Home তোমাদের গল্প হলুদ এলিয়েন এবং অনামিকা -মোনোয়ার হোসেন

হলুদ এলিয়েন এবং অনামিকা -মোনোয়ার হোসেন

চৈত্রমাস চললেও সূর্যের নেই রাগী রাগী তাতানো রোদ। মাসজুড়েই চলছে বৈরী আবহাওয়া। আষাঢ় মাসের মতো মেঘলা আকাশ, কখনো বা গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি, কখনো বা মুষলধারে। এই বৈরী আবহাওয়ার কারণে মা অনামিকাকে ঘরের বাইরে যেতে নিষেধ করেন। অনামিকা বাইরে যেতে পারে না, মাঠে গিয়ে বন্ধুদের সাথে খেলতে পারে না। এতে তার মন খুব খারাপ হয়। সে যায় দাদুর কাছে। ‘দাদু, দাদু, ও দাদু?’
সবেমাত্র আসরের নামাজ শেষ করেছেন দাদু। হাতে এখনো তাসবিহ, মাথায় টুপি। দিদিভাইকে দেখে হেসে বললেন, ‘কিছু বলবে, দিদিভাই?’
‘হ্যাঁ দাদু।’
‘বলো।’
‘তোমাদের সময় তোমরা যখন ছোট্ট ছিলে, তখন কি আকাশ চৈত্রমাসে এমন মেঘলা থাকত, বৃষ্টি পড়ত?’
‘না দিদিভাই, আমরা যখন ছোট্ট ছিলাম, তখন চৈত্রমাসে রাগী রাগী তাতানো রোদ পড়ত। রোদের তাপে মাটি পুড়ে গরম হয়ে যেত, ছাতা আর পায়ে জুতা ছাড়া বাইরে বের হওয়া যেত না। আমরা বের হতাম সন্ধ্যার দিকে। মাঠে গিয়ে খেলতাম গোল্লাছুট, কানামাছি, ডাংগুলি।’
দাদুর কথা শুনে অনামিকার মন আরো খারাপ হয়ে যায়। রাগ উঠে আকাশের প্রতি। বৈরী আবহাওয়া হওয়ার আর কোনো সময় পেল না? ঠিক আমাদের খেলার সময় বৃষ্টি ঝরাতে হবে? রাগে গাল ফুলায় সে। গাল ফুলিয়ে বারান্দায় চুপচাপ বসে থাকে। বাইরে মাঝারি ফোঁটায় বৃষ্টি পড়ছে। বসে বসে বৃষ্টি দেখছিল সে। হঠাৎ তার কানে চিকন সুরে কান্নার আওয়াজ ভেসে আসে। কান খাড়া করে ভালোভাবে কান্নার আওয়াজ শুনার চেষ্টা করে সে। ‘হ্যাঁ ঠিকই তো, সত্যি, সত্যিই কে যেন কাঁদছে। কে কাঁদছে, কে?’ চারপাশে তাকায় সে। চোখ পড়ে জাম্বুরা গাছের নিচে। জাম্বুরা গাছের নিচে হলুদ রঙের ছোট কী যেন একটা দাঁড়িয়ে আছে। তার পাতং পুতুলটার মতো উচ্চতা হবে। ভাইয়া চীনে থাকে। চীন থেকে তার জন্য ওই পাতং পুতুলটা পাঠিয়েছে। পুতুলটা কথা বলতে পারে। হাসতে পারে। কাঁদতেও পারে। অবসর সময়ে পুতুলটার সঙ্গে খেলা করে সে।
‘ওটা কি কোনো পুতুল নাকি? জাম্বুরা গাছের নিচে পুতুল এলো কী করে?’ গালে হাত দিয়ে ভাবে অনামিকা।
পুতুলটা আরো জোরে কাঁদছে।
বৃষ্টি পড়ছে। এখন কী করে গাছের কাছে যায়? ভাবে অনামিকা। হঠাৎ তার মনে পড়ে তার তো একটা ছাতা আছে। হলুদ রঙের ছাতা। ভাইয়া যখন পাতং পুতুলটা পাঠিয়েছিল তার সঙ্গেই ছিল ছাতাটা। হয়তো পাতংয়ের সাথে উপহার ছিল। দৌড়ে ঘরে যায় সে। ঘর থেকে ছাতা বের করে গাছের কাছে আসে। পুতুলটাকে প্রশ্ন করে, ‘কে গো তুমি? পুতুল?’
‘না, আমি এলিয়েন।’
‘এলিয়েন!’
