Home বিজ্ঞান জগৎ কলম্বাস মহানায়ক নাকি অন্য কিছু -আসিফ হাসান

কলম্বাস মহানায়ক নাকি অন্য কিছু -আসিফ হাসান

বিশ্বের সর্বকালের অন্যতম নাবিক ও আবিষ্কারক হিসেবে খ্যাতির অধিকারী ক্রিস্টোফার কলম্বাস। আমেরিকা ‘আবিষ্কারক’ হিসেবে সারা বিশ্ব তাকে চেনে। এই আবিষ্কার বিশ্বের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক ক্ষেত্রে নতুন যুগের সূচনা করেছিল। ইউরোপীয় অনেক দেশের সমৃদ্ধিও ছিল এই আবিষ্কারের নেপথ্যে। আর বর্তমান বিশ্বের একমাত্র সুপার পাওয়ার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সৃষ্টির পেছনেও কাজ করেছে এই আবিষ্কার। বলা যায় আমেরিকায় তার মোট চারটি অভিযানে (১৪৯২-৯৩, ১৪৯৪-৯৬, ১৪৯৮-১৫০০, ১৫০১-০৪) পুরো বিশ্বব্যবস্থাতেই ব্যাপক পরিবর্তন এনে দিয়েছিল।
পশ্চিমা মিডিয়া প্রায়ই বলে থাকে মুসলমানরা এক হাতে তলোয়ার এবং অন্যহাতে কোরআন নিয়ে সাম্রাজ্য বিস্তার করেছিল। তারা আসলে নিজেদের অপরাধই মুসলমানদের উপর চাপিয়ে দিচ্ছে। পশ্চিমারা যে নিজেরাই এই কাজটি করেছিল তথা এক হাতে তলোয়ার এবং অন্যহাতে বাইবেল নিয়ে সমগ্র বিশ্বকে শৃঙ্খলিত করার অভিযান শুরু করেছিল তা বেমালুম চেপে যাওয়া হচ্ছে। কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কারের কাহিনী পড়লেই পশ্চিমাদের সেই ঘৃণ্য অভিযান সম্পর্কে কিছুটা আঁচ করা যায়। এইসব অভিযানের ফলে বিশ্বে ইউরোপীয়দের ঔপনিবেশ, শোষণ, নির্যাতনের রাস্তা তৈরি হয়। উত্তর আমেরিকা, দক্ষিণ আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়ায় ইউরোপিয়ান সাদা মানুষের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছে। তিনটি মহাদেশকেই তারা নিজেদের কুক্ষিগত করে ফেলেছে। আর এশিয়া এবং আফ্রিকাকে সরাসরি কুক্ষিগত না করলেও সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক প্রভুত্ব সৃষ্টি করেছে। পৃথিবীর অপর দুই অঞ্চল উত্তর মেরু এবং দক্ষিণ মেরুও তাদের নিয়ন্ত্রণে। তারা যিশুর বাণী প্রচার এবং প্রসার করার কাজ করেই যাচ্ছে।
অন্যদিকে পাঁচ শতাব্দীর পরিক্রমায় কলম্বাস হয়েছেন কিংবদন্তি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিশেষ করে ইতালিয়ান ও স্পেনিশরা তাকে একজন মহান দূরদৃষ্টিসম্পন্ন, অদম্য অনুসন্ধানকারী, বীর হিসেবে সমাদর করে থাকে। প্রতি বছর অক্টোবরের দ্বিতীয় সোমবার সরকারি ছুটির দিন হিসেবে উদযাপিত হয়। নাইটস অব কলম্বাস নামের একটি ক্যাথলিক সংগঠন বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে। যদিও সাম্প্রতিককালে নানা ঘটনায় কলম্বাসের অনেক কাজই নির্মম, জঘন্য হিসেবে প্রতীয়মান হচ্ছে, তবুও তাকে নিয়ে বীরপূজার কমতি নেই।
