Home সায়েন্স ফিকশন মিশন টু আয়রনম্যান -মহিউদ্দিন আকবর

মিশন টু আয়রনম্যান -মহিউদ্দিন আকবর

[ষষ্ঠ পর্ব]

পৃথিবীর ট্যালেন্ট তরুণবিজ্ঞানী আসিফ আরমানের অত্যাশ্চর্য দৃষ্টি তার মুখোমুখি দাঁড়ানো স্পেসস্যুট ম্যানেজারের মুখের ওপর। ধীরে ধীরে সে দৃষ্টি স্পেসস্যুট ম্যানেজারের মাথা থেকে পা অবধি কয়েকবার ঘুরে এসে ফের স্থির হয় স্পেসস্যুট ম্যানেজারের মুখের ওপর। অবাক হতে গিয়ে কখন আসিফের মুখটা যে সামান্য ফাঁক হয়ে গেছে, সেটা সে টেরই পায়নি।
আসিফ তার দু’টি চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না যে, সেই একই আদল, একই চেহারা! অথচ তার দেখা কলেজ ল্যাবরেটরির বার্নার আর এই বার্নারের মাঝে পার্থক্য হলো- ও ছিল শতভাগ মানব আর এই বার্নার রীতিমত রোবট! কথায় বলে নামে নামে যমে টানে! কিন্তু বার্নার ম্যাশেলের নামের সাথে যমের কোনো সম্পর্ক নেই।
আসলে কলেজ ল্যাবরেটরিতে মামার দেখা সেই বার্নার ম্যাশেলই তার সামনে জলজ্যান্ত মানুষটির মতো রোবটের বেশে দাঁড়িয়ে। যদিও তরুণবিজ্ঞানী আসিফ মামা কিছুক্ষণ নিজের দু’টি চোখকেই বিশ্বাস করতে পারলেন না, … তবুও বিশ্বাস করতে বাধ্য হয়েই স্বাভাবিকভাবে উচ্চারণ করলেন- বার্নার ম্যাশেল! তুমি তো আমার সহপাঠী সেজে মানুষের রূপ নিয়ে পৃথিবীতে গিয়েছিলে, কিন্তু এখন দেখছি তুমিও একটা রোবট!!
মামার কথায় ম্যাশেল একটা ম্যাটালিক হাসি উপহার দিয়ে বললো- তুমি অবাক হচ্ছো আমাকে দেখে, সে আমি খুব বুঝতে পারছি। আসলে এটাও আমার আসল রূপ নয়। আমাদের গড়ন-গঠন তোমাদের মতোই, তবে আমাদের একটা অলৌকিক শক্তি হলো- আমরা আমাদের রূপের সাময়িক পরিবর্তন করতে পারি। যে ক্ষমতা মহান আল্লাহ মানুষকে দেননি।
আমার মনে হয়, মানুষ এমনিতেই মহা চালাক-চতুর প্রাণী। তার ওপর তাদের যদি এই অলৌকিক ক্ষমতাটুকু থাকতো তাহলে তারা যে কত অকৃতজ্ঞ প্রাণীতে পরিণত হতো- তা আল্লাহই মালুম। মানুষকে আল্লাহ আমাদের চেয়ে বুদ্ধিমান বানিয়েছেন, তাতেই তারা ধরাকে সরা জ্ঞান করে বসে। হাজারও জটিলতা-কুটিলতার মাধ্যমে নিজেদের মাঝে প্রতিপত্তি ফলানো আর ক্ষমতার লড়াইয়ে মেতে ওঠে। মিথ্যার আবরণে সত্যকে লুকিয়ে কেবল খাও-দাও আর ফুর্তি কর ধরনের ভন্ডামিতে মেতে থাকে। নিজেদের অপকর্মের কারণে তারা মানবতা নামক মহানুভবতাকে পর্যন্ত হারিয়ে ফেলে, হয়ে ওঠে ঘৃণ্য জানোয়ারের চেয়েও নিকৃষ্ট।…
বার্নার ম্যাশেল হয় তো আরও কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু মানুষের এতোটা সমালোচনা আর শুনতে আগ্রহী নন আসিফ মামা। তিনি বললেন- ব্যাস, ব্যাস। এবার থেমে যাও তো বন্ধু। তুমি মানুষের কেবল একটা রূপই দেখেছ, আরেকটা রূপ দেখনি। মানুষ আসলে যে কতটা বিশ্বাসভাজন, আমানতদার, কর্মনিষ্ঠ, হৃদয়বান, দয়ালু, পরোপকারী, বন্ধুবৎসল…।
