Home খেলার চমক মাশরাফি তিনি আসলে কেমন -আসিফ হাসান

মাশরাফি তিনি আসলে কেমন -আসিফ হাসান

কারো কাছে বড় ভাই, কারো কাছে পিতৃতুল্য। আইকন, আইডল, গুরু, ক্যাপ্টেন, সেলিব্রেটি ইত্যাদি তো আছেই। তিনি দলকে যেভাবে আগলে রাখছেন, তাতে করে তিনি সত্যিকারের একজন অভিভাবক হিসাবে গণ্য হচ্ছেন। সাধারণ মানুষের কাছে তিনি স্বপ্নের মহানায়ক। ক্রিকেট বাংলাদেশের প্রধান খেলা হওয়ায় তিনিই বলা যায় সবার নেতা। বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্যক্তিদের একজন তিনি। তাকে জানা, তাকে বোঝার আগ্রহ কমতি নেই কারো।
তিনি হলেন মাশরাফি বিন মর্তুজা। তাকে নিয়ে লিখলে লেখাটি শেষ হবে না। অনেক পৃষ্ঠা লেখার পরও মনে হবে অসম্পূর্ণতা রয়ে গেছে। এখানে তাকে নিয়ে কিছু ঘটনা, কিছু ভাবনা তুলে ধরা হলো, তাকে জানা আর বোঝার জন্য। এগুলো নতুন কিছু নয়। বিভিন্ন সময় প্রকাশিত তথ্যই নতুন করে সাজানো হয়েছে।
পাগলা রাজা

মাশরাফি সম্পর্কে জানার একটি বড় উৎস ‘মাশরাফি’ নামের বইটি। লিখেছেন দেবব্রত মুখোপাধ্যায়।
তার মতে মাশরাফির নিজের প্রতি খেয়ালটা একটু কম। মানুষের বেঁচে থাকার জন্য হলেও তো কোনো কোনো ক্ষেত্রে একটু স্বার্থপর হতে হয়। সেই স্বার্থপরতারই অভাব রয়েছে তার মধ্যে। একটু বেশিই খামখেয়ালি। এই যেমন ধরুন, জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে তৃতীয় টি-টোয়েন্টি ম্যাচটিরই কথা। দেখলাম একটা সিঙ্গেল বাঁচানোর জন্য সেকি জাম্পটাই না দিলেন! মাশরাফি ওই জাম্পটা না দিলেও পারতেন। কেউ তাকে এ নিয়ে কিছু বলতোও না; কিন্তু ওই যে, নিজের প্রতি খামখেয়ালিপনা… এটাই ওর বড় দোষ।
মাশরাফির সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হলো জনপ্রিয়তা। মাশরাফি শুধু দেশে না, ড্রেসিং রুমেও অনেক জনপ্রিয়। এবার যখন তাকে অধিনায়ক করা হলো, এর একটা বড় কারণ ছিল তার ড্রেসিং রুম জনপ্রিয়তা। ওই সময়ে মনে হয়েছিল, সীমিত ওভারের ম্যাচে এমন কাউকে দেয়া দরকার, যাকে ড্রেসিং রুমে সবাই খুব পছন্দ করে। এই জিনিসটা সব সময় তিনি ধরে রেখেছেন। এখনও রাখেন। সাকিব, তামিম, মুশফিকের মতো সিনিয়রদের কাছেও তিনি জনপ্রিয়। তরুণ খেলোয়াড় যারা আছে তাদের কথা নাই বা বলা হলো। কারণ, ওদের প্রজন্মের সবারই হিরো হচ্ছেন মাশরাফি। ওরা ক্রিকেট খেলা শুরুই করেছে মাশরাফিকে দেখে। মাশরাফি ওদের আইডল। ওদের কাছে জনপ্রিয় হবে এ নিয়ে তো আর কথা নেই; কিন্তু মাশরাফির সমসাময়িক যারা, যেমন মুশফিক, তামিম, রিয়াদ, সাকিব এদের মধ্যেও তিনি খুব জনপ্রিয়। আমরা মানুষ মাত্রই একটু একজনের সঙ্গে আরেকজনের দ্বন্দ্ব দেখতে পছন্দ করি। যেমন মাশরাফির সঙ্গে যদি সাকিবের একটা দ্বন্দ্ব হয়, তাহলে বোধ হয় জিনিসটা অনেক সিনেম্যাটিক হবে। আসলে এ রকম কিছু বাংলাদেশ দলে নেই। দেবব্রত বলেন, বইটা নিয়ে কাজ করতে গিয়ে এই জিনিসটা ফিল করতে পারছি। আপনি ভাবতেও পারবেন না, অবাক হয়ে যাবেন সাকিব বাংলাদেশের ক্রিকেট এরিনায় সম্ভবত সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে মাশরাফিকেই। আমি ওর সঙ্গে বারবার এই নিয়ে কথা বলে এটা বুঝতে পেরেছি। আর রিয়াদ তামিম ওদের তো সব সময়ের প্রিয় চরিত্র মাশরাফি। ওই যে বললাম না, উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আমি আশাই করতে পারিনি যে, সব খেলোয়াড় এভাবে এসে মজা করবে।