ঠিক কবে কলম্বাস জন্মগ্রহণ করেছিলেন তা জানা যায় না। তার জন্ম ও পরিচিতি নিয়ে অনেক কিছু এখনো অজানা রয়ে গেছে। অনেকে তাকে ইতালিয়ান, কেউ কেউ তাকে স্পেনিশও বলে থাকে। এমনকি তিনি পরিচয় গোপন করে থাকা ইহুদিও হতে পারেন। তখন ইহুদিদের ওপর নির্যাতন করা হতো। তাই তার পরিচয় গোপন করাটা অসম্ভব নয়। তিনি নিজেও তার জন্ম-পরিচয় প্রকাশ করতে চাননি। একবার এক প্রশ্নের জবাবে বলেছিলেন, ‘আমি কোথাও থেকে আসিনি’। একটি ভাষ্যে বলা হয়ে থাকে, ১৪৫১ সালের ২৫ আগস্ট থেকে ৩১ অক্টোবরের মধ্যে জেনোয়ায় তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তখন জেনোয়া ছিল ইতালির একটি স্বশাসিত এলাকা। সমুদ্রবন্দর হিসেবেও তার খ্যাতি ছিল। ইতালির ভাষায় পিতা-মাতা তার নাম রেখেছিল ক্রিস্টোফোরো কোলোম্বো (ঈৎরংঃড়ভড়ৎড় ঈড়ষড়সনড়)। তবে ইংরেজিতে তাকে বলা হয়  ঈৎরংঃড়ঢ়যবৎ ঈড়ষঁসনঁং। অবশ্য স্পেনে গিয়ে তিনি নিজেকে পরিচিত করতেন ক্রিস্টোবাল কোলোন (ঈৎরংঃড়নধষ ঈড়ষড়হ) বলে। তার পিতা ডোমিনিকো কলম্বো ছিলেন পশম বয়নকারী। তবে আয় বাড়ানোর জন্য তিনি প্রহরী এবং খন্ডকালীন মদের ব্যবসাও করতেন। তার মাতা সুসানা ফন্টোনারসাও ছিলেন পশম বয়নকারীর কন্যা। কলম্বাস ছিলেন তার ৫ ভাই-বোনের সবার বড়। গির্জাতেই তিনি পড়াশুনা শুরু করেন। কলম্বাস ছিলেন পাভিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র। তিনি গণিত ও জ্যামিতিতে ব্যুৎপত্তি লাভ করেছিলেন। অবশ্য তার শৈশব সম্পর্কে খুব বেশি কিছু জানা যায় না। তবে পিতাই তার মাঝে উচ্চাভিলাষ জাগিয়ে তোলেন। তাকে জাহাজে কাজ করতে অনুপ্রেরণা দেন। তিনি তা করেন। ১৪৭৬ সালে ভিনসেন্ট অন্তরীপে তার জাহাজডুবির পর তিনি পর্তুগালে চলে যান এবং সেখানেই তার নাবিকজীবন শুরু হয়। জাতনাবিক কলম্বাসের স্বপ্ন ছিল আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে ভারতবর্ষে পৌঁছানো।
কলম্বাস সেকালে বিদ্যমান সকল মানচিত্র বিশ্লেষণ করে পশ্চিম দিক থেকে তার অভিযান পরিচালনা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। এমনকি আরব ভৌগোলিকদের মানচিত্রও বিশ্লেষণ করেছিলেন। এই সব মানচিত্রের ভুল-ভ্রান্তিই তাকে আমেরিকা পৌঁছে দেয়। বাইবেলের ভাষ্য (?) অনুযায়ী তখন মনে করা হতো পৃথিবীর ৭ ভাগের ৬ ভাগই স্থল আর একভাগ পানি। কিন্তু বাস্তবে নেমে গিয়ে তিনি ভিন্ন কিছু দেখতে পেলেন। তবে তিনিই যে প্রথম পশ্চিম গোলার্ধে পৌঁছেছিলেন, তা নয়। তারও আগে ভাইকিংরা ১০০০ সালের দিকে সেখানে বসতি স্থাপন করেছিলেন। তবে সেই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। অনেক আরব ভৌগোলিকও জানতেন পশ্চিম গোলার্ধে ভূখন্ড থাকার কথা। এমনকি কলম্বাসের সেখানে পৌঁছানোর প্রায় তিন শ’ বছর আগে আরব নাবিকরা পৌঁছেছিলো বলেও অনেকে মনে করে। গ্রিনল্যান্ডে একটি আরব মুসলমান রাজ্যও স্থাপিত হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়।
