Home উপন্যাস নিঝুম বনের বাসিন্দা -দেলোয়ার হোসেন

নিঝুম বনের বাসিন্দা -দেলোয়ার হোসেন

[গত সংখ্যার পর]

বিজয় নগরের স্বনামধন্য বাদশা মালিক-কাফুরের একমাত্র শাহ্জাদা এই শিবলী সাদী। বাদশাহ্ মারা যাবার পর যুবক শিবলী সাদী সিংহাসনে আরোহণ করেন। পিতার মতই তিনি প্রজাদের ভালোবাসেন। সময়-অসময় ছদ্মবেশে প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে পড়েন এবং ইচ্ছে মত ঘুরে বেড়ান রাজ্য সীমানার মধ্যে। কখনও কখনও কোন দূর গাঁয়ে গিয়ে নিজেকে পথিক পরিচয় দিয়ে মেহমানও হয়েছেন কোনো প্রজার বাড়িতে। সেখানে বাদশাহ শিবলী সাদী দেখেছেন প্রজাদের জীবন-যাপন এবং রাজ্যের ভালো-মন্দ শুনেছেন নিজের কানে। অবশ্য আরও একটা কারণেও তার চিত্ত সর্বদা চঞ্চল থাকতো। কেননা, প্রথম বিবাহের পর কোনো সন্তান হওয়ার লক্ষণ না দেখে, তিনি আবার একটি বিবাহ্ করেন। কিন্তু দ্বিতীয় স্ত্রীও সন্তান দিতে সক্ষম না হওয়ায় খোদার মেহেরবানি লাভের আশায় এমন করে ঘুরে বেড়াতেন বাদশাহ্। তারপর, সাধক বাউল ফকিরের কাছে গিয়ে গুলশানকে দেখলেন, গুলশানের আধ্যাত্মিক গান শ্রবণে মুগ্ধ হলেন বাদশাহ্। ভাবলেন, এই গুলশানআরার মধ্যেই হয়তো দয়াময় আমার বংশধর দিয়ে রেখেছেন।
সে যাইহোক, গুলশানকে বিবাহ করার পর স্বামী-স্ত্রী দু’জনার জীবন যেমন মধুময় হয়েছিলো, তেমনি হয়েছিলো বিষাদময়। মানুষ তার নিজের ইচ্ছামত কখনও জীবন সাজাতে পারে না। ভাবে এক, আর হয়ে যায় আর এক। এখানেই মানুষ বড় অসহায়। আল্লাহ কাকে কিভাবে পরীক্ষা করেন, তা- কেউ জানে না বা বুঝতেও পারে না। পৃথিবীতে মন্দ মানুষদের চেয়ে ভালো মানুষেরাই দুঃখ-কষ্টের শিকার হয়ে থাকে বেশি বেশি। জ্ঞানী ব্যক্তিরা বেশি সুখে শঙ্কিত হন, অযাচিত দুঃখ-কষ্টে ধৈর্য ধারণ করেন। বাদশাহ্ শিবলী সাদী আর সাধককন্যা গুলশানআরার পরবর্তী ঘটনাগুলো যেমনভাবে সুখময় সুন্দরের ছোঁয়ায় ভাসমান তেমনি- কষ্টের অশ্রুতেও বুক ভেসেছে সবার।
এক গভীর রাতে খাসমহলে লোবানের গন্ধ ছড়াচ্ছে দক্ষিণা বাতাস। বেলকনিতে ফুল-পাতার নকশা করা গ্রিলের ছায়া পড়ে কেমন স্বপ্নময় হয়ে উঠেছে রাতের প্রহর। ঝাড়বাতির মৃদু আলোয় পালঙ্কে বসে গুলশানআরা ভাসছে চোখের পানিতে। কেবলি তার বাবার মুখটা ভেসে উঠছে চোখের সামনে। বাবা একা একা কী করছে- কে তাকে দুটো ভাত রেঁধে দেবে, কে তার যত্ন নেবে। বাদশাহ্ শিবলী সাদী সান্ত¡না দিয়ে বললেন, গুলশান তুমি চিন্তা করো না। আমি তার ভালো থাকার সব ব্যবস্থা করে দেবো। তুমি এসব নিয়ে একদম চিন্তা করো না।

পাঁচ.

মেয়েদের সতীন থাকাটা এখন যেমন সাংঘাতিক ব্যাপার, তখন কিন্তু এর গুরুত্ব ছিলো না মোটেই। তখন বাদশাহ্্ের বেগম হওয়াটাই ছিলো বড় ব্যাপার। তাই গুলশানের দু’জন সতীন থাকাতে তার কিছু যায় আসে না। তার জন্য আলাদা মহল, আলাদা দাস-দাসী, গা-ভর্তি সোনা-দানা- আর কী চাই। কিন্তু বাদশাহ্্ের বড় বেগম যতোটা ভালো, ঠিক ততটাই খারাপ মেজো বেগম। তার উপর অহংকারী। তারও একটা বিশেষ কারণ এই যে, মেজো বেগমের বড় ভাই বাদশাহ্ প্রধান সেনাপতি। বাদশাহ্ দুই বিবাহ করার পরও যখন রাজ্যের উত্তরাধিকারের জন্ম হলো না, তখন সেনাপতি মনে মনে এই স্বপ্ন দেখতে থাকে যে, বাদশাহ্কে সরিয়ে অর্থাৎ তাকে ক্ষমতাচ্যুত করে আমি হবো এ রাজ্যের বাদশাহ্। তারপর, কালে কালে আমার সন্তানেরাই হবে এ রাজ্যের উত্তরাধিকারী। যে কারণে বাদশাহ্ তৃতীয় বিবাহ মেনে নিতে পারেনি মেজো বেগম ও তার ভাই।
একদিন বড় বেগম এলো গুলশানের মহলে। গুলশান তাকে সালাম দিয়ে বললো, বড় বুবু- তুমি হঠাৎ এ সন্ধ্যায়? কিছু বলতে চাও? তুমি আমাকে ডেকে পাঠালেই তো হতো।
বড় বেগম হেসে বললো, নারে গুল, কিছু বলতে নয়, এমনি এলাম। তবে তোকে দেখতে ইচ্ছে করছিলো খুব।
বড় বুবু- তুমি আমাকে অন্তর থেকে স্নেহ করো, সে আমি বুঝতে পারি।
কেন, আমাদের বাদশাহ্ কি তোকে কম ভালোবাসেন?
