহন হলো পালকি। সেই সময় পালকিই ছিল একমাত্র বাহন যা সাধারণত ধনিকগোষ্ঠীর লোকেরা বাহন হিসেবে ব্যবহার করতেন। এই পালকি ঘিরে যত গান, যত কবিতা রচিত হয়েছে তা বাংলা সাহিত্যের এক অমূল্য স¤পদই বলা চলে। বাস্তবে আজ আর পালকি চড়াতো দূরের কথা দেখাও যায় না। কিন্তু পালকির মাহাত্ম্য আজও স্বমহিমায় দীপ্তমান। পালকি ঘিরে কত হাসি-তামাশার গল্প আজও শোনা যায় দাদা-দাদি অথবা মায়ের কাছ থেকে তা নিতান্তই রোমাঞ্চকর বটে। নানা ঘটনার সাক্ষী এই পালকি আজ হারিয়ে গেছে এ দেশের জমিন থেকে।
বিজ্ঞানের এই কলের যুগে পালকি আজ বড় বেমানান, ঘটা করে কারো পালকি চড়ার সাধ জাগলেও সে পালকি চড়া সুদূর পরাহত। চাইলেই পালকি চড়া আজ আর যাবে না কারণ এটা কোনো যাত্রিক যন্ত্রের বাহন নয়, এটা মানবচালিত যন্ত্র বা মানবচাকা দ্বারা চালিত বাহন। এ মানবচালিত যন্ত্র বা মানবচাকা আজ চাইলেই পাওয়া যাবে তা ভাবনায় আনাও বোকামি বটে। তবে জাদুঘরে রাখা এসব পালকি চড়ে মনের সাধ মেটাতে পারেন অনায়াসে।
বন্ধুরা অবাক হলে নাকি? মানবচালিত যন্ত্র বা মানবচাকা- এসব শুনে মাথাটা কেমন যেন শিরশির করে উঠলো বুঝি? আরে না, নিজেকে পুরোপুরি তৈরি করে বসো। আজ আমরা গ্রামবাংলার সেই হারিয়ে যাওয়া বাহন, পালকির ইতিহাস-ঐতিহ্য ও উৎপত্তি থেকে শুরু করে আরো না-জানা অনেক কিছু জানার চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ।

পালকি কী ও তার ব্যবহার
পালকি হলো এক ধরনের বাহন যাকে ইংরেজিতে বলা হয় চধষধহয়ঁরহ, খরঃঃবৎ। বিলাসবহুল এ বাহন ব্যবহার করতেন সে-সময়কার জমিদার, ধনিকগোষ্ঠী কিংবা সম্ভ্রান্তবংশীয় ব্যক্তিগণ। তারা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে, জমিদারি তদারকির কোন কাজে, শ্বশুরালয়, বাজার কিংবা অন্য যে কোনো কাজে তা বাহন হিসেবে ব্যবহার করতেন। তা ছাড়া বিয়েতে বর-কনে বহনে পালকিই ছিল অন্যতম ভরসা এবং একমাত্র আভিজাত্যের প্রতীক। পালকি চড়েই বর বিয়ে করতে যেতেন আবার কনেকে এই পালকি চড়েই নিয়ে আসতেন। আশ্চর্যের কথা এ পালকি বাহনের কোনো চাকা ছিল না।
মানবচাকা ব্যবহার করে পালকি চলতো ঘণ্টার পর ঘণ্টা, মাইলের পর মাইল। চাকাবিহীন এ পালকি মনুষ্যশক্তি প্রয়োগে নিজেকে সচল রাখতো যা ছিল নিতান্ত অমানবিক। অর্থাৎ কয়েকজন ব্যক্তি এ বিশাল ওজনের পালকি ঘাড়ে বহন করে নিজে মানবচাকা হয়ে এসব জমিদার, ধনিকগোষ্ঠী কিংবা সম্ভ্রান্তবংশীয় ব্যক্তিগণের একমাত্র বাহনের ভরসা ছিল। পালকিকে কাঁধে ঝুলিয়ে বহন করার এসব কাজ যারা করতেন তাদেরকে বেহারা নামে অভিহিত করা হয়। পালকির ভেতরে যাত্রী হিসেবে ১ থেকে ২ জন থাকত, আর চাকা বা বেহারা হিসেবে পালকি বহন করতেন ৪ থেকে ৮ জন। কোন কোন পালকি আবার ২ জনেও বহন করতে পারতেন।

