Home ভ্রমণ ঘুরে এলাম সিলেট -নাহিদ জিবরান

ঘুরে এলাম সিলেট -নাহিদ জিবরান

রোযার ঈদের কয়েকদিন বাকি।
মনটা ছটফট করছিল কোথাও থেকে ঘুরে আসার জন্য।
কিন্তু কিভাবে কি হবে সেটা বুঝতে পারছিলাম না।
মনটা কেমন যেন ছটফট করছে। কিছুই যেন আর ভালো লাগছিলো না!
চিন্তা করলাম বন্ধুদের একসাথে করে আমরা ইফতারের আয়োজন করলে কেমন হয়। তাহলে সেখানেই বলা যাবে এবার ঈদের প্ল্যানটা।
কথামতো সবাই মিলে ইফতারের আয়োজন করলাম। এভাবে ১৫ জন একসাথে কখনো ইফতার করিনি। এতো আনন্দ! সেটা বলে বুঝানো যাবে না।
ইফতার করে সবাই একত্রিত হয়ে বললাম ঈদের পরের দিন আমরা ঢাকার বাইরে যেতে চাচ্ছি তোমরা কি রাজি আছো। কেউ কেউ বললো কোন জায়গায় যাওয়া যায়। আমি বললাম কক্সবাজার যেতে যেতে আমি ক্লান্ত হয়ে গেছি। সেখানে গেলে আর ভালো লাগবে না। তাহলে কী করা যায়। তখন আমি বললাম পাহাড়ের দিকে চলো যাই। সবাই একটু ভেবে বললো ঠিক আছে আমরা সিলেট যেতে পারি। এক কথায় সবাই রাজি হয়ে বললো, ঠিক আছে ঈদের পরদিন আমরা সিলেট যাব।
যেই কথা সেই কাজ! আমরা ঈদের পরের দিন সিলেট যাব ফাইনাল করলাম। কিন্তু বাসায় তো আমার বলা হয়নি যে সিলেট যাব। যথারীতি ঈদ চলে এলো।
এখন সব ফ্রেন্ডকে ডেকে বললাম আমরা তাহলে কালকে যাচ্ছি। টিকেট তো কাটা লাগবে। তখন দেখা গেল যাওয়ার জন্য কেউ রাজি হচ্ছে না। একেক জন একেক অজুহাত দিচ্ছে। কেউ বলে ওখানে বৃষ্টি বেশি, ঘুরে মজা পাবো না। কেউ বলে কুরবানির ঈদে যাব। কেউ বলে টাকার সমস্যা। সব মিলিয়ে নাজেহাল অবস্থা। সবাই চলে গেল কিন্তু আমার ২টা ফ্রেন্ড বললো কেউ না গেলে নাই। আমরা তিনজন মিলে যাব। যেই কথা সেই কাজ।
ঈদের দিন বাসায় জানালাম আব্বাজানকে। আব্বাজান বললেন কবে যাবে?
