Home সম্পূর্ণ কিশোর উপন্যাস নিঝুম বনের বাসিন্দা -দেলোয়ার হোসেন

নিঝুম বনের বাসিন্দা -দেলোয়ার হোসেন

গাছের ডালে বুনো লতাপাতায় বাঁধা দোলনায় দুলছে এক কিশোরী কন্যা। তার রূপের আলোয় ঝিল্মিলিয়ে হাসছে যেনো নিঝুম বনভূমি। হঠাৎ যদি কেউ, সেই নিঝুম বনে গিয়ে মেয়েটিকে দেখে- তা’হলে এটাই বুঝে নেবে যে, ও মেয়ে কখনো মানুষ হতে পারে না। হয়তো সে কোনো বনপরী কিংবা কোনো মায়াবী। সমুদ্র উপকূলের এই বিশাল বনের গভীরে কোনো মানুষ বাস করতে পারে- একথা কিছুতেই মেনে নেয়া যায় না। কেন না, যেখানে শুধুই পশু আর পাখিদের বাস। যার তিন দিকে থইথই জলরাশি আর একদিকে বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে নিঝুম বনভূিম। কোথাও নেই মানুষের ঘরবাড়ি। সেখানে মানুষ আসবে কী করে!
অথচ এমন ঘোরতর অবিশ্বাসের মধ্যেও একথাই সত্য যে, সেই গভীর বনে জীবন্ত তিনটি মানুষ দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করে আসছে। বনের পশু-পাখিদের অকৃত্রিম ভালোবাসার মধ্যে তারা খুঁজে পেয়েছে জীবনের অন্যরকম স্বাদ, অন্যরকম এক সুখের ঠিকানা।
বড় বড় গাছের সাথে মাচা বেঁধে তৈরি করা হয়েছে দু’টি ঘর। সে ঘরও মাটি থেকে প্রায় দু’তিন হাত উঁচুতে। হরিণ, বানর, খরগোশ, বেজি, কাঠবিড়ালি, ময়ূর ও বনমোরগ-মুরগি ছাড়াও নানা ধরনের পশু-পাখি তাদের নিত্যদিনের সঙ্গী। এরা সবাই তিনটি মানুষকে বড় আপন করে নিয়েছে। বাবুই, টিয়া, হরিয়াল, বুলবুল, ঘুঘু, আর হলদে পাখিরা এসে মেয়েটির দোলনা বাঁধা লতায় ঝুলে দোল খায় এক সাথে। অনেক পাখি বসে মেয়েটির কাঁধের উপর। ময়ূর-ময়ূরী পেখম তুলে নাচে গাছের ফাঁকে ফাঁকে। হরিণ শাবকেরা মেয়েটির গায়ে আদর মাখায়। আবার গলা টান করে দাঁড়ায় আদর নিতে। ওরা সবাই যেন প্রতিযোগিতায় নামে- কে কতটুকু ভালোবাসা দিতে পারে এই তিনজন মানুষকে।
কিশোরী মেয়েটি দোলনায় দুলতে দুলতে হঠাৎ দৌড়ে আসে মায়ের কাছে। আম্মাজান, আমার নানাভাই কোথায়?
দুঃখিনী মা শাকপাতা কুড়িয়ে এনে তখন রান্নায় ব্যস্ত। তবু মেয়ের দিকে তাকিয়ে হেসে বললো, তোমার জন্য ফল আনতে গেছে। ঠিক তখনই ঘরের পেছন থেকে হো-হো শব্দে হেসে ওঠে নানাভাই। কোথায় আমার বনলতা দিদি?
গুরুগম্ভীর সেই কণ্ঠ।
লোকটার মাথা ভরা বাবরি চুল। মুখ ভরা কাঁচা-পাকা চাপ দাড়ি। লোমে আবৃত প্রশস্ত বুক। মহিষের মত শরীরের রং। মাথা থেকে ফলের ঝাঁকা নামিয়ে সে বললো, দেখো দিদি ভাই কত ফল এনেছি। বনলতা এগিয়ে নানার কাছে দাঁড়িয়ে বললো, নানাভাই- নিশ্চয়ই তুমি আজ অনেক দূরে গিয়েছিলে?
হো-হো শব্দে হেসে উঠলো নানাভাই। বনলতার মায়ের দিকে চেয়ে বললো, দেখলি মা, দেখলি- তোর বেটি ঠিক বুঝে নিয়েছে যে, আমি অনেক দূরে গিয়েছিলাম। তোর বেটি রাজরানী হবে দেখিস।
নানাভাই, তোমার ঝাঁকায় দুটো নতুন ফল দেখেই আমি বুঝেছি। তা ছাড়া আজ একটু দেরি হয়েছে তোমার।
আবার সেই হো হো শব্দে গুরুগম্ভীর হাসি।
এই মানুষটার যেমন ভয়ঙ্কর চেহারা তেমনি তার কণ্ঠ। তার বিগত দিনের ইতিহাস যেমনই হোক না কেন, আজ সে শিশুর মত সুন্দর, ফুলের মত পবিত্র।
লোকটার নাম গাফ্ফার। ছোটবেলা পড়ালেখার ধার-ধারতো না। সে ছিল একটু বোকা আর একটু গোজর টাইপের। যুবক বয়সে গাফ্্ফারের চরিত্র এমনই বিদ্ঘুটে হয়ে উঠেছিলো যে, শুধুমাত্র অন্যায় কাজ করতেই সে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতো। মনে মনে খুব খুশিও হতো। মানুষের দুঃখ-কষ্ট কিছুতেই তার মনটাকে ছুঁতে পারতো না। এভাবেই ধীরে ধীরে একদিন সে দুর্ধর্ষ ডাকাত হয়ে ওঠে। যে পথে সে হেঁটে যায়, সে পথের গাছপালাও যেন ক্ষণিকের জন্য ভয়ে স্থির হয়ে যায়। জীব-জন্তু ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে পালায়। হারাম হয়ে যায় দেশের বিত্তবান, ধনী ব্যক্তিদের সুখ-শান্তি আর তাদের চোখের ঘুম। দু’চোখের পাতা বন্ধ করলেই ভেসে ওঠে দস্যু গাফ্ফারের মুখ। এক রাজ্য থেকে আর এক রাজ্যে ছড়িয়ে পড়ে তার নাম। মাত্র দু’একজন তাকে স্বচক্ষে দেখেছে, আর সবাই না দেখলেও কল্পনাতে একটা ভয়ঙ্কর মুখচ্ছবি বানিয়ে নিজেরাই শিউরে ওঠে।
কতকাল আগের সে কথা। তখন আজকের দিনের মত বন্দুক ছিল না, রাইফেল কিংবা পিস্তলও ছিল না। ছিলো বাঁশের লাঠি, ঢাল-সড়কি, তরবারি, রামদা, তীর-ধনুক, খঞ্জর ইত্যাদি ইত্যাদি। গোলমাল, দাঙ্গা-ফ্যাসাদ, খুন-খারাবি, দেশে-দেশে যুদ্ধ, তা যাই হোক না কেন, সে সবই হতো এইসব অস্ত্র দিয়ে। তবে, একজন পাকা লাঠিয়ালের কাছে তরবারি, রামদা, সড়কি কিংবা ছুরি ছিল নিতান্তই তুচ্ছ। দস্যু গাফ্্ফারের পিঠে বাঁধা থাকতো বেতের ঢাল আর কোমরে থাকতো তরবারি। হাতে থাকতো পাকা বাঁশের ঘনগিঁটের পাঁচ হাত লম্বা একটা লাঠি। সেই লাঠির সাহায্যে সে একাই এক’শ।
