Home তোমাদের গল্প সেতু স্যার ও সিয়াম -আবু ইউসুফ সুমন

সেতু স্যার ও সিয়াম -আবু ইউসুফ সুমন

ফিজিকস ক্লাস চলছে। সেতু স্যার ক্লাস নিচ্ছেন। আলোর প্রতিফলন আর প্রতিসরণ(Reflection & Refraction) দুটোই এক সাথে পড়াচ্ছেন। সবার মাঝে আতঙ্ক আর নীরবতা। কখন সুনামি আসে। সেতু স্যার যখন কোনো বিষয় বুঝানোর পরে প্রশ্ন করেন, আর কেউ যদি উত্তর না দিতে পারে, তখন স্যার সোজা বলেন- ”Get lost from my class.” সবার ধারণা স্যারের এমন ব্যবহারের কারণ ছোটবেলায় তিনিও এমন পরিস্থিতির শিকার হয়েছিলেন। তবে ক্লাসে দু-একজন স্টুডেন্ট আছে যারা সেতু স্যারকে খুব একটা ভয় পায় না। তাদের মাঝে একজন হলো সিয়াম আর অন্যজন ওয়াহিদ।
সিয়াম অবশ্য সবচে ব্রিলিয়ান্ট। মেধাবীদের লিস্টে তার নাম সবার প্রথমে রাখা যেতে পারে। সিয়ামের কাছের বন্ধু ওয়াহিদ। খুব ভালো গান গাইতে পারে বলে সমীহযোগ্য। যদিও তার হাতির মতো দেহের জন্য সে সুইট কুমড়ো নামে পরিচিত। তবে ঠিক সুইট কুমড়ো কিনা অনেকে সন্দিহান। যাহোক এদিকে সেতু স্যার ক্লাসে সাইড টক করার অপরাধে মুরাদ নামে একজনের ওপর চড়াও হয়েছেন। তা দেখে অনেকের গলা শুকিয়ে যায় যায় অবস্থা।
ফিজিকস ক্লাসের অর্ধেকটা তখন প্রায় শেষ। সেতু স্যার হঠাৎ বাংলা টিচার সিরাজুল মুস্তফার মতো শান্ত-শ্রান্ত গলায় বললেন, ‘আজ এতটুকুই থাক। এক সাথে এতো কিছু ফিজিকস ক্লাস চলছে। সেতু স্যার ক্লাস নিচ্ছেন। আলোর প্রতিফলন আর প্রতিসরণ(Reflection & Refraction) দুটোই এক সাথে পড়াচ্ছেন। সবার মাঝে আতঙ্ক আর নীরবতা। কখন সুনামি আসে। সেতু স্যার যখন কোনো বিষয় বুঝানোর পরে প্রশ্ন করেন, আর কেউ যদি উত্তর না দিতে পারে, তখন স্যার সোজা বলেন- ”Get lost from my class.” সবার ধারণা স্যারের এমন ব্যবহারের কারণ ছোটবেলায় তিনিও এমন পরিস্থিতির শিকার হয়েছিলেন। তবে ক্লাসে দু-একজন স্টুডেন্ট আছে যারা সেতু স্যারকে খুব একটা ভয় পায় না। তাদের মাঝে একজন হলো সিয়াম আর অন্যজন ওয়াহিদ।
সিয়াম অবশ্য সবচে ব্রিলিয়ান্ট। মেধাবীদের লিস্টে তার নাম সবার প্রথমে রাখা যেতে পারে। সিয়ামের কাছের বন্ধু ওয়াহিদ। খুব ভালো গান গাইতে পারে বলে সমীহযোগ্য। যদিও তার হাতির মতো দেহের জন্য সে সুইট কুমড়ো নামে পরিচিত। তবে ঠিক সুইট কুমড়ো কিনা অনেকে সন্দিহান। যাহোক এদিকে সেতু স্যার ক্লাসে সাইড টক করার অপরাধে মুরাদ নামে একজনের ওপর চড়াও হয়েছেন। তা দেখে অনেকের গলা শুকিয়ে যায় যায় অবস্থা।
ফিজিকস ক্লাসের অর্ধেকটা তখন প্রায় শেষ। সেতু স্যার হঠাৎ বাংলা টিচার সিরাজুল মুস্তফার মতো শান্ত-শ্রান্ত গলায় বললেন, ‘আজ এতটুকুই থাক। এক সাথে এতো কিছু Memorize করাও কঠিন।’ স্যারের এমন বরফগলা কথা সবার জন্য যেন অন্য রকম পাওয়া। কিছুক্ষণ আগেও যা ছিল অপ্রত্যাশিত।
স্যার মুচকি হাসলেন কি না বোঝা গেলো না। কিন্তু আবার গম্ভীর গলায় বললেন, ‘তোমরা আমাকে খুব ভয় পাও তাই না? কিন্তু ভয় কত প্রকার ও কী কী তা হয়তো জানো না। কাল-ই তা টের পাইয়ে দিবো।’
স্যারের এমন কথায় সবার মাঝে পরিবর্তন লক্ষ করা গেলো। যাকে Fearful changes বললে ভুল হয় না। এবার একটু থেমে স্যার বললেন, ‘পড়ার জন্য তোমাদের কিছু বলবো না কিন্তু একটা গবষেণার ফলাফল আগামীকাল না দিতে পারলে বুঝিয়ে দিবো কাঁচা মরিচের ঝাল বেশি, না লাল মরিচের।’