মামার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে ম্যাশেল বলে- হ্যাঁ, তাও অস্বীকার করছি না। আমি আসলে আগে তোমাদের দুষ্ট লোকদের চরিত্রটা বলে নিচ্ছিলাম। তবে যারা ভালো তারা তো ভালোই। আর তাদের এই ভালো হবার পেছনে আছে তাদের স্রষ্টাভীতি, স্রষ্টায় অবিচল বিশ্বাস, শেষ বিচারের দিন ও পরকালের অনন্ত জীবনের প্রতি দৃঢ়বিশ্বাস। তারা কখনও মানুষ তো মানুষই অপর কোনো প্রাণীরও ক্ষতি করেন না। আমরা তাদের প্রতি খুবই শ্রদ্ধাশীল।
এই ধরো তোমার কথাই বলছি। আমি অনেকবার পৃথিবীতে অভিযান চালিয়েছি। পৃথিবীর বিভিন্ন জাতির আচরণ দেখেছি। বিশেষ করে মানুষের মাঝে ইহুদি নামের যে জাতিটি পৃথিবীতে আছে- ওদের চেয়ে প্রতারক, স্বার্থপর, নিকৃষ্ট, কদাকার, হিংসুটে, যুদ্ধবাজ, চালবাজ, সন্ত্রাসী এবং আত্মকেন্দ্রিক জাতি আর নজরে পড়েনি।
তোমাকে আবিষ্কারের আগে আমি ইহুদি ছাড়াও আরও বেশকিছু জাতি-সম্প্রদায়ের তরুণ ও ট্যালেন্ট বিজ্ঞানীকে পর্যবেক্ষণ করেছি। কিন্তু বিজ্ঞানচর্চায় তোমার নিষ্ঠা, আমানতদারি, সততা আর একনিষ্ঠ সাধনার মাঝে কল্যাণমুখিতা দেখেছি। তাতে তোমাকে অনেক অনেক ভালো মানুষ বলে মনে হয়েছে। আর সে কারণেই আমি আমাদের সমস্যা সমাধানের জন্য তোমাকে নির্বাচন করেছি। আমাদের মহান বাদশাহকে জানিয়েছি। তিনিই তোমাকে পৃথিবী থেকে আমাদের এখানে আনার ব্যবস্থা করেছেন।
তবে আমরা যখন দেখলাম তোমার ভাগনেও তোমার অনুসারী তখন তার ওপরে ভর করে তোমাকে এবং ভাগনেকে- দু’জনকেই আমরা নিয়ে আসি।
কারণ আমরা এমন এক জাতি, মানুষদের মাঝে কাউকে পেতে হলে কোনো না কোনো মানুষের ওপর প্রথমে আমাদের ভর করতে হয়। সেটা স্বপ্নের মাঝেই হোক, সাধারণ ঘুমের মাঝেই হোক আর জেগে থাকা অবস্থায়ই হোক না কেন।
– ভর করে মানে? মামা বার্নার ম্যাশেলের কাছে জানতে চান ‘ভর’ কথাটার মানে।
ম্যাশেল মুচকি হেসে জবাব দেয়Ñ ভর করা মানে তো ভর করাই। মানে নির্ভর করা। অর্থাৎ আমাদের এমন এক শক্তি আল্লাহ দিয়েছেন, আমরা সে শক্তিবলে বাতাস হয়েও মানুষের ভেতরে ঢুকে পড়তে পারি। তারপর আমাদের কথাগুলো তার মুখের ভাষায় বলাতে পারি। ইচ্ছে হলে হাসাতে পারি। কাঁদাতেও পারি। আবার ইচ্ছে করেই তাকে যে কোনো কিছু স্বপ্নে দেখাতে পারি। এমনকি আমাদের ভরকরা ব্যক্তির হাতে বাস্তবে এমন কিছু তুলে দিতে পারি যে, মানুষটি তখন বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে যায়। যেমন তোমার ভাগনের হাতে আমরা তুলে দিয়েছিলাম লোহার দন্ড বা আয়রন বার। আবার তাকে কেন্দ্র করে এমন একটা ঘোর তৈরি করেছিলাম যে, কখন তোমাদের পৃথিবীর বুক থেকে তুলে আমাদের মাহাজাগতিক গ্রহরাজ্যে নিয়ে এসেছি- তোমরা তা কল্পনা করারও সুযোগ পাওনি।
