Home চিত্র-বিচিত্র মৌমাছি গণিতবিদ সুনিপুণ শিল্পী -নুসাইবা মুমতাহিন

মৌমাছি গণিতবিদ সুনিপুণ শিল্পী -নুসাইবা মুমতাহিন

“মৌমাছি, মৌমাছি,
কোথা যাও নাচি নাচি
দাঁড়াও না একবার ভাই।
ওই ফুল ফোটে বনে,
যাই মধু আহরণে,
দাঁড়াবার সময় তো নাই।”
নবকৃষ্ণ ভট্টাচার্যের এই কবিতা আমাদের ছোটবেলার কথা মনে করিয়ে দেয়। ছোটবেলায় এই কবিতাটি আমরা বিভিন্ন ভাবে আবৃত্তি করে আনন্দ পেতাম।
এই কবিতাটির মূল বিষয় হলো মৌমাছির কাজের প্রতি নিষ্ঠা। মৌমাছি প্রাণিজগতের অন্যতম পরিশ্রমী প্রাণী। এই মৌমাছির অনেক তথ্যই আমাদের অনেকের অজানা। আজ আমরা জানব মৌমাছির জানা-অজানা বিষয় সম্পর্কে।
ধারণা করা হয় মৌমাছির আবির্ভাব হয় মানুষের জন্মেরও প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি বছর আগে। এই সুদীর্ঘ সময় ধরে বিশে^ টিকে থাকা মৌমাছিরা সংখ্যার দিক থেকেও কম নয়। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, ২০ হাজারেরও বেশি প্রজাতির মৌমাছি রয়েছে পৃথিবীতে। অ্যান্টার্কটিকা ছাড়া পৃথিবীর সব মহাদেশেই রয়েছে মৌমাছি।
প্রাণীদের মধ্যে আর্থ্রােপডা পর্বের পঙ্গ বা ইনসেক্টা শ্রেণীতে অবস্থান মৌমাছির। হাইমেনপটেরা অর্ডারে মৌমাছি প্রায় নয়টি পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। আর এর ২০ হাজারেরও বেশি প্রজাতির কথাতো বলা হয়েছে।
প্রজাতির দিক থেকে অনেক হলেও গঠন প্রণালি প্রায় একই রকম। একটি মৌমাছির শরীরকে প্রধানত ৩টি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়। এগুলো হলোÑ মাথা, বুক ও উদর।
মৌমাছির মাথার গড়নটা বেশ জটিল। মাথার অংশে রয়েছে ২টি জটিল গঠনের চোখ, যাদের বলা হয়ে পুঞ্জাক্ষী। পুঞ্জাক্ষীর প্রতিটিতেই রয়েছে সহ¯্রাধিক আলোক-সংবেদী কোষ। এর বাইরেও মৌমাছির মাথার ওপর ত্রিভুজাকৃতিতে রয়েছে আরোও তিনটি চোখ। মৌমাছির মাথার অংশে রয়েছে অ্যান্টেনা। যার মূল কাজ হলো কোনো গন্ধ পেলে তা মৌমাছিকে জানিয়ে দেয়া। মৌমাছির মাথার আর দুইটি অংশ হলো এদের চোয়াল এবং জিহ্বা। এদের চোয়ালকে বলা হয় ম্যান্ডিবল আর জিহ্বাকে বলা হয় প্রোবোসিস। ফুলের ভেতর থেকে মধু সংগ্রহ করে রাখার জন্য এর গলার অংশে বিশেষ একটি থলিও থাকে।
মৌমাছির ডানা, পা এবং বিভিন্ন পেশির সমন্বয়ে গঠিত হয় এর বুকের অংশটি। মৌমাছির শরীরে থাকে দুইটি পাখনা। আর স্বাভাবিক ভাবেই মৌমাছির ছয়টি পা ব্যবহৃত হয় এর চলাফেরার কাজে। অবশ্য বিভিন্ন ফুলের রেণু বয়ে নিয়ে যেতেও কাজ করে এসব পা।
মৌমাছির বাসা সম্পর্কে আমরা সবাই জানি। এদের বাসাকে বলা হয় মৌচাক। এই মৌচাক থেকেই মধু সংগ্রহ করা হয়। হাজার হাজার মৌমাছির পরিশ্রমে এই মৌচাকে মধু জমা হয়। একটি মৌচাকে তিন ধরনের মৌমাছি বাস করেÑরানি মৌমাছি, পুরুষ মৌমাছি এবং কর্মী মৌমাছি।
মৌমাছিরা রানির নির্দেশে কাজ করে। একটি মৌচাকে একটি মাত্র রানি মৌমাছি থাকে। রানি মৌমাছি কোনো কাজ করে না। তারা শুধুমাত্র একটি কাজ করে। তাহলো ডিম পাড়া। রানি মৌমাছি সাধারণত কয়েক বছর পর্যন্ত বাঁচে। মৌচাকের বিভিন্ন ধরনের মৌমাছির মধ্যে রানি মৌমাছিই আকারে সবচেয়ে বড় হয়।
ডিম পাড়তে রানি মৌমাছিকে সহায়তা করার জন্য মৌচাকে থাকে হাজার দুয়েক পুরুষ মৌমাছি। যেগুলোকে বলা হয় ড্রোন। এত পুরুষ মৌমাছির মধ্যে মাত্র কয়েকটি মৌমাছি রানি মৌমাছির সাথে ডিম উৎপাদনে সহায়তা করে। বাকি মৌমাছিগুলো এমনিতেই মৌচাকে থেকে যায়। ঠান্ডার সময় অবশ্য মৌচাক থেকে পুরুষ মৌমাছিগুলোকে বের করে দেওয়া হয়।