স্যারের এমন কথা শুনে সবাই অনেকটা ধূমকেতু দেখার মতো বিস্মিত। কিভাবে তারা গবেষণা করবে? তারা শুধু ব্যাকরণ বইতে ‘গো+এষণা=গবেষণা’ হয় পড়েছে। কিন্তু স্যার বললেন অন্য কথা। My Dear টাইপের গলায় বললেন, ‘প্রিয় ছাত্র-ছাত্রীরা তোমাদের গবেষণার বিষয়-মানুষ যা পড়ে বা শিখে তা না করে অন্য কিছু কেন করে? এই কেন করার কারণ তোমরা বিজ্ঞানের ছাত্র বলে গবেষণা করে বের করতে হবে। মানুষ এখন মহাকাশ জয় থেকে শুরু করে আরও কত কী করছে। এটাতো সামান্য। আমার দৃঢ় বিশ্বাস তোমরা পারবে।’ স্যার এটুকু বলে থামলেন। সেতু স্যার সবার কাছে ভয়ঙ্কর নাম হলেও ব্যাপারটা যে ইন্টারেস্টিং তা কারোর বুঝতে বাকি রইলো না। কিন্তু বিষয়টা এখনো পরিষ্কার নয়। সিয়াম প্রশ্ন করতে গিয়েও থেমে গেল। কারণ স্যারের পুরো কথা শেষের আগে প্রশ্ন করলে তিনি ৯০ ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলে রেগে যাবেন তা কারো অজানা নয়।
এরপর স্যার নিজেই বললেন, ‘বিষয়টা একটু ক্লিয়ার করি, Listen-ধরো মানুষ অ্যাকাডেমিক শিক্ষায় তার অর্ধেকটা জীবন কাটিয়ে দেয়। তাতে সে অনেক কিছু শিখে। শিখে কিছু নীতিনৈতিকতা। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়-পুষ্প আপনার জন্য ফোটে না ধরনের অনেক কিছুই। Future Plan of life এ সমাজ সেবার কথা বলে ফুরিয়ে ফেলে। কিন্তু তাদের কর্মজীবনে দেখা যায়-লাউ শুধু কদু-ই নাম ধারণ করে। সত্যিকারের পরিবর্তন হয় না। তোমাদের তাই বের করতে হবে কেন এমনটা ঘটে। আশা করি যদি বুদ্ধিমান হও ব্যাপারটা ধরতে পেরেছো। কাল কে-কী ভেবে বের করলে বা অনুসন্ধান করলে তা প্রত্যেক জন থেকে জানতে চাইবো।’ এটুকু বলে স্যার শেষ করলেন এবং ইতোমধ্যে স্যারের ক্লাস শেষ হওয়ায় তিনি আর কিছু না বলে বিদ্যুৎগতিতে ক্লাস থেকে বেরিয়ে গেলেন। সেদিন সবাই গবেষণার উটকো চিন্তা নিয়ে বাড়ি ফিরলো। যে করে হোক তাদের ভেবে-চিন্তে-অনুসন্ধান করে এর যৌক্তিক ব্যাখ্যা খুঁজে বের করতে হবে।
পরদিনের ঘটনা। আগের দিনের মতো সিআইডি স্টাইলে প্রবেশ করলেন সেতু স্যার। ক্লাসে প্রবেশ করেই একজনকে দাঁড় করালেন। বললেন, ‘গবেষণার ফলাফল কী পেলে ব্যাখ্যা দাও।’ স্যারকে এমনিতে সবাই ভয় পায়। এমন ভয়ঙ্কর স্যারের সামনে কেউ কিছু জানলেও ভুলে যাবে। যে দাঁড়িয়েছে তাকে দেখে বুঝা যাচ্ছে তার হার্ট অ্যাটাক হওয়ার অবস্থা। স্যার তার অবস্থা দেখে বললেন, ‘কিছু বলতে পারবে না জানতাম। কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকো। সবাই দেখুক তোমাকে।’
ক্লাসের অবস্থা থমথমে। এবার কাকে দাঁড় করায় সে ভয়। কিন্তু স্যার কি-জানি ভেবে বললেন, ‘আচ্ছা, তোমাদের মাঝে একজন যদি গবেষণার বিষয়বস্তুর পছন্দনীয় ব্যাখ্যা দিতে পারো তবে সবার অপরাধ মাফ।’
প্রথম বেঞ্চি থেকে এটি বলার সাথে সাথে হাত তুললো সিয়াম।
স্যার সামান্য ভ্রু কুঁচকে ইংরেজিতে বললেন,’You can say, What are you thinking.’
সিয়াম রকেট গতিতে দাঁড়িয়ে বললো, ‘স্যার ব্যাপারটা একদম-ই easy আর তা হলো শিকারি আসবে দানা ছিটাইবে কেউ খাইয়োনার মত।’
স্যার বললেন, ‘ক্লিয়ার করো কী বলতে চাও, দ্রুত?’