ভারত, চীন, জাপানসহ এশিয়ার দিকে ইউরোপিয়ানদের নজর ছিল কয়েকটি কারণে। সেই প্রাচীনকাল থেকেই ইন্ডিয়া বা হিন্দুস্থানের প্রতি লোভ ছিল ইউরোপের। তাদের কাছে হিন্দুস্থান মানেই যার খাদ্যভান্ডার থাকে সর্বদা পরিপূর্ণ, যেখানে পথেঘাটে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে রাশি রাশি সোনাদানা আর হীরকখন্ড। এগুলোর জন্য হিন্দুস্থান দখলের জন্য প্রাচীনকাল থেকেই তারা আগ্রাসন চালিয়েছে। চীন, জাপান প্রভৃতি এলাকার কৃষিজ ও প্রাকৃতিক সম্পদও তারা গ্রাস করার পরিকল্পনা করেছিল। আলেকজান্ডারের অভিযানও ছিল প্রায় একই কারণে। একদিকে এশিয়ার সম্পদ, তার উপর খ্রিস্টধর্ম প্রচার ও প্রসারের জন্য তারা অভিযান পরিচালনা করতে মরিয়া হয়ে ওঠে। প্রাচীনকাল থেকে এশিয়া তথা ভারতের সাথে ইউরোপের যে যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল, তা ইসলামের আবির্ভাবের পর ছিন্ন হয়ে যায়। ক্রুসেডের মাধ্যমে তারা তা পুনরায় চালুর উদ্যোগ নিয়েছিল। কিন্তু ক্রুসেড ব্যর্থ হওয়ায় তারা নতুন করে ভাবতে থাকে। এর মধ্যে (১৪৫৩ সালে) আবার কনস্টানটিনোপলও মুসলমানরা জয় করে নিয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপেও তুর্কি মুসলমানদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। তাই সমুদ্রপথই হয়ে দাঁড়ায় একমাত্র ভরসা। সমুদ্রপথেই ভারত আবিষ্কারের কথা ভাবতে থাকে ইউরোপিয়ান দেশগুলো। মধ্যযুগের অন্ধকারের অবসানের প্রাক্কালে সমুদ্রপথে হিন্দুস্থান আবিষ্কার করতে যেয়ে তারা গোটা বিশ্বকেই জয় করে ফেলে। ক্রুসেড শেষ হওয়ার প্রায় দুই শ’ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে তখন।
যাই হোক নানা দেশ ভ্রমণ এবং নানা কিছু বিশ্লেষণের পর কলম্বাস বুঝতে পারেন, ভারত বা এশিয়ায় পৌঁছা তার পক্ষে সম্ভব। ১৪৮৩ সালে তিনি প্রথমে তদানীন্তন পরাশক্তি পর্তুগালে যান তার পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নে সহায়তা লাভের জন্য। কিন্তু সেখানকার রাজন্যবর্গকে তিনি তার প্রকল্পটিতে বিনিয়োগ করতে রাজি করাতে পারেননি। অবশেষে ১৪৮৫ সালে পর্তুগালের প্রতিদ্বন্দ্বী স্পেনে যান। স্পেনের রাজা ফার্ডিনান্ড এবং রানি ইসাবেলা তখন স্পেন থেকে মুসলমানদের নির্মমভাবে বিতারণের কাজ করছিলেন।
পুরো স্পেনে তখন ইসলামবিরোধী আবেগ বিদ্যমান। কলম্বাসও তাতে শরিক হলেন। তিনি পাদ্রি আর ব্যবসায়ীদের প্রতিশ্রুতি দিলেন এশিয়া আবিষ্কারের ফলে যে লাভ হবে, তা তিনি মুসলমানদের কবল থেকে জেরুসালেম উদ্ধারে ব্যয় করবেন। জেরুসালেমে ইহুদিদের জন্য একটি মন্দির নির্মাণের প্রতিশ্রুতিও দেন। এর মাধ্যমে তিনি ইহুদি থেকে ধর্মান্তরিত খ্রিস্টান এবং জন্মগত খ্রিস্টান সবারই সমর্থন পেলেন। ইউরোপে ইহুদিরা তখনো অচ্ছুৎ। কাজেই তারা নতুন ভূখন্ড আবিষ্কারে নিজেদের সম্ভাবনা দেখবে, এটাই স্বাভাবিক। ইহুদিদের এই অভিযানে অংশ নেয়ার কথা অনেকেই বলে থাকেন। বলা হয়ে থাকে, কলম্বাসের নৌপথের চার্ট তৈরি করে দিয়েছিলেন এক ইহুদি। আরেক ইহুদি তার ভ্রমণপঞ্জি এবং অ্যাসট্রোনমিক্যাল