মাশরাফি কাঁদলেন, কাঁদালেন

‘হিরো’ বলেই সবার কাছে পরিচিত বাংলাদেশের পেস সেনসেশন তাসকিন আহমেদ। তবে এই নামটির আবিষ্কারক মাশরাফি নিজেই। মাশরাফি ছাড়াও তাসকিনকে পরিচিত অনেক সাংবাদিক হিরো নামেই ডাকেন। ছোট ভাইয়ের মতো তাসকিনকে আদরের পাশাপাশি শাসন করেন মাশরাফি। তাসকিনও তাকে বড় ভাইয়ের মতোই মনে করেন। তাসকিন বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘আমি মাশরাফি ভাইয়ের মতো ভালো মানুষ হতে চাই। বড় ক্রিকেটার হয়ে কী হবে, যদি ভালো মানুষই না হতে পারি।’
মাশরাফি কেমন মানুষ সেটা নতুন করে বলে দেয়ার প্রয়োজন নেই। তবে প্রত্যেকটা তরুণ ক্রিকেটার কিভাবে মাশরাফির ওপর নির্ভরশীল সেটা জানার প্রয়োজন আছে। মাশরাফিও তাদের প্রত্যেককে ছোট ভাইয়ের মতো আদর-শাসন করে।
সেই মাশরাফি তার ‘হিরো’র নিষেধাজ্ঞায় কাঁদলেন। সবাইকে কাঁদালেন। ঘটনাটি ছিল গত এশিয়া কাপে, যখন তাসকিনকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল তার বোলিং ভঙ্গির জন্য।
ওই আসরে তাসকিনকে দলে নিতে অনাগ্রহ দেখিয়েছিল নির্বাচক প্যানেল! কিন্তু মাশরাফির কথায় তাসকিনকে স্কোয়াডে জায়গা করে দেন নির্বাচকরা। মাশরাফির আস্থার প্রতিদান দিতে এতটুকু দেরি করেননি তাসকিন। বড় ভাইয়ের আদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছে।
কিন্তু তরুণ তাসকিনকে ভয়ঙ্কর এক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছিল। আইসিসি তাসকিনের বোলিং অ্যাকশন অবৈধ ঘোষণা করে। বিশ্বমঞ্চে এরকম এক ঘটনা পুরো বাংলাদেশকে কাঁপিয়ে দিচ্ছে। পুরো বাংলাদেশ দল হতভম্ব। তখন দেখা গেল অন্য রকম মাশরাফিকে। সংবাদ সম্মেলনে মাশরাফি বিন মর্তুজা সচরাচর প্রাণবন্ত থাকেন। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ম্যাচটির আগে মাশরাফি ছিলেন একেবারেই ভিন্ন। মুখে কথা আটকে যাচ্ছিল। জড়তা কাজ করছিল। বারবার ক্যামেরায় মুখ লুকাচ্ছিলেন। ২৫ মিনিটের সংবাদ সম্মেলনে মাশরাফিকে এর আগে কখনো এমনটা দেখা যায়নি। সংবাদ সম্মেলনের পুরোটা সময়েই তাসকিনকে নিয়ে প্রশ্ন। মাশরাফিও উত্তর দিচ্ছিলেন। কিন্তু কোনো উত্তরই শেষ করতে পারছিলেন না তিনি।
তাসকিনকে নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমার বিশ্বাস তাসকিনের বোলিং অ্যাকশন সম্পূর্ণ বৈধ। আমি যাকে নিয়ে কথা বলছি সে আগামী ১০ বছর বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে সার্ভিস দিবে।’
সংবাদ সম্মেলনের শেষে মঞ্চ থেকে নামতে নামতে মাশরাফি অঝোরে কেঁদেই ফেললেন। চোখ মুছলেন জার্সি দিয়ে। মাশরাফি ও ম্যানেজার সুজন বাদে পুরো দল চলে গিয়েছিল টিম বাসে। মাশরাফির হোটেলে ফেরার ব্যবস্থা ম্যানেজার খালেদ মাহমুদ সুজনের সঙ্গে গাড়িতে। সেই গাড়িতেও অশ্রু সংবরণ করতে পারেনি বাংলাদেশের অধিনায়ক। নড়াইল এক্সপ্রেসকে সান্ত¡না দিয়েও থামাতে পারছিলেন না সুজন।
বাইরে থেকে সাংবাদিকরাও সাহস দিচ্ছিলেন। কিন্তু তার কান্না যেন থামার নয়। কারণ এটি বেদনাহত, হৃদয় চূর্ণ হওয়ার অশ্রু। সংবরণের চেষ্টা সেখানে ব্যর্থ অস্ত্র। ভারতের প্রসিদ্ধ বাংলা দৈনিক বর্তমানের সিনিয়র সাংবাদিক রবীন্দ্র চৌধুরী জয়। কলকাতার মানুষ। মাশরাফির কান্না দেখে রীতিমতো হাউ মাউ করেই কেঁদে উঠলেন এ বাঙালি। বারবার বলছিলেন, ‘এমন দৃশ্য আমি জীবনেও দেখিনি রে ভাই। দলের খেলোয়াড়দের জন্য এমন টান, এমন ভালোবাসা কোথাও দেখিনি। ক্রিকেট ইতিহাসে এ ঘটনা কোথাও হয়নি।’
মাশরাফিকে নিয়ে গাড়িটা হুট করে হুইসেল দিয়ে চলে গেল। তার প্রস্থানের পরও সেই আবহের রেশ কাটেনি চেন্নাস্বামীতে। সবার মুখে মুখে ফিরছিল সিংহহৃদয়, দেশপ্রেমে অন্তঃপ্রাণ, সতীর্থদের আপন ভাইয়ের মতো আগলে রাখা মাশরাফির অকৃত্রিম ভালোবাসার কথা।
মাশরাফি ভাই একজন অভিভাবক

