Home বিশেষ রচনা নজরুলের শিশুতোষ ছড়াগ্রন্থ ঝিঙেফুল -ড. আশরাফ পিন্টু

নজরুলের শিশুতোষ ছড়াগ্রন্থ ঝিঙেফুল -ড. আশরাফ পিন্টু

আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে আমরা বিদ্রোহী, সাম্যবাদী, মানবতাবাদী ইত্যাদি বিশেষণে বেশি চিনি। তার মন যে শিশুর মতো নরম-কোমল ছিল তা অনেকেরই অজানা। শিশু-কিশোরদের নিয়ে তার বেশকিছু ছড়া, কবিতা, গল্প ও নাটিকা আছে। মূলত এসব লেখনীতে নজরুলের শিশুমানস ধরা পড়েছে। তিনি যে কতটা প্রাণবন্ত, হাস্যোজ্জ্বল ও রসিক ছিলেন- তা জানা যায় তার শিশুতোষ কাব্যগ্রন্থ ‘ঝিঙেফুল’ পাঠ করলে।
‘ঝিঙেফুল’ কাব্যগ্রন্থে (মূলত ছড়াগ্রন্থ) মোট ১৪টি ছড়া আছে। এসব ছড়ায় তিনি শিশু মনস্তত্ত্বের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেছেন- ‘প্রভাতী’ ছড়ায় প্রকৃতি বর্ণনার সাথে সাথে শিশুদের সকালে ওঠার তাগিদ দিয়েছেন কবি-
ভোর হলো
দোর খোলো
খুকুমণি ওঠরে !
ঐ ডাকে
যুঁই শাখে
ফুল খুকি ছোটরে !
এই ছড়া দিয়েই যেন ‘ঝিঙেফুল’-এর খোকা-খুকু বা শিশু-কিশোরদের যাত্রা শুরু হলো। ‘খোকার বুদ্ধি’, ‘খাঁদু-দাদু’, ‘খুকি ও কাঠবেড়ালি’, ‘খোকার খুশি’, ‘দিদির বে-তে খোকা’ ইত্যাদি ছড়ায় খোকা-খুকুর মনস্তত্ত্বের যেমন একটা ধারাক্রম লক্ষ করা যায় তেমনি লৌকিক ছড়ার রস-রূপ, গন্ধ, রং ধরা পড়ে। ‘খোকার গল্প বলা’-তে আমরা যে খোকাকে পাই সে ‘ন্যাংটা শ্রীযুত খোকন’ অর্থাৎ মুখে কেবল বোল ফুটেছে। তার গপ্প (গল্প) বলা কেমন হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়-
‘একদা এক হাড়ের গলায় বাঘ ফুটিয়াছিল;’
এমনটিই স্বাভাবিক। এরপর (খোকার বুদ্ধিতে) খোকাকে মা বোকা বলায় খোকা তো রেগেমেগে অস্থির-
হাঁপিয়ে এসে মায়ের কাছে বললে ‘ওগো মা!
আমি নাকি বোকা চন্দর? বুদ্ধি দেখে যা !
ঐ না একটা মটকু বানর দিব্যি মাচায় বসে
লাউ খাচ্ছে? কেউ দেখনি, দেখি আমিই এসে।
‘খোকার বুদ্ধি’-তে খোকা বোকা হলেও ‘খাঁদু-দাদু’-তে সে বুদ্ধির পরিচয় দিয়েছে। ইয়ার্কি আর ঠাট্টায় মাকে সে নাকাল করে ছেড়েছে। তাঁর বাবাকে নিয়ে খোকা (নাতি) মেতেছে এ তামাশায়। যদিও নানা এখানে উপস্থিত নেই। তাই বাবার কথাগুলো তার মেয়েকেই শুনতে হচ্ছে-
অ-মা! তোমার বাবার নাকে কে মেরেছে ল্যাং
খ্যাঁদা নাকে নাচছে ন্যাদা-নাক ডেঙাডেং ড্যাং।
ওর নাকটাকে কে করল খ্যাঁদা র্যাঁদা বুলিয়ে?
চামচিকে ছা বসে যেন ন্যাজুড় ঝুলিয়ে!
বুড়ো গরুর টিকে যেন শুয়ে কোলা ব্যাঙ
অ-মা! আমি হেসেই মরি, নাক ডেঙাডেঙ ড্যাঙ।
মায়ের সাথে মায়ের বাবাকে নিয়ে শুধু হাসি-তামাশা নয়, মায়ের প্রতি ভক্তি-শ্রদ্ধাও আছে খোকার। তাই তার কাছে মনে হয়-
হেরিলে মায়ের মুখ
দূরে যায় সব দুখ
মায়ের কোলেতে শুয়ে জুড়ায় পরান। [মা]
দিদির বিয়ে, মামার বিয়েতে ‘খোকার খুশি’ দেখে কে-
কি যে ছাই ধানাই-পানাই
সারাদিন বাজছে শানাই
এদিকে কারুর গা নাই
আজি না মামার বিয়ে!
বিবাহ! বাস কি মজা!
সারাদিন মন্ডা-গজা
গপাগপ খাও না সোজা
দেয়ালে ঠেসান দিয়ে।

