Home দেশ পরিচিতি দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম দেশ ভারত -মুহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম

দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম দেশ ভারত -মুহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম

ভারত দক্ষিণ এশিয়ার একটি রাষ্ট্র। সরকারি নাম ভারতীয় প্রজাতন্ত্র। ভৌগোলিক আয়তনের দিক দিয়ে এটি দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম এবং বিশ্বের সপ্তম বৃহত্তম রাষ্ট্র। অন্য দিকে জনসংখ্যার দিক দিয়ে এই দেশ বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বাধিক জনবহুল তথা বৃহত্তম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। আয়তন ৩২ লাখ ৮৭ হাজার ৫৯০ বর্গ কিলোমিটার (১২ লাখ ৬৯ হাজার ৩৪৬ বর্গ মাইল) এবং জনসংখ্যা ১৩২ কোটি ৬৫ লাখ ৭২ হাজার।
জাতিগত গ্রুপের মধ্যে রয়েছে ইন্দো-আর্য ৭২ শতাংশ, দ্রাবিড় ২৫ শতাংশ এবং মঙ্গোলীয় ও অন্যান্য ৩ শতাংশ। প্রধান ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে রয়েছে হিন্দু ৭৯.৮ শতাংশ, মুসলিম ১৪.২ শতাংশ, খ্রিষ্টান ২.৩ শতাংশ, শিখ ১.৭ শতাংশ এবং অন্যান্য ২ শতাংশ। উল্লেখ্য, ভারতে মুসলিম জনসংখ্যা সমগ্র বিশ্বের নিরিখে তৃতীয় বৃহত্তম এবং অ-মুসলিম প্রধান দেশগুলোর মধ্যে বৃহত্তম।
প্রধান ভাষার মধ্যে রয়েছে হিন্দি ৪১ শতাংশ, বাংলা ৮.১ শতাংশ, তেলেগু ৭.২ শতাংশ, মারাঠি ৭ শতাংশ, তামিল ৫.৯ শতাংশ, উর্দু ৫ শতাংশ, গুজরাটি ৪.৫ শতাংশ, কন্নড় ৩.৭ শতাংশ, মালায়ালাম ৩.২ শতাংশ, উড়িয়া ৩.২ শতাংশ, পাঞ্জাবি ২.৮ শতাংশ, আসামি ১.৩ শতাংশ, মাইথিলি ১.২ শতাংশ এবং অন্যান্য ৫.৯ শতাংশ।
ভারতের জনসংখ্যার ৩০ শতাংশ শহর এলাকায় এবং ৭০ শতাংশ গ্রামাঞ্চলে বাস করে। রাজধানী নতুন দিল্লি এবং বৃহত্তম মহানগরগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো মুম্বাই, ব্যাঙ্গালুরু, কলকাতা, হায়দরাবাদ ও আহমদাবাদ। ভারতের বৃহত্তম জনগোষ্ঠীয় ভাষা হিন্দি হওয়ায় এটি কেন্দ্রীয় সরকারের দাফতরিক ভাষা হিসেবে নির্ধারিত। ‘সহকারী দাফতরিক ভাষা’ ইংরেজি প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে বহুল ব্যবহৃত। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও ইংরেজির প্রাধান্য প্রশ্নাতীত। সংবিধানে বাংলাসহ ২১টি ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেয়া হয়েছে। ভারতে উপ-ভাষার সংখ্যা ১,৬৫২টি।
ভারতের পশ্চিম সীমান্তে পাকিস্তান, উত্তর-পূর্বে চীন, নেপাল ও ভুটান এবং পূর্বে বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও মালয়েশিয়া অবস্থিত। এ ছাড়া ভারত মহাসাগরে অবস্থিত শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ ও ইন্দোনেশিয়া ভারতের নিকটবর্তী কয়েকটি দ্বীপরাষ্ট্র। দক্ষিণে ভারত মহাসাগর, পশ্চিমে আরব সাগর ও পূর্বে বঙ্গোপসাগর দ্বারা বেষ্টিত ভারতের উপকূলরেখার সম্মিলিত দৈর্ঘ্য ৭ হাজার ৫১৭ কিলোমিটার (৪,৬৭১ মাইল)।