টেবিল বানিয়ে দেন। ইহুদি রাব্বির বানানো অ্যাসট্রোনমিক্যাল চার্টের মাধ্যমে তিনি সঠিকভাবে চন্দ্র ও সূর্য গ্রহণ সম্পর্কে নির্ভুল ভবিষ্যদ্বাণী করে স্থানীয়দের অবাক করে দিয়েছিলেন। জাহাজের চিকিৎসকও ছিলেন একজন ইহুদি। জাহাজ আমেরিকায় ভেড়ার পর কলম্বাস নাকি একজন ইহুদিকেই প্রথম ভূখন্ডে নামিয়ে ছিলেন। এ কারণেই অনেকে এতটুকু পর্যন্ত দাবি করেন যে, স্বয়ং কলম্বাসও ইহুদি ছিলেন। তবে রানি ইসাবেলার নিকট থেকে তিনি সমর্থন পান সবচেয়ে বেশি। কলম্বাস এবং রানি উভয়েই ছিলেন প্রায় সমবয়সী। রানির আধ্যাত্মিক গুরু পাদ্রি হারনান্ডো ডি ডালাভেবারও রানির উপর প্রভাব বিস্তার করেছিলেন কলম্বাসের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সহযোগিতা করার জন্য। জনশ্রুতি আছে, কলম্বাসের অভিযানের খরচ জোগাড় করার জন্য রানিকে তার গয়না পর্যন্ত বন্ধক রাখতে হয়েছিল।
কলম্বাস অবশ্য বেশ কিছু শর্ত দিয়েছিলেন তার অভিযানের ব্যাপারে। প্রথমত তাকে ‘অভিজাত’ মর্যাদা দিতে হবে। তাছাড়া বিজিত এলাকায় তার এবং তার বংশধরদের বংশানুক্রমিক শাসন থাকতে হবে এবং প্রাপ্ত সম্পদের একটি অংশ তাকে দিতে হবে। রানি এতে অবশ্য রাজি হননি। এ জন্য তিনি তার অভিযানকে সমর্থন প্রশ্নে ফ্রান্সে এবং ইংল্যান্ডে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য তার ভাইকে সেখানে পাঠান। তিনি নিজে অবশ্য স্পেনেই থেকে গেলেন।
এর মধ্যে স্পেন সেখানকার শেষ মুসলিম এলাকা গ্রানাডা জয় করেছে (১৪৯২ সালের জানুয়ারি মাসে)। গ্রানাডা জয়ের উৎসবে কলম্বাসও শরিক ছিলেন। এই জয় খ্রিস্টানদের আরো আগ্রাসী করে তোলে। তারা এখন সমগ্র বিশ্ব থেকে ইসলামকে মুছে ফেলার স্বপ্ন দেখতে থাকে। তারা নতুন নতুন এলাকা জয় করে সেখানকার ধন-সম্পদ লুট করার সাথে সাথে খ্রিস্টান ধর্মের পতাকাও উড়াতে আগ্রহী হয়ে ওঠে। এসময়েই কলম্বাস পেয়ে যান এশিয়া আবিষ্কারের অনুমতি। তাকে উপাধি দেয়া হলো ‘অ্যাডমিরাল অব দি ওশান্স’। দক্ষিণ স্পেনের টিনটো নদীতে অবস্থিত পালোস বন্দর থেকে তিনটি জাহাজ (পিন্টা, নিনা ও সান্তা মারিয়া) যোগে তারা রওনা হলেন ১৪৯২ সালের ৩ আগস্ট। জাহাজে প্রায় ৯০ জন ক্রু ছিল। এছাড়া অনুবাদক, ৩ জন চিকিৎসক, চাকর, সচিব, হিসাবরক্ষকসহ আরো কিছু কর্মকর্তা ও নাবিক ছিল। তবে এই সফরের জন্য সঙ্গী-সাথী জোগাড় করাটা সহজ ছিল না। ভদ্র কেউ এই অভিযানে শরিক হতে চাইতো না। তাই তিনি খুনি, ডাকাত, ছিনতাইকারী, সমাজবিরোধী ইত্যাদি ধরনের লোকদের তার অভিযানে সঙ্গী করাতে চাইলেন। তাদের নিয়েই ভারত আবিষ্কারের পরিকল্পনা প্রণয়নের খুঁটিনাটি আলোচনা করেন বিখ্যাত নাবিক কলম্বাস। রুদ্ধদ্বার বৈঠকে কুখ্যাত খুনি, ডাকাত কিংবা ছিনতাইকারীরা তার পরিকল্পনার কথা শুনে। স্পেনের রাজা ফার্ডিনান্ড ও রানি ইসাবেলাকে অনুরোধ-উপরোধ করে কলম্বাস এদের ছাড়িয়ে আনেন। কিন্তু তবুও খুনি, ডাকাত, ছিনতাইবাজরা