মামা এবার ম্যাশেলকে শক্ত প্যাঁচে ফেলার জন্য বলেন- এতোই যদি হবে, তাহলে তোমাদের আর আয়রনম্যানের লড়াইয়ের মাঝে আমাদের নিয়ে এলে কেন? তোমরা তো নানাবিধ ভোজবাজির মাধ্যমেই একে অপরকে ঠ্যাঙ্গানি দিতে পারতে।
বার্নার ম্যাশেল মামার কথায় খানিকটা ধাক্কা খেলেও মিষ্টি হেসে বলে- আসলে আমাদের যে অলৌকিক ক্ষমতা আছে তাতো আমাদের পরস্পরের মাঝে লুকোছাপা করার কোনো সুযোগ নেই। এদিক থেকে আমাদেরও যে পাওয়ার, আয়রনম্যান এবং তার বাহিনীরও সে পাওয়ার। অলৌকিক ক্ষমতা দিয়ে কেউ কাউকে ফাঁকি দিতে পারি না। আর পারি না বলেই আমরাও প্রযুক্তিগত লড়াই চালাতে বাধ্য হই। এবার নিশ্চয় বুঝতেই পারছো, প্রযুক্তির আবিষ্কার আর তা প্রয়োগে তোমার যে মেধা এবং দক্ষতা- আমরা তাকেই প্রাধান্য দিয়েছি।
মানববিজ্ঞানী আসিফ মামা এবার রহস্য করে একটু হেসে বললেন- হুম, বুঝেছি। আর সে জন্যই তুমি মানুষের রূপ ধরে কলেজ ল্যাবরেটরিতে প্রাক্টিক্যাল ক্লাস করার ছলনায় হাজির হতে। তা না-হয় বুঝলাম। কিন্তু আমি তোমাকে দেখতে পেলেও আমার সহপাঠীরা; এমনকি আমাদের গাইড প্রফেসর ড. সিফাত হাসান স্যারও তোমাকে দেখতে পেতেন না কেন?
– ও, এই কথা! আসলে আমরা যাকে দেখা দেই, কেবল সেই আমাদের দেখতে পায়। এ জন্য আমাদের কারও দেখা পেলে কাউকে বলতে নেই। তাতে শুধু শুধু হাসি-তামাশার পাত্র হতে হয়। এতদিনে নিশ্চয় তুমি সেটা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছ। ভাগ্যিস তোমাকে সহপাঠীরা পাগল ঠাওড়েনি।…
যাক সে কথা। তোমার বিশ্বস্ততায় আমাদের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এবং স্বয়ং আমাদের মহাবাদশাহও খুবই খোশ। আমরাও খোশ। এবার বলো, আমাকে কেন স্মরণ করেছো?
– তোমাকে ঠিক স্মরণ করিনি। আমার জন্য ফায়ারপ্রুফ স্পেসস্যুটের কথা তুলতেই রোবোসার্জেন্ট তোমার কথা বললো।
– হ্যাঁ, আমিই আমাদের পুরো রাজ্যের সবধরনের স্যুটের সংরক্ষক। তোমার চাহিদাও আমাকেই পূরণ করতে হবে। চিন্তার কোনো কারণ নেই। সব ব্যবস্থা হয়েই আছে। তুমি চাওয়া মাত্রই তা হাজির করা হবে। আমি বুঝতে পারছি, তোমরা একটা খুবই ভয়াল অপারেশনের জন্য তৈরি হচ্ছ। যুুদ্ধটা হতে পারে অতিশয় ভীতিকর।
হয়তো, তাতে মহাজাগতিক বিশ্বে একটা ব্যাপক পরিবর্তনও এসে যেতে পারে। হয়তো, দুয়েকটা উপগ্রহ বিলীনও হয়ে যেতে পারে। আর তাতে যদি ভয়াল ধূলি আস্তরণ এবং পরমাণু বিকিরণ ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে পৃথিবীর আবহমণ্ডলেও তার প্রভাব পড়তে পারে।
– হ্যাঁ, তুমি ঠিকই বলেছ ম্যাশেল। তবে আমার একটা ভিন্ন রকম প্রস্তুতি আছে। তাহলো, এ যুদ্ধে তোমাদের উপকার করতে গিয়ে আমাদের আবহমণ্ডলকে কলুষিত না করা।
– সেটা কেমন করে সম্ভব হবে বন্ধু?
