Home প্রচ্ছদ রচনা বৃষ্টি মালার ছাতা মাথায় বর্ষা এলোরে -শরীফ আবদুল গোফরান

বৃষ্টি মালার ছাতা মাথায় বর্ষা এলোরে -শরীফ আবদুল গোফরান

মাথার ওপরে বিশাল আকাশ। সূর্য ঐ আকাশ জুড়ে। কী সুন্দর কিরণ!
বাতাস বইছে। দক্ষিণা বাতাস। ফুরফুরে বাতাস। ঝরঝরে পথঘাট। আনমনা কিশোরের মন। রাতভর বৃষ্টি হয়েছে। সকালে বৃষ্টি। থেমেছে বেশক্ষণ। কদম ফুলগুলো হাসছে। মনকাড়া হাসি। রজনীগন্ধার কী মিষ্টি গন্ধ। আউশের ক্ষেতে নেমেছে চাষি। কাটছে মুঠি মুঠি ধান। বাঁধছে আঁটি। আঁটি মাথায় ছুটছে কিশোর। ছুটছে বালক। পানিতে ঝাঁপাঝাঁপি করছে দুষ্ট বালকের দল। হাঁসগুলো ছুটছে জোরে। সাঁতার কাটছে। টইটম্বুর পুকুর।
কিন্তু একি! ব্যাঙেরা আবার ডাকছে যে! সূর্যি কোথায় গেলো? কোথায় আলো? সব যে আঁধার। আকাশ আঁধার। আকাশে জমেছে মেঘ। ভাঁজে ভাঁজে। পুঞ্জে পুঞ্জে। উড়– উড়– মেঘ। ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘ। দল বাঁধা মেঘ। মেঘের কত রঙ। সাদা মেঘ, সবুজ মেঘ, ধূসর মেঘ। হিঙ্গুল মেঘ, সিঁদুরে মেঘ, পটকিলে মেঘ। আরো কত রঙ। কত বিচিত্র নাম মেঘের। উর্ণা মেঘ, হাঁড়িয়া মেঘ, কুন্ডল মেঘ, অলক মেঘ, কোদালে-কুড়ালে মেঘ, জলুয়া মেঘ, ফজ্জল মেঘ, রাঙা মেঘ, এমনি কত মেঘ। কত রূপ, কত রঙ, কত নাম। মেঘের খেলা জমে ওঠে আকাশে। মেঘ ঢেকে দেয় আকাশ। স্থির থামে না মেঘ। ছুটতে থাকে, ফের দল ভেঙে যায়। গলতে থাকে। ঝরতে থাকে। বৃষ্টি হয়। নামে বৃষ্টি। মেঘের পাহাড় ভেঙে। সুনীল আকাশ ছেয়ে। বাতাসের ঢেউ বেয়ে। আষাঢ়ের গান গেয়ে। বর্ষার গল্প বলে বলে ঝরতে থাকে বৃষ্টি। ঝরে বৃষ্টি। টুপটুপ, ঝরঝর। ঝুপ ঝুপ। বিরাম নেই। ঝরছে তো ঝরছে। –
‘বৃষ্টি পড়ে মিষ্টি সুরে
শান্তিবাগ আর রেঙ্গুনে
বৃষ্টি পড়ে মিষ্টি ভোরে
ইস্টিশনের ক্যান্টিনে।
বৃষ্টি বৃষ্টি বৃষ্টিরে
আল্লাহ তায়ালার সৃষ্টিরে।’
আকাশে বিদ্যুৎ চমকায়। গর্জে ওঠে আকাশ। বাতাস ছুটে পাগল হয়ে। শোঁ শোঁ আওয়াজ তোলে। থামবার নাম নেই। কোনো এক সময় থেমে যায় আবার,
‘বৃষ্টি এলো বিলে ঝিলে
শ্যামল সবুজ ছোট্ট গাঁয়
বৃষ্টি এলো খালে বিলে
রহিম মিয়ার ছোট্ট নায়।
বৃষ্টি এলো দখিন হাওয়ায়
নতুন বধূর ভিজলো শাড়ি
বৃষ্টি এলো মাছিম পুরে
ভিজলো ছাতা রিকসা গাড়ি।’
কত মেজাজ বৃষ্টির। এখানে আছে তো ওখানে নেই। এ গ্রামে আছে তো ও গ্রামে নেই। নদীর এ তীরে আছে তো ও তীরে নেই। আবার নামে তেপান্তরের মাঠজুড়ে, কত সুর বৃষ্টির। গানের সুরে নামে কখনো। হৃদয় আকুল করে নামে। গর্জে ওঠে কখনো। ভয় জাগায় মনে। সবচেয়ে মজা, রোদমাখা খেঁকশিয়ালের বিয়ের বৃষ্টি।
বৃষ্টির কত রূপ আমাদের এদেশে। বর্ষার কত সাজ। বৃষ্টি আর বর্ষাকে নিয়ে ছড়িয়ে আছে কত গল্প। তাইতো বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন-
