Home সম্পূর্ণ কিশোর উপন্যাস মুক্ত ডানার পাখি -জুবায়ের হুসাইন

মুক্ত ডানার পাখি -জুবায়ের হুসাইন

এক.

‘আসতেছে, আসতেছে! হেরিকেন আসতেছে, কালবোশেখি আসতেছে! টাইফুন, সাইক্লোন- উঁহু, এরা তো আসবে না। হা-হা-হা…’ অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল রসু পাগল। হঠাৎ করেই থেমে গেল। আবার বলতে শুরু করল নিজের মনেই, ‘বিশাল ঝড় আসতেছে। আয়! ঝড় আয়! সব ভেঙে তছনছ করে দে। মাটির সাথে মিশায় দে।’ এবার দু’হাতে মাথার দু’পাশ চেপে ধরে হাঁটু মুড়ে মাটিতে বসে পড়ল রসু। ডুকরে কেঁদে উঠল। আবারও হঠাৎ করেই তড়াং করে উঠে দাঁড়াল। এখন তাকে দেখে কে বলবে এই এক মুহূর্ত আগেই ডুকরে কাঁদছিল? একইভাবে নিজের সাথেই বলে উঠল, ‘এই ঝড় কেউ থামাতি পারবে না। কেউ না। সবকিছু ভেঙে ফালাবেই। ওই, ওই আসতেছে ঝড়! আমি যাই, পালাই, পালাই…’
রসু পাগলকে ওভাবে দৌড়ে পালাতে দেখে শিশির বলে উঠল, ‘ওই লোকটা কে? আর অমনই বা করছিল কেন?’
আবিদ বলল, ‘তাকে সবাই এখন রসু পাগলা বলেই ডাকে।’
শিশির অবাক হয়ে যায়। বলে, ‘সবাই এখন ডাকে বলছ, তার মানে আগে ডাকত না। ঠিক বুঝলাম না তোমার কথা।’
‘সে অনেক লম্বা কাহিনী। বলতে গেলে অনেক সময় লাগবে।’
বিস্তারিত না হয় পরেই শুনলাম। কিন্তু এখন সামারিটা তো বলতে পারবে। সেটাই বলো শুনি।’
‘সামারি করে বলা কঠিন। তারপরও তুমি যখন শুনতে চাইছো, তখন বলছি শোনোÑ’
খানিক পরÑ আবিদ বলল, ‘আসলে একমাত্র ছেলেটার অস্বাভাবিক মৃত্যুই রশিদ উদ্দিনকে পাগল বানিয়ে দেয়। ছেলের শোক তিনি কিছুতেই কাটিয়ে উঠতে পারেননি। তিনি পাগল হয়ে গেছেন বলে এখন সবাই তাকে ডাকে রসু পাগলা বলে।’
‘থাকেন কোথায় লোকটা?’ জানতে চাইল শিশির।
আবিদ বলল, ‘আমাদের বাড়ির তিন-চার ঘর পরেই তার বাড়ি ছিল। কিন্তু পাগল হয়ে যাওয়ার পর আর নিজের বাড়িতে থাকেন না তিনি।’
‘সে কি! তাহলে এখন কোথায় থাকেন?’
‘এখন তাকে একেক সময় একেক জায়গায় দেখা যায়। আজ এখানে তো কাল ওখানে। তবে বেশি দেখা যায় গোরস্তানের পাশটাতে, যেখানে শুয়ে আছে তার একমাত্র ছেলেটা।’
‘বলো কী!’ ভয়ে শিউরে উঠল শিশির।
‘আরে তুমি তো দেখছি আমাদের নাজিমের মতো একটা ভিতুর ডিম।’
‘নাজিম? নাজিমটা আবার কে?’
‘কেন, এর মধ্যেই ভুলে গেলে? আরে আমার ফ্রেন্ড নাজিম। ওর কথা তো তোমাকে আগেই বলেছি। মামা বাড়ি বেড়াতে গেছে বলে দু’দিন স্কুলে যেতে পারেনি। আজই চলে আসার কথা।’
‘কাকে পরিচয় করিয়ে দেবে শুনি?’ নাজিমের কথা বলতে বলতেই ও এসে হাজির হলো।
‘আরে নাজিম তুমি?’ বলল আবিদ। ‘অনেকদিন বেঁচে থাকবে তুমি। তোমার কথাই ওকে বলছিলাম।’
‘এটা তুমি ঠিক বললে না আবিদ, আমার আয়ু যদ্দিন আছে, তদ্দিনই বাঁচবো। এক সেকেন্ড কমও না বেশিও না। তা পরিচয় করিয়ে দেয়া নিয়ে কী যেন বলছিলে?’
শিশির নিজের হাতটা নাজিমের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, ‘আমি গোলাম মোর্তজা শিশির। তোমাদের এখানে নতুন এসেছি।’
‘নিউ কামার? তা উঠেছ কোথায়?’
‘কারোর পরিচয় জানার পর কিন্তু নিজের পরিচয়টাও দিতে হয় আগে।’
‘ও স্যরি। আমি নাজিম মাহমুদ। স্থায়ী বাসিন্দা।’
‘ভালো লাগল তোমার সাথে পরিচিত হয়ে। আবিদের মুখে তোমার কথা শুনে খুবই কৌতূহল হচ্ছিল তোমার সাথে পরিচিত হওয়ার।’
‘কেন, কী বলেছে আবিদ আমার সম্বন্ধে? নিশ্চয়ই খুব বদনাম করেছে?’
‘বদনাম করার মতো কিছু আছে নাকি তোমাকে নিয়ে?’
এবার কথা বলে উঠল আবিদ। বলল, ‘এই, কী শুরু করলে তোমরা? প্রথম পরিচয়ে কেউ বুঝি এভাবে কথা বলে?’
নাজিম বলল, ‘কী আর করবো বলো। এর আগে তো কারোর সাথে প্রথম পরিচয় হয়নি।’
হেসে উঠে ছেলেরা, প্রাণখোলা নির্মল হাসি। শেষ বিকেলের এই নরম আভায় ওদের হাসিটা যেন আরেকটু আলো ছড়িয়ে দিল চার পাশটায়।
আবিদ বলল, ‘শিশিরের বাবা আমাদের প্রাইমারি স্কুলের নতুন প্রধান শিক্ষক হয়ে এসেছেন। উঠেছেন হাসমতদের ভাড়া বাড়িতে।’
নাজিম হাত বাড়িয়ে আবারও হ্যান্ডশেক করল শিশিরের সাথে। বলল, ‘প্রধান শিক্ষকের ছেলে তুমি, তাহলে তো বেজায় মেধাবী। আবার আমাদের সাথে পাল্লা দেবে না তো?’
শিশির এই কথার কোনো জবাব দিল না। মুচকি করে একটু হাসল কেবল।
আবিদই বলল আবার, ‘তবে শুনে রাখো নাজিম, আমাদের শিশির সত্যিই অত্যন্ত মেধাবী। এর আগে যে স্কুলে ছিল, সেখানে ওর রোল ছিল ২।’
একইভাবে মুচকি হেসে এবার বলল শিশির, ‘কাজেই বুঝে নাও, প্রতিযোগিতা তোমাদের সাথে করছিই।’
‘ও কে।’ যেন একটা দীর্ঘশ্বাস গোপনে ত্যাগ করল নাজিম। ‘বন্ধু বন্ধুর সাথে প্রতিযোগিতা করবে, এটা তো খুশিরই কথা। কী বলো আবিদ?’
আবিদ অনেকটাই বুঝতে পারল নাজিমের কথার অর্থ। ওকে আরও একটু বাজিয়ে দেখার জন্য বলল, হ্যাঁ তা ঠিক। কিন্তু আমি ভাবছি অন্য কথা।’
নাজিম জিজ্ঞেস করল, ‘কী?’
‘ভাবছি, এবার ক্লাসে সেকেন্ড পজিশনের ওপর আঘাত বুঝি পড়লই। এতদিন ধরে ওই স্থানটা তুমি পৈতৃক সম্পদের মতো আগলে ধরে ছিলে কি না!’
‘তাতে তোমার টেনশনের কোনো কারণ তো আমি খুঁজে পাচ্ছি না।’ নাজিম সত্যিই চিন্তিত হয়েছে বোঝা গেল। ‘তোমার ফার্স্ট পজিশন তো আর কেউ ছিনিয়ে নিচ্ছে না।’
ওদের ঝগড়া বেধে যাচ্ছে দেখে শিশির কথা বলে উঠল এবার, ‘এই, কী শুরু করলে তোমরা? দুই বন্ধুতে সবসময় এভাবেই ঝগড়া করো নাকি?’
‘হুঁ,’ রহস্যময় ভঙ্গিতে বলল আবিদ। ‘তুমি বোধ হয় জানো না, মাঝে মাঝে ঝগড়া না করলে বন্ধুত্বটা ঠিক মতো টেকে না।’
‘তাই বুঝি?’ বেশ মজাই পাচ্ছে শিশির নাজিম ও আবিদের কথাবার্তায়। ‘এই তথ্যটা তো আমার জানাই ছিল না। কিন্তু এবার ঝগড়া বাদ দিয়ে চলো, কোনো এক জায়গায় বসি। অন্য বিষয়ে আলোচনা করি।’
আবিদ বলল, ‘হ্যাঁ চলো।’
নাজিম যেন ওর কথার প্রতিধ্বনি করল, ‘হ্যাঁ চলো।’
হাঁটা শুরু করল ওরা। হঠাৎ আবার কথা বলে উঠল শিশির, নাজিমকে লক্ষ্য করে, ‘তুমি সত্যিই খুব মজার। ভালোই লাগবে আমার। তবে তোমাকে দেখলে কিন্তু মনে হয় না তুমি খুব ভিতু।’
নাজিম তড়াক করে দাঁড়িয়ে পড়ল। ঘাড় ঘুরিয়ে শিশিরের দিকে তাকিয়ে বলল, এই কথা তোমাকে কে বলল?’ কিন্তু তক্ষুনি বুঝতে পারল ব্যাপারটা কী ঘটেছে। তাই তেড়ে গেল আবিদের দিকে, তবেরে!…

