Home সম্পূর্ণ কিশোর উপন্যাস রিহাল -মূল : হাকিম ওমর ভাষান্তর : হোসেন মাহমুদ

রিহাল -মূল : হাকিম ওমর ভাষান্তর : হোসেন মাহমুদ

সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের ঢেউ এসে আছড়ে পড়েছে আলেপ্পোতেও। দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম নগর আলেপ্পো। যুদ্ধ মানেই ধ্বংস ও মৃত্যু। সিরিয়ার বাহিনীর ভয়াবহ বিমান হামলায় গুঁড়িয়ে যাচ্ছে বাড়িঘর, দোকানপাট, স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল। ওলট-পালট হয়ে গেছে মানুষের জীবনযাত্রা। সিরিয়ার এই ঐতিহাসিক ও প্রাচীন নগরীতে কেউই এখন আর নিরাপদ নয়। বহু লোক প্রাণ বাঁচাতে চলে গেছে শহর ছেড়ে। প্রতিদিনই যাচ্ছে। নগর ত্যাগকারীদের সংখ্যা বাড়ছেই।
স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে তিন মাস আগে। বোমায় মাটির সাথে মিশে গেছে স্কুলঘর। টিচাররা কোথায় গেছেন রিহাল জানে না। যে অবস্থা, স্কুল আর খুলবেই না হয়ত। এখন সারাক্ষণ বাড়িতেই থাকে সে। বাইরে বেরনোর উপায় নেই। তার নয় বছরের জীবনটা একেবারে তছনছ হয়ে গেছে। দু’মাস আগে তার মা তার ছোট ভাই পাঁচ বছরের উবাদাকে নিয়ে ছোটখালার বাড়ি গিয়েছিল। বেশি দূর নয়, তাদের বাড়ি থেকে দশ মিনিটের হাঁটা পথ ছোটখালার বাড়ি। বর্তমান অবস্থায় কি করা যায়, তাই নিয়ে কথা বলতে গিয়েছিল মা। তখনি ফিরে আসার কথা ছিল। কিন্তু তারা বাড়ি থেকে বের হওয়ার কিছুক্ষণ পরই শুরু হয়েছিল বিমান হামলা। ঐ এলাকা পরিণত হয়েছিল দোযখে। আর ফিরে আসেনি মা ও উবাদা। বাবা পাগলের মত ছুটে গিয়ে খুঁজেছে তাদের। দিনের পর দিন। পায়নি। শত শত গজ জায়গাজুড়ে বাড়িঘরের ধ্বংসস্তূপ। তার মধ্যে কোথায় খুঁজবে? অন্য কেউও তাদের কথা বলতে পারেনি।
বাড়িতে মায়ের, ছোট ভাইটির কত স্মৃতি। তারপর থেকে বাবা কেমন যেন হয়ে গেছেন। একেক সময় চুপ করে সোফায় বসে থাকেন। ঘন্টার পর ঘন্টা কেটে যায়। রিহাল কখনো অন্য ঘরে বসে থাকে, কখনো এসে বাবার পাশের সোফায় বসে। তার খুব কথা বলতে ইচ্ছে করে বাবার সাথে। বলে না। বাবা তার দিকে তাকিয়ে থাকেন, চোখের পানি মোছেন। রিহাল কি করবে ভেবে পায় না। বাবার মত সেও চুপ করে কিছু ভাবে। তার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেছে যে এখন বাবাই তার জীবনের সব। দুনিয়াতে তার আর কেউই নেই বাবা ছাড়া।
বাবা কোনো কোনো সময় বাইরে চলে যান। টুকিটাকি জিনিসপত্র কিনে আনেন। রোজই কিছু খাবার তৈরি করেন তিনি। দু’জন কোনো রকমে কিছু খায়। রিহালের সময় কাটতে চায় না। বাইরে যাওয়া একদম নিষেধ। কেউ তাদের বাড়িতে আসেও না। স্কুলের বন্ধুদের সাথে রিহালের দেখা হয় না। এমনকি আশপাশের বাড়ির চেনা ছেলেদের সাথেও নয়। তার ছোট বুকের সারাটা জমিন জুড়ে বয়ে চলে শোকের করুণ বাতাস। মা না থাকার কী যে কষ্ট! তার বই-খাতা সব রাখা আছে টেবিলের উপর। পড়া হয় না। ধুলো জমছে সেগুলোর উপর। কেউ রান্না করে খেতে ডাকে না। ছোট ভাইটা এসে তাকে আর জড়িয়ে ধরে না। আজ কত দিন হলো জামা-কাপড় কাচা হয় না তার ও বাবার। কত স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিল রিহাল। খুব মন দিয়ে লেখাপড়া করে অনেক বড় হবে সে। বড় মানুষ হবে। তার মা যে কত ভালো ভালো গল্প শোনাতো তাদের দু’ ভাইকে! সেই গল্প শুনে তার মনে বড় হওয়ার স্বপ্নগুলো ডানা মেলতো। এখন মা নেই, রিহালের মনে কোনো স্বপ্নও নেই।
বাবা রোজ টিভিতে রাত আটটার সময় যুদ্ধের খবর দেখেন। খবর দেখে তার মুখটা গম্ভীর হয়ে থাকে। রিহাল একদিন তাকে জিজ্ঞেস করে-
: বাবা, যুদ্ধ কি আমাদের এখানে এসে গেছে! আমাদের কি হবে?