আমি বললাম আগামীকাল। আব্বাজান আমাকে আর কিছু বললেন না। আমরা বাসের টিকিট কাটলাম। পরদিন সকাল সাড়ে ৭টায় শ্যামলি বাস কাউন্টারে উপস্থিত হলাম। তার কিছুক্ষণ পর বাস ছাড়লো। মনের মধ্যে খুশির জোয়ার বইতে লাগলো। কারণ আমি কোনো সময় সিলেট যাইনি।
আমরা সকালের নাস্তা খেলাম উজান ভাটি নামক বড় এক রেস্তোরাঁয়। সেখান থেকে নাস্তা করে আবার জার্নি শুরু করলাম।
দীর্ঘ পথ! প্রচন্ড গরমের মধ্যেও খুব আনন্দ লাগছিলো আমাদের। মৌলভীবাজার পৌঁছানোর পর থেকে আঁকাবাঁকা পথ। খুবই ভালো লাগছিলো রাস্তা দেখে। মনে হচ্ছিল বাস থামিয়ে আঁকাবাঁকা পথ দিয়ে হেঁটে যাই। রাস্তার দুই ধারে চা বাগান সারিবদ্ধভাবে আছে। আবার কোনো কোনো জায়গায় বনবাদাড়ে ভরপুর। কী অপরূপ দৃশ্য! দেখলেই মন ভরে যায়। মনে হচ্ছে যেন পাহাড়ের বুক চিরে আমাদের বাস যাচ্ছে।
আকাশের দিকে তাকাতেই আমি দেখলাম এক পাশে ফাটাচেরা রোদ আর অপর পাশে ঘন মেঘের পাল। এরকম তো এর আগে কখনো দেখিনি। বাস আঁকাবাঁকা পথ দিয়ে চলছে আর আমরা একে অপরের ঘাড়ে যেয়ে পড়ছি। মনে হচ্ছে রোলার কোস্টারে বসে আছি।
এভাবেই চলে এলাম ব্রাহ্মণ বাজার। বাস থেকে নেমে আমার এক ফ্রেন্ডকে ফোন দিলাম। আসিফ আমাদেরকে রিসিভ করতে এলো। তারপর সেখান থেকে আমরা আসিফের বাড়ি যাব নাসিরাবাদ, কলেজ রোড। সেখানে যেয়ে দেখলাম ওদের বাড়ির চারপাশে রাবার বাগান, চা বাগান, ধানের জমিসহ আরো অনেক কিছু।
দুপুরের খাবার খেয়ে আমরা তার বাড়ির আশপাশে ঘুরলাম। খুবই সুন্দর জায়গা। আমার মনটা খুবই ভালো লাগছিলো। মনে হচ্ছিল এখানেই থেকে যাই। তারপর এক পাহাড় থেকে আরেক পাহাড় যাওয়ার রাস্তা ছিলো, তাই বেশি কষ্ট আমাদের হয়নি। বিকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ঘুরলাম। সেখানে দেখলাম পাহাড়ের ওপর বাসস্থান। মূলত এখানে খাসিয়ারা থাকে। এছাড়াও বেশ কিছু পাহাড়ের ওপর দেখলাম বাঙলো রয়েছে। সেখানে টুরিস্টরা থাকতে পারবেন। সন্ধ্যা হওয়ার আগেই শিয়ালের ডাক শোনা গেল। আমার বন্ধু বললো বেশিক্ষণ থাকা যাবে না এখানে। শিয়ালের পাল পাহাড়ের গর্ত থেকে বের হয়ে যাবে। তাই যতদ্রুত সম্ভব পাহাড় থেকে নেমে আশা ভালো। বন্ধুর কথামতো আমরা পাহাড় থেকে নেমে এলাম।
তারপর সেখান থেকে চলে গেলাম বাজারে মিষ্টি পান খাওয়ার জন্য। সিলেটের চা বিখ্যাত সেটা আমরা কম- বেশি সবাই জানি, কিন্তু এখানে পানও বিখ্যাত এটা জানতাম না। যাই হোক আমরা বাজারে পান খেতে গেলাম। পান কিনে খেতে না খেতেই তুমুল ঝড় শুরু হয়ে গেল। আমরা একটি দোকানের সামনে দাঁড়ালাম। কিছুক্ষণের মধ্যে বিদ্যুৎ চলে গেল এবং ভারী বৃষ্টিপাত হতে লাগলো। তখন সময়টা ছিলো আনুমানিক সন্ধ্যা ৭টা। সেই যে বৃষ্টি শুরু হলো তো হলো। আমরা বাজারে পান থেকে শুরু করে চিপস, মুড়ি, বিস্কুট, চানাচুর, কেক, জুস, রসগোল্লা ইত্যাদি খেতে শুরু করলাম। আমাদের খাবারগুলো সব শেষ হয়ে গেল কিন্তু বৃষ্টি তখনো থামলো না।
এরকম বৃষ্টি ঢাকায় কখনোই দেখিনি। আর বৃষ্টির সাথে তুমুল বজ্রপাত হতে লাগলো। বজ্রপাতের কারণে আমরা বাড়ি ফিরতে পারছিলাম না। তাই আমাদের সম্বল ছিলো নাম নাজানা সেই দোকানের সামনে। এভাবেই প্রায় সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা আমরা বাজারেই ছিলাম। তারপর একজন বৃদ্ধ লোক আমাদের কাছে এসে সিলেটের ভাষায় বললেন আপনারা কারা, আর কোথা থেকে এসেছেন? তখন আমার বন্ধু তার পরিচয় দিলো। ঠিক তখনই সেই বৃদ্ধ লোকটি আমার বন্ধুকে বুকে জড়িয়ে বললেন ছোট নবাব আপনি এতোদিন পর এসেছেন!