দুই.

আমিন চেয়ারম্যানের পিছু পিছু এগিয়ে এলো চাকর আবুল খায়ের।
‘মানে বুঝলে আবুল খায়ের,’ পিচ করে দুই ঠোঁটের মাঝখান দিয়ে পানের পিক ফেলে বলল আমিন চেয়ারম্যান।
আবুল খায়ের সায় দিয়ে বলল, ‘হ কন চেয়ারম্যান সার।’
‘আজকা ম্যালা গরম পড়তাছে, কী কও?’
‘হ চেয়ারম্যান সার, ম্যালা গরম পড়তাছে। আমার শইলডা তো এক্কেরে ভিজে গেছে।’
তোমার তো খালি শইলডা ভিজছে, মানে বুঝলে না? আমার যে চান্দিও ভিজে যাতেছে। আচ্ছা কও দেখিনি, নয়া হেডমাস্টার সম্বন্ধে কী কী জানতি পারিছাও।’
‘মানুষটা খুব একটা খারাপ হবেনে বলে মনে কয় না। আগে যেখেনে মাস্টারি করতো, সেখেনে ম্যালা নামডাক ছিল।’
‘এটা তুমি কী কচ্ছাও আবুল খায়ের।’ যেন কেউ চেয়ারম্যানের শরীরে কারেন্টের শক দিল। ‘ম্যালা নামডাকিলা একটা মানুষরে তুমি ভালো মানুষ কচ্ছাও? এমানে বুঝলে না? তুমি তো আমারে বেশ চিন্তায়ই ফালায়ে দিলা আবুল খায়ের।’
‘আমি বলি কি, অত চিন্তা কত্তি হবে না চেয়ারম্যান সার। বেশি তেড়িবেড়ি কল্লি মনতাজ মাস্টারের মতোন সরাই দিলিই হবেনে।’
‘হ, পরোজন হলি তাই-ই কত্তি হবেনে আর কি। মানে বুঝলে না? তই একটু চোখ-কান খুলা রাইখো কলাম।’
‘না মানে…’ হাত কচলাতে থাকল আবুল খায়ের।
তাই দেখে চেয়ারম্যান জিজ্ঞেস করল, ‘কী আবুল খায়ের, তুমি অমন কত্তিছাও কেন? কিছু একটা কবা বলে মনে হয়। কিছু কতি চালি কয়ে ফালাও।’
‘মানে ইয়ে কচ্ছিলাম কী চেয়ারম্যান সার, ওই রসু পাগলা…’
এই কথাই আমিন চেয়ারম্যান তড়াং করে লাফিয়ে উঠল, ‘কী-কী হয়েছে রসু পাগলার?’
‘না কিছু হয়নি। তই ব্যাটার চালচলন আমার কাছে ভালো ঠেকতিছে না। কেমন জানি করে আমারে দেখতি পালি। আমার খুব ভয় করে চেয়ারম্যান সার।’
‘দূর পাগল! এমানে বুঝলি না? পাগলরে কেউ আবার ভয় পায় নাকি? আর তুমি হলে গিয়ে আমার মানে এই হ্যারামের  চেয়ারম্যানের চামচা। তোমারে ক্যাডাই কী করবে?’
ঠোঁট ফুলিয়ে ফেলল আবুল খায়ের। বলল, ‘আমি কলাম মাইন করলাম চেয়ারম্যান সার। আপনে আমারে চামচা কলেন।’
‘এই নাও, চামচার আবার মাইনও আছে। আরে এই আবুল খায়েরর‌্যা, তুমারে চ্যারমানের চামচা কওয়াতে তো তুমার খুশিই হওয়ার কথা। মানে বুঝলে না? এই বিরল মর্যাদা কয়জনে পায় কও দেখিনি?’
‘হাচাই চ্যারমান ছার, চ্যারমানের চামচা হওয়া ম্যালা সম্মানের?’
‘তই আমি কি মিছা কচ্ছি? তুমার সম্মান তো মিনিস্টারের পিএসের সুমান, তা কি জানো?’
হে হে করে হাসল আবুল খায়ের। বলল, ‘সে ঠিক আছে। তই আমি কলাম কারোর পিয়েজ-টিয়েজ হতি পারব না চ্যারমান ছার। আমি আপনের চামচা হয়েই থাকব।’
‘আরে মুখ্য, পিয়েজ-টিয়েজ না, মানে বুঝলে না? পি-এস।’
‘ওই হলো পিয়েজ।’
মুখের মধ্যে পানের চিবানো ছিবলা থু করে ফেলে পাঞ্জাবির পকেট থেকে পান রাখার ছোট্ট স্টিলের কৌটাটা বের করে তা থেকে আবার পান মুখে দিল আমিন চেয়ারম্যান। বলল, ‘নাহ্, তুমার সাথে অহেতুক তক্য করে লাভ নেই। …তা আবুল খায়ের, মানে বুঝলে না?…’
‘চ্যারমান ছার, ও-ও-ও…’ দূরে কিছুর দিকে চেয়ারম্যানের দৃষ্টি ফেরানোর চেষ্টা করে আবুল খায়ের।
আমিন চেয়ারম্যান তা বুঝতে না পেরে বলে, ‘আরে কী হয়েছে? অমন করে ও-ও-ও করতিছাও ক্যান আবুল খায়ের?’
‘ও-ওই যে দেখেন…’
‘সব্বোনাশ!’ এতক্ষণে দেখতে পেল আমিন চেয়ারম্যান। তাড়াহুড়ো করে পানের কৌটাটা ফের পকেটে রাখতে গেলে সেটা নিচে পড়ে গেল। হাত দিয়ে মুখ আড়াল করে বলল, ‘পাগলটা তো এদিকেই আসতেছে বলে মনে হয়।’
আবুল খায়ের বলল, ‘চ্যারমান ছার ফোটেন…’ দৌড়ে পালিয়ে গেল আবুল খায়ের। পেছনে আমিন চেয়ারম্যানও।
‘আমিন ব্যাপারিরে দেখলাম মনে হয়?’ বলল রসু পাগল। ‘ও সরি, তিনি তো আবার ব্যাপারি না, এখন চ্যারমান হইছে, আমিন চ্যারমান। হা-হা-হা। তই ঝড়ে উইড়া যাইবোই ব্যাটা। গরুর ব্যাপারি অইছে চ্যারমান! উঁহ্! শয়তানে সাধু সাজছে। তই পালাইলো ক্যান? বুঝছি, আমারে দেইখা ডরাইছে। রসু পাগলারে দেইখা ডরাইছে।’ নিজের বিশেষ ভঙ্গিতে হাসল রসু। হঠাৎ মুখের পেশিগুলো শক্ত করে ফেলল। বলল, ‘বদমাশ আমিন ব্যাপারি, তোর মুখোশ আমি খুইলা ফালাব।’ চোখ পড়ল মাটিতে পড়ে থাকা আমিন চেয়ারম্যানের পানের কৌটাটার দিকে। একটু যেন চমকে উঠল। তারপর নিচু হয়ে সেটা উঠিয়ে নিল। উঠে দাঁড়াল আবার। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখল। ট্যান্টের ঢোলা পকেটে ঢুকিয়ে ফেলল। চোখের উপরে বাম হাত নিয়ে গিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে কিছু দেখার চেষ্টা করল। আবারও উত্তেজনা দেখা দিল তার মধ্যে। ‘হ্যাঁ, ওই তো আসতেছে, ঝড় আসতেছে! সব উড়ায়ে নিয়ে যাবে। তছনছ করে দেবে সব। আয় ঝড় আয়, আয় ঝড়…’ উদ্ভ্রান্তের মতো ছুটে গেল একদিকে।