তখনকার দিনে রাজা-বাদশাহ্রা দেশ শাসন করতেন। দস্যু গাফ্ফার শুধু নিজের দেশের মধ্যেই ডাকাতি, লুটপাট করে বেড়াতো না- দেশের সীমানা পার হয়ে চলে যেতো অন্য দেশেও। দস্যুবৃত্তি করার জন্য গাফ্ফার বিভিন্ন জায়গা থেকে বাছাই করে কিছু সাহসী লোকদের নিয়ে বড় একটি দল গড়ে তোলে। দলের সর্দার গাফ্্ফার। এই দস্যু দলের সঙ্গে সুলতান এবং রাজা-বাদশাহ্্দের সৈন্যবাহিনীও যুদ্ধ করেছে। অবস্থা বুঝে দস্যুদল পালিয়েছে গভীর জঙ্গলে। আজ এখানে তো কাল অন্যখানে- অন্যরাজ্যে।
একবার এক সুলতানের নিকটতম আত্মীয় ধল্লা-নদীর পাড় থেকে একটি মেয়েকে জোর করে ধরে নিয়ে যাচ্ছিল। ওরা বানর বনের কাছাকাছি এলে গভীর বন থেকে মেয়েটির চিৎকার শুনতে পায় দস্যু গাফ্্ফার। তখনই সে বুঝতে পারে এ নিশ্চয়ই সুলতানের কোন দুষ্টু লোকের কাজ। দস্যু গাফ্ফার বন থেকে বেরিয়ে লাঠি হাতে পথ আগ্লে দাঁড়ালো। আট-দশজন সৈন্যসহ মেয়েটিকে ঘোড়ার উপর নিয়ে লোকটি কাছে আসতেই দস্যু গাফ্ফার সিংহের মত গর্জে উঠলো। তখন সন্ধ্যার আবছা অন্ধকার মাত্র জমতে শুরু করেছে। লোকটি ঘোড়ার লাগাম টেনে বললো- কে তুই? প্রাণে বাঁচতে চাস তো পথ থেকে সরে যা।
গাফ্্ফার হুঙ্কার দিলো- আমি দস্যু গাফ্্ফার। মেয়েটিকে ছেড়ে দে। তা-না’হলে এখানেই তোদের কবর হবে।
ঘোড়ার উপর থেকে লোকটা সৈন্যদের হুকুম করলো, দস্যুকে আক্রমণ করো। সঙ্গে-সঙ্গে শুরু হয়ে গেলো মারামারি-কাটাকাটি। দস্যুদের সাহস আর কৌশলের কাছে দিশেহারা হয়ে পড়লো সৈন্যরা। লাঠির ঘায়ে, তরবারির খোঁচায় চার-পাঁচজন সৈন্য মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। বাকিরা জীবন নিয়ে পালিয়ে গেলো। দস্যু গাফ্্ফারের লাঠির আঘাতে ঘোড়া থেকে ছিট্কে পড়লো সুলতানের সেই লোকটি। মেয়েটিও পড়লো সেই সাথে। মেয়েটি তখন ভয়ে জড়োসড়ো। সে দৌড়ে গিয়ে একটা গাছের নিচে দাঁড়িয়ে হরিণ শাবকের মত কাঁপতে লাগলো। এদিকে গাফ্ফার তার তরবারির এক কোপে দুই টুকরো করে ফেললো লোকটাকে।
তারপর মেয়েটিকে না দেখতে পেয়ে আবার হুঙ্কার দিলো দস্যু গাফ্ফার। একজন দস্যু বললো, সর্দার মেয়েটি ঐ যে গাছের নিচে। দস্যু সর্দার মেয়েটির কাছে গিয়ে বললো, তোমার নাম কী?
মেয়েটি বললো- অরুণা।
কোন গাঁয়ে তোমার ঘর?
ধল্লা নদীর পাড়ে। গ্রামের নাম বিষ্ণপুর। তখন দস্যু সর্দার গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠলো- কাঁদছো কেন? যারা তোমার ওপর অন্যায় করেছে, তাদের তো আমি উচিত শিক্ষাই দিয়েছি। মেয়েটি আরও জোরে কাঁদতে-কাঁদতে বললো, আমি তোমাদের পরিচয় জেনেছি। তোমরা আমাকে মেরে ফেলো।
দস্যু গাফ্ফার রাগে ফেটে পড়লো। বললো- দস্যু গাফ্ফার কখনও মেয়েদের গায়ে হাত তোলে না। কোনো মেয়ের বেইজ্জতিও করে না। তুমি তোমার বাড়িতে ফিরে যাও।
মেয়েটি দস্যু গাফ্ফারের নাম শুনে শিউরে উঠেছিল। এখন তার সমস্ত শরীর ভরে উঠেছে অন্যরকম এক প্রশান্তিতে। প্রচন্ড ঝড়ের মধ্যে পড়ে মানুষ যখন শক্ত দেয়াল ঘেরা একটু আশ্রয় খুঁজে পায়, তখন সে যেমন সব কষ্ট ভুলে ক্ষণিকের জন্য হলেও ভাঙাচোরা স্বপ্নের মধ্যে ডুবে যেতে থাকে, ঠিক তেমনি অবস্থা হলো অরুণার।
সে বললো, আমি হিন্দু ঘরের মেয়ে, সমাজ আমাকে আর গ্রহণ করবে না। আমার বাবা সমাজপতি। তবু সে কিছুই করতে পারবে না আমার জন্য। সে কারণেই আমি মরতে চাই।
সর্দার গাফ্্ফার বললো, তোমাকে গ্রহণ না করলে- আমি সারা গ্রামটাই শ্মশান করে ফেলবো।
তাতে লাভ কী হবে? আমার জন্য গ্রামের এতো বড় ক্ষতি হোক, তা- আমি চাই না।
তবু তোমাকে সেখানেই ফিরে যেতে হবে।
আমি যাবো। তবে, তারা আমাকে গ্রহণ না করলেও তুমি তাদেরকে কিছু বলতে পারবে না।
আচ্ছা সে দেখা যাবে।
দু’জন দস্যু অরুণাকে নিয়ে গেলো ওদের গ্রামে। অরুণার বাবা-মা তাদের আদরের সন্তানকে দেখে হায়-হায় করে উঠলো। চোখের পানিতে বুক ভাসালো। কিন্তু কিছুতেই মেয়েকে ঘরে তুলতে পারলো না। অরুণার একটাই অপরাধ যে, একজন মুসলিম জোয়ান তাকে স্পর্শ করেছে। তাকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল। এলাকার একটি মানুষও অরুণার পক্ষে কোন কথাই বললো না। শেষে অরুণা দু’জন দস্যুকে অনেক বুঝিয়ে আবার ফিরে এলো সর্দারের কাছে।
সর্দার গর্জে উঠে বললো, আবার এখানে ফিরে এলে কেন?
অরুণা জোড়হাত করে নিবেদন করলো, আমি এখানেই থাকতে চাই। সর্দার বললো, আমরা দস্যু, আজ এখানে তো কাল সেখানে, তুমি আমাদের সঙ্গে কী করে থাকবে?
তোমরা যেভাবে থাকো, আমিও সেভাবেই থাকবো।
তাÑ হয় না। আমরা সবাই পুরুষ, তুমি একা মেয়ে মানুষ। তাই…
এতোই যদি অসুবিধা- তা’হলে আমাকে তুমি বিয়ে করে নাও। আর যদি তা না পারো, তা’হলে আমাকে কেটে টুকরো-টুকরো করে ফেলো এক্ষুনি।
মেয়েটির স্পর্ধায় অতিষ্ঠ হয়ে দস্যু সর্দার গাফ্্ফার তরবারি হাতে লাফিয়ে উঠলো।
একজন দস্যু ছুটে এসে হাতজোড় করে বললো, সর্দার তুমি কোনদিন মেয়েদের অসম্মান করো নাই। আজ সেই মেয়ে মানুষকেই তুমি খুন করতে চাও?