তা কেন বুবু। আমাদের বাদশাহ্ মতো মানুষ কি আর হয়? আমি গরিবের মেয়ে, উনি দয়া করে এই রাজপ্রাসাদে আমাকে ঠাঁই দিয়েছেন, সে কি কম ভাগ্যের কথা।
বড় বেগম হঠাৎ একটু অন্যমনস্ক হয়ে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো, কিছুই ভালো লাগে নারে গুল। একা একা শুয়ে বসে দিন কাটে না। বাদশাহ্কে আমরা যা- দিতে পারিনি, তুই তার সব আশা, সব স্বাদ পূরণ করবি। কিন্তু কতো দিনই তো হয়ে গেলো …। একটা শুভ সংবাদ শোনার জন্য আমি ব্যাকুল হয়ে আছি। তোর ছেলে হোক, বা মেয়ে হোক, আমি তাকে বড় করে তুলবো।
ছল্্ছল করে উঠলো বড় বেগমের চোখের পাতা। একটু অপ্রস্তুত হয়ে বললো, আমি যাইরে গুল। গুলশানআরা বড় বেগমের হাত ধরে বললো, বুবু তোমার মনটা ভালো নেই, তুমি এখানেই থাকো। আমি কথা দিচ্ছি, আমি আমার প্রথম সন্তানটা না হয় তোমাকেই দেবো। বড় বেগম এক দৃষ্টিতে গুলশানের মুখের দিকে চেয়ে থেকে বললো, আল্লাহ্্ তোকে যেনো ঘর ভরে সন্তান দেন।
এখন আর বাদশাহ্্ শিবলী সাদী আগের মতো নেই। তার মনে ফিরে এসেছে শক্তি। খুব মনোযোগ দিয়েই তিনি রাজকার্য পরিচালনা করেন। গরিবদের অভাব-অভিযোগের কথা মন দিয়ে শোনেন। প্রতিকারের জন্য যথাসাধ্য চেষ্টাও চালিয়ে যান।
তিন বছরে বিভিন্ন এলাকায় অনেকগুলো পুকুর খনন করলেন। দুর্গম এলাকায় মাটি কেটে রাস্তা নির্মাণ করলেন। স্থায়ীভাবে সরকারি হাট-বাজারের ব্যবস্থাও করলেন। যেনো একস্থান থেকে মালামাল রাজ্যময় ছড়িয়ে যেতে পারে এবং জনসাধারণের অভাব দূর হয়। রাজ্যের প্রতিটি প্রজাই তাদের বাদশাহ্কে ভালোবাসে। কিন্তু বাদশাহ্্ের এতো সুনাম সহ্য করতে পারলো না সেনাপতি শেখ আবু মেহের।
অনেক সময় জোছ্্নারাতে চিলেকোঠায় বসে বাদশাহ্্ এবং ছোট বেগম শুধু গল্পই করেন না, রাজ্যের বিভিন্ন বিষয় নিয়েও আলোচনা করেন। বাদশাহ্ কখনো বলেন, গুলশান সেদিন তুমি যে গানটা গেয়েছিলে, সেটা কি আমার উদ্দেশে?
তা কেন- গানটা আমার নিজের জন্যও। সত্য এবং সুন্দরের যে রূপ তা- অন্তর চক্ষু দিয়েই দেখতে হয়। বাহ্যিক রূপ- আসল রূপ নয়।
এর মধ্যেই মেজো বেগম বলতে শুরু করে দিলো যে, ছোট বেগমও দেখছি বাদশাহ্কে কোনো সন্তান দিতে পারলো না। তা’হলে নতুন করে শাদি করার অর্থ কী? এর কিছুদিন পরই গুলশান অনুভব করলো, তার গর্ভে সন্তান এসেছে। সে প্রথমে কাউকে কিছু বলতে পারলো না। গুলশান ভাবলো, আরও দু’মাস দেখি না।
এর কয়েকদিন পরই গুলশান শুনলো বড় বেগম কিছুদিনের জন্য পিত্রালয়ে বেড়াতে যাচ্ছেন। প্রাসাদের অন্দরে পালকি অপেক্ষা করছে। গুলশান ছুটে গেলো বড় বুবুর মহলে। সামনে গিয়ে থম্কে গেলো। মুখটা লাল হয়ে উঠলো। তবু বললো, বুবু তুমি জলদি ফিরে এসো, বলেই চলে এলো নিজের ঘরে। বড় বুবুর মনে কেমন সন্দেহ উঁকি দিয়ে গেলো। ভাবলো ও কি মনে কষ্ট পেয়ে সরে গেলো, নাকি কোন শুভসংবাদ আছে, যা- আমাকেই বলতে চায়।
কিন্তু গুলশান মুখ না খুললেও আসল ঘটনাটা চাপা থাকলো না। একদিন বিকালের দিকে ছোটর মহলে ঢুকতেই মেজো বুঝতে পারলো, ছোট মা হতে চলেছে। তখনই মনে মনে কি সব চিন্তা করে ছুটে গেলো গুলশানের কাছে। বুকে জড়িয়ে বললো, গুলশান এই খবরটা তুই কেন আমাকে বলিস নি। এ সময় খুব সাবধানে থাকতে হবে তোকে। কোনো ভয় নেই, সব ব্যবস্থা আমি করছি।
তখনই গুলশানআরাকে পালঙ্কে শুইয়ে রেখে মেজো বেগম খবর পাঠালো বাদশাহ্ কাছে। বাদশাহ্ তখন প্রাসাদের বাইরে এক বৈঠকখানায় তার মন্ত্রীর সাথে নিরিবিলিতে কথা বলছিলেন। বাদশাহ্ এসে ছোট বেগমের মহলে প্রবেশের পথেই মেজো বেগম পথ আগলে বললো, জনাব আজ একটা শুভসংবাদ আপনাকে শোনাবো- যা শুনে আপনি পাগল হয়ে যাবেন।
বাদশাহ্্ কিছুটা হলেও অনুমান করলেন আর অধীর আগ্রহে বললেন, সংবাদটি তুমি জলদি বলো। মেজো বেগম বললো, আমরা আপনাকে যা দিতে পারিনি, যে আশা পূরণ করতে পারিনি- গুলশানআরা আপনার সে আশা পূরণ করতে যাচ্ছে। ছোট মা হবে।
বাদশাহ্ শিবলী সাদী তখনই দু’হাত ওপরে তুলে বললেন, ইয়া আল্লাহ্- এতদিনে তুমি মুখ তুলে চেয়েছো। তোমার দরবারে হাজার শুকরিয়া। বলেই বাদশাহ্ গলা থেকে একগাছা মুক্তার মালা বেগমের হাতে দিয়ে ছুটে গেলেন অন্দরমহলে। পালঙ্কে চোখ দুটো বন্ধ করে শুয়ে ছিলো গুলশানআরা। বাদশাহ্ আনন্দে গুলশানআরার মুখটা দু’হাতে তুলে ধরে বললেন, প্রিয় গুল, আজ আর কিছুই না দেয়ার নেই তোমাকে। তুমি আমার কাছে চাও, যা- চাইবে, তাই তুমি পাবে।
গুলশান বললো, আপনার কাছে আমার কিছু চাওয়ার নেই। আপনি শুধু আমার জন্য দোয়া করুন।
বাদশাহ্ এই খুশির সংবাদ রাজ্যময় ঘোষণা করে দিলেন। সাত দিন ধরে রাজ্যের দিন-দুঃখীরা পেট পুরে খেয়ে গেলো, আর দোয়া করে গেলো বাদশাহ্ মনস্কামনা পূরণের জন্য।
কিন্তু একটি মহল বাদশাহ্রর এই সুখ চায় না। তারা মরিয়া হয়ে উঠলো, কিভাবে গুলশানআরাকে এই প্রাসাদ থেকে তাড়ানো যায়। মেজো বেগম তার ভাইয়ের সাথে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করলো। কোনোভাবে অপবাদের বোঝা মাথায় চাপাতে হবে গুলের। শুধু অপবাদ দিলেই চলবে না, সাক্ষ্য প্রমাণও জোগাড় করতে হবে। বাদশাহ্ কোনভাবেই ব্যভিচারিণীকে প্রাসাদে আশ্রয় দিবেন না এবং ঐ সন্তানকে মেনে নেবেন না। ফলে, এই হবে যে, রাজ্যের উত্তরাধিকারও থাকবে না আর বাদশাহ্ এই আঘাতে অনেকখানি দুর্বল হয়ে পড়বেন। তখন সহজেই সৈন্য এবং প্রজাদের মনে অসন্তোষ বৃদ্ধি পেতে থাকবে। তারা বাদশাহ্ বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে দ্বিধা করবে না। আর সেই সুযোগটা নিতে হবে আমাদের। ভাইয়ের কথা শুনে মেজো বেগম বললো, তাতে- আমার কতটুকু লাভ হবে? আপনি বাদশাহ্ হবেন, তারপর আপনার ছেলে উত্তরাধিকার সূত্রে রাজ্যের বাদশাহ্ হবে। কিন্তু আমি …।
ভাই সেনাপতি বললো, তোমার মর্যাদা এখন যেমন আছে পরেও এমনই থাকবে। আমার ছেলে সিংহাসনে বসলে তো তুমি হবে তার মূল অভিভাবক। বাদশাহ্ ফুফু আম্মা, সে কি- কম কথা! তাছাড়া তুমি কী চাও, তোমার সতীন ঐ বাউলের মেয়ে রাজমাতা হোক?