শিশির, আবিদ ও নাজিম রাস্তা দিয়ে হাঁটছিল। হাঁটতে হাঁটতেই কথা বলছে ওরা।
শিশির বলল, ‘আজকের বিকেলটা বোধ হয় মাটিই হয়ে গেল। দেখ আকাশে কেমন মেঘ করেছে!’
আবিদ বলল, ‘তা যা বলেছ। মনে হয় প্রচন্ড ঝড় উঠবে।’
নাজিম বলল, ‘চলো এক কাজ করি, সবাই মিলে ঘরে বসে কবিতা লিখি।’
অবাক হলো শিশির। বলল, ‘তুমি কবিতা লেখ বুঝি? কই, আগে বলোনি তো?’
লজ্জায় মুখ লাল হয়ে গেল নাজিমের। বলল, ‘না মানে একটু লেখার চেষ্টা করি আর কি।’
আবিদ ধরল কথাটা। শিশিরকে উদ্দেশ করে বলল, ‘ওর কথা বিশ্বাস করো না শিশির। ও শুধু চেষ্টাই করে না, বেশ ভালোই লেখে ও কবিতা। ইতোমধ্যেই বেশ কয়েকটা লেখা বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় ছাপা হয়েছে।’
নাজিম পাল্টা বলল, ‘আর তোমার লেখা বুঝি ছাপা হয়নি?’
‘না মানে ইয়ে…’
‘দেখো আবিদ, আর যদি কোনো উল্টোপাল্টা করো, তাহলে কিন্তু…’
নাজিমকে কথা শেষ করতে দিল না আবিদ। বলল, ‘কী? তাহলে কিন্তু কী?’
নাজিম বলল, ‘তাহলে কিন্তু বলে দেব যে তোমার ওই কবিতাটা ছিল বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্কল্প কবিতার নকল।’
মুখটা ফাটা বেলুনের মতো চুপসে গেল আবিদের। যেন কেঁদে ফেলবে, বলল, ‘কাজটা তুমি ঠিক করলে না নাজিম!’
এবার শিশির ওদের কথার মাঝে কথা না বলে পারল না। বলল, ‘নাহ্! তোমরা দু’জন দেখছি সতীনের মতো। খালি ঝগড়া বাধানোর তালে থাকো। আচ্ছা বাবা, আমি কি অতো ডিপলি কিছু জানতে চেয়েছি?’
মুখটা তেমনি ভার করে আবিদ বলল, ‘তাহলে তুমিই বলো শিশির, নাজিম কি কাজটা ঠিক করলো? ও আসলে…’
আবিদের কথা শেষ হলো না। হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলো আবুল খায়ের। মাটির দিকে চোখ রেখে কিছু খুঁজছে সে। আশপাশে কোনো কিছুর দিকে খেয়াল নেই। তাই ধাক্কা খেল আবিদের সাথে। এ কারণেই থেমে যেতে বাধ্য হয়েছে ও। ভয় পেয়ে গেল আবিদ। চিল্লিয়ে উঠল, ‘কে, কে?’
আবুল খায়ের এবার চমকে সোজা হয়ে দাঁড়াল। সম্বিত ফিরে পেল বুঝি। বলল, ‘তুমরা? তুমরা এখানে কী করতিছাও? ও বুঝছি, তুমরাই তালি ওটা সরাইছো। বের করো, বের করো কলাম।’
তিন কিশোর মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল। আবুল খায়ের কিসের কথা বলছে ওরা বুঝতে পারছে না। ওদেরকে ওভাবে নির্বিকার থাকতে দেখে আবুল খায়ের আবারও বলে উঠল, ‘কী হলো মিয়ারা, কথা কানে যায়নি? শুনতে পাওনি আমার কথা? আমি কলাম চ্যারমান ছারের চামচা, এক্কেরে সুজা কথার মানুষ। কনে রাখিছাও জিনিসটা?’ ছেলেদের পিঠে ঝোলানো স্কুল ব্যাগের দিকে নজর গেল। ‘বুজছি, ব্যাগের মধ্যি ঢুকাই রাখিছাও। দেখি ব্যাগ দেখি…।’
নাজিম বাধা দিয়ে বলল, ‘এ-এ কী করছেন আপনি? আমাদের ব্যাগ ধরে টানাটানি করছেন কেন?’
আবুল খায়ের নিজের কাজ চালিয়ে যায়। বলল, ‘তুমরা ধরা পড়ে গিছাও চান্দু। আমি কলাম চ্যারমানের চামচা, সুজা কথার মানুষ। এখন ভালোই ভালোই জিনিসটা বের করে দাও দেখিনি। নইলে কিন্তু…’
আবিদ বলল, ‘নইলে কিন্তু কী? কী করবেন আপনি আমাদের?’
আবুল খায়ের বলল, ‘নইলে কী করবো?’ ঠোঁটে আঙুল রেখে ভাবতে লাগল কী করবে। ‘নইলে কী করবো, নইলে কী করবো… ধুস, কী করবো নইলে? এই, তুমরা কেউ বলতি পারো নইলে কী করবো?’
শিশির বলল, ‘আসলে আপনার সমস্যাটা কী? কী খুঁজছেন আপনি?’
আবুল খায়ের আবারও ভাবল। ‘কী খুঁজছি আমি?’ হঠাৎ যেন মনে পড়ে গেল সে কী খুঁজছে। বলল, ‘অ্যাঁ, তুমাদের কবো কেন আমি কী খুঁজছি? আমি কলাম চ্যারমান ছারের চামচা। ভালোই ভালোই জিনিসটা দিয়ে দাও।’
শিশির বলল, ‘কিন্তু জিনিসটা কী তা তো বলবেন আমাদের।’
‘কলাম তো কবো না। জিনিসটা দাও, আমি ভালোই ভালোই চলে যাই।’
আবিদ বলল, ‘ভালোই ঝামেলায় পড়ে গেলাম তো! ঠিক আছে, আপনি যখন বলবেন না জিনিসটা কী, আর সন্দেহ করছেন ওটা আমাদের ব্যাগের মধ্যে আছে, তাহলে নেন, আমাদের ব্যাগ চেক করেন, দেখেন আপনার মহামূল্যবান জিনিসটা পাওয়া যায় কি না।’
শিশির বাধা দিতে যায়। বলে, ‘কিন্তু…’
নাজিম ওকে বাধা দিয়ে বলে, ‘হ্যাঁ শিশির, ব্যাটা চেক করুক আমাদের স্কুলব্যাগ। কিছুই তো পাবে না। ভয় কিসের তাহলে?’
শিশির আর বাধা দেয় না। নিজের ব্যাগটার জিপার খুলে চেক করতে সাহায্য করে।
আবুল খায়ের একে একে ওদের তিনটা স্কুলব্যাগই চেক করল। কিন্তু যা হওয়ার তাই-ই হলো, কিছুই পেল না। শেষে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে মুখটা হা করে হাঁফাতে লাগল।
আবিদ বলল, ‘কই, পেলেন আপনার মহামূল্যবান জিনিসটা?’
আবুল খায়ের মাথাটা শুধু এপাশ ওপাশ নাড়াল।
শিশির বলল, কৌতূহলী হয়ে, ‘এই যে জনাব, সরি, চেয়ারম্যানের চামচা, কী জিনিস খুঁজছেন আপনি?’
আবুল খায়েরের যেন সেদিকে কোনো খেয়ালই নেই। বলল, তুমরা যে জিনিসটা লুকিয়ে রাখোনি তা আগে কলিই পারতে। খালি খালি আমার সুমায় নষ্ট। যত্তোসব!’
নিজের মনে গজগজ করতে করতে চলে গেল আবুল খায়ের।
আবুল খায়ের চলে যেতেই হাসিতে গড়াগড়ি খেতে লাগল ছেলেরা।
হাসি থামিয়ে শিশির জিজ্ঞেস করল, ‘তোমাদের এখানে সবাই পাগল নাকি?’
নাজিম বলল, ‘তোমার কাছে বুঝি তাই মনে হচ্ছে?’
শিশির রহস্যময় ভঙ্গিতে উপর-নিচ মাথা নাড়ল।
আঁতকে উঠল আবিদ। বলল, ‘তুমি আবার আমাদের দু’জনকেও পাগল ভাবছ না তো?’
শিশির মুচকি হাসল। বলল, আরে না, তোমরা পাগল হতে যাবে কেন? জাস্ট মাথার স্ক্রুগুলো কিছুটা ঢিলা হয়ে গেছে এই যা।’
‘তার মানে তুমি সত্যিই…’ কথা শেষ করতে পারে না আবিদ। তার আগেই দৌড়ে পালিয়েছে শিশির। ওকে ধরতে পিছু নিল আবিদ ও নাজিম।

তিন.