হ্যাঁ-হ্যাঁ, আমি তাই করবো। দস্যুদের কাছে মেয়ে-পুরুষের কোন বাছ-বিচার নেই।
অরুণা নির্ভীক, তার মুখে টুঁ-শব্দটি নেই। সে মাথানত করে দাঁড়িয়ে আছে।
দস্যু গাফ্ফার তরবারি তুলে আঘাত করতে গিয়ে হো-হো শব্দে কাঁপিয়ে তুললো সেই নির্জন প্রান্তর। দস্যুরা একসঙ্গে বলে উঠলো- সর্দারের জয় হোক। আমাদের সর্দার দীর্ঘজীবী হোক।
দস্যু গাফ্ফার দলবলসহ পাশের বন পেরিয়ে একটা নদীর কাছাকাছি পৌঁছে অরুণাকে বললো, তুমি হিন্দু ঘরে জন্মেছো, আমি মুসলমানের ঘরে। তা’হলে কিভাবে আমাদের বিয়ে হবে। অরুণা বললো, তোমার ধর্মই আজ আমার ধর্ম। তোমাদের মধ্যে যেভাবে বিয়ে হয়, সেভাবেই হবে। কেননা, আমার ধর্মের মানুষ বিনা অপরাধে আমাকে ধর্মচ্যুত করেছে। আমি কোন অধিকারে সেই ধর্মের বড়াই করবো।
সেই রাতেই একজন কাজীকে ধরে আনা হলো এবং দস্যু গাফ্্ফারের সাথে বিয়ে হলো- অরুণার। তবে, বিয়ের সময় অরুণা আর অরুণা থাকলো না। তার নাম রাখা হলো আমিনা বেগম।

দুই.

সেকালে মানুষ ছিলো খুবই কম। যেখানে-সেখানে জলাভূমি আর বন-বাদাড়ে ভরা। দিগন্ত জোড়া খাস জমি। যে কেউ, যেমন ইচ্ছা তেমনই ঘরবাড়ি তৈরি করতে পারে। প্রয়োজন মত চাষ-আবাদও করতে পারে। এর জন্য কারো অনুমতির প্রয়োজন হতো না। তো- বিয়ের পর দস্যু সর্দার ভাবলো, এখন স্থায়ী একটা বসতবাড়ি প্রয়োজন। যেমন ভাবনা তেমন কাজ। একদিন একটা নদীর ধারে ঘরবাড়ি তৈরি করতে লেগে গেলো দস্যুসর্দার। অন্যদেরও পরামর্শ দিলো, যার-যার এলাকায় গিয়ে তোমরা সংসারী হও।
এখানে-সেখানে পুঁতে রাখা সোনাদানা, টাকা-পয়সা এনে দলের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা করে দিলো সর্দার। ঘর পেয়ে আর বুঝি ঘর ছাড়া হতে চাইলো না সর্দারের মন। আমিনার ব্যবহার এবং তার সুন্দর কথা-বার্তায় গাফ্্ফারের মনটা বদলে যেতে লাগলো দিন দিন।
এমনিতেই গাফ্্ফার একদিন বললো, আমিনা, তুমি কি সত্যি-সত্যি আমাকে ভালোবাসো? না- কি অন্য কোন উপায় নেই দেখে মনের বিরুদ্ধে এমন ভালো মানুষ হয়ে থাকো। আমিনা কথাটা শুনে কিছুক্ষণ চুপ থেকে খুব সহজ সুরে বললো, তোমার কী মনে হয়?
আমার দুটোই মনে হয় কিন্তু আমি তোমার মুখ থেকে শুনতে চাই যে, দুটোর মধ্যে কোনটা ঠিক। সত্যটা শিশুরাও বুঝতে পারে। তাছাড়া একথা কি কখনো বলা যায়? নাকি বলা উচিত যে, আমি তোমাকে সত্যি ভালোবাসি? বললো স্ত্রী আমিনা।
আমি বুঝলাম, তুমি আমাকে ভালোবাসো। কিন্তু কেন? আমি ভয়ঙ্কর একটা মানুষ- দেখতেও ভালো নই, তা’হলে?
ঐ যে বললাম, শিশুরা সব বুঝতে পারে। আমি তো তোমার বাহিরটা দেখিনি। দেখেছি তোমার ভিতরটাকে। তোমার ভিতরে যে সুন্দর আগুন আছে, সেই আগুনে পুড়ে মরেছি আমি। সেদিন যদি তোমার তরবারির আঘাতে আমার মরণ হতো, তা’হলে সে মরণ হতো আমার সুখের মরণ।
এতো সব ভালো কথা আমি বুঝি না। আমার নেশা ও পেশা ধনীর ধন লুট করা। তুমি কখনও আমার এ কাজে বাধা দিতে এসো না।
না না, সে চিন্তা তুমি কখনো করো না। তুমি নিজের থেকে যেদিন ভালো হয়ে যাবে, সেদিন আমি সত্যিকারের সুখ অনুভব করবো। জোর করে কিছু পাওয়ার মধ্যে কোন সুখ নেই।
অরুণার যে বুদ্ধি-বিবেচনা- তা ছিলো অসাধারণ। তবে, বাবার বাড়িতে তা ছিলো অস্ফুটো এক কুঁড়ির মতো। অনুরাগের ছোঁয়ায় আজ তা ফুটেছে। হয়তো যেখানে তার ফোটার প্রয়োজন ছিলো, সেখানে সে ফুটতে পারলো না। এও বুঝি আল্লাহরই খেলা। একথা দস্যু গাফ্ফারও ভাবে। আর ভাবতে ভাবতে এক সময় তার এমন অবস্থা হয় যে, তখন দস্যু গাফফার পৃথিবীর সব কিছু দূরে ঠেলে আপন মনের নিভৃতে একটা শিশুর মতো হয়ে যায়।
এদিকে সুলতানের সৈন্যরা খুঁজে ফিরছে দস্যু গাফফারকে। তিনটি তেজী ঘোড়ার মধ্যে দুটি দিয়েছে দলের দু’জন দস্যুকে, আর একটি রয়েছে দস্যু গাফ্ফারের কাছেই। ঘোড়াটিও এমন হয়েছে যে, সর্দারেরস্নেেহ-ভালোবাসা উপেক্ষা করে সে আর কারো বশ্যতা স্বীকার করবে না কখনো।
দস্যু সর্দার সব সোনাদানা, ভালো কাপড়-চোপড় একে একে বিক্রি করে দিয়েছে শহরে। তারপরও যা ছিলো সেগুলো এখন আমিনার সারা অঙ্গে শোভা পাচ্ছে। ঘরবাড়ি ছাড়াও নতুন করে ফলের বাগান, আর একটি পুকুর কাটতে লেগে গেলো প্রায় এক বছর। হাতের টাকা-পয়সা প্রায় শেষ হবার পথে। সর্দার গাফ্ফার আবার ডাকাতি করার কথা ভাবলো। কিন্তু স্ত্রীকে একা ঘরে রেখে যেতে তার মন সায় দিলো না। তা ছাড়া আমিনা এখন মা হবে। একথা ভাবতে ভাবতে সর্দার একদিন ঘোড়া নিয়ে বেরিয়ে পড়লো লোকালয়ের দিকে। সন্ধ্যায় একটি কুঁড়েঘরে আলো জ্বলতে দেখে সেখানে গিয়ে বললো, বাড়িতে কে আছেন?
কে? দশ-বারো বছরের একটি ছেলে বেরিয়ে এলো ঘর থেকে। সে বললো, কারে খোঁজেন? আপনার বাড়ি কোন মল্লুকে? গাফ্ফার বললো, আমি একজন বিদেশী। একটু পানি খেতে চাই। ঘরের ভিতর থেকে একজন বুড়ি এগিয়ে এসে বললো, তা-বাবা পানি খেতে চাও ভালো কিন্তু আর কিছুই তোমাকে খাওয়াতে পারবো না। আমরা গরিব মানুষ।
তোমাদের আর কে আছে?
