Home গল্প ফালতু -মোহাম্মদ লিয়াকত আলী

ফালতু -মোহাম্মদ লিয়াকত আলী

মোতালেব মিয়ার মোবাইলে একটা আননোন কল এলো। সে সব কলই রিসিভ করে।
হ্যালো, আপনি কি মতলব চাচা?
আমি মোতালেব মিয়া বলছি। তুমি কে?
আমি ফালতু।
ফালতু! এ আবার কেমন নাম?
সারাদিন ফালতু কাম কইরা বেড়াই। তাই মাইনসে ফালতু কইয়া ডাহে।
তা আমার সাথে কী দরকার?
আমার কিছুর দরকার নেই। দরকারতো আপনার। আপনার লাইগা একটা খবর আছে।
প্যাচাল না পেড়ে কি বলতে চাও বল।
আপনার বাড়ির পানির রিজার্ভ টাংকিতে ঢাকনা আছে তালা নাই।
তালার দরকার নাই। বালতি ভরে টাংকি থেকে পানি চুরি করার চোর এই এলাকায় নাই।
চোর না থাকলে ফালতু কাম করার লোক আছে। আমি ঐ টাংকিতে পেশাব করছি। সব পানি নাপাক কইরা দিছি। আপনার কাম বাড়াইয়া দিছি। তাড়াতাড়ি পানি ফালায়া টাংকি পরিষ্কার করেন।
এই ফাজিল, কি প্রমাণ আছে?
এইসব ফালতু কামের কোন প্রমাণ থাকে নাকি? কামতো আমি করছি। বিশ্বাস না করলে নাপাক পানিই খান। হসপিটালে নাকি পেশাব পরীক্ষা কইরা দেহে, জীবাণু আছে নাকি। পানি পরীক্ষা কইরা পেশাব বাইর করনের কোন টেস্ট থাকলে কইরা দেহেন।
স্যাটাপ রাবিশ।
মোতালেব কি করবে বুঝতে পারে না। এমন ফালতু ঝামেলায় জীবনে কখনো পড়েছেন বলে মনে হয় না। স্ত্রীকে ডেকে জিজ্ঞেস করেন:
আজকে কি রিজার্ভ টাংকি থেকে ছাদের টাংকিতে পানি তোলা হইছে?
না, এতক্ষণ কারেন্ট ছিল না। তাই মোটর চলে নাই। এখন উঠাইমু।
না, পানি উঠানো যাবে না। রিজার্ভ টাংকি পরিষ্কার করণ লাগবো।
পাম্প মেশিন দিয়ে টাংকির সব পানি ফেলে দিয়ে ফোম দিয়ে নিংড়ায়ে ব্লিচিং পাউডার ছিটিয়ে টাংকি পাক করতে গিয়ে গলদঘর্ম হয়ে যায় মোতালেব। ফালতুর চৌদ্দ গোষ্ঠীর মুন্ডুপাত করতে করতে রাতে বিছানায় যায়। মোবাইলটা বালিশের কাছে রেখে ঘুমায় মোতালেব। ঘুম আসার আগেই আবার মোবাইল বেজে ওঠে:
হ্যালো, কে?
আমি সেই ফালতু?
আবার কি করেছো ?
আমিতো কিছুই করি নাই। সকালে মিছা কতা কইছিলাম।
এই বেয়াদপ! তোরে ধইরা পুলিশে দিব। খামাখা আমারে সারাদিন খাটইছস। টাকা খরচ করাইছস।
খামাখা খাডেন নাই। পানি নাপাকই ছিল। কামডা আমি করি নাই। অন্য কেউ করছে।
কে করেছে? জানলে নাম বল।
আপনার বাড়ির কেউ করছে।
আমার বাড়িতে বাচ্চা পোলাপান নাই। যা বলার ঠিক করে বল।
আপনি গতকাইল মসজিদে জুমা পড়তে গেছিলেন না?
হ্যাঁ, আমি প্রত্যেক শুক্রবার মসজিদে জুমার নামাজ পড়ি।
আমিও পড়ি। হুজুর একটা হাদিস কইছিল, মনে আছে? বাড়িত কি কি থাকলে রহমতের ফেরেস্তা ঢোকে না?
খুতবার সময় আমি ঘুমাই, কিছুই মনে নাই।
বাড়িত কুত্তা থাকলে। আপনেতো দুইডা কুত্তা পালেন?
এগুলা রাস্তা ঘাটের নেড়ি কুকুর না। কাঁটাবন থেকে কিনা আনছি।
ট্রেনিং দেয়া কুকুর। ইনজেকশন দেয়া আছে। কামড়াইলেও রোগ হবে না।
কুত্তা কুত্তাই। ট্রেনিং ভালাই কামে লাগাইছে। পাও দিয়া ঠেইলা টাংকির ঢাকনি উল্ডাইয়া পেশাব করছে।
ইংলিশোন দিলে কি পেশাব মিডা লাগবো?
কি বললি? আমার কুকুর এই কাজ করছে? কি প্রমাণ আছে?
আবার হেই এক কতা! মানুষই প্রমাণ রাহে না, কুত্তায় প্রমাণ রাখব? পানিতো সব ফালাইয়া দিছেন। টেস্টও করার সুযোগ নাই। রিমান্ডে নিয়া পিডাইলে কুত্তায় স্বীকার যাইবো নাকি?