রানি মৌমাছি এবং পুরুষ মৌমাছির বাইরে প্রতিটি মৌচাকে কাজ করে প্রায় ৪০ হাজার শ্রমিক বা কর্মী মৌমাছি। এরা মেয়ে হলেও ডিম পাড়তে পারে না। ফুল থেকে মধু সংগ্রহের কাজটি করে থাকে এই কর্মী মৌমাছিগুলোই। এ ছাড়া মৌচাকে জন্ম নেয়া বাচ্চা মৌমাছি যাদের লার্ভা বলা হয় তাদের খাওয়ানো। মৌচাক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা, মোম তৈরি করা, রেণু সঞ্চয় করা, মৌচাককে পাহারা দেয়ার কাজও কর্মী  মৌমাছিরা করে। মৌচাকে মৌমাছিদের মধ্যে এরাই আকারে ছোট হয়।
খাবার গ্রহণের জন্য মৌমাছিরা ফুলের ওপর নির্ভরশীল। বিভিন্ন ধরনের ফুল দেখতে এবং গন্ধে বিভিন্ন রকমের হলেও বেশির ভাগ ফুলই দুটি সাধারণ জিনিস উৎপাদন করে। এর মধ্যে একটি হলো চিনি মিশ্রিত পানি যাকে ইংরেজিতে বলে নেক্টার। এটিই হলো মধুর মূল উপাদান। ফুলের আর একটি উৎপাদিত উপাদান হলো রেণু। হলুদ রঙের পাউডারের মতো দেখতে এই উপাদানটি মূলত প্রোটিনে সমৃদ্ধ। শিশু মৌমাছিদের এই রেণু খাওয়ানো হয়। এতে শিশু মৌমাছিদের বৃদ্ধি দ্রুত হয়। শীতের দিকে মৌচাকের মধু মৌমাছিদের খাবার হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
মৌমাছির সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বিষয় তাদের বাসা অর্থাৎ মৌচাক। মৌচাক মূলত তৈরি হয় মোম দ্বারা। কর্মী মৌমাছিরা এই মোম উৎপাদন করে। নিজেদের উৎপাদিত মোমকে তারা পা দিয়ে নির্দিষ্ট আকার প্রদান করে। মৌচাকের প্রতিটি খোপ হয় ষড়ভুজাকৃতির। এদের একটি স্তরের আশপাশে থাকে রেণু। মৌচাকের অন্য অংশের খোপগুলোতে মধু জমা করে রাখা হয়। মৌচাকের একটি অংশ বরাদ্দ থাকে রানি মৌমাছির জন্য।
এতো গেলো মৌচাক মৌমাছির অবস্থান নিয়ে। এখন আমরা জানবো মৌচাক গঠন নিয়ে।
একটি মৌচাককে ব্যবচ্ছেদ করা হলে সেখানে স্তরে স্তরে সজ্জিত ষড়ভুজের সজ্জা পাওয়া যায়। মধু সংগ্রহ করে রাখার জন্য তারা যে ঘর বানায় তার স্থাপত্যশৈলী সত্যিই অবাক করার মতো। ষড়ভুজ আকারের খোপগুলো এমনভাবে হেলে থাকে যেন তরল মধুর সামান্য অংশও নিচে না পড়ে। সবগুলো খোপ একই আকারের। পুরো বাসাটা আবার পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রের সমান্তরালে অবস্থান করে।
মৌমাছির এই বৈজ্ঞানিক কৌশল বিজ্ঞানী মহলকে আকর্ষিত করেছে। গ্রিক দার্শনিক পাপসে মনে করতেন, মৌমাছিরা স্বর্গ থেকে প্রাপ্ত এক বিশেষ ক্ষমতার অধিকারী।
পদার্থবিদরা মনে করেন মৌচাকের এমন আকৃতির পেছনে পৃষ্ঠটান ধর্ম কাজ করে। পৃষ্ঠটান ধর্মই তার প্রভাবের মাধ্যমে খোপগুলোকে সুষম ষড়ভুজ আকৃতি প্রদান করে।
মৌমাছিরা জ্যামিতিক আকৃতির মাঝে ষড়ভুজকেই কেন বেছে নিল তা নিয়ে বিস্ময়ের শেষ নেই। ষড়ভুজ আকৃতি এমনভাবে গঠিত থাকে যেন একটা খোপ থেকে অন্য খোপে ফাঁকা না থাকে। ষড়ভুজে বেশি দেয়াল থাকে এবং ভেতরের জায়গা সবচেয়ে কম অপচয় হয়। অর্থাৎ মধু সংগ্রহ করলে তা খোপের প্রতিটি কোণায় পৌঁছে যায়।
শুধু বাসা বানানো নয় মৌমাছি আত্মরক্ষায়ও কৌশলী হয়। মৌমাছির আত্মরক্ষায় মূল অস্ত্র এর হুল। ছোট পোকাকে হুল ফুটিয়ে দিলে তা সহজে বের করে আনতে পারে। তবে মানুষ বা বড় কোনো প্রাণীকে হুল ফোটালে আর হুল বের করে নিয়ে আসতে পারে না। তখন মৌমাছি মারা যায়। মানুষের ক্ষেত্রে সাবান, পারফিউম, শ্যাম্পু, কিংবা শরীরের অন্য কোনো গন্ধ দ্বারা মৌমাছি আকৃষ্ট হলে সে মানুষের শরীরের আশপাশে বসে বুঝতে চায় যে সেখান থেকে নেক্টার সংগ্রহ করতে পারবে কিনা! এসময় চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। সম্ভাবনা না পেলে মৌমাছি চলে যায়।