আমরা শুনেই অবাক হলাম। ছোট নবাব মানে!
মনে মনে কথাটি জমা করে রাখলাম, পরে বলবো আমার বন্ধুকে। তারপর বৃদ্ধ লোকটি একটা সিএনজি ডেকে এনে আমাদেরকে বাড়ি যেতে বললেন। আমরা বাড়িতে আসতে আসতে জিজ্ঞেস করলামÑআচ্ছা বন্ধু তোকে নবাব বললো কেন? তখন আমার বন্ধু একটু হেসে বললো, আমরা নবাব বংশ। তাই সেই প্রেক্ষিতে আমাকে ছোট নবাব বলে ডাকে। বন্ধুর কাছে আরো কথা শুনতে লাগলাম ব্রিটিশ আমলের না জানা অনেক গল্প।
তার দাদা ঐ এলাকার নবাব ছিলেন। উপজাতিদের থাকার স্থান দিয়েছেন। মুসলমানদের জমি দিয়েছেন, খাসিয়াদের বাসস্থানের জায়গা করে দিয়েছেন। তাদের ছেলে-মেয়েদের পড়ার খরচ দিয়েছেন। আরও অনেক কথা। আর সেই থেকে তাদেরকে উচ্চ সম্মান দিয়ে আসছেন ওদের এলাকার মানুষেরা। সত্যিই ভাবতে খুবই ভালো লাগে। যাই হোক আমরা বাড়িতে চলে এলাম। তারপর রাতে খাওয়া-দাওয়া করে শুয়ে পড়লাম। সকালে আমরা সবাই শাহজালাল মাজার, হাকালুকি হাওর, ব্রিটিশ রেলস্টেশন এগুলোতে ঘুরতে যাবো। যাইহোক এতো ক্লান্তি থাকা সত্ত্বেও আমার ঘুম আসছিলো না। তাই গল্প করতে লাগলাম। এক পর্যায়ে ফজরের আজান দিলো। আমিসহ আমার বন্ধুরা সবাই নামাজ পড়ে নিলাম।
তারপর আমি না ঘুমিয়ে একটু বাইরে বের হলাম প্রকৃতিটা একটু ভালো করে দেখার জন্য। কিন্তু তা আর হলো না। কিছুদূর যেতে না যেতেই শিয়ালের পাল রাবার বাগানের সামনে ঘোরাঘুরি করছিল। আমি ভয়ে চলে আসতে লাগলাম কিন্তু শিয়ালের সংখ্যা আরও বেড়ে গেল। আমি খুব ভয় পেয়ে গেলাম। কোন কিছু না ভেবে আমি দিলাম দৌড়! এক দৌড়ে বাড়িতে চলে এলাম।
সেদিনের বিপদের কথা মনে পড়লে এখনো গা শিউরে ওঠে। বেশ কিছুক্ষণ পর সবাইকে ঘুম থেকে উঠালাম। কারণ আমার যে আর ধৈর্য হচ্ছে না কখন বের হবো তাই ভেবে।