– হবে সম্ভব হবে। অবশ্যই হবে।
– বাব্বাহ! যেভাবে তুমি দৃঢ়তা দেখাচ্ছ তাতে তো তোমার ওপর আর বিশ্বাস হারালে চলবেই না।
– হ্যাঁ, পুরোপুরি বিশ্বাস রাখো। ইনশাআল্লাহ, দুনিয়ার ওপর এর প্রভাব কিছুতেই পড়বে না।
– কিন্তু ওদের মাকড়সাবিজ্ঞানী খুবই কৌশলী। একেবারে শয়তানের খাস শিষ্য। কখন যে কী দিয়ে কী করে বসে বলা যায় না।
– সে ভাবনা আমার মনে আছে। তবে এরই মাঝে আমি ওকে স্টাডি করে ফেলেছি। শোন, বার্নার ম্যাশেল! আমাদের দুনিয়ায় একটা কথা প্রচলিত আছে। তা হলো- ‘মোল্লার দৌড় মসজিদ পর্যন্ত’। আর আমি বলি- ‘মাকড়সার দৌড় হলো জালের কেন্দ্র পর্যন্ত’। ওই বিজ্ঞানী যদি প্রকৃতপক্ষে এলিয়নদের মাঝ থেকে মাকড়সা হয়ে থাকে, তো- তাকে সব দিকপাশ বাঁচিয়ে তার সৃষ্ট ইলেকট্রনিক স্পাইডারনেট এর কেন্দ্রের দিকেই দৌড়াতে হবে। তখনই আমরা ছড়িয়ে দেবো ফোটন মোশন। আস্তে আস্তে নিস্তেজ হয়ে যাবে ব্যাটা মাকড়সা বিজ্ঞানী। আর তখনই ওকে পাকড়াও করতে পটাশিয়াম কার্বোনেট গ্যাসের ভয়াল আগুনে ইলেকট্রনিক স্পাইডারনেট গলিয়ে সেই নেটটাকে ওর জন্য একটা জেলখানা বানিয়ে দেবো। হা: হা: হা:….।
– দারুণ! দারুণ!! দারুণ প্ল্যান!!! কিন্তু ওকে শেষ পর্যন্ত না মারতে পারলে আবার কী দিয়ে যে কী করে বসে….।
– সে ভাবনাও আমার মাথায় আছে।
– তাহলে তো বাঁচোয়া…।
— কিন্তু ম্যাশেল আমাকে একটা বিষয় জানাতে পারবে কি?
– কী বিষয়?
– আমরা পৃথিবীতে বসে মহাকাশ গবেষণায় মহাকাশের মিল্কওয়ের কথা জেনেছি। ওই মিল্কওয়েটা আসলে কী, তুমি কি তা জানো?
– ওরে বাপস্! মিল্কওয়ের কথা আর বলো না। সে তো কোটি কোটি ন্যানোমিটার লম্বা এক তারকার ঝাঁক। বলতে পারো, ছায়া পথে লাখ লাখ তারার এক বিশাল নদী বা সমুদ্র একটা।
– হুম বুঝতে পারছি, মিল্কওয়ে সম্পর্কে তোমার স্বচ্ছ ধারণা আছে।
মানববিজ্ঞানী আসিফ মামার কথায় বার্নার ম্যাশেল তার মাথা দুলিয়ে একটু ক্রেডিট নেয়ার জন্য বলে ওঠে- আরে আমরা সময় সুযোগ মতো মহাজগৎ চষে বেড়াই না!
ম্যাশেলের জবাব শুনে আসিফ মামা ফের জানতে চান- বেশ, তুমি তাহলে মিল্কওয়ে থেকে ব্ল্যাকহোলের দূরত্ব এবং অবস্থানটাও বলতে পারবে।
– আ’ম এক্সস্ট্রিমলি স্যরি ডিয়ার! সেটা আমার জানা নেই। তবে আমাদের প্রধান বিজ্ঞানী ডিকেটর গোরিয়ান বার্দে স্যার সেটা ভালো জানেন। কিন্তু এখানে আবার মিল্কওয়ের কথা আসছে কেন?