পালকির অতীত ও বতর্মান
বাংলাদেশে এক সময় অভিজাত শ্রেণীরা এই পালকি নামক মানবযান ব্যবহার করতন। আভিজাত্যের এই বাহনে চড়ে তারা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাতায়াত করতেন। তখন একমাত্র বাহন হিসেবে পালকি-ই ছিল তাদের অহঙ্কারের প্রতীক। তা ছাড়া বিভিন্ন অনুষ্ঠানে পালকির ব্যবহার ছিল ব্যাপকভাবে প্রচলিত। এর মধ্যে বিয়ের অনুষ্ঠান ছিল উল্লেখ করার মতো। আবহমান বাংলার অন্যতম ঐতিহ্য এ পালকি চড়ে নববধূর শ্বশুরবাড়ি আগমন ছিল একটি অলিখিত রেওয়াজ। এই রেওয়াজের বাস্তবতা দাপটের সাথে চলে অনেকদিন। এ ছাড়াও অসুস্থ মানুষকে হাসপাতালে বা অক্ষম মানুষকে বিভিন্ন স্থানে নেয়ার জন্যও পালকির ব্যবহার ছিল প্রচুর। কিন্তু বতর্মানে সে অবস্থা আর নেই। পালকি ব্যবহারের সে-ই সেকাল আজ সুদূর অতীত। ঊনবিংশ শতাব্দীতে এসে সড়ক ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির ফলে যাতায়াতের বাহন হিসেবে পালকির ব্যবহার প্রায় বন্ধই হয়ে যায় বলা চলে। বিশেষ করে ১৯৩০-এর পর থেকে শহরাঞ্চলে রিকশার প্রচলন শুরু হলে পালকির ব্যবহার উঠে যায়। আজ অবধি রিকশা চলছে দাপটের সাথে আমাদের শহর, গ্রাম ও বন্দরে। বর্তমানে পালকিকে আমাদের অতীত ঐতিহ্যের নিদর্শন হিসেবেই ধরা হয়। বেহারাদের কাঁধ থেকে পালকির স্থান এখন হয়েছে বিভিন্ন জাদুঘরে। সভ্যতা এবং বাস্তবতার কথা চিন্তা করলে পালকিকে হয়ত আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। তবে আমরা এবং আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যাতে পালকির কথা ভুলে না যায় সেদিকে আমাদের দৃষ্টি রাখা প্রয়োজন।

বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন নামে
পালকির পরিচয়
বিভিন্ন দেশে বিভিন্নভাবে পালকি মানুষের কাছে পরিচিত। সে হিসেবে পালকির ব্যবহার সারা বিশ্বজুড়ে ছিল তা অনায়াসে বলা যায়। শুধু তা-ই নয়, তাকে একটি আন্তর্জাতিক মানবযান হিসেবে ভাবলেও মনে হয় অত্যুক্তি হবে না। দক্ষিণ এশিয়ায় পালকি শব্দটি এসেছে সংস্কৃত শব্দ পালঙ্ক থেকে যার অর্থ বিছানা বা খাট। বাংলা এবং হিন্দি উভয় ভাষায় এটাকে পালকি বলা হয়ে থাকে। পালি ভাষায় একে ‘পালঙ্ক’ বলা হয়। লন্ডনে পালকিকে সিড্যান চেয়ার নামে আখ্যায়িত করা হয়। একটি চেয়ার একটি জানালা ও একটি ক্যাবিন রেখে উক্ত চেয়ার তৈরি করা হয়, এটাকে বহন করতে আগে-পিছে দু’জন লোককে ব্যবহার করা হতো। তাদের চেয়ারম্যান হিসেবে পরিচিতি দেয়া হতো। তা ছাড়া চীন ও হংকংয়ে এ সিড্যান চেয়ারের বেশ প্রচলন ছিল। তারা এ চেয়ারকে বিয়েতে ভাড়া দিয়ে টাকা পয়সা রোজগার করতো। হংকংয়ে সিড্যান চেয়ার জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত ছিল তবে তা ব্যবহারের জন্য ব্যবহারকারীদের নিবন্ধন করতে হতো। পাশাপাশি ব্যবহার-কারীদের সরকারকে করও প্রদান করতে হতো। ব্যক্তিগত চেয়ার বা পালকি ব্যবহারকারীকে উচ্চমর্যাদাস¤পন্ন ব্যক্তি হিসেবে গণ্য করা হতো। ইন্দোনেশিয়ার জাভা সম্প্রদায়ে পালকির প্রচলন ছিল ব্যাপক। দুই খুঁটিতে বেহারারা কাঁধে করে যাত্রী পারাপার করতেন এবং যেকোনো যাত্রী অর্থের বিনিময়ে তা ব্যবহার করতে পারতেন। তা ছাড়া এই যান বিভিন্ন দেশে বিভিন্নভাবে বিভিন্ন নামে পরিচিত হয়ে ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন- পর্তুগিজরা এর নাম দিয়েছিল পালাঙ্কুয়িন। কোন কোন জায়গায় ডুলি, শিবিকা এসব নামেও ডাকা হয়। আবার রোমে-লেটিকা, চীনে-জিয়াও, ভিয়েতনামে-কিউ, ¯েপনে-লিটারা, ফ্রান্সে-পালানকুইন, পর্তুগালে- লিটেইরা, থাইল্যান্ডে-ওহ, কোরিয়ায়-গামা, জাপানে- নোরিমোনো, তুরস্কে- টাহটিরেভান ইত্যাদি নামে পালকি পরিচিত হয়ে আসছে বা ছিল।
পালকির ইতিহাস
বিখ্যাত পরিব্রাজক ইবনে বতুতা থেকে শুরু করে চতুর্দশ শতকে পর্যটক জন ম্যাগনোলি ভ্রমণের জন্য পালকি ব্যবহার করতেন বলে জানা যায়। সম্রাট আকবরের শাসন আমলে এবং তারও পরবর্তী সময়ে সেনাধ্যক্ষদের যাতায়াতের জন্য প্রধান বাহন হিসেবে পালকিই ব্যবহৃত হতো। হিন্দুদের রামায়ণেও আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব ২৫০ সালের দিকে পালকির উল্লেখ পাওয়া যায়। ধারণা করা হয় যে, স্লেজচালিত গাড়ির ধারণা থেকে পালকি পরিবহনটির ব্যুৎপত্তি ঘটেছে। জানা যায়, প্রাচীন রোমের সম্রাজ্ঞী এবং সিনেটরদের স্ত্রীদের ন্যায় সম্ভ্রান্তবংশীয় এবং উচ্চমর্যাদাস¤পন্ন ব্যক্তিদের জন্য বরাদ্দ ছিল পালকি। কিন্তু সাধারণ লোকদের জন্য এ পরিবহন ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়। সপ্তদশ শতকে ইউরোপে পালকি পর্যাপ্ত পরিমাণে ছিল; মজবুত নির্মাণশৈলী এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বজায়সহ উভয় খুঁটিতে চামড়ার বর্ম আচ্ছাদন করা হয়। ব্রিটিশ শাসন আমলে ইউরোপের উচ্চ শ্রেণীর সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিরা এই পালকিতে চলাচল করতেন। তবে উপমহাদেশে রেলগাড়ি প্রচলনের পর ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের মাঝে পালকির ব্যবহার অনেকটাই কমে আসে। মিসরীয় চিত্রকর্মেও পালকির অস্তিত্ব দেখতে পাওয়া যায়। পারস্য রাজ্যেও পালকির অস্তিত্ব ছিল বলে জানা যায়। অর্থাৎ ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় পালকির প্রচলন সে অনেক আগের। বিশ্বের প্রায় সব দেশেই ছিল এর ব্যাপক প্রচলন।
আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে পালকির সুনাম ছিল বিশ্বজোড়া। কালের গর্ভে পালকির অস্তিত্ব বিলীন হলেও বিশ্বে কোথাও কোথাও আজও তার উপস্থিতি বিদ্যমান। জানা যায়, ভারতীয় উপমহাদেশে কোন কোন জায়গায় বিবাহ অনুষ্ঠান অথবা তীর্থযাত্রায় পালকি এখনো ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