রওনা দিলাম শাহজালাল মাজারের দিকে। মাজারের আগে রয়েছে ব্রিটিশ রেলস্টেশন। আমরা আগে রেলস্টেশনে গেলাম। তারপর যেতে যেতে দেখলাম পাহাড় কেটে রাস্তা বানানো তার মাঝখান দিয়ে আমরা যাচ্ছি। আর এক পাশে পাহাড় তো অন্য পাশে বনবাদাড়। কী অপরূপ দৃশ্য! দেখলেই চোখ জুড়িয়ে যায়। তার কিছুদূর পর দেখলাম রাস্তা পার হচ্ছে বানর, অসংখ্য বানর। লাফালাফি, ছোটাছুটি করছে। বাহ কী চমৎকার। তবে এভাবে তারা দৌড় দিয়ে পার হওয়ার সময় গাড়িচাপায় মারা যায়।
শাহজালাল মাজার ঘুরে ক্লান্ত হয়ে গেলাম তাই দেরি না করে খাবারের রেস্টুরেন্টে গেলাম। পানসিঁতে দুপুরের খাবার খেলাম। এরপর আমরা চলে গেলাম হাকালুকি হাওরে। বেশ ভালো লাগছিলো। সেখানে বেশ কিছু সময় কাটিয়ে আমরা আমাদের বন্ধুর বাড়ির উদ্দেশে রওনা হলাম। কিছুদূর যেতে না যেতেই গাড়ির চাকা গর্তের মধ্যে ঢুকে গেল। কপাল ভালো ছিলো কেউই আহত হয়নি আল্লাহর রহমতে। আমরা বাড়িতে ফিরে এলাম। পরের দিন আমরা শ্রীমঙ্গল, শিয়া মসজিদ, চা ইনস্টিটিউট গবেষণা কেন্দ্র, চায়ের বাজার ইত্যাদি ঘুরতে যাবো।
যেতে যেতে বেশ আনন্দও করলাম। শ্রীমঙ্গলে ঢুকলাম। দুই পাশে ঘন জঙ্গল, আর প্রাণীদের আওয়াজ কানে ভেসে আসছিলো। চশমা বানর এই প্রথম দেখলাম। খুব সুন্দর। তারপর পাহাড়ের উপর উঠলাম, আর দেখলাম পানগাছ। পানগাছের লতা বড় বড় গাছের সাথে জড়িয়ে আছে। এরকম আমি এর আগে দেখিনি কখনো। তারপর সেখান থেকে চলে গেলাম চা কিনতে। চা কেনা হলে চলে গেলাম শিয়া মসজিদে। সেখানে কিছুক্ষণ থেকে আমরা চলে এলাম বাড়িতে। আর বেশি ঘুরতে পারিনি বৃষ্টির কারণে। দিনের বেলা তাপমাত্রা বেশি আর রাতের বেলা তাপমাত্রা কম।
৩ দিনের সফর আমাদের খুবই ভালো কাটলো। আসার সময় আমরা ট্রেন ভ্রমণ করলাম। ট্রেনের জার্নিটা আমার ভালো লাগে। ট্রেনের জানালা দিয়ে বাইরে তাকাতেই দেখি পাহাড়গুলো ডেকে বলছে বিদায় বন্ধু। তবে আবার এসো। আমাদের দেশের প্রাকৃতিক দৃশ্য যে খুবই সুন্দর। সময় পেলেই চলে এসো আমাদের কাছে। কমলাপুর রেলস্টেশনে চলে এলাম। এরপর যে যার বাসার দিকে রওনা দিলাম। আর ভাবলাম আল্লাহপাক সুস্থতা দান করলে আবার ছুটে যাবো কোন এক জায়গায়, কোন এক প্রান্তে।

SHARE

Leave a Reply