– আসতেই পারে বন্ধু! যদি পরিস্থিতি এমন হয় যে, আয়রনম্যানের বাহিনী থেকে আমাদের আত্মগোপনের জন্য তারকার ঝাঁকের পেছনের আশ্রয়ে চলে যেতে হয়, তাহলে ডিসট্যান্স এবং ওয়েটা জানা থাকলে দ্রুত আড়ালে চলে যাওয়া সম্ভব হবে। আবার সেখান থেকে হঠাৎ বেরিয়ে এসে কমান্ডো হামলা চালাতে বেশ সুবিধাই হবে।
– ঠিক আছে। বিষয়টা তুমি আমাদের প্রধান বিজ্ঞানীর সাথে আলাপ করে জেনে নাও।
কথাটা বলে ম্যাশেল আর অপেক্ষা করে না। একটা ইউনি ডিভাইসে প্রবেশ করেই অদৃশ্য হয়ে যায় বার্নার ম্যাশেল। অমনি সময় কোত্থেকে সাদিত এসে হাজির। ওর পরিধানে রীতিমত প্যারাট্রুপারের স্যুট।
কাণ্ড দেখে আসিফ মামা খলখল করে হেসে বলেন- কিরে, কোথায় জাম্প করার ফন্দি এঁটেছিস?
মামার প্রশ্নে সাদিতের প্রেস্টিজ পাংচার হবার দশা! ও একটানে মুখের মাস্কটা সরিয়ে নিয়ে বলে- কেবল জাম্প করতেই বুঝি প্যারাস্যুাট পরতে হয়! বলি তোমার যে ম্যাগা-ওয়ার প্ল্যান! তাতে আত্মরক্ষার জন্যও তো প্যারাস্যুট লাগতে পারে, না কি?
সাদিতের কথায় মামা সামান্য হাসেন। তারপর বেশ মুড নিয়ে বসে রকিংচেয়ার দুলিয়ে দুলিয়ে আয়েশ করে বলেন- সে ভাবনা তোর একার তো নয়। আরে হাদারাম পান্ডে! এই মহাযুদ্ধে তোর সিম্পল প্যারাস্যুট পলকেই ঝলসে যেতে পারে। তাই আমার এবং তোর জন্য ফায়ারপ্রুফ স্পেসস্যুটের ব্যবস্থা হয়েছে। ওই স্যুট পরলে আমরা সুরক্ষা পাবো।
মামার কথায় সাদিত ফোড়ন কেটে বলে- তাহলে আবার মিল্কওয়েতে পালাবার কথা ভাবছো কেন?
– ওটা আত্মরক্ষার একটা অলটারনেটিভ ব্যবস্থা। আসলে আমাদের যে মিল্কওয়েতে গিয়ে পালাতেই হবে, এমন নয়। তারপরও ‘যদি’ বলে একটা কথা আছে। আরে মহাবীর বাহাদুর! আসলে আয়রনম্যানের বাস্তবিক শক্তি সম্পর্কে আমরা পরিষ্কারভাবে কিছু জানি না। আমাদের বন্ধুদের দেয়া গোয়েন্দা রিপোর্ট, সুপার-রাডারের ইনটেনসিটিগ্রাফ, এখানকার রোবোবিজ্ঞানী আর রোবোসার্জেন্টদের দেয়া তথ্যানুসারে যতটুকু বুঝেছি তাতে আয়রনম্যানকে বেশ শক্তসামর্থ্য বলেই অনুমান করছি। আর তাছাড়া শত্রুকে কখনও দুর্বল ভাবতে নেই- বুঝলি না?