‘হ্যাঁ, এলিয়েন।’
এলিয়েনদের কথা ভাইয়ার কাছে অনেক শুনেছে সে। ভাইয়া সায়েন্স ফিকশন পড়ে তাকে এলিয়েনদের অনেক গল্প বলতো। এলিয়েনরা পৃথিবীর শত্রু। পৃথিবীকে নিজের আয়ত্তে নেয়ার জন্য তারা পৃথিবীবাসীদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। কিন্তু সত্যি সত্যি যে এলিয়েন আছে, সেটা জানতো না সে। আজ এলিয়েন দেখে সে যেমন অবাক হলো, তেমনি ভয়ও পেল খুব।
চোখ কপালে তুলে বললো, ‘তুমি কোথা থেকে এসেছ, এলিয়েন?’
‘সব বলব। তার আগে তুমি আমাকে তোমার ছাতার নিচে আশ্রয় দাও। বৃষ্টি আমাদের চরম শত্রু। শরীরে বৃষ্টি পড়লে আমাদের খুব কষ্ট হয়।’
অনামিকা তাড়াতাড়ি এলিয়েনকে কোলে তুলে নিলো। ঘরে এনে শরীরের পানি ভালো করে মুছে দিলো।
‘তোমাকে অনেক ধন্যবাদ।’ বললো এলিয়েন। ‘তুমি আমার জীবন বাঁচিয়েছ।’
অনামিকা বললো, ‘তোমাকেও ধন্যবাদ। এবার বলো এলিয়েন, তুমি কোথা থেকে এসেছ? নিশ্চয় পৃথিবী ধ্বংস কিংবা পৃথিবীবাসীদের সাথে কোনো গভীর ষড়যন্ত্রের ফন্দি নিয়ে এসেছ?’
‘তুমি এসব কি বলছ বন্ধু? আমি পৃথিবী ধ্বংস করতে আসবো কেন? হলুদ এলিয়েন কোনো দিন কারো কোনো ক্ষতি করে না। তোমাদের পৃথিবী আমার খুব ভালো লাগে। তাই প্রতি বছর এই সময়ে আমি পৃথিবীতে ঘুরতে আসি। এই সময়ে আকাশ স্বচ্ছ-পরিষ্কার থাকে। চড়চড় রোদ উঠে। কিন্তু এবার এসে দেখছি বৈরী আবহাওয়া। গনগনে দুপুরের খাঁ খাঁ রোদের বিপরীতে প্রতিদিন বৃষ্টি পড়ছে। বৃষ্টির কারণে আমি আমার গ্রহে ফিরে যেতে পারছি না।’
‘তুমি বৃষ্টিকে এতো ভয় পাও কেন?’
‘পানি আমাদের চরম শত্রু। আগুনে পুড়লে তোমাদের যেরকম কষ্ট হয়, পানিতে ভিজলে আমাদেরও সেরকম কষ্ট হয়।’
‘বুঝলাম।’ বললো অনামিকা। ‘যতদিন বৃষ্টি পড়বে, ততদিন তুমি আমার কাছে থেকো। তোমার কোনো অসুবিধা হবে না।’
মাথা ডানে দুলিয়ে সুন্দর একটা হাসি দিয়ে এলিয়েন বললো, ‘তোমাকে অনেক ধন্যবাদ বন্ধু।’
অনামিকা এলিয়েনকে বাসার সবার সাথে পরিচয় করে দিলো। ভাইয়াকে ফোন করলো। এলিয়েনের কথা শুনে ভাইয়াতো আনন্দে একেবারে বাকবাকুম। ফোনে পাঁচ মিনিট কথা বললো এলিয়েনের সাথে।
সন্ধ্যায় পড়তে বসলো সে। পাশে এলিয়েন বসে আছে।
এলিয়েন অবাক হয়ে বললো, ‘তুমি কি পাগল হয়ে গেলে অনামিকা?’
‘কেন?’
‘একা একা কী সব বক বক করছ?’
মাথা দুলিয়ে হেসে উঠলো অনামিকা। ‘বই পড়ছি রে, বই পড়ছি।’
‘বই!’
‘হুঁ, বই।’
‘বই পড়ে কী হয়?’
‘বই পড়ে মানুষ মানুষ হয়।’
‘তুমি তো মানুষই আছ।’
এলিয়েনের কথা শুনে খিলখিল করে হেসে উঠলো অনামিকা। ‘আরে, এই মানুষ হওয়া মানে শিক্ষিত হওয়া, বড় হওয়া, মানুষের মতো মানুষ হওয়া।’
‘শিক্ষিত হলে কী হয়?’