আমিন চেয়ারম্যানের বৈঠকখানা। তাকে ঘিরে বসে আছে সাত্তার মেম্বর ও আবুল খায়ের। সবার চেহারা থমথমে।
আমিন চেয়ারম্যান বলল, ‘না না মিম্বার, কাজটা তুমি, মানে বুঝলে না? ঠিক করো নাই।’
আবুল খায়ের বলল, ‘আমিও তাই কই সাত্তার, তুমি কাজটা কত্তি পাল্লে ক্যামুন করে কও তো দেখিনি।’
সাত্তার মেম্বর বলল, ‘যা হওনের তা তো হয়েই গেছে চ্যারমান ছার, এখুন কী করা তাই কন?’
আমিন চেয়ারম্যান বলল, ‘দেখ মিম্বার, আমার মাথাটা আসলে মুবাইলের মতোন হ্যাং হয়ি গেছে। মানে বুঝলে না? কিছুই মাথায় ঢুকতিছে না।’
‘কিন্তু আপনি কিছু একটা না কল্লি আমি কনে যাবো? আপনিই তো আমাদের সব।’ বলল সাত্তার মেম্বর।
‘হ, চ্যারমান ছার, বুদ্ধি একটা আপনার দিতিই হবে। বেচারা যখন এতো করি কচ্ছে।’ সাত্তার মেম্বরের পক্ষ নিয়ে বলল আবুল খায়ের।
আমিন চেয়ারম্যান বলল, ‘আমি আর কী বুদ্ধি দেবো। মানে বুঝলে না? তুমিই একটা বুদ্ধি কয়ে দ্যাও না আবুল খায়ের। তুমি তো আমার যোগ্য চামচা, না কি?’
আবুল খায়ের হেসে দিল এই কথায়। বলল, ‘আমি কলাম সুজা কথার মানুষ। তই চ্যারমান ছার, আমার মাথায় একটা বুদ্ধি খেলতিছে।’
সাত্তার মেম্বর বলল, ‘হ্যাঁ খায়ের ভাই, কও তুমার বুদ্ধিটা।’
‘চ্যারমান ছার কী কন? কবো বুদ্ধিটা?’
আমিন চেয়ারম্যান বলল, ‘তুমি কি আমার, মানে বুঝলে না? আমার সংযমের পরীক্ষা নিচ্ছাও আবুল খায়ের?’
‘চ্যারমান ছার যে কী কন? আমি কলাম সুজা কথার মানুষ। আমি আপনার সংযমের পরীক্ষা নিতি পারি?’
‘তাহলি কচ্ছাও না ক্যান?’
‘কচ্ছি শুনেন তাহলি…’ আবুল খায়ের তার বুদ্ধির কথা বলা শুরু করল। অন্যরা মন দিয়ে শুনতে লাগল।

চার.

সাত্তার মেম্বর গলা চড়িয়ে ডাকল, ‘কাশেম? ওই কাশেম? কাশেম বাড়িতে আছো?’
কাশেম    জবাব দিতে দিতে ঘর থেকে বের হল, ‘হ বাড়িতে আছি। আপনি ক্যাডা কচ্ছেন?’ বাইরে এসে মেম্বরকে দেখে চমকে উঠল। ‘মিম্বার তুমি?’
মেম্বর বলল, ‘হ কাশেম, আমারে আসতিই হলো।’
‘না মানে তুমি আসবা সে তো ঠিকই আছে। কিন্তু তুমি কলি আমিই যাতাম তুমার কাছে।’
কিরণ বলল, ‘আসলে খুব জরুরি বলে মিম্বারই তুমার কাছে আসেছে।’
কাশেম বলল, ‘ঠিক আছে কও কী জন্যি এসেছাও।’
মেম্বর বলল,    ‘কিরণ তুমিই কও।’
‘তুমি বলে মেঠেপাড়ার উজ্জ্বলরে কয়েছাও ঋণির টাকা শোধ দিতি হবে না?’ আসল কথাটা বলল এবার কিরণ।
‘কথাটা কি ঠিক?’ মেম্বর যোগ করল।
কাশেম জবাব দিচ্ছে না দেখে কিরণ আবার জিজ্ঞেস করল, ‘কী হলো, কথা কচ্ছাও না কেন?’
‘হ্যাঁ আমি কয়েছি। ও ঋণির টাকা কিভাবে শোধ করবে? তাই আমার কাছে আসলি আমি ওই কথা কইছি।’ বলল কাশেম।
‘কিন্তু টাকাটা তো আমি আমার ভান্ডার থেকে দিইনি, সরকারি তহবিল থেকে দিইছি।’ বলল সাত্তার মেম্বর।
কাশেম বলল, ‘সেজন্যিই তো শোধ না দিতি কইছি। সরকার তো জনগণের জন্যিই। বুঝিয়ে কলি নিশ্চয়ই উজ্জ্বলের বিষয়টা বুঝতি পারবেনে।’
মেম্বর বলল, ‘কিন্তু…’
কিরণ বলল, ‘কিন্তু সেটা তুমি কওয়ার ক্যাডা?’
কাশেম বলল, ‘না আমার মনে হলো তাই…’
‘ঠিক আছে কয়ে ভালোই করেছো।’ বলল সাত্তার মেম্বর। ‘তই আমি কয়ে দিচ্ছি, আগামী সাত দিনির মধ্যি টাকাটা আমার চাই।’
এই সময় বারান্দায় এসে দাঁড়ায় কাশেমের ছোট ভাই হাশেম।
কাশেম বলল, ‘কিন্তু মিম্বার…’
কিরণ বলল, ‘কোনো কিন্তু না, উজ্জ্বল দিতি না পাল্লি টাকাটা তুমারেই দিতি হবে।’
‘আমি? আমি কোত্থেকে টাকা দিব?’
‘সেটা তো আমি জানিনে কাশেম। তুমি ওরে টাকা দিতি নিষেধ করিছাও, তার মানে দায়টা তুমার উপরেই বর্তায়। তাই…’ হঠাৎ স্বর উঁচু করে ফেলে সাত্তার মেম্বর। ‘মনে রাখবা, সুমায় মাত্র সাতদিন। চলো কিরণ।’
সাত্তার মেম্বর ও কিরণ চলে যায়।
ঢপাস করে মাটিতে বসে পড়ল কাশেম। পাশে বসল হাশেম।
হাশেম বলল, ‘এখন কী হবে ভাই?’
কাশেম    ফ্যালফ্যাল করে ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘জানিনে রে ভাই, আমি কিচ্ছু জানিনে।’
‘মিম্বারটা খুব পচা, তাই না ভাই?’
কাশেম ভাইকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘তোরে তো আমি খাতি কলাম, না খেয়ে উঠে আসলি কেন?’
‘ওরা যে তুমারে বকছিল, আমার ভালো লাগছিল না। তাই আসলাম। আচ্ছা ভাই, আমরা গরিব কেন?’
‘তুই কোনো চিন্তা করিস না ভাই, দেখিস, একদিন ঠিকই বড়লোক হবো আমরা।’
‘না ভাই, বেশি বড়লোক আমি হতি চাইনে। দেখলে না মিম্বারটা কেমন পচা? বেশি বড়লোক হলি আমরাও পচা হয়ে যাব।’
‘তুই আমারে নিয়ে খুব ভাবিস, নারে হাশেম?’
‘দূর! আমি কি কিছু ভাবতি পারি? আমি তো ছোট। যখন বড় হব, তখন ভাবব।’
‘চল ঘরে চল, তোকে খাইয়ে দিই।’
‘আমার ক্ষিধে নেই ভাই।’
‘কেনরে, ক্ষিধে নেই কেন? সকালেও তো অল্প একটু খেলি।’
‘সকালে তো তুমিও কম খেয়েছ। তুমার বুঝি ক্ষিধে লাগিনি?’
‘ও, সেই জন্যি তুই খাবিনে?’
হাশেম উপর-নিচ মাথা নাড়ল।
‘তুই আমার জন্যি এতো ভাবিস? নে চল, দুইজন মিলে খেয়ে নিই।’
বারান্দা থেকে ঘরের মধ্যে চলে গেল দুই ভাই।
পাঁচ.