– হুম, খুব বুঝেছি। তো প্যারাস্যুট খুলে রাখবো।
– সেটাই ভালো।
মামার কথায় সাদিত গ্রিনওয়ে চ্যানেল ধরে সামনে বাড়তেই বায়োকপ্টারে উড়ে আসে রোবোসার্জেন্ট। তার ম্যাটালিক চোখে-মুখে দারুণ উত্তেজনা। ফলে তার ডান কানের গহ্বর থেকে বেরিয়ে আসা নীল আলোর পরিবর্তে লাল আলো ঠিকরে বেরোচ্ছে। সার্জেন্টকে দেখেই মামা বুঝে নিয়েছেন কোনো না কোনো একটা অঘটন ঘটেছে। তাই রোবোসার্জেন্ট মুখ খোলার আগেই আসিফ মামা বলে উঠলেন- স্থির হও মাই ডিয়ার। তারপর ঝটপট বলে ফেলো ঘটনাটা কী ঘটেছে।
মামার প্রশ্ন করার ধরন দেখে সার্জন্ট খানিকটা দমে যায়। তারপর ধীরে ধীরে কিন্তু প্রায় কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে জানায়- স্যার, ঘটনা তেমন কিছু নয়। তবে…।
– আরে ওই তবেটা কী? সেটাই বলে ফেল।
– স্যার, তিন মিনিট আগে আমাদের প্রতিরোধ বেষ্টনীর ত্রিশ হাজার ন্যানোমিটার নিচ দিয়ে একঝাঁক মিরেজ-৫৫ সাটেলস্পেস উত্তর গোলার্ধের দিকে ছুটে গেছে।
সার্জেন্টের কথায় মামা শক্ত করে এক ধমক লাগিয়ে বলেন- যদি মিরেজ-৫৫ই হবে তাহলে তা আবার উত্তর গোলার্ধের দিকে ছুটে যাবে কেন? ওদের অবস্থানই তো পৃথিবীর উত্তর গোলার্ধে।
রোবোসার্জেন্ট চিন্তিত কণ্ঠে উচ্চারণ করে- তা ঠিক। তাহলে ব্যাপারটা যে কী হতে পারে….।
আসিফ মামা স্বগতোক্তির মতো করে আবার মুখ খুললেন- আচ্ছা! তাহলে ওরা আবার কোনো বিশেষ অভিযান শেষ করে নিজেদের কক্ষপথে নিরাপদে ফিরে এলো নাতো?
সার্জেন্ট একটু সুযোগ পেয়ে বলে উঠলো- আবার এমনওতো হতে পারে, ওরা আমাদের শত্রুদের সাহায্য করতেই দক্ষিণ গোলার্ধে ছুটে গিয়েছিলো।
ধরুন স্যার, ওরা কর্কটক্রান্তি পেরিয়ে ত্রিশ হাজার ন্যানোমিটার বাঁক ঘুরে দ্রাঘিমা অঞ্চল বরাবর একটা নতুন ফ্লাই জোন বানিয়েছে। আর সেই জোনকে কেন্দ্র করেই আমাদের ফাঁকি দিয়ে আয়রনম্যানের বাহিনীর সাথে যোগসাজশ করে যাচ্ছে।…
এবার আসিফ মামা রীতিমত ক্ষেপে ওঠেন। তিনি রকিংচেয়ারে স্থির হয়ে বসে বলেন- শোন সার্জেন্ট, তোমার মাথা ঠিক আছে তো? কোথায় কর্কটক্রান্তি আর কোথায় দ্রাঘিমা অঞ্চল। যদি তাই হয় তাহলে ত্রিশ হাজার ন্যানোমিটার বাঁক নেবার প্রয়োজনটা কি হে! ওরা তো সোজা চাঁদের দিকে রওনা হয়ে নব্বই ডিগ্রি স্টেট ঊর্ধ্বাকাশে উঠে মঙ্গলগ্রহ পাস করেই আয়রনম্যানের ব্ল্যাকহোল প্রভিন্সে ঢুকে যেতে পারে। কিন্তু তোমার বিবরণ শুনে এবারে আমি শিওর হলাম যে, মিরেজে-৫৫এর ঝাঁক আসলে আয়রনম্যানের প্রভিন্সের দিকে যায়নি। অথবা সেখান থেকেও ফিরে আসেনি। ওদের অভিযান ভিন্ন। আর মিরেজ-৫৫ গুলো যে কোন দেশের তাতো ভালো করেই জানো?
– তা অবশ্য জানি বলেই একটু আশঙ্কা স্যার। আপনাদের পরমাণুসমৃদ্ধ দেশ রাশিয়ার মিরেজ-৫৫। আপনারা যে দেশটাকে অক্ষশক্তি হিসেবে বিবেচনা করছেন।
– তা করছি বটে! কারণ, বিগত বিশ্বযুদ্ধগুলোতে ওদের, মানে রাশিয়ার যে ভূমিকা ছিলো তা রীতিমত দুঃখজনক।
– তাহলে তো ভালো করেই জানেন, রাশিয়া হচ্ছে ওই হিংসুটে ও স্বার্থবাদী ইহুদিদের পৃষ্ঠপোষক। নিজেদের দেশের অধিকাংশ নাগরিকও ইহুদি। ওদের দ্বারা শয়তানের দোসর আয়রনম্যানকে সাহায্য করা খুবই স্বাভাবিক।
– হ্যাঁ, স্বাভাবিক। কিন্তু আপাতত মোটেও যে স্বাভাবিক নয়, তাও তোমাকে ভাবতে হবে।
– কেন? আপাতত কেন স্বাভাবিক নয়?
