Home গল্প রম্যগল্প দৌড় -মোহাম্মদ লিয়াকত আলী

দৌড় -মোহাম্মদ লিয়াকত আলী

সাক্ষীকে আদালতে হাজির করতে বহু কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে আসামিপক্ষকে। আইনজীবীকে দিতে হয়েছে মোটা অঙ্কের টাকা।
উকিল সাহেব জানিয়েছেন, রমজান মাস জামিনের জন্য আসামিপক্ষের মোক্ষম সময়। বিচারক আসামিদের প্রতি একটু সহানুভূতিশীল থাকেন। কারা কর্তৃপক্ষও ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত বন্দী নিয়ে ঝামেলায় থাকেন। রমজান মাসে ঝামেলা আরো বেড়ে যায়। বিনা বিচারে আটক আসামিরা জামিন পেলে ঝামেলা কিছু কমে। সুযোগ পেয়ে সাক্ষীটাও গোঁ ধরেছে। তারও নগদ টাকা চাই।
আমার বাপ-দাদার জন্মে কেউ থানা পুলিশ কোর্ট কাছারি মাড়ায় নি। আইজ আমি যামু কাঠগড়ায় খাড়াইতে? আমি পারমু না। অন্য লোক ম্যানেজ করেন।
– আরে বাবা, তোমারতো আর জেল-জরিমানা হচ্ছে না। শুধু সাক্ষ্য দিয়ে চলে আসবে। রোজার দিন তোমাকে বেশি ঘাঁটাইব না।
– তাতে আমার কী লাভ? কোন দুঃখে জজ সাবের বহা খাইতে যামু?
– এতো দাম বাড়াইতেছ কেন? বললাম তো, তোমারে খুশি করে দেবো। ভালো করে ঈদ করতে পারবা।
– উকিল সাবতো সব অ্যাডভান্স লইয়া যায়। আমার সব বাহি। বাহির নাম ফাহি।
– উকিল সাহেবের সাথে তোমার তুলনা কর? তোমার চৌদ্দগুষ্ঠিতে কেউ উকিল হইছে?
– উকিল সাব লাট-সাব অইয়া গেছে? আমি বানে ভাইসা আইছি?
– এমন নাছোড়বান্দা হইছ কেমনে? লাজ-শরমের মাথা খাইছ নাকি? এই ধর এক হাজার। ভালা কইরা কয়দিন ইফতারি খাইবা। আল্লাহর নাম বইলা বাইর হও। এই দিন দিন না, আরও দিন আছে।
বীরদর্পে লেফট রাইট করতে করতে দায়রা জজ আদালতের কাঠগড়ায় উঠে আমানুল। ভাবখানা এমন, যেন সেই মামলার বিচারক!
একজন কর্মচারী একটা শ্লেট সামনে ধরে বলেন,
– পড়েন, যাহা বলিব সত্য বলিব। সত্য বই মিথ্যা বলিব না।
কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে আমানুল্লাহ। পেশকার মৃদু স্বরে ধমক দেয়,
– চুপ কইরা আছেন কেন? তাড়াতাড়ি পড়েন। অদ্ভুত ভঙ্গিতে মুখ খোলে আমানুল্লাহ,
– যাহা বলিব মিথ্যা বলিব। মিথ্যা বই সত্য বলিব না। উকিল সাহেব যাহা শিখাইছে, শুধু তাহাই বলিব। সত্য-মিথ্যার বিছার আল্লায় করব।
আদালতকক্ষে হাস্যরস ও গুঞ্জন শুরু হয়। দায়রা জজ অবাক হয়ে কিছুক্ষণ তার আপাদমস্তক লক্ষ করেন।
তার আইনজীবী দাঁড়িয়ে বলেন,
– স্যার, এই হলফনামা পাঠ করা শুধু একটি ফর্মালিটিজ। বাস্তবে এর তেমন গুরুত্ব নেই। আপনার যা জানার জেনে নেন। প্রশ্ন করেন।
– আপনার কথায় আদালতের নিয়ম বদলানো যাবে না। সাক্ষীকে ঠিকমত হলফনামা পড়তে বলুন।
– এই বেয়াদব, যা লেখা আছে তাই পড়।
এখন পড়তে অসুবিধা নাই। আগেই বইলা নিছি, উকিল সাহেব যাহা শিখাইছে শুধু তাহাই বলিব।