তখন সিয়াম বললো, ‘স্যার শুধুমাত্র বুঝার জন্য পীরপ্রথা নিয়ে রচিত একটি ইসলামি কাহিনী বলছি।’ এটুকু বলে সিয়াম কাহিনীটি বলতে শুরু করলো, ‘একদিন একজন এক পীরের কাছে গেলো। পীরের মুরিদ হতে। তখন পীরটি মুরিদ হওয়ার আগে লোকটিকে একটি কাজ দেয়। কাজটি ছিলো সেখান থেকে কিছু খাদ্যদানা আর একটা মাছ ধরার জাল নিয়ে পাশের জঙ্গলটি (সেখানের) থেকে কিছু পাখি ধরে আনা। তখন লোকটি পীরের কথামতো জঙ্গলে গেলো। কিন্তু সে জঙ্গলে যেতেই কিছু পাখি তাকে দেখে বললো-শিকারি আসবে দানা ছিটাইবে কেউ খাইয়ো না! এটি শোনে লোকটি ঘাবড়ে গেলো। ভূত-টূত কিনা পাখিগুলো সে সন্দেহটা তার ঘাড়ে চেপে বসলো। সে ভয় পেয়ে পীরের কাছে ফিরে গেলো। বললো, ‘হুজুর পাখিগুলো ধরা অসম্ভব। তারা সব জানে। বলছে-শিকারি আসবে দানা ছিটাইবে কেউ খাইয়ো না। কী ভয়ঙ্কর ব্যাপার!’
তখন পীরটি বললো, ‘তোমাকে খাদ্য দানাগুলো দিয়েছিলাম ছিটানোর জন্য, তুমি ছিটিয়েছিলে?’
তখন লোকটি ‘না’ বোধক উত্তর দেয়ায় পীরটি তাকে আবার জঙ্গলে যেতে বললো আর পাখি ধরে আনতে বললো। তারপর লোকটি আবার জঙ্গলে গেলো। দানা ছিটালো এবং সাথে সাথে পাখিগুলো হুমড়ি খেয়ে পড়লো আর তা খেতে থাকলো। লোকটি তখন জাল ফেলে পাখিগুলো নিয়ে পীরের কাছে ফিরে এলো। তখন পীরটি একগাল উজ্জ্বল হাসি দিয়ে বললো, ‘এসব আমার পোষা পাখি। তাদের একথাগুলো আমি এই জন্য শিখিয়েছিলাম যে আমাদের পাখির মতো হলে চলবে না। তাই জানতে হবে-বুঝতে হবে-অনুধাবন করতে হবে। পাখিরা শব্দগুলো মুখস্থ করেছে ঠিক কিন্তু না বুঝেই। বুঝলে খাদ্যদানাগুলো খাবে না বলে কি খেতো?’
নিশ্চয় খেতো না স্যার?
সিয়ামের প্রশ্নে স্যার গভীর মনোযোগ ভেঙে Soft গলায় আওয়াজ নিচু করে বললেন, I got the point. তুমি আর কিছু বলবে?’
সিয়াম বললো, ‘জি স্যার। পাখির ব্যাপারটি ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে বলা হলেও ঠিক এই পাখির মতোই সবাই সব শিখে যাচ্ছে। পাখির মতো যেটা করবে না বলছে তাই করছে। পড়ছে- Honesty is the best policy কিন্তু কর্মক্ষেত্রে তাদের best policy-টা ঠিক থাকে। শুধু পরিবর্তন করে দেয়honesty শব্দটার। পড়ছে পরিশ্রম সাফল্যের চাবিকাঠি। কিন্তু তা পড়া পর্যন্তই সীমাবদ্ধ। এমনভাবেই মানুষ সব শিখে যাচ্ছে এক রকম। কিন্তু করে বসছে অন্যটা, নীতি বিরোধীটা।’
সিয়ামের কথা এতক্ষণ সবাই নেতার ভাষণের মতো শুনছিলো মুগ্ধ হয়ে। বিস্ময়ের রেশ এখনো অনেকের মাঝে বিদ্যমান। কিন্তু সেতু স্যারের মাঝে সামান্য বিস্ময়ও পরিলক্ষিত হলো না। তাই সবাই ভেবে নিলো স্যার হয়তো ভাবছে-বিজ্ঞানের কতো কিছুই তো এখন বিস্ময়ের। সিয়ামের ব্যাখ্যা তারচেয়ে বিস্ময়ের কী এমন বিষয়?
স্যার কিছুক্ষণ চুপ থাকলেন। তার চোখগুলো কেন জানি ভেজা ভেজা মনে হলো। তিনি সিয়ামকে কিছু বলতে চেয়েও কেন জানি বললেন না। ঠিক তার একটু পরেই বজ্রপাতের মতো রাগের গলায় বললেন, ‘ফিজিকস বই দাও বাকি অংশ বুঝিয়ে দেই, কুইক।’হ

SHARE

Leave a Reply