– আরে বোকার হদ্দ! তুমি দেখছি প্রোগ্রাম করা রোবোটের মতোই কথা বলছো। আদতে তোমরা যে রূপান্তরিত রোবট বা রোবটের আদল নিয়ে আছ, সে কথা যেন ভুলেই বসে আছ। বলি, আমাদের এই মোস্ট সিকিউর অভিযান সম্পর্কে রাশিয়া এমনকি আমেরিকাও যে বিন্দু-বিসর্গ জানতে পেরেছে- তা তুমি স্যাঙ্গুইন হলে কেমন করে?
– জানতেও তো পারে। ওরা মহাজগতে যে হারে স্যাটেলাইট বসিয়েছে। তাতে আমাদের দুনিয়াতে যাতায়াত এবং আপনাদের তুলে আনার ইনভিজুয়াল স্ক্যান যে ধরা পড়ে যায়নি তাইবা কেমন করে বলি।
– তাতে কী হবে?
– মানে, ওরা সে সূত্র ধরে এগোলে তো ….আরেব্বাস! আর ভাবতে পারছি না।
– হয়েছে, হয়েছে। অনেক অ্যাডভান্স ভাবনা ভেবে বসে আছ। এখন খামুশ হয়ে যাও। আরে বাবা, ওদের মিরেজ-৫৫ গুলো যে উচ্চতা দিয়ে উড়ে গেছে তাতে মনে হচ্ছে ওরা বরং মঙ্গল গ্রহের অভিযান নিয়েই ব্যস্ত। তবে ঝাঁকে ঝাঁকে স্পেসশিপ ছুটে যাওয়া একটা ব্যতিক্রম ঘটনা। আপাতত ও নিয়ে আমাদের মাথা ব্যথার কোনো কারণ দেখছি না। তারপরও উত্তর গোলার্ধের মহাকাশ সীমানায় তোমরা একটু নজরদারি বাড়াতে পারো। ওতেই আপাতত চলে যাবে বলে আমার মনে হচ্ছে।
এদিকে রোবোসার্জেন্ট এবং মানববিজ্ঞানী আসিফ মামার মাঝে যখন কথা হচ্ছিল তখন গ্রিনওয়েতে একটা আবছা ছায়ামূর্তির নড়াচড়া লক্ষ করছিলেন আসিফ মামা। হয়তো ওটা কোনো রোবোসিকিউরিটির ছায়া হবে। তারপরও কী মনে করে ছায়াটার ব্যাপারে রোবোসার্জেন্টের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন। অমনি সাথে সাথে ছায়াটা উধাও হয়ে গেলো।
চোখের পলকে বায়োকপ্টার রেখেই ছুটলো রোবোসার্জেন্ট। সামনে যেতেই দেখতে পেল সাদিতের কেবিনের স্লাইডিং ডোরটা হাট হয়ে আছে। আর সাদিত বেশ আয়েশের সাথে নাক ডেকে ঘুমোচ্ছে তার দুগ্ধফেনিল বেডে। সার্জেন্ট এদিক সেদিক চোখ মেরে দ্রুত ফিরে এলো বায়োকপ্টারের কাছে। আর কোনো রকম কথাবার্তা না বলে অনেকটা ছোঁ মেরে বায়োকপ্টারের স্টিয়ারিং ধরেই গ্রিনওয়ে পেরিয়ে ডিজিটাল ওয়াচটাওয়ার ফাইটিং ফিফটি ফাইভের দিকে উড়ে চললো।
পরিস্থিতির জটিলতা আঁচ করে আসিফ মামা খানিকটা হতবাক হয়ে গ্রিনওয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন। অমনি মুহূর্তে সার্জেন্টের একটা কথার ক্ষীণ আওয়াজ তার কানের পিনায় এসে লাগলো। তিনি মৃদু হাসলেন মাত্র।
(চলবে)

SHARE

Leave a Reply