হলফনামা পাঠের পর জজ সাহেব প্রশ্নোত্তর শুরু করেন।
– তোমার নাম কী?
– আকিকার সময় কী নাম রাখছিল জানি না। লোকে ডাকে আমান বইলা। আই.ডি.কার্ডে লেখা আছে আমানুল্লাহ বেপারী। ভুল লেখে নাই, আসলেই আমি একটা আদার ব্যাপারী।
– থাম, তোমার বাবার নাম কি?
– বাবা নাই। গ্রামের ক্ষেতে বাগুন তুলতে গিয়ে সাপের কামড়ে পটোল তুলেছে।
– বাবা নাইতো কি হয়েছে? নামতো আছে। নাম বল?
– কেরামত উল্লাহ ব্যাপারী।
– বয়স কত?
– আমার, না বাবার?
– তোমার।
আদালতের দেয়ালে টাঙানো ঘড়িটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে আামানুল্লাহ।
– তোমার বয়স জিজ্ঞেস করেছি।
– বয়সের হিসাবই করতাছি স্যার। গাইনি ডাক্তারের বার্থ সার্টিফিকেটের হিসাবে ২৬ বছর ৩ মাস ১৮ দিন ১৩ ঘণ্টা ৩২ মিনিট।
– রাখ তোমার ঘন্টা মিনিট। বাসা কোথায়?
– বো।
– কিসের বো?
– রোজার মাসে কথা কমাইবার চাইছিলাম। বাসা কোথায় জিগাইছেন তো, সাথে বো লাগাইলেই চলে। ঢাকায় থাকেন, বাসাবো চিনেন না?
– চুপ, একদম চুপ, এটা আদালত। কোন ফালতু কথা চলবে না। যা জিজ্ঞেস করি, তার জবাব দিবে। একটা কথাও বেশি বলা যাবে না। এখন যে কয়টা প্রশ্ন করব, শুধু হাঁ অথবা না বলবে।
– সব কথার জবাব কি হাঁ-না কইলেই অয় স্যার?
– অবশ্যই হয়, যদি প্রশ্ন হাঁ-না’র হয়।
– তুমি এতো কথা বলছো কেন?
জজ সাহেব রেগে গিয়ে তার আইনজীবীকে বললেন,
– এ সাক্ষী আদালতে গ্রহণযোগ্য নয়। অন্য সাক্ষী নিয়ে আসুন। আমি বিব্রত বোধ করছি। আজ আদালত মুলতবি।
আদালত মুলতবি ঘোষণা করায় সকলে ফাইলপত্র গুছাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। আমানুল্লাহ কাঠগড়াকে রাজনৈতিক মঞ্চ বানিয়ে একটা বক্তৃতা দেয়,
– ভাইসব, জজ সাহেব বিব্রত অইছে। আমি বিব্রত অই নাই। দাঁড়িপাল্লা মার্কা কোট-কাছারিতে কোনো ইনসাফ নাই।
গরম ভাতে বিলাই বেজার
সত্য কথায় মানুষ বেজার
সত্য কথায় ভাত মিলে না মিথ্যাবাজির মুল্লক ভাই।
ভাইবা দেখেন কথা মিথ্যা নয়।
এজলাস থেকে নামতে নামতে জজ সাহেব ঘোষণা দেন:
– সিকিউরিটি, তাকে এখান থেকে বের করে দাও।
সিকিউরিটি পুলিশ জিজ্ঞেস করে:
– এরেস্ট করবো স্যার?
– তার দরকার নেই। শুধু ঘাড় ধরে বের করে দাও।
আমানুল্লাহর বক্তৃতা চলতেই থাকে:
– এই কাম পুলিশ ভাইরা ভালাই পারে। শুধু ঘাড় ধইরা কেন? পিছে লাত্থি মাইরাও বাইর করণের ক্ষমতা আছে। আমিও কম সেয়ানা না। আমারও পাও আছে।
সিকিউরিটি পুলিশও এবার ক্ষেপে যায় :
– এই? তুই পা দিয়া কি করবিরে?
– কি আর করমু? দৌড়ায়া পলাইমু, সুখ রঞ্জন বালির মত। তাড়া খাইয়া পাতি হিয়াল যেমনে দৌড়ায়। আর কিছু না পারলেও দৌড় ভালাই পারি।
– তবে এখনি দৌড় দে। আর কোন দিন কোর্টে আইলে খবর আছে!

SHARE

Leave a Reply