তিনি শান্ত গলায় বলেন-
: চিন্তা করো না বাবা, সব কিছু ঠিক হয়ে যাবে। যুদ্ধও শেষ হয়ে যাবে শিগগিরই।
কিন্তু রিহালের মনে হল বাবা তার মনটাকে ভালো করার জন্য এ কথা বললেন। কারণ, যুদ্ধ ক্রমেই তাদের কাছে এগিয়ে আসছিল। আশপাশের সব বাড়ির লোকজন যাচ্ছিল যে যার মত। ক্রমেই একা হয়ে পড়ছিল তারা।
রাতে ঘুমানোর সময় হলে প্রতিদিনই বাবা রিহালের কাছে আসেন। তার পাশে শুয়ে তাকে জড়িয়ে রাখেন বুকের ভেতর। আস্তে আস্তে হাত বুলিয়ে দেন তার চুল ভরা মাথায়। রিহালের তখন মনে হয়, সে খুব নিরাপদ। বাবা থাকতে কোনো সমস্যা বা বিপদ হবে না তার। তিনি সব কিছু থেকে রক্ষা করবেন তাকে। কোনো কোনো দিন যখন আবার ঘুম আসতে চায় না তখন গল্প বলেন তিনি। গল্প শুনতে শুনতে সে ঘুমিয়ে গেলে তারপর উঠে নিজের ঘরে যান তিনি।
রিহাল ঘুমিয়ে পড়েছিল। হঠাৎ বোমা বিস্ফোরণের প্রচন্ড আওয়াজে ঘুম ভেঙে যায় তার। এখন মনে হয় মাঝরাত। খুব ভয় পেয়ে যায় সে। সারা শরীর কাঁপছে। ঘর অন্ধকার। তার বাবা তাকে রোজ ঘুম পাড়িয়ে দিয়ে যাবার সময় লাইট নিভিয়ে দিয়ে যান। উঠে লাইট জলাবে, সে শক্তিও নেই তার। বাবাকে ডাকতে থাকে সে, কিন্তু কোনো জবাব পায় না। জানালা দিয়ে বাইরে তাকায়। একটু পরপরই প্রচন্ড আওয়াজের সাথে আলোর ঝলক দেখা যাচ্ছে। তার মানে বোমা ফেলা হচ্ছে বিমান থেকে। বাবার কোনো সাড়া না পেয়ে কুঁকড়ে বিছানায় পড়ে থাকে। তার মনে ভয় এসে বাসা বাঁধে। বাবার কিছু হল নাতো? তাহলে কি করবে সে? সারা শরীর অসাড় হয়ে আসে তার। কিছুক্ষণ পর বোমা হামলা থেমে যায়। কিভাবে যেন ঘুমিয়ে যায় রিহাল।
রিহালের ঘুম যখন ভাঙলো, তার মনে হল দুপুর হয়ে গেছে। তাকিয়ে দেখে, ঘরের মেঝেতে ভাঙা কাচের স্তূপ জমেছে। ভেঙে পড়েছে ঘরের একদিকের দেয়াল। বন্ধ হয়ে গেছে দরজা। বের হবার উপায় নেই। ঘরের মধ্যে আটকা পড়ে গেছে সে। বাইরের দিকের জানালাটা দেখা যাচ্ছে। কিন্তু তাতে লোহার শিক। তার সাধ্যও নেই যে ওই শিক গলে বের হবে। চারদিকে নীরবতা। সে আবার বাবাকে ডাকতে থাকে চিৎকার করে। কিন্তু এবারও কোনো সাড়া না পেয়ে চিৎকার করে কেঁদে ওঠে। তবু কেউ আসে না। তার মনে হয়, দুনিয়ায় কোনো মানুষ বুঝি বেঁচে নেই। কাঁদতে কাঁদতে ক্লান্ত হয়ে পড়ে সে। তখন আপনা থেকেই কান্না থেমে যায়। সে এখন একা। এ উপলব্ধি ভয় ধরিয়ে দেয় তার মনে। শুয়ে পড়ে সে। তার মনে হয়, এখন ঘুমিয়ে পড়াই ভালো। ঘুম থেকে উঠলেই বাবাকে দেখতে পাবে।
রাত নামে। ভয় জেঁকে ধরে তাকে। বাবা তার কাছে আসেনি। তবে কি বাবা বেঁচে নেই? কি করবে সে এখন? মা নেই, বাবা নেই। নিজের আপন কেউ নেই তার। কোথায় যাবে সে? কার কাছে যাবে? আলেপ্পোতে শুধু ছোটখালা ছাড়া আর কোনো আত্মীয়ের কথা সে জানে না। কিন্তু তারা বোধ হয় এ শহরে নেই বা মারা গেছে। নইলে তো তাদের খোঁজ নিত। রিহাল ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে আর আল্লাহর কাছে করুণ আকুতি জানায় : আমার বাবাকে এনে দাও তুমি। তাকে ছাড়া আমি কি করে বাঁচব?
ক্ষুধা পেয়েছে তার, পানির পিপাসা লেগেছে খুব। রাতে এমনিতেই ঠান্ডা। সে রাতে যেন ঠান্ডার তীব্রতা বাড়ে। রিহালের কিছুতেই বিছানা থেকে উঠতে ইচ্ছা করে না। তার মনে হয়, ঘুমিয়ে পড়াই ভালো। কিন্তু ক্ষুধা ও পিপাসা তার ঘুম কেড়ে নেয়। তারপর কখন যেন চোখ বুজে আসে তার।
ঘুমের মধ্যে রিহাল শুনতে পায় কে যেন তাকে ডাকছে। কে ডাকে তাকে? গলা যেন চেনা মনে হয়। চোখ খুলে তাকাতে বেশ কষ্ট হয় তার। ততক্ষণে আরো জোরালো হয়েছে ডাক। তার মনে হয়, জানালা দিয়ে কেউ তাকে ডাকছে। তখনি সে মুখটি চোখে পড়ে। আলি। তাদের পাশের বাড়ির ছেলে। তার সমবয়সী বন্ধু, সহপাঠী, খেলার সাথী। আলি সামান্য একটু কুঁজো ছিল বলে স্কুলের ছেলেমেয়েরা সবাই তাকে কুঁজো আলি বলে খেপাতো। সে জন্য খুব মন খারাপ করত আলি। অন্য সবার থেকে দূরে সরে থাকত। রিহাল কখনো তাকে ঐ বিচ্ছিরি নামে ডাকত না। তাই আলি ভীষণ ভালোবাসত তাকে। রিহালও। কারণ আলির ব্যবহার ছিল খুব ভালো, মনটি ছিল উদার। তার সাথে স্কুলে আসত-যেত সে। কিন্তু আলির বাবা তার খেপানোর বিষয়টি জানতে পেরে কষ্ট পান। তাই তার স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দেন তিনি। তার বদলে কাজ শিখতে পাঠিয়ে দেন এক মেকানিকের কাছে। তারপর থেকে আলির সাথে আর তেমন দেখা হয় না রিহালের। কিন্তু তার কথা প্রায়ই মনে পড়ে তার।
জানালায় আলির মুখ দেখে ভীষণ খুশি হয়ে ওঠে রিহাল। আলি যে তার খোঁজে আসবে এ কথা সে ভাবতেও পারেনি। আলিকে দেখে তার মনে হয়, পরিবারেরই কারো দেখা পেয়েছে। তাকে মনে হয় আঁধারে আলোর শিখা। আবেগে কেঁদে ফেলে সে। এ সময় আলি হাত বাড়িয়ে দেয় তার দিকে। হাতে কয়েকটি চকোলেট। রিহাল একটু শান্ত হলে আলি জিজ্ঞেস করে-
: তুই একা। তোর বাবা কোথায়?