মামার বিয়ের মতো দিদির বিয়েতেও সে খুশি। তবে দিদি বিহনে তার মনে জাগে-
দিদি, তুই সেথায় গিয়ে
যদি ভাই যাস ঘুমিয়ে
জাগাব পরশ দিয়ে
রেখে যাস সোনার কাঠি।
[দিদির বে’তে খোকা]

এই খোকা (শিশু থেকে) বড় হয়- কৈশোরে পদার্পণ করে তখন তার মাথায় আসে নানান দুষ্টামি। পাড়াময় ঘুরে বেড়ানো, এর গাছের বরইতে ঢিল ছোঁড়া, ওর গাছের লিচু চুরির পরিকল্পনা-
বাবুদের তালপুকুরে
হাবুদের ডাল কুকুরে
সে কি বাস করলে তাড়া,
বলি থাম, একটু দাঁড়া!
পুকুরের ঐ কাছে না
লিচুর এক গাছ আছে না
হোথানা আস্তে গিয়ে
য়্যাব্বর কাস্তে নিয়ে
গাছে গ্যে যেই চড়েছি
ছোট এক ডাল ধরেছি,
ও বাবা মড়াৎ করে
পড়েছি সড়াৎ জোরে।
[লিচুচোর]

খোকারা দুষ্টুমি আর দস্যিপনা করে অন্যের গাছের লিচু চুরি করার সাহস দেখালেও খুকিরা তা পারে না। তারা নেহায়েত অবলার মতোই কাঠবেড়ালির ওপর নির্ভর করে থাকে একটি পেয়ারা পাবার আশায়। কাঠবেড়ালিকে বিভিন্ন ছলাকলা দেখিয়ে ভুলিয়ে-ভালিয়ে একটি পেয়ারা পেতে প্রাণান্ত চেষ্টা করে যায় খুকি-
কাঠবেড়ালি! তুমি আমার ছোড়দি হবে? বৌদি হবে? হু
রাঙাদিদি? তবে একটা পেয়ারা দাও না। উঃ!
কিন্তু তখন কাঠবেড়ালি ‘দাঁত দেখিয়ে’ দে ছুট।
কিছু ছড়া কবিতায় আছে শিশু-কিশোরদের দৈহিক বা আঙ্গিকগত বর্ণনা, যে বর্ণনা করা হয়েছে হাস্যরসের মাধ্যম। “হোঁদল কুঁৎ কুঁতের বিজ্ঞাপন”- এ কবি শিশুদের বিভিন্ন চেহারার বর্ণনা দিয়ে হাস্যরসের সৃষ্টি করেছেন-
পুঁয়ে লাগা সুটকো ছেলে মুখটা সদাই মুচকে রয়
পেটফুলো তার মস্ত পিলে, হাত-পাগুলো কুঁচকে রয়!
প্যাঁটরা ছেলের য়্যাব্বর পেট, হাত নুলো আর পা সরু!
চলেন যেন ব্যাংটি হো-হো উর-গজ ঢাক গাল পুরু।
শুধু কবি নয়, এরকম রং-তামাশা কিশোর-কিশোরী একে অপরের মধ্যেও করে থাকে। লোকছড়ার মধ্যে এ রকম অজস্র উদাহরণ পাওয়া যায়। তেমনি ‘পিলে পটকা’-তে নজরুল ইসলাম বলেছেন-
উটমুখো সে সুটকো হাশিম
পেট যেন ঠিক ভুটকো কাছিম!
চুলগুলো সব বাবুই দড়ি
ঘুসকো জ্বরের কাবুয় পড়ি!