বাদশাহ্- শিবলী সাদী মেজো বেগমের আন্তরিকতা দেখে কোনভাবেই ভাবতে পারলেন না যে, সেই ঘরের শত্রু বিভীষণ হতে পারে। এদিকে মেজো বেগম তেঁতুলের আচার বরই-এর আচার এবং যেখানে যা পায়, সংগ্রহ করে গুলশানকে দিতে লাগলো। গুলশান তবু ব্যাকুল হয়ে থাকলো তার বড় বুবুর অপেক্ষায়।
একদিন সুযোগ বুঝে মেজো বেগম গেলো গুলের মহলে। নিরিবিলিতে গুলশানকে বললো, গুল- একটা কথা কিন্তু তোমাকে না বললেই নয়। একথা সবাই জানে যে, রাজা-বাদশাহ্দের পূর্ব পুরুষেরা এক সময় অনেক অবিচার-অত্যাচার করেছে প্রজাদের ওপর। এ বংশে একটা অভিশাপ আছে যে, এ বংশের বাতি চিরতরে নিভিয়ে দেয়ার জন্য বেগমদের পেটে কোনো সন্তান আসে না। আবার এলেও সে সন্তান জন্মের আগেই মারা যাবে। কিন্তু আমরা কেউ চাই না, তোমার সন্তান মারা যাক। বাদশাহ্ কিন্তু এসব অভিশাপের কথা কখনো মানতে চান না।
তা কেন?
সে কথা জানি না। সন্তানের জন্য দোয়া চাইতে কোন ফকির বা কবিরাজের কাছে কখনও যাইতে দেন নাই আমাদের। বাদশাহ্ ইচ্ছা যে, সন্তান না’হলে নতুন নতুন বিবি তিনি ঘরে আনবেন।
তা কেন হবে?
তাই তো হচ্ছে। তবুও আমি লুকিয়ে সেনাপতির সাহায্যে সেই দরবেশ ফকিরের আস্তানায় গিয়েছিলাম। তুমি তো জানোই যে, সেনাপতি আমার বড় ভাই।
শুনেছি।
তো, ফকির সাহেব বললেন, মা, অভিশাপ বড় নিষ্ঠুর। যতো বড় অভিশাপই হোক না কেন, একবার সন্তান পেটে এলে সে সন্তানকে আমি আল্লাহ্ রহমতে রক্ষা করতে পারবো।
তা’হলে বাদশাহ্কে আমি বুঝিয়ে বলি, আমার কথা উনি ফেলতে পারবেন না।
গুল তোমাকে যতটা বুদ্ধিমতী ভেবেছিলাম, এখন দেখছি তুমি ততটাই বোকা। এতক্ষণ আমি তোমাকে কী বুঝালাম। আমরা সন্তান চাই। তোমার সন্তান কি আমাদের সন্তান নয়! বড় বেগমকে বড় মা আর আমাকে মেজো মা বলবে, এতেই আমরা খুশি। তুমি দু’জন দাসী সঙ্গে করে সেই দরবেশ ফকিরের কাছে চলে যাও।
কবে?
আসছে পূর্ণিমায়। ঐ দিন হয়তো বাদশাহ্ থাকবেন না। শুনেছি কোথায় কোন জঙ্গলে হরিণ শিকার করতে যাবেন। আমি সেনাপতিকে বলে রাখবো। প্রয়োজনে দু’জন সেপাইও তোমার সঙ্গে যাবে।
গুলশানআরা কথাটা নিয়ে অনেক ভাবলো। সে এখন কী করবে কিছুই ভেবে উঠতে পারছে না। এ সময় যার সান্নিধ্য খুব বেশি প্রয়োজন ছিলো- সেই বড় বুবুও অনুপস্থিত। এদিকে মেজো বুবু যা কিছু বলেছেন, সে সবও ফেলনা নয়। রাজা-বাদশাহ্দের পরিবারে কত কিছুই ঘটে থাকে, যা- সাধারণ মানুষের ঘরে কখনো ঘটে না। সন্তানের জন্য দোয়া চাইতে যাওয়ার মধ্যে আর অপরাধ কী? তাছাড়াও সঙ্গে দাসী থাকবে, সৈন্যরাও থাকবে।
শেষ পর্যন্ত মনস্থির করে ফেললো ছোট বেগম। বাদশাহ্্ের সামনে গেলেই কেমন অপরাধের ছায়া ফুটে উঠে গুলশানের মুখে। বাদশাহ্্ বিচলিত হয়ে বললেন, গুল- তোমার কি খারাপ লাগছে?
না-। গুলশানের ছোট উত্তর।
একে একে দিন ফুরালো। এলো পূর্ণিমা। বাদশাহ্্ শিকারে চলে গেছেন সকালের দিকেই। সন্ধ্যায় মেজো বেগম এসে বললো, গুল প্রস্তুত হয়ে নে, গাড়ি অপেক্ষা করছে। তারপর সেনাপতিকে ডেকে বললো, ভাইজান, আপনি না হয় গুলের সঙ্গে যান। ওকে পৌঁছে দিয়ে চলে আসবেন। দরবেশ ফকিরের সাথে দেখা করে সৈন্যদের সাথে ও চলে আসবে।

ছয়.