রিহাল বলে-
: আমি জানি না। বাবা আসেনি। আমি বের হতে পারছি না। জানালা দিয়েও বের হওয়ার যো নেই।
একেবারে বড়দের মত কথা বলে আলি-
: শান্ত হ রিহাল। মাথা ঠান্ডা রাখতে হবে। আমি ফিরে না আসা পর্যন্ত চুপ করে বসে থাক। যদি কোনো সৈন্যকে দেখিস তাহলে যেখানেই হোক লুকিয়ে থাকবি। অস্ত্র হাতে অন্য কেউ এলেও বের হবি না। কাউকে বিশ্বাস নেই। আমার বস বলেছে, সরকারি সৈন্যরা উর্দি পরা। আর সরকার বিরোধীরা সাধারণ পোশাক পরে তাদের সাথে লড়াই করছে। তাদের হাতে নিরীহ মানুষ মরছে। ছোট-বড় কাউকে রেহাই দেয় না তারা। মানুষ মেরে ফেলে একে অন্যের ওপর দোষ চাপায়। আমি দেখি, কাউকে খুঁজে পাই কিনা। মনে হয় না কাউকে পাব। আমাদের এ পাড়া ও আশপাশে কোনো লোক বোধ হয় নেই। আমার বাবাও কাল থেকে এ পর্যন্ত বাড়ি ফেরেনি। মা ও ভাই-বোনেরা তো কবেই চলে গেছে। যাক, আমি যাচ্ছি। খুব জলদি ফিরে আসব। চিন্তা করিস না।
আলি চলে যায়।
বিকেল হয়ে আসছে। রিহালের ভয় হয়, আলি ফিরে আসবে তো! না-ও তো আসতে পারে। সে না এলে এ ঘরের মাঝে আটকা পড়ে থাকতে হবে তাকে। তারপর মনে হয়, আলি আসবে। ও খুব ভালো। রিহাল একবার বিছানায় শুয়ে পড়ে, আবার উঠে বসে। জানালার দিকে তাকিয়ে থাকে- ওই বুঝি আলি এলো। এক সময় সন্ধ্যা হয়ে আসে। সারা ঘর আঁধারে ঢাকা পড়ে। রিহালের মনে হয়, তার ঘরই শুধু নয়- সারা দুনিয়াই আঁধারে ডুবে গেছে। কোথাও কোনো শব্দ নেই। সেই নিস্তব্ধতার মধ্যে রিহাল আল্লাহকে ডাকতে থাকে।
কতক্ষণ কেটে গেছে রিহাল জানে না। হঠাৎ জানালার পাশে কাদের কথাবার্তার আওয়াজ কানে আসে তার। তারা কারা সে জানে না। চিৎকার করে উঠতে গিয়েও নিজের মুখ চেপে ধরে সে। আলির নিষেধের কথা মনে পড়ে গেছে। দ্রুত জানালার বিপরীত দিকে খাটের নিচে লুকিয়ে পড়ে রিহাল। কেউ একজন রিহালের ঘরের জানালার কাছে এসে দাঁড়ায়। তার হাতে টর্চলাইট। সারা ঘর ভালো করে দেখে। বেশি সাবধান হতে গিয়ে রিহাল নড়ে উঠেছিল। সাথে সাথে লোকটির টর্চের আলো তীরের মত তার খাটের উপর এসে পড়ে। ভাগ্য ভালো, খাটের আড়ালে রিহালকে দেখতে পায়নি সে। এ সময় একজন আদেশ দেয়, কাউকে দেখা গেলেই গুলি করবে। কেউ যেন বেঁচে না থাকে। এ কথা শুনে পাথরের মত স্থির হয়ে থাকে রিহাল। কারো সাড়া না পেয়ে চলে যায় লোকটি।
একটু পরই আসে আলি। বলে, এরা সৈন্য। তাদের জন্যই অনেকক্ষণ আটকা পড়েছিল সে। তাই আসতে পারেনি। রিহালের দিকে ফ্ল্যাশ লাইট বাড়িয়ে দেয়। বলেÑ
: এটা ধর রিহাল। শিকের উপর আলো ফেলে ধরে থাক। আমি একটা লোহা কাটার হাত করাত পেয়েছি। শিক কেটে ফেলছি এখনি। সৈন্যরা আবার ফিরে আসতে পারে। তাই জলদি কাজ সারতে হবে।
রিহালকে একটি কম্বল দিতে বলে আলি। সেটা দিয়ে নিজেকে ঢেকে রাখবে যাতে ফ্ল্যাশ লাইটের আলোয় তাকে বাইরে থেকে দেখা না যায়। আমি তাকে একটি কম্বল দিতেই তা ঝটপট গায়ে জড়িয়ে নেয় সে। তারপর কাজ শুরু করে। মেকানিকের দোকানে কাজ শিখছিল। সে জন্য একটু অভিজ্ঞতা তার হয়েছিল। তাই দ্রুতই জানালার শিক কাটা হয়ে যায়। বাইরে বেরিয়ে আসে রিহাল। রাতের শীতল বাতাসের পরশ লাগে গায়ে। বেশ ভালো লাগে তার।

দুই.