‘ডাক্তার, বিজ্ঞানী আরো অনেক কিছু।’
‘আমিও তাহলে বই পড়ব।’
‘ঠিক আছে, আমার সাথে সাথে পড়।’
এলিয়েন অনামিকার সাথে সাথে বই পড়ে।
মা নুডুলস রান্না করে নিয়ে আসেন।
অনামিকার নুডুলস খুব প্রিয়। সে নুডুলস খায়, এলিয়েনকে খেতে বলে।
এলিয়েন মাথা ডানে বামে সুন্দর করে দুলিয়ে, মোলায়েম হেসে বুঝায় সে এসব খায় না।
এলিয়েনের এই হাসিটা খুব ভালো লাগে অনামিকার। বলে, ‘এলিয়েন!’
‘হুম।’
‘তুমি এত সুন্দর করে হাসো কী করে?’
‘তোমার হাসিটাও সুন্দর অনামিকা।’ বললো এলিয়েন। ‘একেবারে মিষ্টি হাসি।’
এলিয়েনের কথা শুনে আরো জোরে হেসে উঠে অনামিকা।
অনামিকা আর এলিয়েন খুব ভালো বন্ধু হয়ে গেল। এলিয়েন তাদের গ্রহের মজার মজার গল্প অনামিকাকে শোনায়। অনামিকা চোখ বড় বড় করে, মুখ হা করে তার গল্প শোনে। খুব মজা পায়।
অনামিকা তাকে প্রত্যেহ স্কুলে নিয়ে যায়। বই পড়া শেখায়।
এলিয়েনরা খুব ব্রিলিয়ান্ট। তাদের ব্রেন খুব শার্প। একবার কিছু শুনলেই তাদের মনে থেকে যায়।
অনামিকার কাছে পড়া শিখে এখন অনেক কিছুই বুঝে এলিয়েন। এখন সে নিজে নিজেও পড়তে পারে।
সেদিন স্কুল থেকে এসে দুপুরে খেয়ে দেয়ে শুয়ে ঘুমাচ্ছিল অনামিকা আর এলিয়েন। কিন্তু এলিয়েনের চোখে কিছুতেই ঘুম আসছিল না। সে উঠে বসলো। তার দৃষ্টি পড়ল পড়ার টেবিলের দিকে। টেবিলের ওপর সুন্দর একটি বই জ্বল জ্বল করছে। নাম “মায়ের ভালোবাসা”।
বইটা নিয়ে পড়তে লাগল সে । পড়তে পড়তে তার অশ্রু ঝরতে লাগল।
অনামিকা ঘুম থেকে উঠে দেখলো এলিয়েন চুপচাপ বসে আছে। তার চোখের পাতা ভেজা, চোখ ফোলা ফোলা। তার ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।
‘এলিয়েন!’
‘হুঁ।’
‘কী হয়েছে তোমার? কাঁদছ কেন?’
‘মাকে খুব মনে পড়ছে আমার। আমি মায়ের কাছে যাবো।’
অনামিকা দেখলো তার পাশে পড়ে আছে মায়ের ভালোবাসা বইটি। অনামিকা বুঝতে পারল বইটা পড়ে তার মায়ের কথা মনে পড়েছে। ছোট্ট একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সে বললো, ‘তুমি চিন্তা করো না এলিয়েন, আজ আবহাওয়া বার্তায় বলেছে, আর দুদিন পরেই বৈরী আবহাওয়া কেটে যাবে। তারপর তুমি তোমার মায়ের কাছে ফেরত যেতে পারবে।’
‘সত্যি!’ আনন্দে চোখ চকচক করে উঠলো এলিয়েনের।
এলিয়েনের হাতে হাত রাখলো অনামিকা। মিষ্টি করে হাসলো। ‘হুম, সত্যি।’
দু’দিন পর বৈরী আবহাওয়া কেটে গেল। টনটনে তাতানো রোদ উঠলো। এলিয়েন বললো, ‘এবার আমাকে বিদায় দাও বন্ধু। আমি মায়ের কাছে যাই। মা নিশ্চয় আমার জন্য খুব দুশ্চিন্তা করছে।’
‘ঠিক আছে এলিয়েন।’ মিষ্টি হেসে বললো অনামিকা। ‘আবার এসো।’
‘নিশ্চয় আসবো, আর এসেই সর্বপ্রথম তোমার কাছে পড়া শিখবো।’
‘দুষ্টু একটা।’ হেসে উঠলো অনামিকা।
তার সাথে সাথে এলিয়েনেও হাসলো। তারপর ‘বাই’ বলে সাঁয় করে আকাশের দিকে উড়ে গেল। অনামিকা তার উড়ে চলার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইল।

SHARE

Leave a Reply