দ্বিধা-দ্বন্দ্বের মধ্যেই জোড়া ঘোড়ার গাড়িতে গিয়ে বসলো গুলশান। সাথে একজন বাঁদী এবং অশ্বারোহী দু’জন সৈনিক চললো গাড়ির আগে-পিছে। এ গাড়ি কোথায় যাবে, কোথায় পৌঁছাবে, এ সবের কিছুই জানে না গুলশান। গাড়ি যেতে যেতে কত গ্রাম কত মাঠ-ঘাট বন পেরিয়ে কেবল যেতেই থাকলো। গুলশানের মনের মধ্যে বার বার একটি কথাই উঁকি দিয়ে যাচ্ছে- আমি কি ভুল করলাম। বড় বুবু না আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করাই বুঝি ভালো ছিলো।
আর কত দূর? একবার কোচয়ানকে প্রশ্ন করলো ছোট বেগম। কোচয়ান বললো, বেগম সাহেবা এইতো চলে এসেছি। ঘোড়ার পায়ের খট্্খট শব্দ যেনো প্রচন্ডভাবে আঘাত করছে তার মাথার মধ্যে। বারবার নিশি রাতের পাখি যেনো ডেকে বলছে, গুল এ কী ভুল করলি তুই? বুনো ঝোপঝাড়ের ভেতর থেকে ডেকে উঠছে পাল্পাল শিয়াল। গুলশানের বুকটা বারবার চম্কে উঠছে। শেষ পর্যন্ত একটা পুরনো পাকা কবরের কাছে এসে থামলো গাড়ি। কবরের উপর নতুন লাল শালু বিছানো। সেখানে লোকজনও নেই। শুধু একটি মাত্র লোক মাথায় পাগড়ি বেঁধে মোম জ্বেলে বসে আছে।
সেনাপতি সেখান থেকে বিদায় নিয়ে আবার ঘোড়া ছুটালো। শুধু দুইজন সৈনিক দূরে অপেক্ষায় থাকলো। ফকির একে একে অনেক সত্যি কথা বলে যেতে লাগলো। বাদশাহ্ শিবলী সাদিকের বংশে যে অভিশাপ আছে, সে কথাও বললো ফকির। ফকিরের এসব কথা শুনে গুলশানের মনটা একটু শান্ত হলো।
ফকির ঝাড়-ফুঁক ছাড়াও তেলপড়া, পানিপড়া দিয়ে ব্যবহারের নিয়ম-কানুন বুঝাতে বুঝাতে হঠাৎ আজানের শব্দ কানে এলো। সঙ্গে সঙ্গে চঞ্চল হয়ে উঠলো গুলশান। ফকির সাহেবও এদের বিদায় দিয়ে ওযু করার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়লো।
এদিকে ভোর হওয়ার পূর্বে বাদশাহ্ ফিরে এলেন শিকার থেকে। মহলে প্রবেশ করে গুলশানকে না দেখতে পেয়ে বিচলিত হয়ে পড়লেন তিনি। মেজো বেগম ছুটে এসে বললো, গুলতো আপনি যাওয়ার পরপরই গাড়ি করে কোথায় বেরিয়ে গেছে। কোথায়, কার সাথে দেখা করতে যায়, সে কথা তো কখনও বলে যায় না।
তার অর্থ কি এই নয় যে, সে প্রায়ই বাইরে যায়।
হ্যাঁ জনাব।
ছোট বেগম তো বাউলের মেয়ে, দেশে-দেশে গান গেয়ে বেড়িয়েছে। কত মানুষের সাথে তার জানা-শোনা ছিলো, রাজ-পরিবারের মর্যাদা কি সে রাখতে জানে?
এতোদিন আমাকে বলো নি কেন?
বললে কি আপনি আমাদের কথা বিশ্বাস করতেন।
বাদশাহ্ রাগে পায়চারি করতে করতে সেনাপতিকে ডেকে পাঠালেন। সেনাপতি এসে সালাম দিতেই বাদশাহ্ বললেন, ছোট বেগম প্রাসাদ ছেড়ে কোথায় যায় সে খবরটুকুও রাখতে পারেন না?
জি জনাব, খবর যে রাখিনি তা নয়। তবে, আমি কিইবা তাকে বলতে পারি। সে তো এক রকম ছোট বোনেরই মতো- তার উপর ছোট বেগম সাহেবা। আজও তাকে অনুসরণ করেছিলাম, তারপর ফিরে এসেছি।
কোথায় যায়, কেন যায়?
সে সব কথা আপনাকে আমি বলতে পারবো না। আমাকে ক্ষমা করবেন।
মেজো বেগম বললো, আমরা চাই না এ রাজ্যের ভাবী উত্তরাধিকারী রাজবংশের না হয়ে …।
বেগম-
বেয়াদবি মাফ করবেন জনাব। গুলশানের পেটে সন্তান তো আগেও আসতে পারতো। কিন্তু যখন থেকে তার বাইরে যাওয়া-আসা শুরু হলো…।
চুপ করো। সে অপরাধী হলে নিশ্চয়ই তাকে এমন সাজা দেয়া হবে যে, সারাজীবন ধুঁকে-ধুঁকে তাকে মরতে হবে।
বাদশাহ্ মাথায় যেনো আগুন ধরে গেলো। পায়চারি করতে লাগলেন তিনি। কখন গুলশান মহলে ফিরে আসে। অনেক প্রশ্ন, অনেক কথাই তার মনে জটিল হয়ে রেখাপাত করতে লাগলো। পৃথিবীটাকে বড় নিষ্ঠুর মনে হতে লাগলো তার কাছে। ভালোবাসার মধ্যে ঢুকে পড়লো যন্ত্রণা। তখন সত্য-মিথ্যার জোর লড়াই চলতে লাগলো মনের মধ্যে। গুলশান কি সত্যি পাপী? আমাকে না জানিয়ে কেন তার এই আসা-যাওয়া।
বেশ বেলাতে গুলশান ফিরে এলো। সে বড় ক্লান্ত। মহলে প্রবেশের আগেই বাদশাহ্্ বললেন, দাঁড়াও। চম্কে উঠলো গুলশানের প্রাণ। বারুদের মতো জ্বলে উঠে বাদশাহ্্ বললেন, কোথায় গিয়েছিলে?
দরবেশ ফকিরের কাছে।
ফকির ফকির ফকির। তুমি তো এক বাউল ফকিরের মেয়ে ছিলে। তারপর ধুলা থেকে তুলে এনে এই রাজপ্রাসাদে ঠাঁই দিয়েছি। এখন বাদশাহ্ বেগম তুমি। আবার কেন ফকিরের কাছে যাওয়া।
আপনার সন্তানের মঙ্গলের জন্য।
আমার সন্তান? ভিখারির কাছে রাজপ্রাসাদের চেয়ে বনের ছায়াই উত্তম। চিরকালের জন্য তুমি সেই বনের ছায়াতেই ফিরে যাও।
তারপর সেই দু’জন সৈন্যকে তলব করলেন যারা বেগমের সঙ্গে গিয়েছিলো। ভয়ে ভয়ে দু’জন সামনে আসতেই সিংহের মতো গর্জে উঠলো বাদশাহ্।
বলো, গত রাতে কোথায় গিয়েছিলে?