ধীর পায়ে বাড়ি থেকে দূরে সরে যাচ্ছিল রিহাল। বারবার পেছন ফিরে তাকায়। অন্ধকারে স্পষ্ট কিছু দেখা যায় না। সব কিছু পড়ে থাকল। কিছুই সাথে নিয়ে যাচ্ছে না সে। বাবা কোথায় জানে না। আলি বলেছে তারও কিছু জানা নেই। কোথায় যাবে সে? আলি তাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে তা বলেনি। শুধু বলেছে এখান থেকে সরে যেতে হবে। বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগে বাবার সন্ধান করতে চেয়েছিল রিহাল। কিন্তু আলি তাকে সে সুযোগ দেয়নি। বলেছে, এক মিনিট দেরি হলেই সৈন্যরা এসে পড়তে পারে। গুলি ছাড়া আর কিছু বোঝে না তারা। তাই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তাদের এখান থেকে দূরে সরে যেতে হবে। রিহালের মন খুব ভার হয়ে আছে বাবার সাথে দেখা হয়নি বলে। আলি বলেছে বাবা সীমান্তের ওপারে তুরস্কের ক্যাম্পে চলে গেছে। তার মোটেই বিশ্বাস হয়নি সে কথা। বাবা তাকে ফেলে চলে যেতে পারে না। রিহাল দেখতে পায়, শহরটা এর মধ্যে ভুতুড়ে শহরে পরিণত হয়েছে। কোথাও কাউকে দেখা যায় না। এমনকি রাস্তায় একটি কুকুরও নেই।
হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে রিহাল। আলি জিজ্ঞেস করে-
: কি রে, কী হলো?
: আমি যাবো না আলি, তুই যা। বাবা এসে আমাকে দেখতে না পেলে ভীষণ কষ্ট পাবে। আমি বাবাকে ছেড়ে থাকতে পারব না।
আলি তাকে বোঝানোর চেষ্টা করে-
: রিহাল আমার কথা শোন। তাড়াতাড়ি চল এখান থেকে। সৈন্যরা আমাদের দেখতে পেলে বিপদ হবে।
: না রে, তুই যা। আমি বাড়ি ফিরে যাচ্ছি। বাবা না আসা পর্যন্ত আমি লুকিয়ে থাকব।
কিন্তু আলি যায় না। বলে-
: আমি তোকে রেখে কিভাবে যাবো বল? কিন্তু এখানে থাকলে তুইও মরবি, তোর বাবাও তোর জন্য মারা পড়বে। বরং আমরা যদি সীমান্তের দিকে যাই তাহলে হয়ত আংকেলের সাথে তোর দেখা হয়ে যেতে পারে। আর আমিও তো আমার বাবাকে খুঁজছি। এখন চল, আর দেরি করিস না।
আলির কথায় অবশেষে মন নরম হয় রিহালের। তাইতো, বাবার সাথে দেখা হওয়ার জন্য সে সব কিছু করতে পারে। আলি বলেছে, পথে হয়ত বাবার সাথে দেখা হয়েও যেতে পারে। মনে একটু ক্ষীণ আশা জাগে তার। হাঁটতে শুরু করে সে।
তারা যে পথে চলছিল তা খুব নিরাপদ ছিল না। কোথাও কাছেই গোলাগুলির আওয়াজ শোনা যাচ্ছিল। কোথাও সৈন্যদের একটি দল রাস্তা দিয়ে যেতে দেখে তারা আশপাশে গিয়ে লুকিয়ে পড়ছিল। আকাশে চাঁদ উঠেছিল। চাঁদের আলোয় পথ চলা একটু সহজ হয়। তাছাড়া শহরের পথ আলির চেনা ছিল। এ পথ সে পথ, এ গলি ও গলি ঘুরে তারা যখন আলেপ্পো নগরের বাইরে এলো তখন ভোর হয়ে গেছে। এখান থেকে সড়ক চলে গেছে সীমান্তের দিকে। দিনের আলোয় পথ চললে বিপদ হতে পারে। তাই অপেক্ষা করা ভালো মনে হয় তাদের। সড়কের দু’পাশে বিস্তৃত মাঠ। মাঠে ফসল। একটি ফসলের মাঠে গিয়ে লুকিয়ে পড়ে তারা। এখান থেকে রাস্তার দিকে নজর রাখা যাবে।
: নে ধর, এটুকু খেয়ে নে।
নিজের ভাবনায় ডুবে ছিল রিহাল। আলির কথায় যেন নিজের মধ্যে ফিরে আসে সে। আলি তার দিকে এক টুকরো রুটি আর সামান্য একটু পনির বাড়িয়ে দিয়েছে। রিহাল অবাক হয়ে বলে-
: কোথায় পেলি রুটি? এতক্ষণ দিসনি কেন?
আলি হাসে। আসলে পালানো নিয়ে সে এত চিন্তার মধ্যে ছিল যে খাবার বের করার কথা তার মনেই আসেনি। নিজের সাথে থাকা একটি ঝোলা দেখিয়ে জানায় এর মধ্যে ছিল। বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসার সময় ঘরে থাকা ক’টুকরো রুটি ও ছোট এক বোতল পানি আর খানিকটা পনির এর মধ্যে ভরে নিয়ে এসেছিল সে বুদ্ধি করে। কাঁধে ঝোলানো ছিল ঝোলাটি। রিহাল তা লক্ষ করেনি বলে একটু লজ্জিত হয়। প্রচন্ড ক্ষুধা ও পিপাসার কারণে সামান্য খাবার ও পানি সবই শেষ হয়ে যায়।
সড়কে সারাদিন ধরে সেনাবাহিনীর গাড়ি চললেও বিকেলের পর থেকে বন্ধ হয়ে গেল। আরো কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর ফসলের মাঠ থেকে বেরিয়ে পথ চলা শুরু করে তারা। পাশাপাশি হাঁটতে থাকে। কিন্তু অনেকক্ষণ চলার পরও কোনো লোকজনের দেখা মেলে না। দু’জনেই ক্লান্ত পায়ে হেঁটে চলে। রিহালের অবস্থা বেশি খারাপ। এতটা পথ কোনোদিন হাঁটেনি সে। পায়ে ভীষণ ব্যথা হয়ে গেছে তার। আলিকে থামার জন্য বলে। কিন্তু সে রাজি হয় না। বলে-