কেউ নেই। জোয়ান ছেলেটা অসুখে মারা গেছে। বেটার বৌ ছেলেটা রেখে কোন এক নাগরের হাত ধরে চলে গেছে। গাফফার বললো, বুড়ি মা, তোমরা কি আমার সাথে যাবে? আমার বাড়িতে থাকবে। তোমাদের আর খাওয়ার চিন্তা করতে হবে না। তোমার মতো একজন মানুষ আমার খুব দরকার।
বাবা: আমি তো একা নই যে যাবো। আমি চলে গেলে আমার নাতিটার কি হবে?
নাতিটাও যাবে। খাবে-দাবে আর ফলের বাগান দেখাশুনা করবে।
বুড়ি রাজি হলো। পরদিন শেষ বেলা দু’জনকে সঙ্গে নিয়ে গাফ্ফার ঘরে ফিরলো। বুড়িকে পেয়ে স্ত্রী আমিনা এত খুশি হলো যে, তা- আর প্রকাশের নয়। কিন্তু গাফ্ফার তার আসল পরিচয় জানতে দিলো না বুড়িকে। একদিন হঠাৎ চলে গেলো অন্য কোথাও। বুড়ি বললো, পোলায় কই গেলো রে মা?
আমিনা বললো, বিদেশে গেছে। আয়- রোজগার না করলে আমরা খাবো কী।
প্রায় এক সপ্তাহ পর গাফ্ফার ফিরে এলো। তারপর আর কোথাও যেতে ইচ্ছে করলো না তার। ডাকাতি, খুন-খারাবি করতে যেনো আর ভালো লাগে না এখন। একদিন সে ক্ষেত-খামারের কাজ শুরু করলো। এর মধ্যেই আমিনার কোলে এলো একটি মেয়ে। মেয়েটির গায়ের রং বাবার মতো কালো কিন্তু চেহারাটা ঠিক মায়ের মতো মিষ্টি।
মেয়েটিকে দেখেই ভয়ঙ্কর সেই দস্যু সর্দার একেবারে মাটির মানুষ হয়ে গেলো। সারাক্ষণ স্নেহ-মমতায় আগলে রাখছে মেয়েকে। দেখতে দেখতে কেটে গেলো প্রায় বারোটি বছর। এর মধ্যে হঠাৎ একদিন সেই বুড়িটা মারা গেলো। বুড়ির নাতি জোয়ান হয়ে উঠেছিলো কিন্তু সেও হঠাৎ কাউকে কিছু না বলে কোথায় যে চলে গেলো, তার আর খোঁজ পাওয়া গেলো না।
এখন আর আগের কোনো কিছুই মনে রাখতে চায় না গাফ্্ফার। নিজের পরিশ্রমের ফসল খায়, কোথাও বিক্রি করে আবার ঘোড়ার পিঠে সওয়ার হয়ে চলে যায় দূরের হাট-বাজারে। এভাবে চলতে চলতে একদিন কেউ একজন চিনতে পারে এই লোকটাই দস্যু গাফ্্ফার। পূর্বের কোনো ঘটনার জের ধরেই লোকটা প্রতিশোধ নেয়ার জন্য গোপনে দস্যু গাফ্্ফারের পিছু নেয়। রাতের অন্ধকারে মাঠঘাট পেরিয়ে বন-জঙ্গলের ভিতর এসে দেখে যায় জনমানবহীন জঙ্গল এলাকাটা। কিন্তু তারা জানে না, সেই দস্যু গাফ্্ফারের বর্তমান জীবনের কথা। পরদিনই খবর পৌঁছে যায় সুলতানের অত্যাচারী সৈন্যদের কাছে। যারা প্রতিদিন মনে মনে খুঁজে বেড়াচ্ছিল দস্যু সর্দার গাফ্্ফারকে।
সেদিন খুব ভোরবেলা গাফ্্ফার নামাজ পড়ছে, সেজ্্দা দেয়ার সময় তার কানে বাজলো অনেকগুলো ঘোড়ার খুরের আওয়াজ। শব্দটা যেনো ক্রমেই এগিয়ে আসছে। তার মনে সন্দেহ জাগলো, হয়তো আমার উপর কোনো বিপদ আসছে। নামাজ শেষ করেই পরিত্যক্ত সেই লাঠি আর তলোয়ার খানা নিয়ে বৌকে বললো, মেয়েটাকে সঙ্গে নিয়ে নদীর দিকে পালিয়ে যাও। মনে হচ্ছে অত্যাচারী সুলতানের সৈন্যরা এদিকেই আসছে। বলেই সে দ্রুত লাফিয়ে উঠলো ঘোড়ার পিঠে। নদীর পাশ দিয়ে ধীরে ধীরে চলে গেলো সৈন্যদের পেছন দিকে।
গাফ্্ফারের ধারণা মিথ্যা নয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই সৈন্যরা ঘোড়া নিয়ে ঢুকে পড়লো বনের মধ্যে। কিন্তু এতো বড় বনের মধ্যে তেমন কিছুই চোখে পড়লো না সৈন্যদের। তবে আজ ওরা ফিরে যাওয়ার জন্য আসেনি। দস্যু গাফ্্ফারের সাথে শেষ বোঝাপড়া করতে চায় ওরা। হত্যার বদলে হত্যা। এক সময় সৈন্যরা ঠিকই আবিষ্কার করতে সক্ষম হলো দস্যু গাফ্ফারের আস্তানা। তথাপি সৈন্যদের মনে হলো এটা আস্তানা নয়, দশজন সাধারণ মানুষের বাড়ি-ঘরের মতোই একটা বসতবাড়ি।
যাইহোক, সেখানে কোনো লোকজন না দেখে ওরা অবাক হলো। অথচ একটু আগেও এখানে যে মানুষ ছিলো তা বেশ বুঝা যায়। সৈন্যরা দ্বিগুণ উৎসাহে এগিয়ে গেলো নদীর দিকে। হঠাৎ নদীর উজান দিকে হিজল-তমালের ঝোপের মধ্যে কেউ লুকিয়ে আছে এটা নিশ্চিত হয়ে সৈন্যরা হইচই না করেই দূর থেকে বর্শা ছুঁড়লো।
দস্যু গাফ্ফারকে কাছ থেকে হাতেনাতে পাক্ড়াও করা যে কতো কঠিন কাজ, তা- তারা জানে। তাই বর্শা ছুঁড়া। অব্যর্থ সেই আঘাত। মুহূর্তে একটা যন্ত্রণা কাতর চিৎকার ছড়িয়ে পড়লো আকাশে-বাতাসে। তারপরই মা বলে চিৎকার দিয়ে উঠলো গাফ্্ফারের মেয়ে মায়মুনা। যাকে গাফ্্ফার আদর করে ডাকতো মুনিয়া বলে।
মুনিয়ার চিৎকার, মুনিয়ার মায়ের আর্তনাদ সুচের মতো গিয়ে বিঁধলো দস্যু গাফ্্ফারের কলিজায়। বুকের মধ্যে যেনো দাউ দাউ করে জ্বলে উঠলো আগুন। খুনের উন্মাদনায় সারা শরীর থর থর করে কাঁপতে লাগলো তার। এক হাতে ঢাল, অন্য হাতে তরবারি নিয়ে বিদ্যুৎ গতিতে ছুটে এলো সেই বনের মধ্যে। বনের ভেতর দিয়ে কিভাবে চলতে হয়, ছুটতে হয় তা- খুব ভালো করেই জানে গাফ্্ফার ও তার ঘোড়াটা। গাফ্্ফার পিছন থেকে আক্রমণ করলো সৈন্যদের। চোখের পলকে ধরাশায়ী করলো দু’জন সিপাইকে। বড় বড় গাছের ফাঁক দিয়ে কৌশলে ঘুরতে লাগলো- আর আঘাত হানতে লাগলো। সৈন্যরা বনের মধ্যে ঘোড়া নিয়ে ঠিক যেনো তাল করে উঠতে পারছে না।