‘মনে পড়ে ছেলেবেলায় শুনেছিলাম গান
বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর, নদে এলো বান।’
বর্ষার আরো অনেক গল্প আছে। প্রাচীনকালের সাহিত্যেও ছিল বর্ষা ও মেঘের গল্প। কালিদাসের ‘মেঘদূতে’ও আছে গল্প। গল্পটি বেশ মজার। আশ্চর্যেরও বটে।
সে বহুকাল আগের কথা। এক রাজা একজন লোককে শাস্তি দিয়েছেন। সেকেলে শাস্তি। জেল খাটতে হবে না, মারও খেতে হবে না। তাকে ছাড়তে হবে ঘর-বাড়ি, আত্মীয়-স্বজন। যেতে হবে জঙ্গলে। মানে বনবাসে। ভালোইতো হলো। বনে কি আর খাবারের অভাব আছে? কত ফলমূল সেখানে। যা একটু হিংস্রা পশুর ভয়। লোকটি ঠিক ঠিক গেলো জঙ্গলে। সে টেরই পেলো না, কিভাবে সময় পেরিয়ে যাচ্ছে। একদিন, দু’দিন করে দশ মাস হয়ে গেলো। আর মাত্র দু’টি মাস। দু’মাস পরই সে জঙ্গল ছেড়ে যাবে। ফিরে যাবে মুক্ত জীবনে। ফিরে যাবে বাড়িতে। নিজের ঘরে। কে জানতো, এ সময়েই ঘটবে ঘটনাটা। রোজ বিকালে আকাশটা কেমন হয়ে যায়। মুখ গোমড়া করে। মেঘ জমে আকাশে। কালো কালো মেঘ। মেঘের বুক চিরে নামে বিদ্যুতের ঝলক। বাতাসে শোঁ শোঁ আওয়াজ। দিনরাত বৃষ্টি ঝরে। যেন পৃথিবীটাকে পানিতে ডুবিয়ে দেবে। লোকটা আর স্থির থাকতে পারে না। বুকের ভেতর শুরু হয় ওলটপালট। হু হু করে কেঁদে ওঠে মন। ব্যথা-বেদনায় নীল হয়ে যায় সে। ছুটে যেতে চায় জঙ্গল ছেড়ে। মানুষের ভিড়ে যেতে চায়। জন কোলাহলে মিশতে চায়। কিন্তু উপায় যে নেই। যাবে কি করে, সে যে শাস্তি ভোগ করছে। তার শাস্তি যে আরো দু’মাস আছে। তাকে যে আরো দু’মাস থাকতে হবে বনে। ভাবতে ভাবতে এক কান্ড করে বসে সে। একেবারে পাগলের কান্ড।
সে মেঘকে ভাই ডাকে। আপনজন বলে। আকুতি মিনতি করে। অনুরোধ করে। কাছে ডাকে মেঘকে। বলে, ভাই কত জায়গায় না তুমি উড়ে উড়ে যাও। কত জনের কত উপকার করো। একবার শুধু আমার উপকার করো। তোমার পায়ে ধরি ভাই, তুমি শুধু একবার আমার বাড়িতে গিয়ে বলো যে, আমি ভালো আছি। বেশ ভালো। কেউ যেন একটুও চিন্তা না করে। আর কদিন, এইতো দু’মাস পরেই আমি বাড়ি ফিরে যাবো। এটুকু কথা বলে এসো না ভাই।
কী দারুণ গল্প। বৃষ্টিকে নিয়ে এতো অবাক করা গল্প বোধ হয় আর কোথাও নেই। থাকেব কি করে! দুনিয়ার আর কোথাও এমন রূপের বর্ষাও হয়তো নেই।
‘বর্ষাকালে বৃষ্টি নামে
খালে বিলে কাশের বনে
ডাকাতিয়ার তরীর পালে।
টাপুর টুপুর বৃষ্টি নামে
বৃষ্টি নামে বর্ষাকালে।’
বর্ষা এদেশের মানুষের জীবনের সাথে মিশে আছে। ষড়ঋতুর উল্লেখযোগ্য ঋতু বর্ষা। গ্রীষ্মে আর শরতের কিছু অংশও দখল করে নেয় বর্ষা। বর্ষার দু’মাসে প্রকৃতির মধুর রূপ আবার দুঃখেরও কারণ হয়।
‘ভর দুপুরে ঝিল পুকুরে
টাপুর টুপুর টুপ
আকাশভরা কালো মেঘে
দমকা হাওয়া চুপ।