লৌকিক ছড়া নিয়ে যারা গবেষণা করেছেন তাদের মধ্যে অন্যতম লোকবিজ্ঞানী আশুতোষ ভট্টাচার্য বলেছেন- “ছড়ার রাজ্যে বুদ্ধি ও বিচারের অধিকার নেই। শিশুদের কাছে বুদ্ধি ও বিচারের অপেক্ষা রসের মূল্য বেশি, মস্তিষ্ক অপেক্ষা হৃদয় বড়।” আর আধুনিক কবি-সাহিত্যিকরাও এই রস ও হৃদয়কে অস্বীকার করতে পারেন নি। তাই তাদের ছড়াগুলোতেও অনিবার্যভাবে ধরা পড়েছে লৌকিক রস-রূপ ও ছন্দ। কাজী নজরুল ইসলামের ‘ঝিঙেফুল’- এর অনেক ছড়াতেই লৌকিক ছড়ার প্রভাব লক্ষ করা যায়। ‘ছোটবোনের চিঠি’-তে বড় বোন যে ছন্দে চিঠিটি পড়েছেন- তা লৌকিক ছড়ার ছন্দ। ছড়ার ভূমিকাতেও লৌকিক (খেলার ছড়া) ছড়াটির ছন্দের উল্লেখ রয়েছে- “এই পথটা কা-টবো/ পাথর ফেলে মা-রবো।” লৌকিক ছন্দের সাথে আছে চিরায়ত শিশুরস-
পেয়ে তোর ঐ পত্র
যদিও তিন ছত্র!
যদিও তোর অক্ষর
হাত পা যেন যক্ষর,
পেটটা কারুর চিপসে
পিঠটা কারুর টিপসে
ঠ্যাংটা কারুর লম্বা
কেউবা দেখতে রম্ভা !
তেমনি ‘ঠ্যাংফুলি’-তে পাওয়া যায় একজন কিশোরীর পা-কে নিয়ে বিভিন্ন উপমায় রসিকতা-
এক ঠ্যাং তালপাতা তার
যেন বাট হালকা ছাতার
আর পা তার
ভিটরে ডাগর।
যেন বাপ গোবদা গো-সাপ
পেটফুলো- হুস অজগর।
পাড়া প্রতিবেশীরা কিশোরী ফুলির পা ফুলো দেখে হাসি তামাশা করছে- এতে ফুলির মন খারাপ হওয়া স্বাভাবিক। শিশু-কিশোরদের এমন মনস্তত্ত্বের দিক মনে রেখেই কবিতার শেষে কবি তাকে সাহস দিয়েছেন-
কেন? ঠ্যাং তেড়েং বেড়েং?
হাসবে লোকে? বয়েই গেল !
‘ঝিঙেফুল’-এর ১৪টি ছড়া কবিতার মধ্যে শুধু নাম কবিতা (ঝিঙেফুল)-টিই ব্যতিক্রম। এখানে হাসি-তামাশা নেই, আছে ঝিঙেফুলের লৌকিক ও নান্দনিক ছন্দময় বর্ণনাÑ
গুল্মে পর্ণে
লতিকার কর্ণে
ঢল ঢল স্বর্ণে
ঝলমল দোলে দুল-
ঝিঙেফুল॥
তবে ‘ঝিঙেফুল’- এর ছদ্মাবরণে, এর কাব্যিক বর্ণনায় ঝিঙেফুল নয়, গ্রাম বাংলার কোনো কিশোরীর কানের ফুলের চিত্রময়তাই যেন ভেসে ওঠে চোখের সামনে।

‘ঝিঙেফুল’-এ কাজী নজরুল ইসলাম খোলামেলা হাসি-তামাশা করেছেন। লৌকিক ছড়ায় যেমন বিষয়বস্তু নির্বাচনে তেমন কোনো বালাই নেই, রস-রসিকতা, আনন্দ-বিনোদনের মূল্যই সেখানে বেশি- কবি এ চিন্তা-চেতনা মাথায় রেখেই যেন ছড়াগুলো রচনা করেছেন। তবে এর পাশাপাশি শ্লেষের মাধ্যমে সমাজের অসঙ্গতির দিকের অঙ্গুলি নির্দেশ করেছেন তিনি। আর ‘ঝিঙেফুল’ আধুনিক ছড়াগ্রন্থ হলেও লোকছড়ার মতোই শিশু-কিশোর চরিত্রের তথা শিশু-মনস্তত্ত্বের বিভিন্ন দিক সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন। হ

SHARE

Leave a Reply