গ্রামের রাস্তা। কথা বলতে বলতে যাচ্ছে সফি মামা ও মানিক।
সফি মামা বললেন একসময়, ‘বুঝলি ভাগ্নে, তোদের এই এলাকাটা আমার হেভি লাইক হয়ে গেছে। আই ফিল লাভ! এ হেভি অ্যান্ড গ্রেট লাভ!’
সফি মামা এরকমই। ভুলভাল ইংরেজিতে কথা বলেন।
মানিক বলল, ‘তুমি আসল ব্যাপারটা জানো না বইলাই এই কথা কচ্ছাও। আমাদের এলাকাটা পছন্দ করার কুনো কারণই নাই।’
‘দ্যাখ ভাগ্নে, আমার ফ্রেশ মুডটারে তুই ব্রেক কইরা দিবি না।’ হঠাৎ দূরে কিছু একটা দেখে সেদিকে ইঙ্গিত করে আবার বলল, ‘লুক ভাগ্নে, দ্যাট লুক, ও-ও-ওইটা কী জিনিস?’
মানিক ভালো করে দেখে হেসে দিয়ে বলল, ‘ও ওইটা? ওইটা হলো গিয়ে একটা ভাস্কর্য।’
‘নাইস দেখতি হয়েছে। তা ভাগ্নে, অত্ত লুকিং নাইস জিনিসটা বানাইছে ক্যাডা?’
‘মনে হয় কর্তৃপক্ষ বানাইছে।’ নাটকের একটা ডায়ালগ ঝাড়ল মানিক সুযোগ বুঝে।
সফি মামা অত নাটক-ফাটক দেখেন না। তাই মানিকের ধার করা সংলাপটা ধরতে পারলেন না। বললেন, ‘ও। …’ আরেক দিকে ইঙ্গিত করে আবার জিজ্ঞেস করলেন, ‘এই ভাগ্নে, এই সুন্দর ম্যাটারটাতো আগে লুকিং করি নাই। ক্যাডায় বানাইল এইটা?’
মানিক আবারও সংলাপটা ঝাড়ল, ‘এটাও কর্তৃপক্ষ বানাইছে।’ মনে মনে হাসল মামাকে বোকা বানাতে পেরে।
সফি মামা এবারও বুঝতে না পেরে বললেন, ‘এইটাও কর্তৃপক্ষের কাজ!’ অন্যমনস্ক হয়ে হাঁটতে লাগলেন তিনি। একটু পর আবার বললেন, ‘বাহ্! কী সুন্দর সবকিছু। হাউ বিউটিফুল! হাউ চার্মিং! ভাস্কর্য, স্মৃতিস্তম্ভ সবই বানাইছে কর্তৃপক্ষ। কর্তৃপক্ষ, কর্তৃপক্ষÑ আচ্ছা এই…’ পেছন ফিরে ভাগ্নের চোখে চোখ রাখলেন, ‘এই ভাগ্নে, এই কর্তৃপক্ষটা আবার ক্যাডারে? এ কী! ভাগ্নেটা আবার গেল কই? মানিক? এই মানিক? আমারে একলা ফালায়ে কই গেলিরে ভাগ্নে?…’
সফি মামাকে একা রেখে ভাগ্নে কখন কেটে পড়েছে বুঝতেই পারেননি তিনি।
সফি মামা একইভাবে মানিককে ডেকে চলেছেন, ‘ভাগ্নেরে তো কোত্থাও দেখতাছি না। আমি একলা এখুন কী করবো?’
অন্যমনস্ক হয়ে এলোমেলো কথা বললেন তিনি। তাই বিপরীত দিক থেকে আসা সাত্তার মেম্বরের সাথে কখন ধাক্কা খেলেন তা টেরই পেলেন না। পড়ে যেতে গেলে মেম্বর তাকে ধরে পতন ঠেকাল। পাশ থেকে কিরণ এসে জড়িয়ে ধরল মামাকে।
মামা বললেন, ‘ক্যাডা, ক্যাডা তুমরা?’
কিরণ বলল, ‘তুমি ক্যাডা মিয়া? মাতালের মতোন রাস্তায় ঘুইরা বেড়াচ্ছাও কেন?’
মেম্বর সুযোগ বুঝে সফি মামার শার্টের বুক পকেটে একটা কাগজ গুঁজে দিল। বলল, ‘আমি হলাম গিয়ে এই ওয়ার্ডের মিম্বার। যারে কয় জনপ্রতিনিধি।’
সফি মামা শুধু এতটুকুই বললেন, ‘ও।’
মেম্বর বলল, ‘তা মিয়াভাই, এই এলাকায় কার কাছে আয়েছেন? ক্যান্ আয়েছেন?’
কিরণ বলল, ‘এই এলাকায় আসতি গিলি যে সাত্তার মিম্বারের পারমিশন নিতি হয় তা কি তুমারে কেউ কয়ে দেইনি?’
সফি মামা ভীষণ ভড়কে গেলেন। আমতা আমতা করে বললেন, ‘আ-আমি আসলে…’
কথা শেষ হলো না তার। তার আগেই কিরণ বলল, ‘আরে কি আমি আসলে আমি আসলে কত্তিছাও। এইখানে কার কাছে আয়েছাও সেইটা আগে কওতো চান্দু! মতলবটা কী শুনি?’
সফি মামা ঘড়রাৎ করে একটা ঢোক গিলে বললেন, ‘আমি কামিং মানে আইছি মানিক হোম মানে মানিকদের বাড়ি। আমি ওর মামু লাগি।’ বলেই সাদা ঝকঝকে দাঁত বের করে হাসতে লাগলেন।
মেম্বর বলল, ‘তালি তো মিয়াভাই তুমি আমাদেরও মামু। তা মামুভাই, এইদিকে কনে যাচ্ছাও? পথ হারায় ফেলিছাও নিশ্চয়ই?’
‘হ্যাঁ মামুভাই, কনে যাচ্ছাও কও আমরা তুমারে পথ দেখাই দিবানে।’ যোগ করে কিরণ।
সফি মামা বললেন, ‘আমি আর মানিক ওয়াকিং মানে হাঁটছিলাম। সাডেনলি মানে হঠাৎ সে উধাও হয়ে গেছে। এখন কনে যাব ঠিক কতি পাচ্ছিনে।’
মেম্বর বলল, ‘তার মানে এখুন তুমি মানিকদের বাড়ি যাবা, এই তো?’
সফি মামা হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়েন।
‘মেম্বর বলল, ‘ওই কিরণ্যা, মামুভাইরে মানিক্যাদের বাড়ির পথটা দেখায় দে।’
কিরণ সফি মামার হাত ধরে একপাশে নিয়ে গিয়ে বলল, ‘এইদিকে আসো মামুভাই। এখন আমি যেমনি দেখাই তেমনি দেখ। এই পথটা ধইরা সুজা গিলি ওই যে জঙ্গলটা দেখতিছাও, ওইটা পার হলিই মানিক্যাদের বাড়ির পথটা তুমি পায়ে যাবানে। বুঝতি পারিছাও?’
সফি মামা বললেন, ‘তালি আমি এখুন গো মানে যাই, কী কন মেম্বর ভাই?’ যেন পালাতে পারলে বাঁচেন এদের হাত থেকে।
মেম্বর এগিয়ে এসে বলল, ‘যাও মামুভাই। তুমার সাথে আবার দেখা হবেনে।’
‘তুমাদের মেনি মেনি থ্যাংকু, মেনি মেনি ধন্যবাদ।’ দ্রুত ওখান থেকে চলে গেলেন সফি মামা।
হাসিতে দুই গাল ভরিয়ে চলে গেল মেম্বর ও কিরণ।

ঘন ঘন হাতের ঘড়িটার দিকে তাকাচ্ছেন লোকটা। কেবলই পায়চারি করছেন। এদিক-ওদিক তাকাচ্ছেন। প্যান্টের পকেটে রাখে মোবাইল ফোনটা বেজে উঠল এবার। বের করে নম্বরটা দেখে রিসিভ বাটনে চাপ দিয়ে রিসিভ করে কানে ধরলেন। নীরবে শুনতে লাগলেন ওপাশের কথা। তারপর আবার পকেটে রেখে দিলেন মোবাইল ফোনটা। কিছু পর সেখানে এসে উপস্থিত হলেন সফি মামা, দেখলেই বোঝা যায় অত্যন্ত ক্লান্ত। শ্রান্তও।
‘ওয়াটার! পানি!’ লোকটার কাছে পানি চেয়ে বসলেন সফি মামা।
সফি মামাকে দেখতে পেলেন লোকটা। নিজের মনে বললেন, ‘ওই তো এসে পড়িছে।’ তারপর স্বাভাবিক কণ্ঠে বললেন, ‘হাই! ভালো আছাও মিয়াভাই?”
সফি মামা জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি ক্যাডা কচ্ছাও? তুমারে তো ঠিক মার্কিং মানে চিনতি পাচ্ছিনে। যেন একটু আগে পানি চেয়েছিলেন তা ভুলে গেছেন।
‘আমারে ভুলি গেলেন মিয়াভাই? আরে আমি, ওই যে আমি, সেই যে…’ লোকটা রহস্যময়ভাবে বলে চললেন।
‘না তো, তুমারে আগে কোনোখানে লুকিং করিছি বলে তো মনে কচ্ছে না।’ বললেন সফি মামা।
হঠাৎ স্বর তীক্ষè করে বলল লোকটা. ‘তুমার পকেটে একটা মেসেজ আছে, ওটা জলদি বের করে দ্যাও।’
সফি মামা চমকে উঠলেন। বললেন, ‘মাই পকেট? আমার পকেটে মেসেজ? তুমি…’
সফি মামাকে কথা শেষ করতে দিলেন না লোকটা। বললেন, ‘দেখ মিয়াভাই, আমার হাতে টাইম খুবই শট। জলদি ওটা বের করি দ্যাও, আমি যাই।’
সফি মামা পকেটে হাত ঢোকালেন। হাতে বের হয়ে এলো ভাঁজ করা একটা কাগজ। চোখের সামনে মেলে ধরে অবাক হয়ে গেলেন। ছোঁ-মেরে কাগজটা কেড়ে নিলেন লোকটা। বললেন, ‘তুমি এবার যাতি পারো।’
মামা কোনো বাক্যবিনিময় ছাড়াই স্থানটা ত্যাগ করলেন। আসলে তিনি এতটাই অবাক হয়েছেন যে কিছু বলার ভাষাও খুঁজে পেলেন না ওই মুহূর্তে।
লোকটা ভাঁজ করা কাগজটা মেলে পড়লেন। তারপর দু’হাতে দলা পাকিয়ে ছুড়ে ফেলে দিলেন এক দিকে। চলে গেলেন তিনিও।