কিছুতেই কলম্বাসের ভয়ঙ্কর সমুদ্রযাত্রার সঙ্গী হতে সহজে রাজি হয়নি। কারণ তখনকার জাহাজ ছিল খুবই নিম্নমানের। ভিতরে পানি ঢুকে যেত। জাহাজগুলো ছিল কাঠের। কোনো ইঞ্জিন বা যান্ত্রিক ব্যবস্থা ছিল না। ঘুমানো কিংবা বিশ্রাম নেয়ার কোনো বিশেষ ব্যবস্থা ছিল না। জাহাজে প্রধান খাবার ছিল নোনতা মাংস ও মাছের স্ট্র, শক্ত বিস্কুট, পানি মিশ্রিত মদ, ফলমূল। ফলমূলও কয়েক দিন পরই পচে যেত। খাবার পানিতে ভাসতো বড় বড় পোকা। তাই টাইফয়েড, স্কার্ভি রোগ আর শুকনা খাবার চিবিয়ে দাঁত আর মাড়ির রোগ ছিল অবধারিত। অন্যান্য বিপদ-আপদ তো আছেই। তাই এই দাগি আসামিরাও কলম্বাসের প্রস্তাবে নারাজ। কলম্বাসও হাল ছাড়ার পাত্র নন। তিনি তাদের সম্ভাব্য আর্থিক সুবিধার লোভ দেখালেন। সেই সাথে পরকালের ‘আজাব’ হ্রাসের কথাও বলেন। তিনি  বিনামূল্যে তাদেরকে ‘ইন্ডালজেন্স’ (মধ্যযুগে পাপীদের ক্ষমা করে নরকবাস লাঘব করার জন্য গির্জার যাজকরা ইন্ডালজেন্স নামক এক ধরনের দলিল বিক্রি করতো। চাইলে স্বর্গের টিকিটও পাওয়া যেতে পারতো আরো কিছু পয়সা খরচ করে) কিনে নরকবাস কমিয়ে দেয়ার প্রস্তাব দেন। তিনি আস্থা অর্জনের জন্য সত্যি সত্যিই গির্জার যাজকদের কাছ থেকে কলম্বাস এই দাগি আসামিদের জন্য পরলোকের নরকবাসের সময়সীমা কমিয়ে আনতে প্রত্যেককে ইন্ডালজেন্স কিনে দেন। তাছাড়া জেল থেকে ছাড়া পেয়ে শহরে দাগি আসামিরা হয়ে যেত অচ্ছুৎ। এবার তারা ইহকাল ও পরকালের লাভ দেখতে পেল। কলম্বাস তাদের জেল থেকে ছাড়িয়ে এনেছেন। দিয়েছেন বিনামূল্যে ইন্ডালজেন্স। তাই কৃতজ্ঞতাবশত খুনি, ডাকাত, পকেটমার, ছিনতাইকারীরা অবশেষে কলম্বাসের সঙ্গী হলো। শুরু হলো এশিয়া জয়ের অভিযান। সাগরে নামলেন। কিন্তু কোথায় শেষ হবে, কেউ বলতে পারলো না। তাই তারা ভাসতেই থাকলেন। দীর্ঘ দু’মাস পরও কোনো স্থলভাগের দেখা না পাওয়ায় সমুদ্রযাত্রার কষ্ট সহ্যের সীমার বাইরে গেলে অন্যরা বিদ্রোহ পর্যন্ত করেছিল। তবে তিনি সবাইকে আর মাত্র দু’দিন অপেক্ষা করতে বলেন। এর মধ্যে ডাঙার সন্ধান না পাওয়া গেলে দেশে ফিরে যাওয়া হবে। এতে কাজ হয়। চূড়ান্ত মুহূর্তের আগে তারা ভূমির দেখা পেল।
১১ অক্টোবর সন্ধ্যায় কিংবা ১২ অক্টোবর ভোরে পিন্টা জাহাজ থেকে এক নাবিক ‘ভূমি, ভূমি’ বলে চিৎকার করে উঠে। রানি ইসাবেলা অবশ্য আগেই ঘোষণা দিয়েছিলেন, যে আগে ভূমি দেখবে, তাকে পুরস্কৃত করা হবে। তাই কলম্বাস ওই নাবিকের দাবি বাতিল করে দিয়ে বলেন, তিনি আরো আগেই ভূমি দেখেছিলেন। তবে কাউকে কিছু বলেননি। আবিষ্কৃত হলো ‘নুয়েভো মুনদো’ বা নতুন দুনিয়া।