: আমাদের আরো অনেক পথ যেতে হবে। থামা যাবে না। সারারাত আমরা চলব। সকাল হলে কোথাও লুকিয়ে থাকতে হবে যাতে কেউ আমাদের না দেখে।
আরো অনেক সময় সড়ক ধরে হেঁটে চলে দুই খুদে বীর। এক সময় পাকা রাস্তা ছেড়ে কাঁচা পথে নেমে আসে আলি। তাকে অনুসরণ করে রিহাল। এ পথ খুব খারাপ। এমনিতেই রাতের বেলা, চাঁদের আলো যদিও আছে কিšুÍ পথে কোথাও গর্ত, কোথাও পাথর থাকায় চলতে খুবই কষ্ট হচ্ছিল তাদের। এক সময় একটা গ্রামের কাছে পৌঁছে তারা। হাঁটতে কষ্ট হচ্ছিল। দু’জন ঠিক করে গ্রামে প্রবেশ করবে তারা, কোনো বাড়িতে গিয়ে সে বাড়ির লোকদের কাছে আশ্রয় ও খাবার চাইবে।
প্রথমে একটি বাড়িতে ঢোকে রিহাল ও আলি। আশ্চর্য, বাড়িতে কেউই নেই। মনে হয়, অনেকদিন ধরেই সেখানে কেউ থাকে না। লোকজন কোথাও চলে গেছে। অন্ধকারে আর বেশি কিছু বোঝা যায় না। সেখান থেকে বেরিয়ে আসে তারা। একের পর এক বাড়িতে ঢোকে আর বেরিয়ে আসে। না, কোনো বাড়িতেই কেউ নেই, খাবার পাবারও কোনো আশা নেই। মানুষই যেখানে নেই সেখানে খাবার আসবে কোথা থেকে? গোটা গ্রামই এভাবে ঘুরে দেখে তারা হতাশ হয়ে পড়ে। হঠাৎই দেখে, গ্রামটি থেকে খানিকটা দূরে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকা একটি বাড়ির ভিতরে অনুজ্জ্বল একটি আলো জ¦লছে। আলো আছে যখন তখন নিশ্চয়ই মানুষ আছে। দু’জন দৌড় দেয় সে বাড়িটির দিকে। একটি জানালার কাছে গিয়ে ভিতরে উঁকি দেয় দু’জন। এক বৃদ্ধ ও বৃদ্ধা মেঝেতে বসেছিলেন। তাদের দেখে খুশি হয় তারা। ভাবে এরা বৃদ্ধ মানুষ, এদের কাছ থেকে ভয়ের কিছু নেই। বাড়ির দরজায় গিয়ে কড়া নাড়ে আলি। প্রথমে তারা দরজা খুলতে চাইলেন না। কিন্তু দু’টি একেবারেই অল্প বয়সী ছেলের বারবার ডাকাডাকি ও অসহায় কণ্ঠের আকুতিতে বৃদ্ধা এসে দরজা খুলে দিলেন। তার নাম ওম হাসান। ঘরের মধ্যে যাওয়ার পর আলোয় রিহাল ও আলিকে দেখে তারা বেশ খুশি হন। আলি বুঝতে পারে, অল্প কিছুদিন হল একা রয়েছেন তারা। পরিবারের অন্য সদস্যরা তাদের রেখে চলে গেছে। একটু পর বৃদ্ধা তাদের দু’জনের জন্য কিছু খাবার নিয়ে এলে প্রচন্ড ক্ষুধার্ত তার উপর যেন ঝাঁপিয়ে পড়ে। খাবারের পরিমাণ বেশি নয়। তাই অল্প সময়েই খাওয়া শেষ হয়ে যায় তাদের।
বৃদ্ধ আবু হাসান ও ওম হাসানের সাথে গল্প করছিল তারা। রিহাল ও আলি বড়দের মতই কথা বলছিল। বোঝা যায়, পরিস্থিতি হঠাৎ করেই যেন তাদের বয়স বাড়িয়ে দিয়েছে। দু’জনই তাদের পরিবার ও নিজেদের বর্তমান অবস্থার কথা তাদের জানায়। তাদের কথা শুনে তারাও বিচলিত হয়ে পড়েন। এ ছেলে দু’টি কিভাবে তাদের পরিবার, বিশেষ করে রিহাল তার বাবাকে খুঁজে পাবে, ভেবে পেলেন না তারা। ওম হাসান জিজ্ঞেস করেন-
: তোমরা কোন দিকে যাবার কথা ভাবছ? সব জায়গাতেই তো বিপদ।
আলি বলে-
: যারা পালিয়ে যাচ্ছে তাদের কাছে শুনেছি যে তারা ইরাক বা তুরস্কে চলে যাচ্ছে। আমরাও তুরস্কে যাবো।
তিনি বলেন-
: কিন্তু তুরস্ক সীমান্ত তো এখান থেকে বহুদূর। কোনো যানবাহন নেই। এত পথ তোমরা ছোট দু’টি ছেলে কিভাবে যাবে? পায়ে হেঁটে কি অতদূরে যেতে পারবে? তার চেয়ে তোমরা আমাদের সাথেই থেকে যাও। আমার ছেলে খুব শিগগিরই আসবে বলেছে। সে এলে না হয় তার সাথে তোমরা যেও। ইনশাআল্লাহ সেটাই ভালো হবে তোমাদের জন্য।
বৃদ্ধার মমতা দেখে অভিভূত হয়ে পড়ে আলি। কিন্তু রিহাল বলে-
: দেখুন, আমার বাবার সাথে পথে দেখা হয়ে যেতে পারে। তাই আমরা কালই রওনা হয়ে যাব। আপনি কিছু মনে করবেন না।