ভাঁজ করা কাগজটা প্রথমে শিশির দেখতে পেল। প্রতিদিনকার মতো ঘুরতে বের হয়েছে তিন বন্ধু।
দ্রুত কাগজটা তুলে নিল শিশির।
নাজিম জিজ্ঞেস করল, ‘কী ওটা?’
শিশির বলল, ‘বোধ হয় একটা চিরকুট।’
‘চিরকুট? কী লেখা আছে ওতে?’ আশ্চর্য হয়ে জানতে চাইল আবিদ।
‘একটা ঠিকানা।’ জানাল শিশির।
‘জোরে পড়ো, আমরাও শুনি।’ বলল নাজিম।
‘তে-রাস্তার বাঁ-পাশে, কলাগাছে ঘেরা প্রথম বাড়ি। শুক্রবার রাত সাড়ে ১০টা।’ পড়ল শিশির।
‘মানে কী এর?’ বুঝতে না পেরে জানতে চাইল আবিদ।
‘আমি কিন্তু স্পষ্ট রহস্যের গন্ধ পাচ্ছি।’ বলল শিশির।
‘মানে?’ এবার আশ্চর্য হলো নাজিমও।
আবিদ জিজ্ঞেস করল, ‘এর মধ্যে আবার রহস্য পেলে কোথায় তুমি?’
শিশির বলল, ‘দেখলেই তো লোকটা জোর করে অন্য লোকটার কাছ থেকে কাগজটা একপ্রকার ছিনিয়ে নিল। অথচ মনে হলো ওই লোকটা কাগজটা সম্বন্ধে কিছুই জানে না।’
আবিদ বলল, ‘তার মানে তুমি বলতে চাচ্ছ কাগজটা বেশ গুরুত্বপূর্ণ?’
‘অবশ্যই!’ সাফ জবাব শিশিরের।
‘তাহলে কী করবে এখন?’
‘তদন্ত করবো?’
‘এহ্! তুমি কি পুলিশ যে তদন্ত করবে?’ নাজিমের প্রশ্ন।
শিশির জবাব দিল, “রহস্যের তদন্ত করতে পুলিশ হওয়া লাগে না। গোয়েন্দা কাহিনী পড়নি গোয়েন্দারা কিভাবে রহস্যের তদন্ত করে আসামি খুঁজে বের করে?’
আবিদ বলল, ‘তার মানে এই চিঠিটা নিয়ে তদন্ত করলে কোনো আসামির সন্ধান পাবো আমরা?’ যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না ও।
শিশির রহস্যময়ভাবে হাসল। বলল, ‘পেতেও পারি, না-ও পেতে পারি।’
আবিদ বলল, ‘ব্যাপারটা কিন্তু আমার কাছে বেশ ইন্টারেস্টিং মনে হচ্ছে।’
নাজিম বলল, ‘কিন্তু শুক্রবারের তো এখনো দুই দিন বাকি।’
শিশির বলল, ‘হ্যাঁ দুই দিন বাকি আছে। এর মধ্যে আরও কিছু কাজ আমাদের সারতে হবে। চলো এখন বাড়ি ফিরে যাওয়া যাক।’

ছয়.

খেলার মাঠে জড়ো হয়েছে ছেলেরাÑ আবিদ, নাজিম, শিশির। একপাশে বসে গল্প করছে।
‘আচ্ছা শিশির, রসু পাগলাকে হঠাৎ কেন সন্দেহ করছো তুমি?’ হঠাৎ প্রশ্ন করে বসল নাজিম।
‘আমারও কিন্তু সেই একই প্রশ্ন। কেন সন্দেহ করছ রসু পাগলাকে?’ নাজিমের প্রশ্নের সাথে যোগ করল আবিদ।
‘আসলে প্রথম যেদিন তাকে দেখি, সেদিনই আমার একটা ব্যাপারে খটকা লাগে। তবে ঠিক বুঝিয়ে বলতে পারব না আমি তোমাদের।’ বলল শিশির।
‘আচ্ছা সে না হয় হলো, কিন্তু কী সন্দেহ করছ তুমি সেটা তো বলবে?’ আবারও প্রশ্ন করল নাজিম।
‘আমি কিন্তু নিজেও জানিনে কী সন্দেহ করছি। কোথায় যেন একটু গরমিল লাগছে আমার কাছে, এই যা। তবে আমার সন্দেহ ঠিক না-ও হতে পারে।’ একটু যেন ঘুরিয়ে জবাব দিল শিশির।
আবিদ বুঝতে পেরে বলল, ‘তুমি কিন্তু বেশ রহস্য করছ আমাদের সাথে। প্লিজ! আমাদেরকে আর ঘোরের মধ্যে রেখ না।’
নাজিম বলল, ‘হ্যাঁ শিশির, একটু ঝেড়ে কাশো, দোহায় লাগে তোমার।’
শিশির হাসল, বলল, ‘তোমাদেরকে আসলে ব্যাপারটা আমি বোঝাতে পারছিনে। … আচ্ছা বাদ দাও ওসব। এখন এসো কাজের কথায় আসা যাক।’ একটু নড়েচড়ে বসল। তারপর আবার বলল, ‘শুক্রবার রাতে সম্ভাব্য কী কী ঘটতে পারে এসো আমরা একটু আলোচনা করি। ওইদিন…’
শিশিরের কথায় বাধা পড়ল। মোবাইল ফোনে কথা বলতে বলতে প্রবেশ করল রবু ও কবির। এলাকার উচ্ছৃঙ্খল যুবক হিসেবে সবার কাছে পরিচিত ওরা। চেয়ারম্যানের অন্যতম সহকারীও বলা যায় তাদের।
রবু মোবাইলে কার সাথে যেন কথা বলছে, ‘ওকে স্যার, তাই হবে। আমরা যথাটাইমে পৌঁছে যাবানে।.. আপনি কুনো টেনশন নিয়েন না ছার।… ঠিক আছে ছার। … ওকে ছার, রসু?… ওকে, ওকে ছার। রাখি ছার। সালাম ছার।’
উঠে দাঁড়াল তিন কিশোর। চাপাস্বরে নিজেদের মধ্যে কথা বলে নিল।
শিশির জানতে চাইল, ‘ওদেরকে চেন তোমরা?’
নাজিম বলল, ‘হ্যাঁ চিনি। এই গ্রামেই বাড়ি।’
‘হুঁ, একটু ভাবতে হবে।’ কয়েক মুহূর্ত ভাবল শিশির। শেষে হাতে তুড়ি বাজিয়ে এবং পকেট থেকে মোবাইল সেটটা বের করে সেটা অফ করে আবার পকেটে রেখে ওদের কাছে এগিয়ে গেল। বলল ওদেরকে উদ্দেশ করে, ‘এক্সকিউজ মি, আমরা খেলা করছিলাম। হঠাৎ করে…’
নাজিম ও আবিদকে চিনতে পারল কবির। বলল, ‘আরে তুমাদেরকে তো আমি চিনি। তুমরা তো খুব ভালো ছেলে। তা কী করতিছিলে এখানে?’
আবিদ বলল, ‘মানে এই আমরা খেলছিলাম।’
রবু শিশিরকে দেখিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘এই ছোকরাটা আবার ক্যাডা? আগে তো কুনোদিন দেকিচি বলে মনে কয় না।’
নাজিম বলল, ‘ও এই গ্রামে নতুন এসেছে। আমাদের প্রাইমারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক ওর আব্বা।’
রবু বলল, ‘ও তুমি হেডমাস্টারের ছেলে? ছার তো খুব ভালো মানুষ। তুমার আব্বারে কয়ো, একদিন যাবানে তুমাদের বাড়িতে। নাস্তা করে আসপানে। …তা কী সমস্যা হয়েছে তুমাদের?’
শিশির বলল, ‘আসলে সমস্যাটা আমারই। খেলা করতে করতে আমার মোবাইলটা কোথায় যেন পড়ে গেছে। কিছুতেই খুঁজে পাচ্ছিনে। তাই…’
‘ও বুঝতি পারিছি, আমার মুবাইলটা দিয়ে তুমার মুবাইলে কল দিতি চাও। এই ন্যাও।’ নিজের মোবাইল সেটটা বাড়িয়ে দেয় রবু।
শিশির হাত বাড়িয়ে নিয়ে নিজের মোবাইল নম্বরে কল দেয়। কানে ধরে। আশপাশে লক্ষ করে সবাই কোথাও শব্দ হয় কি না। তারপর বলল, ‘নাহ্, হারিয়েই গেছে বোধ হয়।’ মোবাইল সেটটা ফিরিয়ে দিল রবুকে। ‘আপনাকে ধন্যবাদ। সরি ডিস্টার্ব করার জন্য। আমরা এখন তাহলে আসি।’
রবু বলল, ‘ভালো লাগত তুমাদের মুবাইলটা খুঁজে দিতি সাহায্য কত্তি পাল্লি।’
ছেলেরা চলে গেল।
কবির বলল, ‘ছেলেগুলান আবার কুনো ঝামেলা পাকাবে নাতো?’
‘ধুর তুমি যে কী কও! চলো যাই।’ কবিরের কথায় কোনো পাত্তাই দিল না রবু।
‘হ্যাঁ চলো।’ বলল কবির। তারপর চলে গেল।