মৌমাছি সম্পর্কে আরোও কিছু মজার তথ্য জানা যায়।
১.    মৌমাছিই একমাত্র পতঙ্গ যারা যে খাবার তৈরি করে তা সরাসরি মানুষ খেতে পারে। এটি হলো মধু।
২.    এক চামচ মধু সংগ্রহ করতে মৌমাছিদের প্রায় ৩০ হাজার ফুলে যেতে হয়।
৩.    মৌমাছিরা এক ঘণ্টায় গড়ে ১৩ থেকে ১৫ মাইল পর্যন্ত উড়তে পারে।
৪.    পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মৌমাছির নাম মেগাচিল প্রুটো।
৫.    মৌমাছিরা লাল রঙ দেখতে পায় না। তাই লাল রঙের ফুলের সাধারণত মৌমাছি বসে না।
৬.    আলট্রাভায়োলেট বা অতিবেগুনি রশ্মি মানুষের জন্য ক্ষতিকর এবং এই রশ্মি মানুষ দেখতে পায় না। কিন্তু মৌমাছিরা এই রশ্মি দেখতে পায়। সাদা রঙের ফুল অতি বেগুনি রশ্মিকে প্রতিফলিত করে তাই সাদা ফুলকে মৌমাছির কাছে বেশি আকর্ষিত মনে হয়।
প্রকৃতির পরতে পরতে অনেক জটিলতার দেখা পাওয়া যায়। আবার এসব জটিলতার মাঝেও অনেক সারল্যের খোঁজ পাওয়া যায়। মাঝে মাঝে সত্যিই খুব অবাক হতে হয়। নিয়মহীন ছন্নছাড়া প্রকৃতির মাঝেও কত সুন্দর নিয়মিতান্ত্রিকতা বিরাজ করছে। মৌমাছিদের মাধ্যমে আমরা এটাই উপলব্ধি করি।
আল্লাহ তা’য়ালা তার কোনো সৃষ্টিই বিনা প্রয়োজনে সৃষ্টি করেননি।
মহান রব যেমন সূরা আন নাহলে বলছেন : ‘তোমাদের জন্য পৃথিবীতে যেসব রঙবেরঙের বস্তু ছড়িয়ে দিয়েছেন, সেগুলোতে নিদর্শন রয়েছে তাদের জন্য যারা চিন্তা ভাবনা করে।’ (আন নাহল : আয়াত ১৩)
তিনি আরও বলেন : ‘আপনার পালনকর্তা মধুমক্ষিকাকে আদেশ দিলেন : পর্বতগাত্রে, বৃক্ষ এবং উঁচু চালে গৃহ তৈরি কর। এরপর সর্বপ্রকার ফল থেকে খাবার আহরণ কর এবং আপন পালনকর্তার উন্মুক্ত পথসমূহে চলমান হও। তার পেট থেকে বিভিন্ন রঙে পানীয় (মধু) নির্গত হয় তাতে মানুষের জন্য রয়েছে রোগের প্রতিকার। নিশ্চয় এতে চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য নিদর্শন রয়েছে।’ (আন নাহল : আয়াত : ৬৮-৬৯)
সত্যিই প্রতিটি সৃষ্টির মাঝে রয়েছে অসাধারণ নিদর্শন। আশরাফুল মাখলুকাত হিসেবে আমাদের কর্তব্য সেসব নিদর্শন উপলব্ধি করে আমাদের প্রত্যহ জীবনে কাজে লাগানো। তবেই না জীবন সুন্দর, সমৃদ্ধ। প্রত্যেকেই গড়ব আদর্শ জীবন।

SHARE

Leave a Reply