দলপতি চিৎকার করে বললো- গাফ্্ফার আত্মসমর্পণ করো, তা না’হলে তোমার মেয়েকেও আমরা খুন করে ফেলবো। গাফ্্ফার হুঙ্কার দিয়ে বললো, প্রাণে যদি বাঁচতে চাস, তা’হলে এখান থেকে কেটে পড়। আমার মেয়ের শরীর থেকে এক বিন্দু রক্ত ঝরলে তোদের একটাকেও আমি বাঁচতে দেবো না। আর সুলতানের প্রাসাদেও আমি আগুন জ্বেলে দিবো।
সৈন্যরা তখন বন থেকে বের হওয়ার জন্য কেবলই পথ খুঁজছে। শেষে নদীর পথ ধরে এগিয়ে যেতে লাগলো ওরা। আর গাফ্্ফারকে খুন করার জন্য এই প্ল্যান করলো যে, ওর মেয়েকে ছেড়ে দিলে ও হয়তো মেয়েটাকে নিয়েই ভেগে যাবে। আর মেয়েটাকে শেষ করে দিলে ও মরিয়া হয়ে লড়বে আমাদের সাথে। তখন বনের বাইরে খোলা জায়গায় ওর সাথে আমরা লড়তে পারবো। তাহলে সহজেই বধ করা যাবে দস্যু গাফ্্ফারকে। এসব কথা চিন্তা করেই গাফফারের কলিজার টুকরো, অবুঝ শিশু কন্যাকে ওরা আঘাত করলো।
মেয়ের আর্তনাদের সঙ্গে বাবা বাবা বলে সেই চিৎকার দস্যু গাফ্্ফারের কলিজাটা ফালা ফালা করে দিলো। আর দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে উঠলো বুকের মধ্যে। বেঁচে থাকার মতো কোনো আশা, কোনো স্বপ্নই আর থাকলো না তার। ইয়া আলী বলে একটা চিৎকার দিয়ে ঘোড়ার পেটে আঘাত করলো গাফ্্ফার। তেজী ঘোড়াটা বুঝে নিলো, তার মনিবের বুকের আগুন নেভানোর জন্য আজ তাকে মরণ-পণ লড়তে হবে। ঘোড়া ছুটলো কৌশলে। গাফ্্ফারের হাতের লাঠি ঘুরতে লাগলো বনবন শব্দে। ঘোড়ার উপর বসে, শুয়ে এবং ঝুলে গাফ্্ফার লাঠি চালাতে লাগলো মরিয়া হয়ে। লাঠির আঘাতে ঘোড়া থেকে ছিট্কে পড়তে লাগলো সুলতানের সিপাইরা।
ঢাল-তলোয়ার নিয়েই অনেকক্ষণ লড়াই করলো গাফফার। যেনো রক্তের হোলি খেলায় মেতেছে দু’পক্ষ। তবে, এক পক্ষে শুধু গাফ্্ফার, অন্য দিকে সুলতানের সৈন্যরা। এক সময় চারদিক থেকে সৈন্যরা ঘিরে ফেললো গাফ্্ফারকে। অবস্থা বেগতিক বুঝে বেপরোয়া ঘোড়া ছুটিয়ে সৈন্যদের বেষ্টনী ভেঙে বেরিয়ে পড়লো সে। আর নতুন করে প্রতিশোধ নেয়ার জন্য জঙ্গল পার হয়ে, বিল-ঝিল, মাঠ-ঘাট পিছে ফেলে অন্য এক রাজ্যের গভীর জঙ্গলে গিয়ে প্রবেশ করলো গাফ্্ফার। সুলতানের সৈন্যরা বুঝতেও পারলো না, কোন পথে কোথা দিয়ে দস্যুটা হাওয়া হয়ে গেলো।

তিন.

পাহাড়ের ওপাশে বিশাল এক খরস্রোতা নদী। নদীর কাছাকাছি পৌঁছে গেলো গাফ্্ফার। একটা বড় বটগাছের ঘন ছায়ায় পৌঁছাতেই তার শরীরটা যেনো অবশ-অচল হয়ে পড়লো। ঘোড়া থেকে কোনোভাবে নেমে মাটিতে বিছিয়ে দিলো শরীরটা। ব্যথায় সারা শরীর টন্্টন করে উঠলো। তরবারির আঘাতে, বর্শার খোঁচায় দেহের অনেক জায়গা থেকে তখনও রক্ত ঝরছে। ব্যথায় আর ক্লান্তিতে গাফ্ফারের দু’চোখের পাতা বন্ধ হয়ে এলো। সেই সাথে চোখের কোল বেয়ে অঝরে গড়িয়ে পড়তে লাগলো ব্যথার অশ্রু, কষ্টের অশ্রু। আল্লাহ বলে একটা চিৎকার দিতেই জ্ঞান হারালো সে।
যেনো একটা শান্তির ঘুম দিয়ে শেষ বেলা জাগলো গাফ্ফার। জেগেই তার মনে পড়লো সব কথা। চোখের সামনে ভেসে উঠলো একমাত্র মেয়ে মুনিয়া আর স্ত্রী আমিনার নিষ্পাপ মুখ। কানে বাজতে লাগলো মা-মেয়ের করুণ আর্তনাদ। বাবা আমাকে বাঁচাও, ওরা আমাকে মেরে ফেলবে। গাফ্ফার হা হা করে বুক ভাঙা আর্তনাদ করে উঠলো। সঙ্গে সঙ্গে সে উঠে বসলো আর পাগলের মতো বুক চাপড়াতে শুরু করলো।
হঠাৎ পেছন থেকে কে যেনো বলে উঠলো- বিপদে ধৈর্য ধরতে হয় বাবা। মধুর সেই কণ্ঠ কানে আসতেই কেমন যেনো মনটা ভরে উঠলো গাফ্্ফারের। চোখ ফেরাতেই দেখে সারা শরীরে একখানা সাদা কাপড় জড়িয়ে এক বৃদ্ধ চেয়ে আছে তার দিকে। বড় বড় চুল-দাড়ির মধ্যেও মিষ্টি হাসির আলোয় মুখটা অপূর্ব দেখাচ্ছে তাকে।
এই জঙ্গলে হঠাৎ তাকে দেখেও ভড়কে গেলো না গাফ্ফার। তার মনে হলো- এ যেই হোক না কেন, তবে সে হয়তো আমার শুভাকাক্সক্ষী। সে বুঝি আমার মনের কথা, কষ্টের কথা সবই জানে। এ নিশ্চয়ই আল্লাহর অসীম দয়া।
গাফ্ফার বললো, বাবা ওরা আমার…..
আমি জানি।
ঐ জালিম সুলতানের প্রাসাদে আগুন না দেওয়া পর্যন্ত আমার মনের আগুন নিভবে না বাবা। তুমি আমাকে দোয়া করো।
আমি তাইতো করছি। চোখের পানি মুছে ফেল, তোর মনের আগুন নিভে যাবে। এখানেই বাকি জীবন থেকে যা। একদিন শান্তিতে তোর বুকটা ভরে যাবে। এখানে তোর কোনো অভাব হবে না। আমি এবার যাচ্ছি।
কোথায়?
অন্য কোনো জায়গায়।
কেন? তুমি আমার কাছেই থাকো না!