ওরা জোড় হাত করে বললো, হুজুর আমাদের ক্ষমা করুন- আমাদের কোন দোষ নেই। আমরা শুধু হুকুমের দাস। আমরা ছোট মুখে কিছুই বলতে পারবো না। এতক্ষণে গুলশান বুঝতে পারলো এখানে শান্তি নেই, এখানে শুধু রাজনীতি আর ষড়যন্ত্র। তবুও মিনতি করে বললো, হুজুর আপনি সারা রাজ্যের বিচারক। আপনি ন্যায়বিচার করুন। আমার কোন দোষ নেই। আমি ষড়যন্ত্রের শিকার। যারা আমাকে …
চুপ করো।
বাদশাহ্্ তার কোনো কথাই কানে তুললেন না। অন্য দু’জন সৈন্যকে হুকুম দিলেন এই মুহূর্তে একে বনবাসে দিয়ে এসো। আর কোনদিনও যেনো প্রাসাদে ফিরে না আসতে পারে। গুলশান আর একটি কথাও উচ্চারণ করলো না। বড় অভিমানে তার সারা অঙ্গ তখন জ্বলে-পুড়ে খাক্ হয়ে যাচ্ছে। যেন চোখের পল্কে সে হারিয়ে যেতে পারলেই বাঁচে। তবে, এই প্রাসাদ ঘিরে প্রচন্ড ঝড় উঠার আলামত সে যেন দেখতে পেলো। মনে মনে ভাবলো, বাদশাহ্ ভুল একদিন ভাঙবে- ততদিন আমি বেঁচে থাকতে পারবো তো? গুলশানের দু’চোখ বেয়ে তখন সমানে অশ্রু ঝরছে। সেভাবেই সে আবার জোড়া ঘোড়ার গাড়িতে গিয়ে বসলো। দু’চোখ বন্ধ করে মনে মনে বললো, হে দয়াময় তুমি আমাকে দয়া করো- আমার গর্ভে বাদশাহ্ অনেক আশার অনেক স্বপ্নের সন্তান, তাকে যেন আমি রক্ষা করতে পারি।
সৈন্যরা তাকে জনমানবহীন গভীর বনে ফেলে যাওয়ার পর কেটে গেলো একরাত একদিন। তারপর দিনের শেষে সেই যে দস্যু গাফ্্ফারের সাথে দেখা হয়ে গেলো আর গাফ্ফার তাকে মেয়ের অধিকার দিয়ে নিয়ে গেলো তার পাতার কুটিরে। হয়তো আল্লাহই কূলহারা গুলশানের এমন একটা ঠাঁই করে দিলেন।
সাত.

এদিকে বড় বেগম পিত্রালয়ে যাওয়ার বেশ কয়েকদিন পর তার পিতা আকবর আলী খাঁ সাহেব হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। তিনি জমিদার। দুই মেয়ের মধ্যে বড় মেয়ে বাদশাহ্ শিবলী সাদিকের বড় বেগম, আর ছোট মেয়ের স্বামী এক ধনী ব্যবসায়ী। দেখতে দেখতে জমিদারের অসুখ বেড়েই চললো। আজ যাই, কাল যাই করে বড় বেগম আর রাজ্যে ফিরতে পারলেন না। এর মধ্যেই পিতার মৃত্যুতে শোকে বিহ্বল হয়ে পড়লেন তিনি। এদিকে বাদশাহ বড় বেগমের কোনো সংবাদ না পেয়ে লোক পাঠালেন সেখানে। তখনই বড় বেগম জানতে পারলেন প্রাসাদের যাবতীয় খবর। কিন্তু তিনি আসতে পারলেন না। কেননা, জমিদারি দেখাশোনার ভার এখন তার উপর বর্তেছে। তবে, বাদশাহের কাছে এই মর্মে চিঠি পাঠালেন যে, গুলশানকে এতবড় সাজা না দিলেও চলতো। আমার মনে হচ্ছে এটা ষড়যন্ত্র।
সে যাই হোক, দস্যু সর্দার গাফ্ফার অনেক অনুরোধ করলো গুলশানের জীবনে ঘটে যাওয়া সব কথা বলার জন্য। কিন্তু গুলশান কিছুই বললো না। শুধু এতটুকুই বললো যে, বাবা- আজ থেকে আমি শুধু তোমার মেয়ে। আমার আর কোন পরিচয় নেই। যদি কোনদিন পরিচয় দেয়ার মতো সুযোগ দয়াময় আমাকে দেন, তা’হলে সেদিন আমি আমার সব কথা বলবো। তুমি শুধু আমার পেটের সন্তানকে রক্ষা করার জন্য যা- কিছু করা দরকার সব তুমি করবে। আমার কাছে অনেক সোনাদানা আছে। এসব কোথাও বিক্রি করে যা কেনা-কাটার প্রয়োজন মনে করো, সে সব কোথাও গিয়ে কিনে আনবে। আমার সন্তানকে আমি বড় করে তুলতে পারলেই আমার সব অপবাদ ঘুচে যাবে, আমি আমার ন্যায়বিচার পাবো।
বলতে বলতে গুলশান চিৎকার দিয়ে কেঁদে উঠলো। আর তখনই বেসামাল হয়ে পড়ে গেলো মাটিতে। সর্দার গাফ্ফার দৌড়ে গিয়ে পাঁজা কোলে করে মাচানের উপর শুইয়ে দিলো। ভেজা হাত দিয়ে চোখ, মুখ মুছে দিতে দিতে বললো, মা রে, আল্লাহ্্র উপর ভরসা রাখ। আমি আমার মেয়ের জন্য যা কিছু করার আমি সব করবো। তুই এ নিয়ে একটুুও চিন্তা করিসনে।
তারপর, দেখতে দেখতে প্রায় ছয়-সাত মাস কেটে গেলো। এর মধ্যে গাফ্্ফার গুলশানআরার একগাছা গহনা নিয়ে দূরের এক শহরে বিক্রি করে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে এসেছে। সেই সাথে একটি মজবুত ডিঙ্গি নৌকাও ক্রয় করে স্রোতের অনুকূলে বেয়ে এসে অপ্রশস্ত খালের মধ্যে রেখে দিয়েছে।
হঠাৎ একদিন মধু পূর্ণিমায় গুলশানের কোলজুড়ে এলো ফুট্ফুটে চাঁদের মতো একটি মেয়ে। তার রূপের আলোয় সারা বন ঝল্মল করে উঠলো। সর্দার গাফ্ফার তার নাতনীর নাম রাখলো বনলতা।