সুপ্রাচীন কাল থেকেই ভারতীয় উপমহাদেশ অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের জন্য সুপরিচিত। ঐতিহাসিক সিন্ধু সভ্যতা এই অঞ্চলেই গড়ে উঠেছিল। ইতিহাসের বিভিন্ন পর্বে এখানেই স্থাপিত হয়েছিল বিশালাকার একাধিক সাম্রাজ্য। নানা ইতিহাস-প্রসিদ্ধ বাণিজ্যপথ এই অঞ্চলের সঙ্গে বিশ্বের অন্যান্য সভ্যতার বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক রক্ষা করত। হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন ও শিখ বিশ্বের এই চার ধর্মের উৎসভূমি ভারত। খ্রিষ্টীয় প্রথম সহস্রাব্দে জরথুস্ট্রীয় ধর্ম (পারসি ধর্ম), ইহুদি ধর্ম, খ্রিষ্টধর্ম ও ইসলাম এদেশে প্রবেশ করে এবং ভারতীয় সংস্কৃতিতে বিশেষ প্রভাব বিস্তার করে। অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ থেকে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ধীরে ধীরে ভারতীয় ভূখণ্ডের অধিকাংশ অঞ্চল নিজেদের শাসনাধীনে আনতে সক্ষম হয়। ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে এই দেশ পুরোদস্তুর একটি ব্রিটিশ উপনিবেশে পরিণত হয়।
ভারত বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনৈতিক ব্যবস্থাগুলোর মধ্যে দ্বিতীয়। তবে অতিমাত্রায় দারিদ্র্য, নিরক্ষরতা ও অপুষ্টি এখনও ভারতের অন্যতম প্রধান সমস্যা। সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে ভারত একটি বহুধর্মীয়, বহুভাষিক ও বহুজাতিক রাষ্ট্র। আবার বন্যপ্রাণী ও উদ্ভিদ জগতের নানা বৈচিত্র্যও এ দেশে পরিলক্ষিত হয়।
ভারত নামটির উৎপত্তি চন্দ্রবংশীয় পৌরাণিক রাজা ভরতের নামানুসারে। কথিত আছে এই বর্ষ বা অঞ্চলটি রাজা ভরতকে দান করা হয়েছিল বলে এর নাম ভারতবর্ষ। ইংরেজি ইন্ডিয়া শব্দটি এসেছে সিন্ধু নদের আদি ফার্সি নাম হিন্দু থেকে। এ ছাড়াও প্রাচীন গ্রিকরা ভারতীয়দের ইন্দোই অর্থাৎ ইন্দাস (সিন্ধু) নদী অববাহিকার অধিবাসী নামে অভিহিত করতেন। স্বাধীনতার পর ভারতের সংবিধানে ও লোকমুখে ভারত নামটিই প্রচলিত হয়। এ ছাড়া মধ্যযুগে উত্তর ভারত অর্থে ফার্সি হিন্দুস্তান (বা হিন্দুস্থান; অর্থাৎ, ‘হিন্দুদের দেশ’) শব্দটিও ব্যবহৃত হতো। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই শব্দটি সমগ্র ভারত অর্থেও ব্যবহৃত হয়ে থাকে।
খ্রিষ্টীয় দশম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে মধ্য এশিয়া থেকে ভারতে ইসলামের আগমন ঘটে। এর ফলে সমগ্র উত্তর ভারত প্রথমে সুলতানি ও পরে মুঘল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। ক্রমে ক্রমে মুঘল সম্রাটগণ উপমহাদেশের এক বৃহৎ অংশে নিজেদের কর্তৃত্ব স্থাপনে সক্ষম হন।
ষোড়শ শতক থেকে পর্তুগাল, নেদারল্যান্ডস, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের মতো ইউরোপীয় শক্তিগুলো ভারতে বাণিজ্যকুঠি স্থাপন করতে শুরু করে। পরবর্তীকালে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক গোলযোগের সুযোগ নিয়ে তারা ভারতে উপনিবেশ স্থাপন করতেও সক্ষম হয়। ১৮৫৬ সালের মধ্যেই ভারতের অধিকাংশ অঞ্চল ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হস্তগত হয়। এর এক বছর পরেই ভারতকে আনা হয় ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের প্রত্যক্ষ শাসনাধীনে।
১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ১৫ আগস্ট ভারত ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্তিলাভ করে। একই সঙ্গে দেশের পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্তের মুসলিম-অধ্যুষিত অঞ্চলগুলো বিভক্ত হয়ে গঠন করে পাকিস্তান রাষ্ট্র। ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি নতুন সংবিধান প্রবর্তনের মধ্য দিয়ে ভারতে গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র স্থাপিত হয়।