ভয় নেই, খোদাকে স্মরণ রাখিস। যিনি তোকে সৃষ্টি করেছেন।
গাফ্ফার কিছু একটা বলবে ভেবে একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়লো। তারপর চোখ তুলে দেখে লোকটি নেই। গাফ্ফার দৌড়ে গেলো যেদিকে লোকটি বসেছিলো। চিৎকার করে বললো, আপনি কোথায়? আপনি ফিরে আসুন। কিন্তু কোনো সাড়া মিললো না। দৃষ্টির সীমানায় তার কোনো কায়াছায়াও দেখতে পেলো না গাফ্ফার। ফিরে এসে বটগাছের একটা মোটা ঝুড়ির সাথে হেলান দিয়ে বসলো। দৃষ্টি পড়লো শরীরের ক্ষত জায়গাগুলোর দিকে। কী আশ্চর্য, সব ক্ষত স্থানগুলো শুকিয়ে গেছে। শুধু দাগটা বোঝা যায়।
তারপর সেই নিঝুম বনে একা একা কাটতে লাগলো দস্যু গাফ্ফারের দিন। একা তবু আনন্দের মধ্যেই দিন যায় রাত পোহায়। বনের পশু-পাখিরাই ধীরে ধীরে তার স্বজন হয়ে উঠলো। বাঘ, ভালুক, হাতি, গন্ডার ছাড়া ছোট ছোট সব প্রাণীই আছে এখানে। আর আছে রংবেরঙের পাখিরা। সকাল, দুপুর ও সন্ধ্যায় পাখিদের গানে গানে ভরে উঠে নিঝুম বন।
একদিন শেষ বেলা ঘুম ভাঙতেই গাফ্ফারের কানে বাজলো কারো কান্নার সুর। হঠাৎ নিঝুম বনে কান্নার শব্দ শুনে অবাক হয়ে চারদিক তাকালো সে। কী ভেবে গাফ্্ফার আনন্দে অস্ফুট স্বরে আপন মনে বলে উঠলো- তবে কি সত্যি আমার মুনিয়া আমার কাছে ফিরে এসেছে। মুনিয়া মরে নাই, বেঁচে আছে! আর সে তার বাবার খোঁজে এসেছে এই জঙ্গলে। কিন্তু বাবাকে সে খুঁজে না পেয়ে হয়তো ভয়ে কাঁদছে। গাফ্্ফার দু’হাতে চোখ রগড়ে কান্নার আওয়াজ লক্ষ্য করে সামনের দিকে ছুটে গেলো। গাছের ফাঁক দিয়ে যতদূর দৃষ্টি যায় কোথাও সে দেখতে পেল না কাউকে। হঠাৎ পিছন দিকে তাকাতেই বড় একটা গাছের গোড়ায় দেখতে পেলো জড়োসড়ো হয়ে বসে আছে একটি মেয়ে। গায়ে দামি শাল, পাশেই পড়ে আছে একটি বাক্স। মেয়েটির মুখ দেখা যাচ্ছে না। মুখটা তার দু’ হাঁটুর উপর শিথিল হয়ে আছে। দেখেই মনে হলো সে খুব ক্লান্ত, অবসন্ন।
তবু গাফ্ফারের হঠাৎ এ কথাই মনে হলো যে, এখানে তো কোনো মানুষ আসতে পারে না। তবে কি সে পরী, ভূত-প্রেত অথবা আমার মুনিয়া! তা সে যেই হোক, তবু আমি তার কাছে যাবো। গাফ্ফার ধীরে ধীরে এগিয়ে চললো মেয়েটির দিকে। কাছাকাছি গিয়ে বললো, মা- তুই কি আমার মুনিয়া? যদি তুই আমার মুনিয়া হয়ে থাকিস, তা’হলে তুই আর আমাকে ছেড়ে কোথাও যাস্নে। এই গভীর বনে আমি বড় একা- রে মা।
মেয়েটিও এই গভীর বনে হঠাৎ কারো কণ্ঠে মা ডাক শুনতে পেয়ে অবাক হয়ে মুখ তুললো। কাঁদতে কাঁদতে তার দু’চোখ যেনো মরা মাছের মতো ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। অতিকষ্টে বললো, তুমি কে বাবা- আমাকে মা বলে ডাকলে? তুমি কি সত্যি কোনো মানুষ না- অন্য কিছু?
না মা- আমি মানুষ। আমি দস্যু সর্দার গাফ্ফার। কিন্তু এখন আর আমি দস্যু নইরে মা। আমি শুধু গাফ্্ফার। বলতে বলতে গাফফারের বুকটা আবার কান্নায় ভরে উঠলো।
কিন্তু বাবা, আমি তো তোমার মুনিয়া নই। কোনো পরীও নই। আমি এক দুঃখিনী, এ জগতে আমার আপন বলতে কেউ নেই।
এখানে আসলি কেন, তোর কী হয়েছে? সব খুলে বল আমাকে।
আমার ভাগ্য আমাকে এখানে নিয়ে এসেছে বাবা।
কে তোকে এত বড় শাস্তি দিলো, আমাকে বল। আমি আমার মুনিয়াকে বাঁচাতে পারি নাই। কিন্তু এবার আমি কাউকে ছাড়বো না। আমি আবার দস্যু হয়ে যাবো।
সে অনেক কথা বাবা।
আমি তোর সব কথা শুনবো। কিন্তু এখানে এভাবে তুই বাঁচতে পারবি না। আমার কুঁড়েঘরে চল। বিশ্বাস রাখিস, আল্লাহ যার সহায়- তাকে কেউ ক্ষতি করতে পারে না।
ছোট ছোট গাছ কেটে গেরস্ত বাড়ির মতো বেশ বড় উঠোন করা হয়েছে। তারই পাশে একটা নারকেল পাতার ঘর। মাটি থেকে উঁচু করে বাঁশের মাচান বাঁধা। মেয়েটি এই নিরাপদ জায়গাটুকু পেয়ে যেনো আকাশের চাঁদ হাতে পেলো। তার ফেলে আসা রাজপ্রাসাদের কথা ভাবতে গিয়ে শরীর জুড়ে অনুভব করলো তীব্র এক বিষের জ্বালা। মনে মনে খোদাকে স্মরণ করলো। খোদা, তুমি তো জানো- আমি কোনো পাপ করিনি। তারপর ক্লান্ত শরীরে মেয়েটি নিশ্চিন্ত মনে ঘুমিয়ে পড়লো সর্দারের সেই কুঁড়েঘরে। গাফ্্ফারও আর কিছুই বললো না মেয়েটিকে। বাইরে গাছের ছায়ায় আর একটি মাচানে শুয়ে শুয়ে সে ভাবতে লাগলো তার ফেলে আসা দিনগুলোর কথা। আর সেই বৃদ্ধের কথা, যে তাকে বলেছিলো, এখানেই তুই একদিন খুঁজে পাবি তোর আপনজন।
পাখিদের স্বর্গরাজ্যে বেলা অবধি কি ঘুমানো যায়? পাখিদের নানান রকম সুরেলা কণ্ঠের গানে ঘুম ভেঙে গেলো মেয়েটির। হঠাৎ চমকে উঠলো সে, আমি এখানে কেন? কিন্তু পরক্ষণেই মনে পড়লো সব কথা। বেড়ার ফাঁক দিয়ে তাকালো বাইরে। কালো আর দৈত্যের মতো লোকটিকে দেখলো মাচানে বসে নামাজ পড়ছে। অপলক চেয়ে থাকলো, তারপর মনে মনে আবারও খোদাকে স্মরণ করলো। তোমার অনেক অনেক দয়া খোদা। আমার এই বিপদে এই বিজন বনে একজন ভালো মানুষের কাছে আমার ঠাঁই করে দিয়েছো। তারপর, ঘর থেকে এক’পা, দু’পা করে সকালের নরম আর মিষ্টি আলোয় ভরা উঠোনে এসে দাঁড়ালো মেয়েটি। চারিদিকে পাখিদের ডাকাডাকি। কেমন যেনো মায়া মাখা চারপাশ।
মেয়েটি মনে মনে ভাবলো- লোকটা দেখতে কী ভয়ঙ্কর অথচ তার মনটা শিশুর মতো সুন্দর। সেই মনে না জানি কতো কষ্ট। কথাটা ভাবতে গিয়ে চোখে পানি এসে গেলো। তবু এই ভেবে মনটা হালকা হলো যে, পৃথিবীতে হয়তো আমার মতো আরো অনেক দুঃখী মানুষ আছে। তারাও তো মনটাকে শক্ত করে বেঁচে আছে। আমাকেও বাঁচতে হবে। বাঁচাতে হবে আমার সন্তানকে। ওকে বড় করে ফিরিয়ে দিতে হবে ওর আব্বা হুজুরের কাছে।
সর্দার গাফ্্ফার নামাজ শেষ করে মেয়েটির দিকে তাকাতেই কেমন চমকে উঠলো। এ যে সোনার প্রতিমা! হয়তো কোনো রাজা-বাদশ্াহের ঘরে ছিলো। কেন এমন হলো ওর?