সেই বনলতা দেখতে দেখতে একদিন কিশোরী হয়ে উঠলো। বনময় ঘুরে বেড়ায়, পশু-পাখিদের সাথে খেলা করে। এখানে তার কোন শত্রু নেই। তবুও সর্দার গাফ্ফার তাকে সর্বদা চোখে চোখে রাখে। অনেক সময় বনলতা মায়ের স্নেহের আঁচলে শুয়ে মাকে বলে, মা- ঐ মানুষটা তোমার বাবা হয়, কিন্তু আমার বাবা কোথায়? সঙ্গে সঙ্গে মায়ের সুন্দর মুখটা নীল হয়ে যায় ব্যথায়। মা বলে, সে আছে অনেক দূরে। সেখানে হাজার হাজার মানুষ আছে, কী সুন্দর সুন্দর সব ঘরবাড়ি। তুমি বড় হলে আমরা সেখানে যাবো। তোমার নানাভাইও যাবে।
বনের মধ্যে ফলের অভাব নেই। তারপরেও বনলতার মা- শাক্্সবজি ছাড়াও আরও অনেক কিছু রান্না করে মাঝে মাঝে। জঙ্গলে রয়েছে অনেক মরিচগাছ। এসবই জন্মেছে পাখিদের কারণে। শুধু বিশেষ প্রয়োজন মেটাতে গাফ্্ফার ডিঙ্গি নিয়ে চলে যায় লোকালয়ের কোন হাট-বাজারে। ফিরে আসতে কখনও দু’দিনও কেটে যায়। তখন দূরে দূরে ছিটে-ফোঁটা মানুষের বাস ছিলো। কারো এমন কৌতূহল বা প্রয়োজনও ছিলো না যে, সাগর কুলের এই গভীর জঙ্গলে আসবে কোন কিছুর প্রয়োজনে।
সময় স্রোতের মতো গড়াতে গড়াতে চলে যায় মাস, ফুরিয়ে যায় বছর। একদিন বনলতা পা রাখলো পনেরতে। এখন সে আর বনে থাকতে চায় না। অনেক মানুষের ভিড় ভেঙে সে তার বাবার কাছে যেতে চায়। মা কেবলই সান্ত¡না দেয় তাকে। বনলতা কখনও হরিণ শাবকের পেছনে ছুটতে ছুটতে চলে যায় সাগর মোহনার সেই শাখা নদীর তীরে। সামনে যতোদূর চোখ যায় শুধু পানি আর পানি। বালির চরে ঢেউ এসে কেমন আছড়ে পড়ে। ঢেউ আর বালুতটের কেমন মায়ার খেলা, ভালোবাসার খেলা বনলতা চেয়ে চেয়ে দেখে। মনের মধ্যে কেমন যেন লাগে তার। একদিন হঠাৎ বনলতার চোখে পড়লো বেশ দূরে অনেকগুলো নারকেল গাছের আড়াল থেকে দু’টি মেয়ে ছুটতে ছুটতে আসছে তার দিকে। দেখেই বনলতার আনন্দ যেনো আর ধরে না। পুল্কে তার সারাশরীর কেঁপে উঠতে লাগলো বার বার। দু’টি মেয়েও যেনো ঠিক বনলতার মতো। ওরা একই বয়সের। আর দেখতেও সুন্দর। বনলতার কাছাকাছি এসে হঠাৎ থমকে গেলো ওরা। তারপর হাসি হাসি মুখ করে কাছে এসে বললো, সুন্দরী তোমার নাম কি?
আমার নাম বনলতা। তোমরা কে? তোমরাও কি আমার মতো এই বনে থাকো?
বনলতার কথা শুনে মেয়ে দু’টি খিল্খিল করে হাসলো। বললো, আমরা ঐ দিকে থাকি। তোমাকে আজই প্রথম দেখলাম। এদিকে আমরা প্রায়ই আসি। সারারাত ঘুরে বেড়াই বালুচরে। তারপর আবার চলে যাই।
বনলতা ওদের দু’জনের পোশাক-পরিচ্ছদ দেখে তো অবাক। সে বললো, এতো সুন্দর পোশাক তোমরা কোথায় পেয়েছো? এতো ভালো পোশাক তোমাদের কে দিয়েছে? তোমাদের বাবা বুঝি অনেক দূরদেশ থেকে নিয়ে এসেছে? মেয়েরা বললো, বনলতা তুমি খুব সুন্দর। তোমার এই ছেঁড়া, ময়লা কাপড়ে তোমাকে মানায় না। তুমি যদি আমাদের বান্ধবী হয়ে যাও তা’হলে আমরা তোমাকে অনেক উপঢৌকন দিবো। অর্থাৎ অনেক ভালো ভালো পোশাক দিবো। বনলতা বললো, আমি তো তোমাদের বন্ধুই হতে চাই। খেলতে চাই, মিশতে চাই, সারাদিন কথা বলতে চাই। বনের মধ্যে একা একা আর ভালো লাগে না।
তোমার আর কে কে আছে?
আমার মা আর নানাভাই।
বনলতা আজ আমরা যাই, তুমিও যাও। কাল বিকালে আমরা আবার আসবো।
বনলতা বললো, তোমাদের নাম কী?
একজন বললো, আমি বিলকিস। আরেকজন বললো, আমার নাম লায়লা। আমরা দু’জন বান্ধবী।
এদিকে মেয়েকে অনেকক্ষণ না দেখে উতলা হয়ে পড়লো মা। চিৎকার করে ডাকাডাকিও করলো, কিন্তু বনলতার কোন সাড়া পেলো না। বনলতার নানাভাইও উপস্থিত নেই। আজ তিনদিন হলো লোকালয়ের কোন বাজারে কেনাকাটা করতে গেছে। তখন সন্ধ্যা। চাঁদের আলোয় বনের পথ-ঘাট দারুণ দেখাচ্ছে। বনলতা ছুটতে ছুটতে একেবারে ক্লান্ত হয়ে পৌঁছালো মায়ের কাছে। মা মেয়েকে দেখে মনটা তার শান্ত হলো। পরে বললো, কোথায় ছিলে এতক্ষণ?
মা জানো- আজ নদীর ঘাটে দু’জন সুন্দর মেয়ের সাথে আমার দেখা হয়েছে।
মা- মেয়ের কথা শুনে তো অবাক। বলিস কী? এই বনে আমরা ছাড়া আর কোন মানুষ আছে নাকি?
ওরা বললো, আজ থেকে আমরা তিন বান্ধবী। ওরা ঐ দিকে থাকে। ওরা বলেছে, কাল আবার আসবে, আমাকেও যেতে বলেছে।
মেয়ের কথা শুনে মা যেনো চম্কে উঠলো, মনে মনে ভাবলো ওরা কিছুতেই মানুষ হতে পারে না। নিশ্চয়ই ওরা পরী। কিন্তু… কোন জিনের নজরে পড়লে মেয়েকে নিয়ে আমার তো খুব বিপদ হবে!
অনেক ভেবে-চিন্তে মা বললো, ঐ মেয়ে দুটো আমাদের মতো মানুষ না।
তবে ওরা কি মা?