১৯৭৪ সালে একটি ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক পরীক্ষা ও ১৯৯৮ সালে আরও পাঁচটি পরমাণু পরীক্ষা চালিয়ে ভারত নিজেদের একটি পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্র হিসেবে প্রকাশ করে। রাশিয়া, ফ্রান্স ও ইসরাইল ভারতের প্রধান অস্ত্রসরবরাহকারী রাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা সহকারী দেশ।
ভারতে প্রচলিত দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ ওয়েস্টমিনিস্টার-ধাঁচের একটি সংসদীয় ব্যবস্থা। এ দেশের সরকার প্রথাগতভাবে ‘আধা-যুক্তরাষ্ট্রীয়’ সরকারব্যবস্থা হিসাবে বর্ণিত হয়; যার বৈশিষ্ট্য হল একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় সরকার ও অপেক্ষাকৃত দুর্বল একাধিক রাজ্য সরকারের সহাবস্থান। যদিও ১৯৯০-এর দশকের শেষভাগ থেকে রাজনৈতিক ও আর্থ-সামাজিক সংস্কার ও পরিবর্তনের ফলে রাজ্য সরকারগুলোর ক্ষমতা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি দেশকে চালিত করছে একটি যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার দিকে।
ভারতের বর্তমান রাষ্ট্রপ্রধান হলেন রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ। রাষ্ট্রপতি পরোক্ষভাবে একটি নির্বাচকমণ্ডলী কর্তৃক পাঁচ বছরের সময়কালের ব্যবধানে নির্বাচিত হন। অন্য দিকে ভারতের বর্তমান সরকারপ্রধান হলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। অধিকাংশ শাসনক্ষমতা ন্যস্ত থাকে প্রধানমন্ত্রীর হাতেই। রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিযুক্ত প্রধানমন্ত্রীকে প্রথাগতভাবে সংসদের নিম্নকক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনপ্রাপ্ত রাজনৈতিক দল বা জোটের সমর্থন লাভ করতে হয়।
ভারতীয় পার্লামেন্ট দ্বিকক্ষবিশিষ্ট। এটি গঠিত হয়েছে রাজ্যসভা নামক একটি উচ্চকক্ষ ও লোকসভা নামক একটি নিম্নকক্ষ নিয়ে। রাজ্যসভার সদস্য সংখ্যা ২৪৫; মেয়াদ ছয় বছর। এদের অধিকাংশই রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলোর বিধানসভা থেকে রাজ্যের জনসংখ্যার ভিত্তিতে পরোক্ষভাবে নির্বাচিত হয়ে আসেন। অন্য দিকে লোকসভার ৫৪৫ জন সদস্যের মধ্যে ৫৪৩ জন পাঁচ বছরের মেয়াদে নিজ নিজ নির্বাচন কেন্দ্র থেকে প্রত্যক্ষ ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত হন। এ ছাড়া রাষ্ট্রপতি যদি মনে করেন যে সংসদে অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান সম্প্রদায়ের যথেষ্ট সংখ্যক প্রতিনিধি নেই, তবে তিনি দুইজন সদস্যকে উক্ত সম্প্রদায় থেকে সাংসদ মনোনীত করতে পারেন।
ভারতের প্রশাসনিক এলাকা ২৯টি রাজ্য ও সাতটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে বিভক্ত। ভারতে প্রত্যেক রাজ্যে নির্বাচিত রাজ্য সরকার অধিষ্ঠিত রয়েছে; নির্বাচিত সরকার রয়েছে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল পন্ডিচেরী ও দিল্লিতেও। অপর পাঁচটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল রাষ্ট্রপতির প্রত্যক্ষ শাসনাধীন; এই অঞ্চলগুলোতে কেন্দ্রীয় সরকার প্রশাসক নিয়োগ করে থাকেন। ১৯৫৬ সালে রাজ্য পুনর্গঠন আইন বলে ভাষার ভিত্তিতে রাজ্যগুলো স্থাপিত হয়। তারপর থেকে এই কাঠামোটি মোটামুটি অপরিবর্তিত রয়েছে। তৃণমূল স্তরে শাসন ও প্রশাসন পরিচালনার লক্ষ্যে রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলো মোট ৬১০টি জেলায় বিভক্ত। জেলাগুলো আবার মহকুমা বা তহসিলে এবং গ্রামে বিভক্ত।