বিছানায় শুয়ে ওম হাসানের কথা শোনে তারা। তিনি এ গ্রামে কি ঘটেছিল তা বলেন। তিন সপ্তাহ আগে কয়েকজনের তরুণের খোঁজে বাশারের সৈন্যরা এসে হাজির হয় গ্রামে। বলে, ওই তরুণরা বিদ্রোহীদের সাথে যোগ দিয়েছে। কয়েকজনকে আটক করে তারা। তাদের কোনো কথা বলার সুযোগ দেয়নি সৈন্যরা। মা-বাবা-ভাই-বোনসহ গ্রামের লোকদের সামনেই গুলি করে হত্যা করে তারা তরুণদের। গ্রামের সব মানুষের মধ্যে চরম আতংক সৃষ্টি করতেই এটা করে তারা। গ্রামের মানুষ তাদের নৃশংসতা দেখে আতঙ্কিত হয়েছে ঠিকই, কিন্তু তার ফলে সৈন্যদের প্রতি সবার মনে সৃষ্টি হয়েছে সীমাহীন ঘৃণা। বিদ্রোহীদের জন্য সহানুভূতি বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই গ্রামের একেবারে কিশোর পর্যন্ত যোগ দিয়েছে বিদ্রোহীদের সাথে। অন্যদিকে সৈন্যদের প্রতিশোধের ভয়ে প্রতিটি মানুষ গ্রাম ছেড়ে চলে গেছে। তাই আমরা ছাড়া একটি প্রাণীও নেই গ্রামে। সবাই আমাদেরও যেতে বলেছিল। যাইনি। কোথায় যাবো? এই গ্রামেই আমাদের জীবন কেটেছে। কত স্মৃতি জড়িয়ে আছে এ বাড়ির আনাচে কানাচে। এসব ফেলে কি যাওয়া যায়, তোমরাই বল? আমাদের একটাই ছেলে। যাবার সময় বলে গেছে যে খুব শিগগিরই সে ফিরে আসবে। জানি না আল্লাহর কী ইচ্ছা। কে কখন মারা পড়ে তার ঠিক নেই। আমরা এখানেই মরব।
সকাল বেলা বের হতে গিয়ে তারা অবাক হয়ে দেখে বৃদ্ধ আবু হাসান তাদের জন্য একটি গাধা প্রস্তুত করে রেখেছেন। তাদের বয়স অল্প, বড়দের মত হাঁটতে পারবে না বলে এ ব্যবস্থা করেছেন তিনি। তাদের উদ্দেশে বলেন-
: এখান থেকে সোজা উত্তর দিকে যাবে। প্রধান সড়ক থেকে দূরে থাকবে। বেশ কিছুদূর গেলে পরের গ্রাম পাবে। সাবধান! গ্রামে ঢোকার আগে দেখে নেবে তা নিরাপদ কিনা। সব ঠিক থাকলে গ্রামে পৌঁছে আবু সালিহর সন্ধান করবে। তার দেখা পেলে বলবে যে আবু হাসান আপনার কাছে আমাদের পাঠিয়েছেন। তিনি আমাকে ভালো করে চেনেন। তোমাদের যতœ করবেন তিনি। যে কয়দিন ইচ্ছে হয় সেখানে থেকো। তারপর তিনিই তোমাদের নিরাপদে তুরস্কে যাবার পথ বাতলে দেবেন। আশা করি তোমাদের পরিবারের সাথে মিলতে পারবে। আর আমার ছেলের নাম আবু সোলায়মান। যদি ঘটনা চক্রে তার সাথে তোমাদের দেখা হয়ে যায় তাহলে তাকে বলো যে আমরা ভালো আছি। আমাদের জন্য সে যেন চিন্তা না করে। আমাদের আর হারানোর কিছু নেই। অনেকদিন আমরা দুনিয়ায় কাটিয়েছি, এখন আখেরাতের জীবনের জন্য অপেক্ষা করছি, যেখানে কোনো দুঃখ নেই, কষ্ট নেই। সেখানে আছে আল্লাহর ন্যায়বিচার আর অফুরান সুখ ও শান্তি। প্রতিটি মুসলমান তো সেই জীবন পাওয়ার জন্যই লালায়িত। তাকে বলো, তার ফিরে আসা উচিত হবে না। আমরা মারা গেলে বেহেশতে তার সাথে দেখা হবে ইনশাআল্লাহ। তোমরা রওনা হও এখন। তোমাদের উপর আল্লাহর রহমত নাযিল হোক। আর হ্যাঁ, সামান্য কিছু খাবার আর পানি দিয়েছি। ক্ষুধা লাগলে খেয়ে নিও।
আলি জিজ্ঞেস করে-
: আমরা ওই গ্রামে পৌঁছার পর গাধাটির জন্য কী ব্যবস্থা করব?
তিনি হেসে বলেন-
: কিচ্ছু করতে হবে না। শুধু গলার দড়ি খুলে দিও। ও ঠিক এখানে ফিরে আসবে।
তাদের বিদায়ী সালাম জানিয়ে গাধার পিঠে চড়ে রওনা হয় দু’জন। রিহালের মনে তখন ভাবনা বাসা বেঁধেছে। গ্রামে একটি মানুষ নেই। এই বৃদ্ধ ও বৃদ্ধা কিভাবে সেখানে বেঁচে থাকবেন? তাদের তো সাহায্য করার কেউ নেই!

তিন.

রিহালের জীবনে গাধার পিঠে চড়া এই প্রথম। বেশ মজা পায় সে। তবে আলি গম্ভীর। তার মনে নানা চিন্তা। সম্পূর্ণ অচেনা এক জায়গায় যাচ্ছে তারা। সামনে কী অপেক্ষা করছে তা জানা নেই। ঠিক কতটা পথ পার হলে আবু সালিহদের গ্রাম পাওয়া যাবে তাও সে জানে না। গাধাটিকে কোনো নির্দেশ দিতে হচ্ছে না। আপন মনে চলেছে সে। হয়ত এ পথটি আগে থেকে তার চেনা। দুপুরের পর এক জায়গায় থামে তারা। আবু হাসানের দেয়া খাবার ও পানির কিছুটা খেয়ে বাকিটা রেখে দেয়। তারপর আবার চলতে শুরু করে। দিন শেষ হয়ে যায়, রাত নামে। মাঝরাতের দিকে আবার থামে তারা। নিরাপত্তার কথা ভেবে রাস্তা থেকে খানিকটা দূরে গিয়ে আশ্রয় নেয় একটি গাছের নিচে। বাকি খাবারটুকু থেকে আবার কিছুটা খেয়ে শুয়ে পড়ে তারা।
