Home চিত্র-বিচিত্র লম্বা গলার শান্ত জিরাফ -নুসাইবা মুমতাহিন

লম্বা গলার শান্ত জিরাফ -নুসাইবা মুমতাহিন

আকার-আকৃতির দিক থেকে প্রাণীদের বিভিন্নতার শেষ নেই। কোন প্রাণী খাটো আবার কোনটি বিশাল আকারের। আকারের সাথে সাথে আমাদের মনে ধারণা জাগে এদের আচরণ সম্পর্কে। আমরা ধরেই নেই যে প্রাণী আকারে যত বড় সে ততবেশি আক্রমণাত্মক। কথাটি কি ঠিক বলতো বন্ধুরা? তোমরা গত কয়েক সংখ্যা লেখায় পড়েছ ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র প্রাণী কতটা ভয়ঙ্কর। তেমনিভাবে আকারে বড় অথচ স্বভাবে শান্ত, নিরীহ বৈশিষ্ট্যের প্রাণীও রয়েছে।
প্রাণীদের মধ্যে সবচেয়ে লম্বা প্রাণী কোনটি বললেই সবাই একবাক্যে বলবে জিরাফ। জিরাফ আমাদের পরিচিত একটি প্রাণী। আমরা জানি জিরাফ লম্বা প্রাণী। তবে কতটা লম্বা সেটা শুনলে তোমরা অবাক হবে। জিরাফ ১৭ ফুটেরও বেশি লম্বা হতে পারে। কি, তোমরা অবাক হচ্ছো তাই না? হ্যাঁ। অবাক হবারই কথা! জিরাফের গলা অনেক লম্বা।
প্রাণিজগতের মধ্যে অসাধারণ সুন্দর জিরাফ। জিরাফ প্রাণীটি দেখতে অনেক আদুরে। এরা আকারে অনেক বড়, বিশাল উঁচু। জিরাফের ৪টি শক্তিশালী পা রয়েছে। তেমনি শক্তিশালী তাদের গলা।
তোমাদের মাথায় প্রশ্ন খেলতে পারে জিরাফের গলা এত লম্বা হলে হার্ট থেকে মাথায় রক্ত সঞ্চালন হয় কিভাবে! আসলেই বিস্ময়কর ব্যাপার। মহান আল্লাহর সৃষ্টি সত্যিই অসাধারণ, বৈজ্ঞানিক। যার মাধ্যমে আমরা অনেক কিছুই জানতে পারি। তিনিই তো পারেন অসম্ভবকে সম্ভব করতে, কঠিনকে সহজ করতে।
লম্বা গলায় রক্ত সঞ্চালনের জন্য জিরাফের হার্ট অনেক বড় আর শক্তিশালী। জিরাফের গলা লম্বা হওয়ার সাথে সাথে তার মাথায় রক্ত পৌঁছাবার জন্য ক্যারোটিভ আর্টারিও লম্বা হয়। জিরাফের লম্বা গলার জন্য এর মাথা থেকে রক্ত হার্টে নিয়ে আসে রক্তনালী। ‘জুগুলার ভেইন’ এর ভেতর ভালভ তৈরি হয়। যেন পানি পান করতে মাথা নিচু করার সময় বিপুল এই রক্তের প্রেসার মাথায় রক্তক্ষরণ না করতে পারে। সত্যিই দারুণ বিস্ময়কর!
মাথার গঠনে প্রথমে চোখ যায় শিং এর দিকে। জিরাফের মাথায় ৪টি শিং রয়েছে। যদিও বিজ্ঞানীরা এ কথা মানতে নারাজ। আসলে তরুণাস্থি দিয়ে মাথার ত্বকের উপরের এই শিং হল ঈড়ৎঁধষ ঢ়ৎড়পবংং ড়ভ ংশঁষষ নয়।
জন্মের সময় একটি জিরাফ প্রায় ৬ ফুট লম্বা হয় এর ওজন হয় ৬৮ কেজি। অনেক জিরাফের মাথায় ২টি বা চারটি ভোঁতা শিং থাকে। জিরাফের জিহ্বাও খুব লম্বা হয়। নিজের কান পরিষ্কার করার জন্য জিরাফ তার প্রায় ২১ ইঞ্চি লম্বা জিহ্বা ব্যবহার করে।
জিরাফ নিরীহ স্বভাবের প্রাণী। তবে আক্রান্ত হলে যুদ্ধংদেহি রূপ ধারণ করে। জিরাফ মূলত সিংহ, বন্য কুকুর ও হায়েনা দ্বারা আক্রান্ত হয়। প্রতি বছর সিংহের আক্রমণে বেশ কিছু জিরাফ মারা যায়। তবে একটি পূর্ণ বয়স্ক জিরাফকে সিংহ খুব সহজে আক্রমণ করতে চায় না। কারণ, জিরাফের লাথির আঘাতে সিংহ মারা যাওয়ার ঘটনা অহরহ ঘটে। তাই শিশুও অপেক্ষাকৃত দুর্বল জিরাফকে সিংহ আক্রমণ করে। তবে বাচ্চা জিরাফকে আক্রমণ করার সময় সিংহকেও সাবধানে থাকতে হয়। কারণ বাচ্চা জিরাফের আশপাশে মা জিরাফ থাকে।