১২ অক্টোবরের দুপুরের আগে তারা নোঙর করে। স্থানটি ঠিক কোনটি ছিল তা নিয়ে মতবিরোধ আছে। তবে বেশির ভাগই মনে করেন সেটি ছিল বর্তমানে এল সালভাদরের রাজধানী সান সালভাদর। কলম্বাস মনে করেছিলেন, তিনি চীন বা জাপানের কাছাকাছি কোথায়ও এসেছেন। কাছেই আছে ভারত। এই ভুল ভাঙতে অবশ্য আরো প্রায় ৩০ বছর সময় লেগেছিল (যদিও ১৫ শ’ শতক থেকেই অনেকে বিশ্বাস করতো পৃথিবী গোলাকার, কিন্তু কলম্বাসের মতো অনেকে তখন মনে করতে পারছিল না যে ইউরোপ ও এশিয়ার মাঝখানে বিশাল কোনো ভূখন্ড থাকতে পারে। ঘুণাক্ষরেও তার মনে হয়নি তিনি নতুন মহাদেশে পৌঁছেছেন। তাই তিনি সেখানকার বাসিন্দাদের নামকরণ করলেন ‘ইন্ডিয়োস’ বলে। তবে এটি যে আসল ‘ইন্ডিয়া’ নয়, তা ধরা পড়ে বেশ কয়েক বছর পর। পেশায় কসাই হিসেবে প্রথম জীবন শুরু করা আরেক ইতালির নাবিক আমেরিগো ভেপসুচির কাছে। তার নামেই হয় আমেরিকার নাম।
কলম্বাস স্থানটির নাম করেন সান সালভাদর (স্পেনিশ ভাষায় (ঐড়ষু ঝধারড়ৎ)। স্থানীয় অধিবাসী তিয়ানোরা অবশ্য স্থানটিকে বলতো ‘ওয়ানাহানি’।
সান সালভাদরের বাসিন্দা তাইনোরা প্রাথমিক অস্বস্তিকর অবস্থার পর সেদিন ক্রিস্টোফার কলম্বাস ও তার দলকে সাদরে বরণ করে নিয়েছিল। আদর আপ্যায়নও করেছিল যথাযোগ্য সম্মানের সাথে। তখনকার সার্বিক অবস্থা বিবেচনা করলে বলতে হবে, ইউরোপের সভ্যতার তুলনায় স্থানীয়রা অনেক এগিয়ে ছিল। তারা সুতি কাপড় বয়নে বেশ দক্ষ ছিল। তাদের সামাজিক ও সরকার পরিচালনা ব্যবস্থা বেশ উন্নত ছিল। ইউরোপের সাদা মানুষদের তুলনায় তারা অবশ্য কয়েকটি দিকে পিছিয়ে ছিল। যেমন তাদের অন্য দেশের সম্পদ গ্রাস করার কোন অভিলাষ ছিল না। অযথা মারামারি হানাহানি করার অভিপ্রায় ছিল না। আর গায়ের রং ছিল লালচে। গরমের দেশ হওয়ায় তারা দেহের একটি বড় অংশই অনাবৃত রাখতো, ইউরোপিয়ানদের মতো পুরো দেহ ঢেকে রাখার প্রয়োজন পড়তো না। এগুলোই ছিল কলম্বাস এবং তার স্বদেশীদের চোখে ‘বর্বরতা’ আর ‘অসভ্যতার’ লক্ষণ। স্পেনের রাজা ও রানিকে কলম্বাস লিখেছিলেন, ‘এখানকার মানুষজন এতোই সুবোধ ও শান্তিপ্রিয় যে, মহামান্য রাজপদে আমি শপথ করে বলতে পারি সারা দুনিয়াতে এদের চেয়ে ভালো কোন জাতি আর নেই। প্রতিবেশীদের তারা একান্ত আপনজনের মতোই ভালোবাসে। তাদের আচার-আচরণও অতীব ভদ্র এবং মিষ্টি। মুখে যেন হাসি লেগেই থাকে। এটা অবশ্য ঠিক যে তারা বেশ কিছুটা নগ্ন, তবুও তাদের ব্যবহার ও সৌন্দর্যবোধ অতীব প্রশংসাযোগ্য।’
তবে তাদের এই গুণাবলিকে অখ্রিস্টীয় বা বর্বরতার চিহ্ন বলে যতটা না গণ্য করা হয়েছিল, তার চেয়ে বেশি গণ্য করা হয়েছিল দুর্বলতা হিসেবে। একজন ন্যায়পরায়ণ ইউরোপিয়ান হিসেবে কলম্বাসের দৃঢ়বিশ্বাস জন্মেছিল, এইসব লোকজনকে চাষাবাদ ও অন্যান্য আবশ্যকীয় কাজকর্মে এমনভাবে লাগানো উচিত, যাতে তারা ‘ইউরোপীয় জীবনপ্রণালীতে’ অভ্যস্ত হয়ে উঠতে পারে। সেই থেকে পরের ৪ শ’ বছর লাখ কোটি ইউরোপীয় শ্বেতাঙ্গ এবং তাদের বংশধররা হাজারো রকম চেষ্টা করেছে নব্য আবিষ্কৃত এই ভূ-ভাগের জনগোষ্ঠীর ঘাড়ে নিজেদের জীবনাচার চাপিয়ে দিতে।