মুশফিকুর রহীমের এই মন্তব্য মাশরাফির টি-২০ ক্রিকেট থেকে অবসর ঘোষণার পরপরই। শ্রীলঙ্কায় টেস্ট ও ওয়ানডের পর টি-টোয়েন্টি সিরিজও ১-১ ড্র করে বাংলাদেশ। সাফল্যমন্ডিত এক সফর শেষে শুক্রবার দেশে ফেরেন বাংলাদেশ দলের খেলোয়াড়রা। সেখানেই সাংবাদিকদের সামনে কথা বলেন মুশফিকরা।
মাশরাফিকে নিয়ে মুশফিক বলেন, ‘মাশরাফি ভাই শুধু একজন ক্রিকেটার নন, তিনি একজন অভিভাবকও। মাশরাফি ভাই যে অবদান টি-টোয়েন্টি ও ওভারঅল সব ফরম্যাটে রেখেছেন, এটা আসলেই কেউ পূরণ করতে পারবে না। আমরা যারাই ভবিষ্যতে টি-টোয়েন্টি খেলি না কেন যদি আরো ভালো করতে পারি, তাহলে মনে হয় উনিই বেশি খুশি হবেন।’
অন্য এক মাশরাফি
মাশরাফিকে সবাই মাঠে চেনে। পরিবারে তিনি কেমন? তিনি তো একইসাথে কারো বাবা, কারো স্বামী। তাদের কাছে তিনি কেমন? এই ইংল্যান্ড সফরের সময়কার ঘটনাটিই এখানে তুলে ধরা যাক।
সন্ধ্যায় যুক্তরাজ্যে ফেরার ফ্লাইট। দুপুর বেলাতেও মাশরাফি বিন মর্তুজার ফুরসত নেই। মেয়েকে নিয়ে যেতে হবে চোখের ডাক্তারের কাছে। স্বামী- মেয়েকে এগিয়ে দিতে বেরিয়ে এলেন সুমনা হক, যার অসুস্থতার কারণেই মাশরাফির দেশে ফেরা। ‘হাঁটা-চলা করতে পারছেন তাহলে?’, প্রশ্ন শুনে শুকনো মুখে হাসলেন মাশরাফির স্ত্রী। মাশরাফির উত্তর, ‘নাহ, বিছানা থেকেই তো নড়তে পারে না। এখন একটু উঠল।’
অসুস্থ স্ত্রীর পাশে থাকার জন্য গত ৩০ এপ্রিল ইংল্যান্ড থেকে দেশে ছুটে এসেছেন মাশরাফি। ছেলে সাহেলেরও তখন প্রচন্ড জ্বর। এর মধ্যেই আবার মেয়ে হুমায়রার পুরনো চোখের সমস্যা দেখা দিয়েছে প্রবলভাবে। সব মিলিয়ে কয়েকটা দিন সত্যিকার অর্থেই দিশেহারা অবস্থা ছিল। সবকিছু একটু সামলে শনিবার সন্ধ্যায় আবার ফিরে যাচ্ছেন মাশরাফি।
শনিবার দুপুরেও মেয়েকে চোখের ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাচ্ছিলেন মাশরাফি। স্ত্রীকে নিয়েও খানিকটা দুর্ভাবনা আছে। সোমবার রাতে অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। একটি বায়োপসি রিপোর্ট পাওয়ার কথা শনিবার রাতে। মাশরাফির ইচ্ছা ছিল রিপোর্টটা পেয়ে পুরোপুরি নিশ্চিত হয়ে ফিরে যাওয়া। কিন্তু বেলফাস্টের কানেক্টিং ফ্লাইট ধরতে হলে সন্ধ্যায় রওনা হওয়া ছাড়া উপায় নেই।