‘বুদ্ধিটা তুমি দারুণ করেছ!’ বলে উঠল নাজিম। ‘ওরা বুঝতেও পারেনি যে আমরা ওদেরকে সন্দেহ করেছি।’
‘সত্যিই তোমার বুদ্ধির তারিফ না করে পারছিনে।’ বলল আবিদ। ‘তুমি তোমার মোবাইলে মিসড্ কল অ্যালার্ট রেখেছ। তাই ওটা বন্ধ করে রেখে ওদের মোবাইলটা নিয়ে নিজের মোবাইলে মিসড্ কল দিলে। পরে সেট অন করে নাম্বারটা সেইভ করে নিলে। চমৎকার!’
শিশির হাতের মোবাইল সেটটা নাচিয়ে বলল, ‘এই মোবাইলটাই হয়তো আমাদেরকে এখন অনেক দূর পৌঁছে দেবে। আচ্ছা বলো তো এখন তোমাদের নিজেকে গোয়েন্দা গোয়েন্দা মনে হচ্ছে কি না?’
আবিদ বলল, ‘তা হচ্ছে। তবে…’
নাজিম বলল, দূরে কাউকে এদিকে আসতে দেখে, ‘আরে ওটা হাশেম না? হ্যাঁ হাশেমই তো। এই হাশেম, এদিকে আয়।’
হাশেম ওদের পাশে এসে দাঁড়াল। বলল, ‘আমারে কিছু কবা তুমরা? কলি জলদি কও। আমার আবার সুমায় কম।’
নাজিম বলল, ‘কেন, কী হয়েছে তুমার?’
‘আমাদের ম্যালা বিপদ।’ কেমন মলিন দেখাল হাশেমের মুখটা। চোখে-মুখে স্পষ্ট চিন্তার ছাপ।
‘বিপদ? কিসের বিপদ?’ আবার প্রশ্ন করল নাজিম।
হাশেম এই কথার কোনো জবাব না দিয়ে কাঁদতে লাগল।
আবিদ ওকে সান্ত¡না দিয়ে বলল, ‘আহা বলবে তো কী হয়েছে? তা না হলে আমরা বুঝব কেমন করে তুমি কাঁদছ কেন?’
হাশেমের কান্না তবুও থামে না।
নাজিম বলল, ‘এই হাশেম, তোর ভাইয়ের কিছু হয়েছে?’
হাশেম উপর-নিচ মাথা নাড়ে।
‘কী হয়েছে?’
‘সাত্তার মিম্বার কয়ে গেছে সাতদিনির মধ্যি ১০ হাজার টাকা দিতি হবে। না হলি, না হলি হ্যারা ভাইরে…’ আবার কেঁদে ওঠে হাশেম হাউ মাউ করে।
‘না হলে কী হবে?’ জিজ্ঞেস করল নাজিম। ‘কী বলে গেছে সাত্তার মেম্বর?’
এবার আর কান্না থামে না হাশেমের।
এতক্ষণ ওদের কথা কেবল শুনছিল শিশির। এবার মুখ খুলল, ‘সামথিং ইজ রং। দেখি আমি দেখছি।’ হাঁটু মুড়ে বসে পড়ল ঘাসের ওপর। ‘এই যে সোনা, এভাবে কেউ কাঁদে? এভাবে কাঁদলে তো লোকে খারাপ বলবে! দেখি দেখি, আমার দিকে তাকাও তো। এই তো গুডবয়। এবার বলো কী হয়েছে। ওরা ১০ হাজার টাকা চায় কেন?’
হাশেম কিছুটা আশ্বস্ত হয় শিশিরের কথা ও সান্ত¡নায়। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলে, ‘উত্তর পাড়ার উজ্জ্বল সাত্তার মিম্বারের কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা ঋণ নিইলো। কিন্তু সে তো ম্যালা গরিব, টাকা শোধ দেবে কন্থে? কাশেম ভাইরে সেই কথা কলি ভাই তারে টাকা ফেরত দিতি মানা করেছে। কয়েছে সরকারের টাকা তো গরিবদের জন্যিই। এই ১০ হাজার টাকা শোধ না দিলি সরকারের কিছুই হবে না। কিন্তু কাল সাত্তার মিম্বার এসে ভাইরে….’ কথা আটকে যায় হাশেমের। আবার কাঁদতে থাকে।
শিশির বলল, ‘তাইতো, তোমাদের তো তাহলে খুব বিপদ!’
হাশেম ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে শিশিরের দিকে। ওকে বোধ হয় ঠিক চিনতে পারছে না বা ওর কথার মাথামুন্ডু কিছুই বুঝতে পারছে না। শেষে বলল, ‘আমারে একটা কাজ দিবা তুমরা? যেকোনো কাজ। আমি কত্তি পারব। দিবা একটা কাজ?’
চোখ জোড়া ছলছল করে ওঠে ছেলেদের।
শিশির বলল, ‘তুমি কাজ করবে? কে বলেছে তোমাকে কাজ করতে? তোমার ভাইয়া?’
হাশেম বলল, এপাশ ওপাশ মাথা নেড়ে, ‘না না, ভাই আমারে কাজ কত্তি কয়নি। আর যদি ভাই জানে আমি কাজ করিছি, তালি তো ভাই আমারে মেরে ফ্যালবেনে। তুমরা কিন্তু ভাইরে কতি যেও না আবার!’
নাজিম বলল, ‘তোমাকে কাজ করতে হবে না। দুপুরে নিশ্চয়ই কিছু খাওয়া হয়নি?’
আবার এপাশ-ওপাশ মাথা নাড়ল হাশেম, ‘খাব কন্থেকে? ঘরে যে একটা চালও নেই। ভাইয়েরও শরীলটা ভালো না। … এই দেখ, আমি খালি খালি তুমাদের সাথে কথা কয়ে সুমায় নষ্ট কচ্ছি কেন? বুজিছি তুমরা কুনো কাজ দিবা না। ঠিক আছে, আমি তালি যাই। অন্য কোনোখানে দেখিগে।’ চলে যাওয়ার জন্য ঘুরে দাঁড়াল হাশেম।
শিশির ওকে থামাল। বলল, ‘কিন্তু তুমি তো…’ কথা শেষ করতে পারে না। তার আগেই চলে যায় হাশেম।
কিছুক্ষণ ‘থ’ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল সবাই। নীরবে কাটল কয়েক মুহূর্ত।
‘বিষয়টা ভাবা যায়?’ নীরবতা ভেঙে শিশিরই বলল। ‘এতটুকু একটা ছেলে টাকা রোজগারের জন্য কাজ খুঁজে বেড়াচ্ছে!’
আবিদ বলল, ‘আমার যদি ক্ষমতা থাকত তাহলে ওকে কোনো একটা কাজ দিয়ে দিতাম।’
নাজিম বলল, ‘বেচারার জন্য খুব মায়া লাগছে।’
শিশির বলল, ‘তোমরা কেউই সঠিক বিষয়টা ভাবতে পারছ না। আরে অতটুকুন একটা ছেলে কাজ কেন করবে? ওর তো এখন মন দিয়ে লেখাপড়া ও খেলাধুলা করার কথা।’
‘তাই তো!’ একসাথে বলে উঠল আবিদ ও নাজিম।
‘এ কথা তো আমাদের মাথায় আসেনি!’ বলল আবিদ।
‘আসলে যতই তোমার সাথে মিশছি ততই অবাক হচ্ছি।’ বলল নাজিম। ‘তুমি সত্যিই একটা জিনিয়াস।’
‘এই শিশির,’ বলল আবিদ। ‘তুমি আবার কিছু ভাবছ নাকি? কী ভাবছ?’
‘ভাবছি অনেক কিছুই।’ কিছুটা অন্যমনস্ক দেখাল শিশিরকে। ‘আচ্ছা চলো এখন, পরে আলাপ করা যাবে। এখন আমাদের মূল কাজ শুরু করার সময় এসে গেছে।’
‘মূল কাজ মানে?’ অবাক হয়ে গেল আবিদ।
‘কিসের মূল কাজ?’ নাজিমও অবাক।
‘ভুলে যাচ্ছ কেন আমরা একটা রহস্যের তদন্ত করতে চাচ্ছি।’ মনে করিয়ে দিল শিশির। ‘সন্ধ্যা হয়ে আসছে, চলো তো বাড়িতে। রাতের পড়াশুনা সেরে আবার সবাইকে একত্রে বসতে হবে। কিছু বিষয় আলোচনা করা দরকার।’ ওদেরকে আর কিছু বলতে না দিয়েই ওখান থেকে চলে গেল।
কিছুক্ষণ ফ্যালফ্যাল করে সেদিকে তাকিয়ে থেকে মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে বাকি দু’জনও চলে গেল।