যারা কলম্বাস ও তাদের দলকে নিরাপদ আশ্রয় দিয়েছিল, প্রতিদানে তারা কী পেয়েছিল? কলম্বাস তাইনোদের ১০ জনকে অপহরণ করে নিয়ে যায় স্পেনে। উদ্দেশ্য, উপহার হিসেবে অর্পণ করবেন মহামান্য রাজা-রানির পদযুগলে। সেই সাথে তাদেরকে শেখাবেন ইউরোপিয়ান জীবনাচার। স্পেনে পৌঁছানোর আগেই কয়েকজন মারা যায়। অবশ্য তার আগেই তাদের সবাইকে দীক্ষা দেওয়া হয়েছিল পবিত্র খ্রিস্টান ধর্মে। যারা মারা গেল, তাদের নিয়েও তাদের কোন আফসোস ছিল না। এক হিদেন বর্বর ইন্ডিয়ান খ্রিস্টান হিসেবে ‘স্বর্গে’ যেতে পারলো, ভেবে স্পেনিশরা মহাখুশি। স্পেনিশরা যদি দেশটি দখল না করতো, তবে তারা নির্ঘাত নরকে যেত! তারা এই সুসংবাদটি ছড়িয়ে দিলো গোটা পশ্চিম ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জে।
আর এরপর থেকে দলে দলে ইউরোপিয়ানরা ছুটতে থাকে আমেরিকার প্রাকৃতিক আর খনিজ সম্পদ হাতিয়ে নেয়ার জন্য। আর সভ্য বানানোর জন্য আসতে থাকেন পাদ্রি সাহেবরা। স্থানীয় বাসিন্দারা নিজদেশে পরবাসী হয়ে পড়েন। শৃঙ্খল পরে তাদের হাতে পায়ে। ইউরোপ থেকে বয়ে আনা ম্যালেরিয়া, গুটি বসন্ত, হাম, টাইফয়েডসহ নানা রোগে আক্রান্ত হতে থাকে আদিবাসীরা। তাদের দেহে এই সব রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতা না থাকায় তারা সহজেই মারা পড়তে থাকে।
কলম্বাস সাথে সাথেই ফেরেননি। তিনি আশপাশের অনেক এলাকায়ও অভিযান পরিচালনা করেছিলেন। ২৪ অক্টোবর তিনি আবিষ্কার করলেন কিউবা। এরপর চললেন দক্ষিণ-পূর্বমুখী এবং এসে পৌঁছলেন লা ইসলাএসপানিওলা বা হিসপানিওলায়। এখানকার উপকূলে তিনি সান্তা মারিয়া জাহাজটিকে হারান। পরে একটি দুর্গ বানিয়ে ৪০ জনকে রেখে যান অনুসন্ধান চালানোর জন্য। সাত মাস পর তিনি দেশের পথ ধরেন। তিনি বার্সেলোনায় বেশ উৎসবমুখর পরিবেশে নিয়ে আসা স্বর্ণ, তোতাপাখি, মসল্লা, বন্দিদের প্রদর্শন করেন। জনপ্রিয়তার তুঙ্গে উঠেন তিনি। ফলে শীঘ্রই দ্বিতীয় অভিযান শুরু করতে সক্ষম হন। ১৪৯৩ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর অন্তত ১৭টি জাহাজ রওনা হয়। এতে ১৩ শ’ বেতনভোগী ছাড়াও প্রায় ২০০ বেসরকারি বিনিয়োগকারী ছিল। একটি সেনাবাহিনীর দলও ছিল। আর ছিল পাদ্রি। ঔপনিবেশ স্থাপনের পাশাপাশি খ্রিস্টান ধর্মের প্রচার ও প্রসারের গুরুত্ব দেয়া হয়েছিল। এই অভিযানের ফল অবশ্য প্রথমটির মতো সুখকর হয়নি। তার জনপ্রিয়তা অনেকটা কমে যায়। তারপরও ১৪৯৮ সালে ৬টি জাহাজ নিয়ে তৃতীয় অভিযানে বের হন। এবার আরো কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়েন। তার আবিষ্কৃত অধিকাংশ জায়গায় তিনি তার পারিবারিক শাসন কায়েম করেছিলেন। কিন্তু তাদের অত্যাচার ও ক্ষমতার অপব্যবহারে শুধু আদিবাসীরাই নয়, অভিবাসীরাও ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। কলম্বাস এমনকি তার ভাই ও ছেলেদের সাথে শৃঙ্খলিতও হন। স্পেনের রাজন্যবর্গও বুঝতে পারেন, অভিযাত্রী হিসেবে কলম্বাস অত্যন্ত ভালো হলেও শাসক হিসেবে তা নন। তাই তাদের শাসনকাজ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। তিনি ১৫০১ সালে তার চতুর্থ ও শেষ অভিযানে নামেন। এটাও খুব বেশি ফলপ্রসূ হয়নি। কলম্বাসের শেষ জীবন খুব কষ্টে না কাটলেও তেমন স্বাচ্ছন্দ্যকর ছিল না।