ছি ছি ছি! কুত্তার প্রস্রাব পানির টাংকিতে। তোর প্রস্রাবইতো ভাল ছিল।
পেশাব পেশাবই। কুত্তার আর মাইনসের। যা অইছে অইছে। এইবার ঘুমান।
পরদিন মোতালেব মিয়া কাঁটাবন পেট বার্ড অ্যান্ড এনিমেল মার্কেটে কুকুর দু’টি পুনরায় বিক্রি করে দেয়। কুরআন হাদিস আমলের ব্যাপারে সারা জীবন তেমন গুরুত্ব না দিলেও ঠেকায় পড়ে আজ একটি হাদিস আমল করেছে। এটাই বা কম কি?
বিকেলে মোবাইলের কল লিস্ট দেখে ফালতুকে নিজেই ফোন করে মোতালেব মিয়া :
হ্যালো, আমি মোতালেব চাচা বলছি। তোর সাথে অনেক কথা আছে। লাইন কাটবি না।
আমি ফালতু হলেও অত ফালতু না। বিল কাটবো আপনার। আমি লাইন কাটবো কোন দুঃখে? কি কইবার চান কন।
তুই কি জুমার দিন মসজিদে হুজুরের খুতবা শোনছ?
আমি কি আপনার মতন ঘুমাই নাকি? আমি শুনি এবং মানার চেষ্টা করি।
মাই না কোনো ফল পাইছস?
হ্যাঁ, পাই।
দুই একটা বল দেখি। কি ফল পাইছস?
গত জুমায়ই শুনছি। আল্লাহর নবী কইছেন, যারা পরিশ্রম কইরা রুজি কামাই করে তারা আল্লাহর বন্ধু। রুজি হালাল অইলে অল্প আমল করলেও কবুল অয়। আমি সারাদিন পরিশ্রম করি। রাইতে নাক ডাইহা ঘুমাই। খাইয়া লইয়া ভালাই আছি।
আমিতো পরিশ্রম করি না। ভাড়া পাই আর খাই। আমি কি আল্লাহর শত্রু?
তার আমি কি জানি? আপনি যাইয়া হুজুররে জিগাইয়েন।
অবশ্য গতকাল তুই আমাকে খুব পরিশ্রম করাইছস। তাতে খারাপ হয় নাই। টাংকির তলায় অনেক ময়লা জমেছিল। আরো দু’চারটা বল।
গত শবেবরাতে হুজুর কইছে, এই রাইতে আল্লায় সবার গুনাহ মাফ করেন, তিন জন ছাড়া।
কারা তিনজন? তার মধ্যে আমি আছি নাকি?
হেই কতাইতো কইতাছি। কতা শেষ না অইতেই প্যাচাল শুরু করছেন।
ঠিক আছে। বল, তিন জন কারা ?
এক নম্বর, যারা মা-বাফরে কষ্ট দেয়। আমি আগে মার লগে একটু আধটু বেয়াদবি করতাম। এর পরতে ছাইড়া দিছি। বউও তাগোর খেদমত বাড়াইয়া দিছে। মিল্লা মিশা ভালাই আছি। সংসারে কোন অশান্তি নাই।
মাকে আলাদা করে দিলে কি কষ্ট দেয়া হয়?
মাদারের এম বাদ দিছেন নাকি? খবরদার, এই কাম জীবনে করবেন না। আল্লাহর গজব পড়বো।
ঠিক আছে দুই নাম্বারটা বল।
দুই নাম্বার যারা মদ খায়। মদ না খাইলে স্বাস্থ্য ভালা থাকে, চেহারা সুন্দর হয়। আর কি ফল চান?
থামলি কেন? তিন নাম্বার বাকি রয়েছে।
তিন নাম্বার, যারা শিরক করে। শিরক কি জিনিস, ক্যামনে করে, বুঝিই না। তাই এই নিয়া মাতা ঘামাই না।
আমারতো বুঝার দরকার।
হুজুরের কাছে যাইয়া বুইঝা আইয়েন।
আমিতো কুকুর বিক্রি করে ফেলেছি। তাতে কি লাভ হয়েছে?
লাভ লোকসান কি লগে লগে দেহা যায়? আমার স্বাস্থ্য-চেহারা কি এক দিনে সুন্দর অইছে? কুত্তা বেচেছেন ভালই করছেন। সিঁড়ির নিছে বিড়ির দোহান দিছেন। হেইডাও বদলান। বিড়ি সিগারেটও মদের মতোই।
ঠিক আছে। বদলাব। এখন বল, আমিও যদি মদ জুয়া ছেড়ে দেই, মা-বাবার সাথে ভাল ব্যবহার শুরু করি, কত দিনে আমার চেহারা সুন্দর হবে, সংসারে শান্তি আসবে? তোর কতদিন লেগেছে?
আপনি কতায় কতায় আমার লগে আপনার তুলনা করতাছেন? আপনে দেহি আমার মতই আরেক ফালতু! হুজুরের কাছে যান। তার কাছ থেকে হুনেন।

SHARE

Leave a Reply