ভারতের রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল
রাজ্য : ১. অন্ধ্রপ্রদেশ, ২. অরুণাচল প্রদেশ, ৩. আসাম, ৪. বিহার, ৫. ছত্তীসগড়, ৬. গোয়া, ৭. গুজরাট, ৮. হরিয়ানা, ৯. হিমাচল প্রদেশ, ১০. জম্মু ও কাশ্মির, ১১. ঝাড়খন্ড, ১২. কর্নাটক, ১৩. কেরালা, ১৪. মধ্যপ্রদেশ, ১৫. মহারাষ্ট্র, ১৬. মনিপুর, ১৭. মেঘালয়, ১৮. মিজোরাম, ১৯. নাগাল্যান্ড, ২০. উড়িষ্যা, ২১. পাঞ্জাব, ২২. রাজস্থান, ২৩. সিকিম, ২৪. তামিলনাড়–, ২৫. তেলঙ্গানা, ২৬. ত্রিপুরা, ২৭. উত্তরপ্রদেশ, ২৮. উত্তরাখন্ড ও ২৯. পশ্চিমবঙ্গ।

কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল : ক. আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ, খ. চন্ডীগড়, গ. দাদরা ও নগর হাভেলি, ঘ. দমন ও দিউ, ঙ. লাক্ষ্যাদ্বীপ, চ. পন্ডিচেরী, ছ. দিল্লি জাতীয় রাজধানী অঞ্চল।

ভারতে হিমালয় থেকে উৎপন্ন নদ-নদীগুলোর মধ্যে প্রধান গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র। উভয়েই বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়েছে। গঙ্গার প্রধান উপনদীগুলো হলো যমুনা ও কোশী নদী। কোশী নদীতে নাব্যতা অত্যন্ত কম থাকায় প্রতি বছর ভয়াল বন্যা দেখা দেয়। উপদ্বীপের প্রধান নদীগুলো হল গোদাবরী, মহানদী, কৃষ্ণা, ও কাবেরী। এই নদীগুলোর খাত অত্যন্ত নাব্য হওয়ায় বন্যা কম হয়ে থাকে। এই নদীগুলোও বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়েছে।
অন্য দিকে নর্মদা ও তাপ্তি পতিত হয়েছে আরব সাগরে। ভারতীয় উপকূলভূমির অন্যতম একটি বৈশিষ্ট্য হলো পশ্চিম ভারতে কচ্ছের রাণ ও পূর্বভারতে সুন্দরবনের পলিগঠিত বদ্বীপ অঞ্চল, যা ভারত ও বাংলাদেশে বিস্তৃত।

SHARE

Leave a Reply