কলম্বাসের অভিযানে ইউরোপে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। আরো অনেকেই আকৃষ্ট হয় অভিযান পরিচালনায়। এই অভিযাত্রীদের ডাকা হতো ‘কংকিস্তাদোর’ নামে-ইংরেজিতে যার অর্থ ঈড়হয়ঁবৎড়ৎং তথা বিজয়ী। এই কংকিস্তাদোদের সঙ্গী হয় পাদ্রিরা। উদ্দেশ্য খ্রিস্টান ধর্মের প্রচার ও প্রসার।
এইসব কংকিস্তাদোরদের একজন হলেন এরনান কোরতেস। ১৫১৯ সালে তিনি ১১টি জাহাজ, ৫০৮ জন সৈন্য, ১০০ নাবিক ও ১৬টি ঘোড়া নিয়ে মেক্সিকোর দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলে পৌঁছে স্থাপন করলেন ভেরাক্রুস শহর। পরে তিনি তক্সকালা জাতির সাহায্যে দখল করে নেন রাজধানী টেনোচতিতলান শহর, যা বর্তমানে পরিচিত মেক্সিকো সিটি নামে। এরপর আসেন কুখ্যাত ফ্রান্সিসকো পিসারো। ১৫৩১ সালে তিনি পেরুতে পৌঁছেন। কাখামারকা শহরের কাছে তার সাক্ষাৎ হলো ইনকা রাজা আতাহুয়ালপার সাথে। তিনি ইনকা রাজাকে খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করার প্রস্তাব দেন। রাজা তা অস্বীকার করেন। রাজাকে বন্দি করা হয়। পিসারো চেয়েছিলেন ইনকাদের সকল স্বর্ণ দখল করতে। তার কথা মতো যে ঘরে রাজা বন্দি ছিলেন সে ঘর স্বর্ণ দিয়ে ভরে দেয়া সত্ত্বেও রাজাকে হত্যা করে দেশে নিজের কর্তৃত্ব স্থাপন করেন।
কলম্বাস সম্ভবত গেঁটেবাতে আক্রান্ত হয়ে মারা যান ১৫০৬ সালের ২০ মে। তবে তার জন্মের মতো মৃত্যুর পরবর্তী অবস্থা নিয়েও বিভ্রান্তি রয়েছে। জীবিতকালে তিনি যেমন ভ্রমণ করেছেন, মৃত্যুর পরও তা থামেনি। স্পেনের ভ্যালাডোলিডে তিনি মারা যান বলে বলা হয়। তাকে প্রথমে কবর দেয়া হয় সেভিলে। তারপর তার ইচ্ছার প্রতি সম্মান দেখাতে ডমিনিকান রিপাবলিকের সান্টো ডমিনগোতে তার মরদেহ সরানো হয়। পরে হিসপানিওলা আইল্যান্ড ফরাসিদের দখলে গেলে তার দেহ কিউবায় এবং সেখান থেকে আবার সেভিলে ফিরিয়ে আনা হয়। সেখানেই তাকে জাতীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়। তার সমাধি সম্পর্কে এটাই সবচেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্য ভাষ্য। তবে ডমিনিকানরা দাবি করছে, কলম্বাসের দেহ তাদের দেশ থেকে কখনো সরানো হয়নি। এমনকি সেখানকার সরকার কবরটি কার তা পরীক্ষার অনুমতিও দেয়নি। অনেকে মনে করছে, সেখানে শায়িত ব্যক্তিটি অন্য কেউ। কিন্তু সেই গোপনীয়তা ফাঁস যাতে না হয়, সেই জন্য এই ব্যবস্থা।
তবে কলম্বাসের মৃত্যুর ৫ শ’ বছর পূর্তি (২০০৬ সালের ২০ মে) উপলক্ষে তার পরিচিতি উদঘাটনে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের উদ্যোগ নেয়া হয়। কলম্বাসের এক ছেলে ফারনান্ডোর বংশধরদের টিস্যুর ডিএনএ পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হয়।

SHARE

Leave a Reply