একটু হেসে গাফ্্ফার বললো, মা- তোর নামটা তো আমি জানতে পারলাম না। তোর নাম কী?
বাবা তুমি আমাকে মুনিরা বলেই ডেকো।
না-না। যে নেই, সে আড়ালেই থাক। তুই তোর নামটা আমাকে বল।
আমার নাম গুলশানআরা। আমার বাবা-মা আমাকে গুলশান বলে ডাকতো।

চার.

এই গুলশানাআরা কিন্তু কোনো রাজা-বাদশার ঘরের মেয়ে না। গ্রামের সাধারণ গরিব বাউলের একমাত্র কন্যা। বাউলকে দশ গাঁয়ের মানুষ বাউল ফকির বলেই শ্রদ্ধা করতো, অন্তর থেকে ভালোও বাসতো। প্রতি বছর মাঘ মাসের শেষ তিনদিন গানের আসর বসতো ফকিরের বাড়িতে। দেশ-বিদেশ থেকে কতো ফকির আসতো, কতো মানুষ আসতো ফকিরদের দেহতত্ত্ব গান শুনতে। গাঁয়ের মানুষ চাল-ডাল তুলে ফকিরদের খাওয়া থাকার ব্যবস্থা করতো। সে উপলক্ষে মেলাও জমে উঠে সেখানে।
তো শেষদিন এক ঘোড়সওয়ার সেখানে গিয়ে হাজির। নওজোয়ানের মাথায় বাবরি চুল, ফর্সা মুখে সুন্দর কালো দাড়ি। পিঠে তীর-ধনুক, কোমরে খাপে আঁটা তরবারি। গায়ে সৈন্যদের মতো পোশাক। উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘোড়া ছুটাতে ছুটাতে সেই যুবক দেখতে পেলো দলে দলে মানুষ কোথায় যেনো যাচ্ছে-আসছে। হঠাৎ ঘোড়ার লাগাম টেনে যুবক তাদের বললেন, ওহে, তোমরা কোথায় যাচ্ছো? তারা বললো, আমরা বাউল ফকিরের ওখানে গান শুনতে যাচ্ছি। ঘোড়সওয়ার যে বাদশ্্াহের কোনো গুপ্তচর অথবা সৈন্য বাহিনীর কেউ হতে পারে, গাঁয়ের মানুষেরা এটাই মনে মনে ধারণা করে নিলো। ঘোড়সওয়ার আবার বললেন, এগাঁয়ের নাম কী? এখান থেকে বাউলের বাড়ি কতটা দূর হবে? লোকেরা বললো, সামনের এই মাঠটা পাড়ি দিলেই ফুলেশ্বরী গ্রাম। বাউল ফকিরের বাড়ির পাশেই বটতলায় গান হয়। মেলাও হয় সেখানে।
আগšুÍক আর কিছু না বলে ঘোড়া ছুটালো সেই দিকে। মাঠটা পার হয়ে গ্রামের মধ্যে ঢুকতেই কানে এলো বাঁশি ও অন্যান্য বাদ্যযন্ত্রের সুর। একটু দূরেই খুব বড় একটা বটগাছও দেখা গেলো। লোকজন যাচ্ছে সেদিকেই। সামনে একটা বড় পুকুর। পুকুরের পাশ দিয়ে রাস্তা। পুকুরের পাড়ে সারি সারি নারকেল গাছ। ঘোড়ার ওপর বসেই নওজোয়ান দেখতে পেলো পুকুরে ফুটে আছে অনেক লাল পদ্ম। হঠাৎ ঘোড়াটা থমকে দাঁড়ালো সেখানে। গাঢ় সবুজ শাড়ি পরে পুকুর ঘাটে এলো একটি মেয়ে। মেয়েটি পানিভরা কলসি কাঁখে নিয়ে আপন মনে আবার পা বাড়ালো বাড়ির পথে। নওজোয়ানও এগিয়ে চললো মেয়েটিকে অনুসরণ করে।
বাগ-বাগিচার মধ্যে একটি বাড়ি। তিন দিকে তিনটি ছনের ঘর। তবে, থাকার দুটো ঘর পরিপাটি করে সাজানো। কাঠের বেড়া, জানালা-দরজা সবই আছে। সামনের দিকে কাচারি ঘর। তারও অর্ধেকটা ঘেরা। ঘরের সামনে বেলি আর গোলাপ ফুলের বাগান। খোলা দিকটায় বাউল ফকির বসে আছে একটা নকশি কাঁথায়। সাদা চুল-দাড়ি, পরনে গেরুয়া ধরনের পোশাক।
পাশের একটা গাছের ছায়ায় ঘোড়াটা বেঁধে রেখে নওজোয়ান এগিয়ে গেলো ফকিরের সামনে। ফকিরকে সালাম দিয়ে তিনি পেতে রাখা নকশিকাঁথার উপর বসলেন। বাউল ফকির বললেন, বাবা- আপনি যে কোনো সাধারণ ব্যক্তি নন, সে আমি বুঝতে পেরেছি। তবে, আমার কাছে আপনি আল্লাহ্র একজন সুন্দর বান্দা। আর এখন আপনি আমার বিশেষ মেহমান। তবে আপনার আগমনের কারণ জানতে পারলে, সেইরূপ খেদমতের চেষ্টা করতে পারি।
বাউলের কথায়- আগক মুগ্ধ হলেন। তবু নিজের পরিচয় গোপন রেখে বললেন, এ রাজ্যের বাদশাহ্ শিবলী সাদীর মতো আমিও দেশ ও দেশের জনগণকে ভালোবাসি। কোথাও কোন বৈষম্য দেখলে, কোনো না কোনো ভাবে সে বিষয় বাদশাহ্র কানে পৌঁছাতে চেষ্টা করি। এখানে মানুষ সুরের টানে ছুটে আসছে। খুশিতে, আনন্দে সবার মনটা কেমন ভরপুর। সেই আনন্দের ভাগীদার আমিও হতে চাই।
বাউল বললেন, চমৎকার আপনার ইচ্ছা। আপনি জ্ঞানী, অবশ্যই বাউলগান আপনার ভালো লাগবে। বটতলা গানের আসর বসেছে। আজই শেষ রজনী। আপনি ক্লান্ত, একটু বিশ্রাম নিন, তারপর আসরে বসে গান শুনবেন। আমার মেয়ে গুলশানও গান গাইবে। ও আমার কাছেই গান শিখেছে। প্রতি বছরের শেষ দিন একটা গান গেয়ে থাকে গুলশান।
এর মধ্যেই গুলশানআরার কণ্ঠ ভেসে এলো।
আব্বা, বাদশাহ্র কোনো একজন সৈন্য নাকি এসেছেন আমাদের কুঁড়েঘরে, তিনি নিশ্চয়ই ক্ষুধার্ত। আমি তার খানার ব্যবস্থা করছি। তিনি যেনো চলে না যান।
বাবা বললেন, না- মা, উনি যাবেন না। বিশ্রামের পর আসরে বসে গান শুনবেন। তুমি ব্যবস্থা করো।
বাবা এবং মেয়ের এই সরল সুন্দর বাক্যালাপে মুগ্ধ হলেন আগক। তারপর যথাসময়ে খুব সাধারণ খাবার খেলেন আনন্দচিত্তে। খাওয়ার ফাঁকে বৃদ্ধ বাউল বললেন, নিশ্চয়ই আপনারা অনেক ভালো ভালো খাবারে পরিতৃপ্ত। জানি না- এই সাধারণ খাবার আপনার ভালো লাগছে কি না। মেহমান বললেন, এই সব খাবার আপনাদের কাছে সাধারণ বটে, কিন্তু আমার কাছে অসাধারণ। এমন চমৎকার রান্নার জন্য রাঁধুনীকে আমার ধন্যবাদ।