বাদলা রাতে হঠাৎ করে
উঠলো তেড়ে সে
দূর গাঁয়ের ঐ সবর জালের
ছাপরা ভেঙ্গেছে।’
ঝড় হলে, ঘূর্ণি হলে, বন্যা হলে নামে ভীষণ দুঃখ। তবুও সবুজের এদেশে বর্ষা না হলে চলে না। গ্রীষ্মের কাঠফাটা রোদ্রের খরতাপে অতিষ্ঠ জীবনে স্বস্তি ফিরিয়ে দিতে বর্ষার বৃষ্টির প্রয়োজন অনিবার্য।
বর্ষা বৃষ্টিকে নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন-
‘বাদলের ধারা ঝরে ঝরো ঝরো
আউশের ক্ষেত জলে ভরো-ভরো
কালি মাখা মেঘে ও পারে আঁধার
ঘনিয়েছে দেখ চাহিরে ॥’
বৃষ্টির দিনে বকেরা বাঁশঝাড়ের আগায় বসে ক্ক ক্ক শব্দ করে আর ঠান্ডায় কাঁপতে থাকে। বাঁশ বনের ভেতর দিয়ে ওরা এদিক ওদিক উড়ে যায়। কবি ফররুখ আহমদ এদেরকে নিয়ে লিখেন-
‘বৃষ্টি এলো কাশ বনে
জাগলো সাড়া ঘাস বনে
বকের সারি কোথায়রে
লুকিয়ে গেলো বাঁশ বনে।’
বর্ষায় বাংলার মাঠঘাট ডুবে যায়। পুকুর, ডোবা, নদী-নালা, খাল-বিল সবই পানিতে টইটম্বুর হয়ে যায়। পানিতে ভাসমান গ্রামের বাড়িগুলোকে দেখে মনে হয় বুঝি এক একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। ডিঙি নৌকায়, কলার ভোলায়, তালের কোঁদায় চড়ে মানুষ এ বাড়ি ও বাড়ি যায়। দৃশ্যটি বেশ উপভোগের। তখন মনে বাজে-
‘ঝুমুর ঝুমুর
টাপুর টুপুর
ঝরছে বাদল
সকাল-দুপুর’…
বৃষ্টি ভেজা কাদা মাখা পথ দিয়ে হাঁটতে ইচ্ছে হয় না। মন ভারী হয়ে যায়। তখন নাকে লাগে ফুলের সুবাস। বর্ষায় কত ফুল ফোটে। কদম, কেয়া, শাপলা, পদ্ম, রজনীগন্ধা, হাস্নাহেনা, হিজল, কলাবতী, চালতা, কলমিলতা, নীলকদম, উলট চঙ্গল, দোলনচাঁপা, সুলতানচাঁপা, কাঁঠালচাঁপা, কচুরিপানা, এমন নানা নামের বিচিত্র ফুল। আম, কাঁঠালের মধুর গন্ধ তখনও হারিয়ে যায় না। ডাহুক, শালিক, কাক, কোকিল, হরেক রকম পাখির কিচির মিচির ডাকে প্রকৃতি মেতে ওঠে এ বর্ষায়। হাজার রূপে বর্ষার রূপের কথা বলে শেষ করা যায় না। শহরের বস্তিবাসী আর গ্রামের গরিব মানুষের জীবনে যে বর্ষা আসে, বর্ষার সে রূপও এড়িয়ে যাবার নয়। আনন্দ বেদনার কত দিক বর্ষার বৃষ্টির, তবুও বর্ষা আসে বারবার। বছর ঘুরে। আবহমান কাল ধরে আসে বর্ষা। বর্ষার আগমনে আমরা আনন্দে গেয়ে উঠি-
‘বৃষ্টি মালার ছাতা মাথায় বর্ষা এলোরে
সারা গাঁয়ে গোলাপ পানি ছিটিয়ে দিলোরে।’

SHARE

Leave a Reply