এ ছাড়া দলবদ্ধভাবে চলাফেরা করার সময় সিংহ কখনোও জিরাফকে আক্রমণ করে না। আক্রমণের ভয়ে জিরাফ কখনো বসে ঘুমায় না বা বিশ্রাম নেয় না। কারণ, জিরাফের বসতে যেমন সময় লাগে তেমনি বসা থেকে দাঁড়াতেও অনেক সময় লাগে। জিরাফ লম্বা হওয়ায় বসতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে না। তবে দলগতভাবে থাকা অবস্থায় কিছু কিছু জিরাফ মাঝে মাঝে বসে বিশ্রাম নেয়। পানি খাওয়া, ঘুমানো কিংবা দিনের বেলা বিশ্রামের সময় অন্তত একটি জিরাফ আশপাশে নজর রাখে শত্রুর উপস্থিতি জানাবার জন্য।
প্রত্যেক প্রাণীরই যোগাযোগের ভাষা ভিন্ন। জিরাফও তেমনি পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে। তবে খুব নিচু আওয়াজে। এদের গলার আওয়াজ ২০ হার্জেরও নিচে। ফলে জিরাফের আওয়াজ মানুষ শুনতে পায় না।
জিরাফের গায়ে ডোরাকাটা দাগ থাকে। তবে এই দাগ প্রতিটি জিরাফের ক্ষেত্রে আলাদা। এর মাধ্যমেই প্রতিটি জিরাফকে আলাদাভাবে শনাক্ত করা যায়।
জিরাফ সাধারণত নিজেদের মধ্যে লড়াই করা পছন্দ করে না। তবে খেলাধুলা করার সময় কিংবা খুব বেশি রাগান্বিত হলে পুরুষ জিরাফরা মাঝে মধ্যে একে অন্যের সাথে লড়াই করে।
জিরাফের আর একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এরা উটের মতো পানি না খেয়ে দীর্ঘদিন কাটিয়ে দিতে পারে। স্বাভাবিকভাবে একটানা সাত দিন পানি পান না করলেও এদের কোনো সমস্যা হয় না। গাছের পাতায় যে পানি থাকে তা দিয়ে এদের পানির চাহিদা মিটে যায়।
নিজের দীর্ঘ ঘাড় ব্যবহার করে নাচ প্রদর্শন করে জিরাফ। জিরাফের এই নাচকে ইংরেজিতে বলে নেকিং। নেক মানে ঘাড়। মানুষের কাছে এই নাচ আকর্ষণীয় মনে হলেও আসলে দুই পুরুষ জিরাফের আধিপত্য ছড়ানোর লড়াই এটা, যেখানে ঘাড়ই তাদের প্রধান হাতিয়ার।
এতটা বৈচিত্র্যময় প্রাণীটি আজ বিলুপ্তির পথে। তিন দশকের মধ্যে জিরাফের সংখ্যা ৩০ শতাংশ কমে যাওয়ায় স্তন্যপায়ী এ প্রাণী ‘নীরব বিলুপ্তির পথে’ এগিয়ে যাচ্ছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। ১৯৮৫ সালে সারা বিশে^ জিরাফের সংখ্যা ছিল এক লাখ পঞ্চান্ন হাজারের মত। ২০১৫ সালে তা ৯৭ হাজারে নেমে এসেছে। এদের কমে যাওয়ার পেছনে খাদ্যাভ্যাস ও বাস্তুভূমি পরিবর্তন, চোরা শিকারিদের হামলা এবং আফ্রিকার দেশে দেশে নাগরিক অসন্তোষ ও যুদ্ধ বিগ্রহকে দায়ী করা হচ্ছে। বন বিলুপ্তির কারণেও আফ্রিকাতে অনেক জিরাফ কমে গেছে।
আমাদের উচিত এই নিরীহ প্রাণীটিকে রক্ষা করা। এদের আবাসস্থল সংরক্ষণ করা। সবচেয়ে লম্বা প্রাণী জিরাফের মাধ্যমে আমাদের প্রাণিকুলের শোভা বৃদ্ধি পায়। আমাদের উচিত এই শোভা বৃদ্ধিতে সহায়তা করা। হ

SHARE

Leave a Reply