সকালের সূর্যের আলোয় দু’জনের ঘুম ভাঙে। বেশ ভালোই ঘুমিয়েছে তারা। রাতে আলি গাধার দড়িটি শেষপ্রান্ত তার হাতের সাথে বেঁধে ঘুমিয়েছিল যাতে ওটা চলে যেতে না পারে। আসলে আলি খুব বুদ্ধিমান ছেলে। সবদিকেই খেয়াল থাকে তার। বহু কিছুই তার জানা। রিহাল বুঝতে পারে, ওই শরীরটা ছোট হলেও জ্ঞান অনেক। এর মধ্যেই আলির ভক্ত হয়ে উঠেছে সে। দু’একবার সে আলির কাছে জানতে চেয়েছে যে সে এত কিছু কিভাবে জানল। জবাবে আলি বলেছে: আমার দাদুর কাছে শিখেছি। আমি তার খুব ন্যাওটা ছিলাম। তার কাছেই বেশির ভাগ সময় থাকতাম। কোনো সময় তিনি শিকার করতে যেতেন। সাথে নিয়ে যেতেন আমাকে। তখন বাইরে রাত কাটাতাম আমরা। তিনি বলতেন, সব সময় শেখার চেষ্টা করবে। কখন কোন জিনিস কাজে লাগে তা বলা যায় না। শুধু স্কুলের লেখাপড়াই সব নয়, চারপাশের গোটা দুনিয়াটাই একটা স্কুল। সবাই তোমার শিক্ষক। জ্ঞান থেকে মানুষ লাভবান হয়। তিনি বলতেন, তুমি যত জ্ঞান অর্জন করবে, যত শিখবে তা ভবিষ্যতে তোমার কাজে লাগবে। তাঁর কথা যে কত সত্যি তা তো দেখতেই পাচ্ছ। আলির কথা শুনে আরো মুগ্ধ হয় রিহাল।
পরদিন আবার রওনা হয় দু’জন। ক্রমে সূর্য তাপ ছড়াতে থাকে। প্রচন্ড গরমে কাহিল হয়ে পড়ে তারা। গাধার পিঠে আছে বলে রক্ষা, নইলে তারা এত প্রচন্ড রোদ ও গরমে পথ চলতে পারত না। এখনো আবু সালিহর গ্রামের দেখা মেলেনি। সেটা আর কতদূর? অধৈর্য হয়ে ওঠে রিহাল। তবে তারা চলা থামায় না। এক সময় বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামে। ভীষণ ক্লান্ত হয়ে পড়েছে তারা। গাধাটাও। তাকেও বিশ্রাম দেয়া দরকার। একটি উঁচু জায়গা পেয়ে থামে। বিশ্রাম নেবে।
আলি চুপ হয়ে আছে। কোনো কথাই বলছে না সে। এ নির্জন প্রান্তরে নীরবতা চেপে ধরে রিহালকে। আলির প্রতি কৃতজ্ঞতা অনুভব করে সে। আলি না থাকলে এ ক’দিনে তার কী অবস্থা হত কে জানে? আহা! এত ভালো এই আলি, অথচ স্কুলে ছেলেমেয়েরা একটু কুঁজো হওয়ার জন্য কতই না ঠাট্টা-বিদ্রুপ করত তাকে। রিহালের মনে হয়, সবার পক্ষ থেকে আলির কাছে তার ক্ষমা চাওয়া উচিত। বলে-
: আলি, স্কুলে তোর সাথে কেউ ভালো ব্যবহার করত না। তোকে উপহাস করত। সে জন্য তাদের পক্ষ থেকে আমি তোর কাছে মাফ চাইছি। তারা তো জানতে পারল না তুই কত ভালো আর কত বড় মনের মানুষ। তুই কিছু মনে করিস না ভাই। আমি তোর বন্ধু হতে পেরে গর্বিত এবং আরো গর্বিত তোকে বন্ধু হিসেবে পেয়ে।
আলি রিহালের কথা শুনে হাসে। বলে-
: বেশি বলছিস। তুই তো আমার বন্ধু। আর বন্ধুই তো বন্ধুর জন্য করে।
সে রাতে আলি রিহালকে জিজ্ঞেস করে-
: তোর পকেটে কি লুকিয়ে রেখেছিস?
রিহাল বলে-
: বাবার ছবি। আগে এটা আমার বালিশের নিচে রাখতাম। বাড়ি ছেড়ে আসার দিন ছবিটি নিয়ে এসেছি। বাবার কথা সব সময় ভাবি। তিনি বেঁচে না থাকলে আমিও বাঁচব না।
আলি কিছু না বলে তার মাথাটা ঘুরিয়ে নেয়, তারপর শুয়ে পড়ে। রিহালের মনে হল সে কিছু বলতে চায় অথবা তার কাছ থেকে কিছু লুকিয়ে যাচ্ছে।
পরদিন প্রচন্ড রোদে ভাজা ভাজা হতে হতে তারা পথ চলছিল। হঠাৎ গাধাটিকে থামিয়ে দেয় আলি। লাফিয়ে নেমে লম্বা করে শ্বাস নিতে শুরু করে। তারপর লাফাতে লাফাতে বলতে থাকে –
: তাজা বাতাস! তাজা বাতাস!
রিহাল অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে-
: তার মানে কি? তাজা বাতাস দিয়ে কী হবে?
আলি তাকে বুঝিয়ে বলে-
: কাছেই কোথাও পানি থাকলে বাতাস এ রকম তাজা হয়। তার মানে হচ্ছে খুশির খবর।
আলি ঠিকই বলেছিল। কিছুদূর এগোনোর পর একটা লেকের পাড়ে পৌঁছে তারা। গায়ের জামা খুলে রেখে লেকের পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। কিছুক্ষণ ধরে সাঁতার কাটা ও গোসল চলে। তারপর পাড়ে উঠে আসে। গাধাটিকে নিয়ে গিয়ে পানি পান করায়। এবার রওনা হতে হয়। আলি তাকিয়ে দেখে, লেক থেকে ডানদিকে রাস্তা চলে গেছে। সেখান থেকে কিছুদূর এগিয়ে একটি সেতু। কিন্তু সেখানে সৈন্যদের দেখা যাচ্ছে। অর্থাৎ তারা সেখানে পাহারায় আছে। তারা ওদিকে গেলে সৈন্যদের হাতে ধরা পড়বে। এখন এটাই পথ। সাঁতরে লেক পাড়ি দিয়ে তাদের ওপারে যেতে হবে। কিন্তু তা সম্ভব নয় তাদের পক্ষে। আলি বলে, সে সাঁতার জানে না। তবে রিহাল জানে। তার বাবা তাকে শিখিয়েছিলেন। কী করা যায়, ভাবতে থাকে আলি। একটু পর তার মুখে হাসি ফোটে। বলে, সমস্যার সমাধান পেয়েছি।
আলি সত্যিই বুদ্ধি রাখে। বলে, গাধাকে পানিতে নামিয়ে দেব। সে সাঁতরাবে। আমরা দু’জন ধরে থাকব তাকে। এভাবে লেক পার হব আমরা।