সাসেক্সে ক্যাম্পে দু’টি প্রস্তুতি ম্যাচ খেলতে পারেননি। তবে ওসব নিয়ে ভাবার অবকাশও ছিল না। জানালেন, খেলা নিয়ে ভাবার অবকাশও ছিল না এই কদিন।
“ক্যাম্পে থাকলে অবশ্যই ভালো হতো। যে ঠান্ডা দেখে আসছি, তাতে মানিয়ে নেয়াটা খুব জরুরি। তবে পরিস্থিতি যা ছিল এখানে, তাতে ওসব ভাবারও সুযোগ নেই। যা হয়েছে, ভালোই হয়েছে। আসতে পেরেছি, পরিবারকে সময় দিতে পেরেছি, এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।”
‘এমনও হতে পারত যে আরো পরে যেতে হচ্ছে। এমনকি না-ও যেতে পারতাম। সবকিছুই এখন নিয়ন্ত্রণে। যদিও ধাক্কাটা পুরোপুরি সামলাইনি, বায়োপসি রিপোর্টটা পাইনি এখনও। তারপরও আশা করছি, সব ঠিক হয়ে যাবে।’
১২ মে আয়ারল্যান্ডে ত্রিদেশীয় সিরিজ শুরু। তার আগে ১০ মে বেলফাস্টে প্রস্তুতি ম্যাচ। এই টুর্নামেন্ট শুরুর আগে ফিরে যেতে পারছেন, এতেই নিজেকে ভাগ্যবান মানছেন মাশরাফি।
‘খারাপের মধ্যেও ভালো যে মূল খেলা শুরুর বেশ আগেই দুর্ঘটনাটা ঘটেছে। খেলা শুরুর পরও এরকম হলে আমি ফিরতাম, ফিরতে হতোই। এটাই স্বাভাবিক। স্ত্রী অসুস্থ, আমার বাচ্চা দুটো চার-পাঁচ দিন মায়ের থেকে আলাদা ছিল। এসময় দরকার ছিল আমাকে। ছেলেটার জ্বর ছিল। মেয়েটার চোখে অনেক সমস্যা। পরিস্থিতি অনেক কঠিন ছিল। হয়ত ৬-৭ দিনের ব্যাপার, কিন্তু কঠিন ছিল। মন্দের ভালো যে খেলা শুরুর আগেই হয়েছে। এখন ফিরতেও পারছি।’
জীবনে কঠিন সময় তো কম আসেনি। প্রথম সন্তান জন্মের সময় দীর্ঘদিন আইসিইউতে ছিলেন স্ত্রী। ভয়ঙ্কর সংগ্রাম করে বেঁচে ফিরেছিলেন। ২০১৫ বিশ্বকাপ চলার সময় ভীষণ অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ছিল ছেলে। নিজের তো ক্যারিয়ারজুড়েই শরীরের সঙ্গে চালিয়ে যাচ্ছেন যুদ্ধ।
তবে এসবের মধ্যেও এবার আরো একবার উপলব্ধি করতে পেরেছেন জীবনের বড় একটা সত্য, সবকিছুর আগে পরিবার।
‘এসব হয়ত আমাকে আরো শক্ত করে। সবকিছই মসৃণ চললে তো আর সেটা জীবন নয়। এসবের মধ্য দিয়েই যেতে হয় জীবনে। আর খেলার চেয়ে পরিবার অনেক অনেক আগে। আমি নিজেও আরেকবার বুঝতে পারলাম।’

SHARE

Leave a Reply