সাত.

জায়গাটা খুবই অন্ধকার। এমনকি নিজের হাতটাও স্পষ্ট দেখা যায় না। চারধারে ঝিঁঝিঁ পোকার বিরক্তিকর একটানা চেঁচানি। দূরে কোথাও থেকে থেকে শেয়াল ডেকে উঠছে। জেগে আছে জানান দিতে ঘেউ ঘেউ করে উঠছে কোনো বাড়ির উঠান থেকে একটা কুকুর। তার ডাকে সাড়া দিয়ে অন্যত্র ডেকে উঠছে আরো কয়েকটা।
‘মানে বুঝলে না?’ কথাটা যেন চেয়ারম্যানের মুদ্রাদোষে পরিণত হয়েছে। ‘বিষয়টা তাহলি বুঝতি পারিছাও তো সাত্তার?’
‘হ্যাঁ চ্যারমান ছার, বুঝতি পারিচি।’ বলল সাত্তার মেম্বর।
‘তবে খুব সাবধান কলাম।’ খায়ের তার তোষামুদি বজায় রাখল। ‘কাকপক্ষিও জানি টের না পায়।’ অন্ধকারেই এদিক ওদিক তাকাল।
মেম্বর বলল, ‘আপনারা নিশ্চিত থাকতি পারেন। সবকিছু ঠিকঠাক মতোন হবেনে।’
কিরণ বলল, ‘তালি আমরা এখন যাই চ্যারমান ছার।’
খায়ের আশপাশে চোখ বুলিয়ে বলল, ‘যাও। দ্রুত এ জাগা থেকে কেটে পড়ো।’
আর কিছু না বলে মেম্বর ও কিরণ দ্রুত চলে গেল।
ওরা চলে যেতেই বলল খায়ের, ‘আমাদেরও বোধ হয় আর দেরি করা ঠিক হবে না চ্যারমান ছার।’
চেয়ারম্যান বলল, ‘চলো যাই।’
ওরাও কেটে পড়বে।

মেম্বর ও কিরণ এসে দাঁড়িয়েছে কাশেমদের বাড়ির সামনে। ঘরের মধ্যে টিমটিম করে ল্যাম্পের আলো জ্বলছে। বাঁশের বেড়ার ফাঁক দিয়ে সেই আলোর হালকা ছটা এসে পড়ছে বাইরে, উঠানে।
‘কাশেম ভাই, বাড়িতে আছো কাশেম ভাই?’ গলা চড়িয়ে ডাকল কিরণ।
‘ক্যাডা?’ ঘরের মধ্য থেকে জবাব দিল কাশেম।
কিরণ বলল, ‘মিম্বার আয়েছে তুমার সাথে জরুরি একটা আলাপ কত্তি। একটু বাইরি আসোতো ভাই।’
কাশেম বাইরে বেরিয়ে এলো। হাতে ধরা কেরোসিনের ল্যাম্পটা। বাতাসে ওপাশ ওপাশ করছে জ্বলন্ত সলতেটা। ‘এতো রাতে না আলিই পাত্তে। কাল বিহানেও তো কথা কওয়া যেত।’
মেম্বর বলল, ‘তা যেত কাশেম। কিন্তুক বিষয়টা খুব জরুরি। তাই রাত্রিই আসতি হলো।’
কিরণ বলল, ‘একটু ঘরের পেছনে আসো।’
কাশেম বলল, ‘এখানে কলি সমস্যা কনে? ছোট ভাইটা ঘরে একলা আছে। আমি গিলি ভয় পাবেনে।’
‘আরে তুমার বেশি সুমায় তো আমরা নিবানে না। একটু আসো।’
‘ঠিক আছে, চলো।’
হাতের ল্যাম্পটা বারান্দায় রেখে বারান্দা থেকে নেমে ওদের সাথে ঘরের পিছনের দিকে গেল কাশেম। তারপর জিজ্ঞেস করল, ‘এবার কও দেখি জরুরি বিষয়টা কী?’
মেম্বর বলল, ‘আমি সহজ কথার মানুষ। তুমরা ভোট দিয়ে আমারে মিম্বার বানাইছাও। তাই তুমাদের সুখ-দুঃখ দেখার দায়িত্বও আমার। তাই কচ্ছিলাম তুমার ওই ১০ হাজার টাকা আর ফেরত দিতি হবেনে না।’
কাশেম যেন বিশ্বাস করতে পারে না মেম্বরের কথা। ‘মানে কী কচ্ছো মিম্বার? আমি তো কিছুই বুজতি পাচ্ছিনে।’
‘এই কিরণ্যা, খুলে কস না ক্যান?’
‘আমি কলাম সুজা কথার মানুষ।’ বলল কিরণ। ‘আসলে বিষয়টা হয়েছে, মানে…’
‘হ্যাঁ কও।’ উৎসুক হয়ে কান পেতে রইল কাশেম।
‘আসলে বিষয়টা হলো তুমারে একটা কাজ করে দিতি হবে।’ আসল কথায় এলো কিরণ। ‘তাহলিই ওই টাকাটা আর ফেরত দিতি হবে না।’
‘কাজ করে দিতি হবে? কী কাজ?’
‘এই তো এতক্ষণ পর আসল কথায় এসেছো।’ বলে উঠল সাত্তার। ‘আসপাই তো, তুমি তো আর মুখ্যু না। লেখাপড়া করিছো কিছু। আমরা তো মুখ্যু-সুখ্যু মানুষ, লেখাপড়াটা ঠিকমতো হলো না। শোনো কাশেম, তুমারে একটা খুব সহজ কাজ করে দিতি হবে। কাজটা করে দিতি পাল্লিই, শুনেছাও তো, ওই টাকাটা আর ফেরত দিতি হবে না।’
‘কিন্তু কাজটা কী মিম্বার?’ এখনও ওৎসুক্য যায়নি কাশেমের।
‘না না, কোনো খুন-টুন কত্তি হবে না। ওসব আমি এখন ছেড়ে দিইছি। খুবই সহজ একটা কাজ তুমারে কত্তি হবে। বিনিময়ে…’
‘কিন্তু কাজটা কি তা তো কবা না কি?’
সাত্তার মেম্বর ঠিক বলতে পারছে না দেখে এবার কথা বলে উঠল কিরণ, ‘অত ভণিতা করে লাভ নেই মিম্বার। আসল কথাটা কয়েই ফালাও।’ তারপর কাশেমের উদ্দেশে বলল, ‘আসলে তুমারে একটা লোকরে কিছুদিনির জন্যি আটকায়ে রাখতি হবে।’
‘মা-মানে?’ কাশেম যেন ভীষণভাবে কারেন্ট শক খেল।
তাই দেখে মেম্বর বলল, ‘আহা ঘাবড়ে যেও না কাশেম। আগে ভালো করে শোনোই না। আর মনে রেখ কাজটা করে দিলি ১০ হাজার টাকা মাফ। …ঠিক আছে, তুমারে ভাবতি দুই মিনিট সুমায়

SHARE

Leave a Reply