পালকির নির্মাণশৈলী
পালকির নির্মাণশৈলীতে আছে নানা বিচিত্রতা। রুচির বাহারি ডিজাইনে পালকি দেখতে খুবই সুন্দর ও মনোমুগ্ধকর। বিভিন্ন আকৃতি ও গঠনশৈলীতে পালকির নির্মাণ ভিন্ন মেজাজের। কোনটা বড় কোনটা ছোট। সবচেয়ে ছোট এবং সাধারণ নকশার পালকিকে ডুলি পালকি বলা হয়। এই ডুলি পালকি সাধারণত ২ জন বহন করতে পারেন। তা ছাড়া আরও আছে ময়ূরপঙ্খি পালকি, আয়না পালকি, আছে প্রজাপতি পালকি ইত্যাদি।
আমাদের দেশে এক সময় হাঁড়ি, মাল, দুলে, বাগদি বা উড়ি প্রভৃতি সম্প্রদায়ের লোক পালকি বহনের কাজ করতেন। এরা পালকি বহনের পাশাপাশি দিনমজুরের কাজ এবং বিভিন্ন ব্যবসার সাথে জড়িত থাকতেন।
পালকির নির্মাণে মিস্ত্রিরা সেগুন কাঠ, শিমুল কাঠ, গান কাঠ ব্যবহার করে থাকেন। তবে বেয়ারা যে লম্বা দন্ড কাঁধে তুলে পালকি বহন করেন এই দন্ডটি তৈরি করেন বটগাছের বড় ঝুরি দিয়ে। এই দন্ডকে বলা হয় বাঁট। সাধারণ বেশির ভাগ পালকি দেখতে আয়তাকার। ঢালু ছাদ এবং চারদিকে কাঠের আবরণ এর প্রধান বৈশিষ্ট্য। নানা রঙের তুলি দিয়ে আঁকা পালকির দুই দিকে দু’টি দরজা থাকতো। আবার কোন কোন পালকিতে একটি দরজাও দেখা যায়। একেকটা পালকি নির্মাণ করতে অনেক শ্রম দিতে হয় মিস্ত্রিদের। তাঁরা ধীরস্থিরে অনেক সময় নিয়ে নানা ঢঙের ডিজাইন ব্যবহার করে মনের মাধুরী মাখিয়ে পালকি তৈরি করতেন।

শেষ কথা
সবশেষে বলা যায় যে, সময়ের একটি অপরিহার্য বাহন ছিল পালকি। এই পালকিই ছিল সমাজের উঁচুতলার মানুষের এক আভিজাত্যের প্রতীক। তখন ঐতিহ্য অনুযায়ী এই পালকি না হলে বিয়ে-শাদি কিছুই হতো না। পালকির গঠনশৈলী বিবেচনা করে আটজন, ছয়জন, চারজন, অথবা দুইজন করে পালকি বহনে বেহারা থাকতেন। তাদের পোশাক-আশাক ছিল বৈচিত্র্যময়, লাল ফতুয়া এবং পরনে সাদা ধুতি, মাথায় গামছা বাঁধা থাকত। হাতে প্রায় দুই হাত লম্বা বাঁশ অথবা গল্লাবেতের লাঠি, লাঠির মাথায় থাকত বল্লম। থাকতো ইয়ামোটা বড় বড় গোঁফ। সরিষার তেল মাখিয়ে গোঁফ পেঁচিয়ে রাখা হতো খুব যতœ সহকারে। পালকি চলমান অবস্থায় তাদের মুখে বুলি ছিল ‘হু-হুম না, রে হু-হুম না’।

এই বুলি বলতে বলতে তারা পালকি কাঁধে বহন করে নিয়ে যেত ঘণ্টার পর ঘণ্টা মাইলের পর মাইল। এভাবে এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে যাওয়া-আসার ব্যবস্থা করা হতো। পালকি চড়ে জমিদার-জমিদারগিন্নিরাও বিভিন্ন জায়গা পরিদর্শনের জন্য যেতেন। প্রায় ৩০০ বছরের পালকির এই অতীত ঐতিহ্য আজ বণর্মালার কালো অক্ষরে বন্দি। ইচ্ছে করলেই পালকিকে উড়োজাহাজের এই যুগে সেই রকম, আগের মতো প্রতিষ্ঠিত করা যাবে না। সময়ের কাছে হার মেনে পালকি আজ জায়গা করে নিয়েছে জাদুঘরের চার দেয়ালের ভেতর। সুতরাং নতুন প্রজন্মের কাছে পালকি এবং পালকির ব্যবহার কল্পনা বা রূপকথার গল্প ছাড়া আর কিছুই নয়। হ

SHARE

Leave a Reply