ওরা পরী। ওদের আলাদা এক রাজ্য আছে। পরীরা মানুষের দৃষ্টির আড়াল দিয়ে চলাফেরা করে। কোন মানুষ ওদের দেখতে পায় না। অবশ্য যদি ওরা ইচ্ছে করে তা’হলে মানুষের সাথে দেখা দেয়। পরীরা কখনও ভালো হয় কখনো আবার মন্দও হয়। আমি বলি কী, তুই আর ওদের কাছে যাসনে। তোর যদি একটা কিছু হয়ে যায়- তা’হলে আমার মরে যাওয়া ছাড়া আর উপায় থাকবে না।
না- মা, ওরা একটুও খারাপ মেয়ে নয়। আচ্ছা কাল না হয় তুমিও আমার সঙ্গে যেও।
আগে তোর নানাভাই ফিরে আসুক।
বনলতা মায়ের কথার প্রতিবাদ করলো না, তবে গাল ফুলিয়ে ভার হয়ে রইলো কিছুক্ষণ। পরদিন গোধূলি লগ্নে বিলকিস আর লায়লা নদীর চরে এসে হাজির। অপেক্ষা করলো তাদের নতুন বান্ধবী বনলতার জন্য। শেষে ধীরে ধীরে বনের মধ্যে এগিয়ে এলো ওরা। দূর থেকে বনলতাকে দেখে ইশারায় ডাকলো। বনলতা এগিয়ে গেলো কিন্তু কোন প্রকার হইচই করলো না। ওরা বনলতার হাতে একগাদা কাপড় দিয়ে বললো, এখন থেকে তুমি এগুলো পরবে, তা’হলে আমরা খুব খুশি হবো।
আমার মা যদি রাগ করে।
করবেন না। কেননা, এগুলো তোমার জন্য আমাদের উপহার। কেউ কিছু দিলে তা ফেরত দিতে হয় না।
আচ্ছা- তোমরা কি পরী?
এ কথা কে বলেছে? প্রশ্ন করলো লায়লা।
বনলতা বললো, মা বলেছেন।
তোমার মা কি আমাদের ঘৃণা করেন?
বনলতা বললো, ঘৃণা করবে কেন? তবে আমাকে নিয়ে মায়ের অনেক ভাবনা। আমার যদি কোনো ক্ষতি হয়, তাই মা ভয় পায়। আমি একটু বড় হলে- মা আমাকে নিয়ে আব্বা হুজুরের কাছে যাবে। বিলকিস বললো, তখন না হয় আমরাও যাবো তোমার সাথে।
এর মধ্যেই বনলতার মায়ের কণ্ঠ ভেসে এলো। বনলতা বললো, মা ডাকছে আমি যাই।
বনলতা মায়ের কাছে ফিরে যেতেই মা মেয়ের হাতে এতো কাপড় দেখে তার দু’চোখ অশ্রুতে ভরে উঠলো। কী ভেবে মায়ের বুকের মধ্যে ঐ পরী মেয়ে দুটোর জন্য স্নেহের কুয়াশা ছাড়তে লাগলো। মনে মনে ভাবলো, বাদশাহ্ মেয়ে, যার স্থান রাজপ্রাসাদে, যে মেয়ে সারা রাজ্যের চোখের মনি, সেই বনলতা আজ জঙ্গলে বাস করে, শতছিন্ন এক টুকরো কাপড় পরে মাসের পর মাস কাটায়।
হঠাৎ মায়ের চোখে অশ্রু দেখে বনলতা অবাক হয়ে বললো, তুমি কাঁদছো কেন মা। তুমি না চাইলে এসব কাপড় আমি কালই আমার বান্ধবীদের ফেরত দিয়ে আসবো।
গুলশান আর নিজেকে আগলে রাখতে পারলো না। মেয়েকে বুকের মধ্যে টেনে নিয়ে হু-হু করে কেঁদে উঠলো। বললো, না মা- না। এখন থেকে তুই এসব জামা-কাপড়ই পরবি। আমি কিছু বলবো না। আর ওরা যদি সত্যি তোকে ভালোবেসে থাকে, তা’হলে আমার কাছে নিয়ে আসিস ওদের। বলিস আমার মা তোমাদের যেতে বলেছে।
বিলকিস আর লায়লা পরী আড়ালেই ছিলো। ওরা লুকিয়ে দেখছিলো বনলতার মা তাদের দেয়া উপহার দেখে কী করে, কী বলে। এবার সশরীরে ঘরের সামনে খোলা জায়গাটাতে এসে দাঁড়িয়ে বললো, আমরা এসে গেছি। গুলশান বাইরে এসে দেখলো- কী সুন্দর দু’টি মেয়ে। যেনো বনলতার আরও দুটো বোন।
সে বললো, তোমরা যে পরী সে আমি আগেই বুঝেছিলাম। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে বনলতার মতো তোমরাও আমার মেয়ে। তোমাদের দোহাই, বনলতার কোন ক্ষতি তোমরা করো না। তোমাদের খালামনি বড় দুঃখী মানুষ। যদি কোনদিন দয়াময় আমাদের দুঃখ ঘুচায়, সেদিন তোমাদেরও আমি খুশি করতে পারবো।
ওরা বললো, সত্যি তুমি আমাদের খালামনি। আমরা তোমার কাছে কিচ্ছু চাই না। তুমি বনলতাকে যেমন ভালোবাসো, তেমনি আমাদেরকেও তোমার স্নেহের আঁচলে বেঁধে রেখো।
পরদিন সেই ঝলমলে রেশমি কাপড় পরে বনলতা আর বনলতা থাকলো না। সে হয়ে গেলো নিঝুম বনের রূপসী এক কন্যা। বনের পশু-পাখিরা যেনো অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকলো বনলতার দিকে। বিলকিস আর লায়লা কি শুধু কাপড়ই দিয়েছে? না। মেয়েদের সাজগোজের যা কিছু প্রয়োজন সব দিয়েছে।
তারপর থেকে আর কোন কিছুর অভাব থাকলো না বনলতার। দেখতে দেখতে পনেরো বছর পার হয়ে ষোলোতে পড়লো তার বয়স। এখন সে সত্যি নিঝুম বনের রূপসী কন্যা। ভালো ভালো পোশাক পরে কেবল ছোটাছুটি করে বেড়ায় খরগোশ কিংবা হরিণ শাবকের পিছু। শুক্ল পক্ষের রাতগুলোর প্রথমার্ধে আসে দুই পরী বান্ধবী। ওদের সাথে এ গল্প সে গল্প করে তবেই ঘুমোতে যায় বনলতা। পরী বান্ধবীরাও চলে যায় নীল আকাশে।

আট.