আমার মেয়ে গুলশানই রান্না করে থাকে। কেননা আজ দু’বছর ও মা হারা। বিয়ের বয়স কবে পার হয়ে গেছে। কিন্তু আমাকে ছেড়ে যাওয়ার কষ্টে ও বিয়ে করতেও রাজি হয় না। আমিও ভাবি, আল্লাহ্পাকের ইচ্ছা হলে, কিছুই আটকে থাকবে না।
সে যাইহোক, সন্ধ্যার পর বিশেষ মেহমানের বসবার জন্য বিশেষ আয়োজন করা হলো। একে একে অনেক বাউল ফকিরই তাদের গান পরিবেশন করলেন। এক পর্যায়ে গুলশানআরা শুরু করলো তার মরমি গান।
মেহমান তন্ময় হয়ে গুলশানআরার গান শুনলেন। তিনি মুগ্ধতার সাগরে ভাসতে লাগলেন তখন। ঠিক রাখতে পারলেন না তার হুঁশ। কেমন এক ঘোরের মধ্যে কাউকে কিছু না বলে উঠে এলেন সেখান থেকে এবং ঘোড়ায় সওয়ার হলেন। চিঁহি-হি শব্দে ডেকে উঠলো ঘোড়া। পথে নামলেন সেই অপরিচিত ঘোড়সওয়ার। বাউলসহ উপস্থিত সবাই অবাক হয়ে চেয়ে থাকলো- জোছ্না ছড়ানো আলো-ছায়া ভরা সেই পথের দিকে। গুলশানআরা কিন্তু কোন মন্তব্যই করলো না।
দু’দিন পর ঠিক দুপুরে বাদশাহ্ শিবলী সাদীর দরবার থেকে স্বয়ং বাদশাহ্্ের বিচক্ষণ উজির, সভাসদ এবং সৈন্যরা মিলে প্রায় পঞ্চাশ জনের একটি দল এসে হাজির হলো বাউল ফকিরের বাড়িতে। সে এক হুলস্থুল কান্ড। ভয়ে বিস্ময়ে গোটা এলাকার মানুষ এসে দূরে দূরে গাছ-গাছালির আড়ালে দাঁড়ালো ঘটনা জানার জন্য। উজির সাহেব ঘোড়া থেকে নেমে নিজ হাতে বাদশাহ্র পাঠানো উপঢৌকন দিলেন বাউল ফকিরের হাতে। ভয়ে ফকিরের গলা শুকিয়ে কাঠ। ভালো-মন্দ কিছুই সে বলতে পারছে না। উজির সাহেব সান্ত¡না দিয়ে বললেন, আমাদের বাদশাহ্্ এসব আপনার জন্য পাঠিয়েছেন। এর মধ্যে হীরা-মুক্তা, সোনা-দানা, টাকা-পয়সা সবই আছে। অচিরেই এখানে ইমারত গড়ার কাজ শুরু হয়ে যাবে। বাউল গানের আসর, বাউলদের থাকার জায়গা আরো অনেক কিছুই হবে।
এতক্ষণে বাউল ফকির বললেন, গত পরশু একজন ঘোড়সওয়ার আমার মেহমান হয়েছিলেন। তিনি এখানে গানও শুনেছেন কিন্তু তার পরিচয় আমরা জানতে পারি নাই। তিনি কে?
তিনিই আমাদের প্রিয় বাদশাহ্্ শিবলী সাদী। তিনি ছদ্মবেশে এভাবেই ঘুরে বেড়ান। প্রজাদের সুখ-দুঃখের খবর নেন। তিনি আপনার জন্য একটি শুভ সংবাদ পাঠিয়েছেন।
বাউল ফকির এ-কথা শুনে আরো অবাক হয়ে বললো, তিনি আমাদের বাদশাহ্্, অথচ আমরা কেউ তাকে চিনতে পারি নাই। হয়তো কতো না বেয়াদবি করে ফেলেছি।
নাÑনা, তিনি আপনাদের ব্যবহারে খুব খুশি হয়েছেন। তিনি আপনার মেয়েকে খুব পছন্দ করেছেন। তাই, তাকে শাদি করার জন্য পয়গাম পাঠিয়েছেন। আপনি হাসিমুখে এই প্রস্তাব কবুল করলেই আমরা ফিরে গিয়ে বাদশাহ কে সুসংবাদটা দিতে পারি।
বাউল ফকির তখন আনন্দে, আবেগে, ভয়ে একেবারে কেঁদে ফেললো। তবে ভয় হচ্ছিল এই ভেবে যে, বাদশাহ্্ের সঙ্গে সম্পর্ক হওয়াটা কি দুঃখের সাগরে ঝাঁপ দেয়া নয়? আবার মনে হয়েছে, যাকে আমি অন্তর দিয়ে দেখেছি, তার কথা শুনেছি, এমন মানুষ কখনো খারাপ হতে পারে না। আবার একথাও মনে হয়েছে- আমি তো একবারেই তুচ্ছ এক প্রজা, বাদশাহ্র ইচ্ছার বিরুদ্ধাচরণ করা মানেই- বোকার মতো তরবারির নিচে গর্দান পেতে দেয়া।
অনেকক্ষণ চুপচাপ থাকার পর বাউল বললো, আমার মেয়ের কাছে একটা কথা শোনা বড়ই প্রয়োজন। আপনারা একটু অপেক্ষা করুন।
বাবা মেয়ের কাছে যেতেই মেয়ে কেঁদে বাবাকে জড়িয়ে ধরে বললো, বাবা এ কী করে সম্ভব!
কিন্তু উপায় কি মা? তাছাড়া আমি তো সারাজীবন তোর সুখই চেয়েছি খোদার কাছে। খোদা কবুল করেছে আমার কথা। আমাদের বাদশাহকে তো তুই স্বচক্ষে, কাছ থেকে দেখেছিস। এতো বড় বাদশাহ অথচ কেমন মাটির মানুষ তিনি। সত্যি তোর কপাল ভালো।
মেয়ে চোখের পানি মুছতে-মুছতে বললো, আমি চলে গেলে তোমার কী হবে বাবা! তোমাকে কে দেখবে? বাবা বললো, আমাকে আল্লাহ্ই দেখবেন। দেশের দশ জন দেখবে। আমার কথা তুই চিন্তা করিস নে।
তারপর বাউল ফিরে এসে বললো, উজির সাহেব আপনি বাদশাহ্কে শুভ সংবাদ দিতে পারেন।
উজির সাহেব বললেন, আল্্হামদুলিল্লাহ্। তবে, কবে কখন, কোথায় শাদির কাজ সম্পন্ন হবে, সেকথা আমরা পরে জানাবো আপনাকে।
গাঁয়ের মানুষ একথা শুনে আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়লো। মেতে উঠলো বাদশাহের গুণগানে। কিছুদিনের মধ্যেই বাদশাহ্্ শিবলী সাদী লোকজন, সৈন্য-সামন্ত নিয়ে আবার এলেন ফুলেশ্বরী গ্রামে, বাউল ফকিরের বাড়িতে। এবার তিনি এসেছেন বর বেশে। একজন কাজীও সঙ্গে নিয়ে এসেছেন। দাসীরা বাক্স ভরা গহনা নিয়ে গুলশানকে এমনভাবে সাজালো যে, তাকে আর চেনাই যায় না। বাদশাহের উপযুক্ত বেগম হয়ে উঠলো। এদিকে চলছে ভুঁড়িভোজের আয়োজন। কাজী সাহেব বিবাহের কাজ সম্পন্ন করলেন। পরদিন বাদশাহ আর বেগম আট বেহারার পালকিতে রাজ প্রাসাদে পৌঁছালেন। (চলবে)

SHARE

Leave a Reply