একদিন বিকেলে বড় একটা গাছের গুঁড়ির উপর বসে নদীর দিকে তাকিয়ে ছিলো বনলতা। বেশ হাওয়া বইছিলো। বড় বড় ঢেউগুলো বালুচরের অনেক অনেক উপর দিকে উঠে আবার গড়িয়ে পড়ছে নিচে। ঢেউয়ের সাথে ভেসে আসে নানা রকম জিনিসপত্র। একদিন হঠাৎ একটা বাঁশের বাঁশি দেখে বনলতা গাছের গুঁড়ি থেকে নেমে ছুটে গেলো পানির কিনারে। ভেজা বালি থেকে বাঁশিটা তুলে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকলো বাঁশিটার দিকে। তাতে অনেকগুলো ছিদ্র। এটা যে কেউ হাতে তৈরি করেছে সেটা সে বেশ বুঝতে পারলো। বনলতা তো জানে না এর নাম বাঁশি। এই বাঁশিতে মানুষ সুর তোলে। বাঁশির সুরও সে কখনো শোনেনি। বাঁশিটি হাতে নিয়ে বনলতা ঘরে ফেরার জন্য গুঁড়ি থেকে নেমে ভেজা বালির উপর দিয়ে হাঁটতে লাগলো। অনেকগুলো হরিণ তখন পানি খেতে দাঁড়িয়েছে কূলে। বনলতা ওদের বললো, জলদি পানি খেয়ে চল এক সাথে যাই। অনেক দূরে একটা পানসী নৌকার ছাদে দাঁড়িয়ে কেউ একজন দূরবীন হাতে এই অবাক করা দৃশ্য দেখছিলো তন্ময় হয়ে।
এদিকে কখনো কোন জাহাজ, বজরা বা কোন বড় নৌকাও আসে না। দূর দেশের এক শাহ্জাদা বড় বজরা নিয়ে পানিপথে দেশ ভ্রমণ এবং সুবিধা মতো শিকার করার উদ্দেশ্যে বের হয়েছিলো প্রায় এক মাসের উপরে। কেবল জঙ্গল আর জঙ্গল। কখনো কোন উপকূলে ছোট ছোট হাট-বাজার দেখেছে। লোকজন নিয়ে ঘুরেছে কিন্তু তেমন বড় শহর তার চোখে পড়েনি। অবশ্য বিশাল বিশাল জঙ্গল দেখেছে। সেখানে বজরা ভিড়ানোর কথা ভাবতেও পারেনি শাহ্জাদা। শেষে ফিরে যাওয়ার পথে স্রোতের অনুকূলে এদিক দিয়ে তার আসা। দূরে পানির কিনারে হরিণ এবং এক মেয়েকে দেখে সে চিৎকার দিয়ে মাঝিদের বললো, ঐ যে দূরে বিশাল বন দেখা যাচ্ছে ওখানে চলো। ওখানে একপাল হরিণের সাথে একটি মেয়েকেও দেখা যাচ্ছে। এ রহস্য আমাকে উদঘাটন করতেই হবে। বজরা ঘুরাও।
মাঝিরা এবং শাহ্জাদার দেহরক্ষীরাও বললো, হুজুর ও বনে কেউ কখনো যায় না। এসব বন বড় ভয়ঙ্কর। বাঘ, ভাল্লুক, সিংহ, হাতি, গন্ডার থাকলেও তো তেমন কিছু যায় আসে না কিন্তু ওসব বনে থাকে অশরীরী আত্মারা-মায়াবিনীর। একবার সেখানে গেলে আমরা আর কেউ প্রাণ নিয়ে ঘরে ফিরে যেতে পারবো না। আমরা বরং দেশেই ফিরে যাই।
কিন্তু শাহ্জাদার মনে এমন জিদ চেপে বসেছে যে, ঐ মেয়েকে আর একটি বার না দেখে সে আর কিছুতেই দেশে ফিরে যাবে না। সেকি সত্যি মায়াবিনী-না কোনো মানুষ, সেটা তাকে দেখতেই হবে। শেষে মাঝিরা বজরার মুখ ঘুরালো সেই বনের দিকে। নির্দিষ্ট চরে পৌঁছাতে সন্ধ্যা পার হয়ে গেলো তাদের। সেখানে পৌঁছাতেই নদীর তীর ঘিরে শুরু হয়ে গেলো শিয়ালের হুক্কাহুয়া, পাখিদের বিচিত্র সুরে ডাকাডাকি আর লক্ষ লক্ষ জোনাকির মিটি মিটি।
সবাই ভাবলো সত্যি সত্যি এ যেনো মায়া মরীচিকার খেলা। মাঝিরা বনের অনেকটা দূরে পানির মধ্যে বজরা নোঙর করলো। রাতে ভয়ে আর মাঝিদের দু’চোখের পাতা এক হয় না। কেবলই ভাবনা যে, কখন যেনো লম্বা একটা কালো হাত এসে আমাদের কাউকে তুলে নিয়ে যায়।
পরদিন সকালে খোলা তরবারি হাতে নিয়ে শাহ্জাদা এগিয়ে চললো সেই বনের মধ্যে। শাহ্জাদার সঙ্গে মাত্র একজন দেহরক্ষী। বাকিরা তীরেই বনের ছায়ায় বসে আছে। কোথাও কিছু দেখা যাচ্ছে না। একটা হরিণও চোখে পড়লো না শাহ্জাদার। তখন দেহরক্ষী বললো, হুজুর এ বন আসলেই মায়াপুরী। কেননা কাল যেখানে পাল পাল হরিণ দেখেছিলেন, আজ সেখানে কিছুই নেই। শাহ্জাদা বললো, এমনও তো হতে পারে হরিণেরা গভীর জঙ্গলে থাকে। শুধুমাত্র পানি পিপাসা মেটাতেই ঐ চরটাতে গিয়েছিলো। আমার বিশ্বাস হরিণের দেখা পেলে মেয়েটির দেখাও মিলবে।
তারপর, আরো কিছুটা এগিয়ে যেতেই বড় একটা বটগাছে বানরের কিচির-মিচির শব্দে থমকে দাঁড়ালো শাহ্জাদা। সতর্ক হয়ে চোখ ঘুরালো চারিদিকে। হঠাৎ অনেকগুলো তিতির পাখির পেছনে ছুটে আসতে দেখলো সেই মেয়েকে। দেখেই শাহ্জাদা যেনো বোবা হয়ে গেলো।
এ মেয়ে পরী অথবা মায়াবী হবে। বনলতাও সেই ক্ষণে সামনের দিকে দৃষ্টি দিতেই দেখতে পেলো সুন্দর এক যুবককে। এই তার প্রথম কোনো যুবক পুরুষকে দেখা। সেও থমকে গিয়ে ঘাড়টা একবার বাঁয়ে একবার ডাইনে কাত করে প্রাণ ভরে দেখতে লাগলো সেই শাহ্জাদাকে। দেহরক্ষী তখন কিছুটা পিছিয়ে কাচুমাচু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বটে তবে, তার বুকের মধ্যে ধড়ফড় শুরু হয়ে গেছে।
শাহ্জাদা দূর থেকেই বললো, তুমি কি কোনো মায়াবী না মানুষ?
বনলতা মনের অজান্তে বলে উঠলো- আমি বনলতা, তুমি কে?
আমি শাহ্জাদা সাব্বির।
তুমি কোথায় থাকো? তুমি কি জিন?
না- আমি মানুষ।
এ বনে তো কোনোদিন কোনো মানুষ আসে না।
[চলবে]

SHARE

Leave a Reply