দু’জন মিলে লেকের দু’পাড়ের মধ্যে সবচেয়ে সংকীর্ণ স্থান খুঁজে বের করে। তারপর গাধাকে এনে নামিয়ে দেয় পানিতে। গাধাটি দিব্যি সাঁতরে চলে। আলি তার পিঠ আর রিহাল লেজ ধরে থাকে। প্রায় অর্ধেকটারও বেশি পথ ভালোই এগোয় তারা। কিন্তু তাদের ভাগ্য খারাপ। গাধাটি হঠাৎ পানির মধ্যে কোনো কিছু দেখে ভীষণ ভয় পেয়ে যায়। সামনে না এগিয়ে পিছনে ফিরে যেতে থাকে। তারা গাধাটিকে আর ধরে থাকতে পারল না। রিহাল সামনের পাড়ের দিকে সাঁতরাতে শুরু করে। কিন্তু সমস্যায় পড়ে আলি। রিহাল তাকিয়ে দেখে, সাঁতার না জানায় কোনো রকমে পানির উপর মাথাটা উঁচু করে রেখেছে সে। সে বুঝতে পারে, এখনি আলিকে সাহায্য করা দরকার, নইলে পানিতে ডুবে যেতে পারে। তার কাছে পৌঁছে যায় সে। বলে-
: ভয় পাস না। আস্তে করে আমাকে ধরে থাক। আমি তোকে টেনে নিয়ে যাব।
লেকের অপর তীর খুব বেশি দূরে ছিল না। দু’জনে তীরে উঠে কিছুক্ষণ শুয়ে বিশ্রাম নেয়। এ সময় আলি বলে-
: আমার নাকে ভীষণ পচা গন্ধ লাগছে। চল তো দেখি।
খানিকটা দূরেই একটি ঝোপের মধ্যে দুর্গন্ধের উৎস মেলে। মানুষের লাশ পচে গিয়ে দুর্গন্ধ বের হচ্ছে। তাকানো যায় না সেদিকে। রিহাল কখনো এ রকম দৃশ্য দেখেনি। ভয়ে চিৎকার করে ওঠে সে। তারপর দৌড়ে পালাতে থাকে সেখান থেকে। বাধ্য হয়ে আলিও দৌড়তে থাকে তার পিছনে।
বেশ খানিকটা দৌড়ানোর পর ক্লান্ত হয়ে থামে রিহাল। হাঁফাতে থাকে বেদম। আলিরও একই অবস্থা। কিছুক্ষণ পর শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক হয়ে এলে রিহাল জিজ্ঞেস করে
: আচ্ছা, মৃত মানুষটি কে?
আলি বলে-
: আমি কি করে জানব বল? সে কোনো বাবা বা মায়ের ছেলে অথবা আমাদের মত কোনো ছেলের হতভাগ্য বাবা। তারা হয়ত পথ চেয়ে বসে আছে তার জন্য। সে হয়ত তাদের কাছেই ফিরে যাচ্ছিল অনেকদিন পর। কিন্তু ফেরা হল না তার। খুনিরা তার প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। এমন দুর্ভাগ্য যে একটু কবরের মাটিও জোটেনি। আমাদের পক্ষেও তাকে মাটি দেয়া সম্ভব নয়।
চলা শুরু করে দু’জন। গ্রাম হয়ত বেশি দূরে নয় এখান থেকে। তাদের ধারণা ঠিকই ছিল। বিকেল হয়ে গেছে। আরো কিছুদূর হাঁটার পর এক মেষপালকের সাথে দেখা হয় তাদের। তার নাম হামেদ। তাদের দেখে অবাক হয় সে। বলে-
: তোমরা কারা? কোথা থেকে আসছ? কোথায় যাবে? বেলা তো আর বেশি নেই।
আলি বলে-
: আমরা সব বলছি আপনাকে। কিন্তু আপনার কাছে যদি কিছু খাবার থাকে তাহলে আগে আমাদের দিন। আমরা খুব ক্ষুধার্ত।
তাদের কাহিল অবস্থা, শুকনো মুখ অল্প বয়স দেখে আর আলির কথা শুনে মায়া হয় হামেদের। নিজের কুঁড়েঘরের মধ্যে নিয়ে যায় তাদের। খনিকটা দুধ ও রুটি দেয়। তাদের খাওয়া শেষ হলে আলি সকল কথা বলে তাকে। হামেদ শোনে আর মাথা ঝাঁকায়। তারপর নিজের মনেই বলে-
: কী যে হল দেশটার! ভাই ভাইকে হত্যা করছে আর তার মাশুল দিচ্ছে তোমাদের মত ছোট ছেলেমেয়েরা। আমি তোমাদের দেখে খুশি হয়েছি। তোমরা আবু সালিহর গ্রামে এসেছ। আমি তারই কাজ করি। এখন আমার কথা শোনো। তোমরা আজকের রাতটা আমার এখানে থাক। কোনো ভয় নেই। কাল আবু সালিহর ছেলে সালিহ আসবেন দুধ নিতে। আমার জন্য কিছু খাবার আনবেন তিনি। তোমরা তার সাথে গ্রামে চলে যেও। সেটাই নিরাপদ হবে। আমাদের এখানে এখন পর্যন্ত কোনো গোলযোগ হয়নি। আমি মনে করি, আবু সালিহর কাছে পৌঁছলে তিনি তোমাদের জন্য ভালো ব্যবস্থাই করবেন।
রাতে আলি ঘুমালেও ঘুম হলো না রিহালের। লেকের পাড়ে দেখা লাশটার কথা ভুলতে পারছিল না সে। বাবার কথা ভাবতে শুরু করে। বুকটা হু হু করতে থাকে তার। ভাবে, আর কি বাবার সাথে কখনো তার দেখা হবে?
পরদিন দুপুরের আগে হামেদের জন্য খাবার নিয়ে আসেন সালিহ। তার সাথে দু’জন মহিলা। দুধ দোয়ার জন্য তাদের সাথে এনেছেন তিনি। রিহাল ও আলিকে দেখে তাদেরও বিস্ময়ের শেষ নেই। হামেদের কাছে সব শোনার পর সালিহ দু’জনের উপর খুশি হলেন। বললেন-
: কাজ শেষ হলেই গ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা হব আমরা।
সব ভেড়ার দুধ দোহন করতে কয়েক ঘন্টা লেগে যায়। আলি ও রিহাল সাহায্য করে তাদের। কাজটি করতে তাদের মজা লাগছিল। রিহালের মনে হয়, গ্রামের জীবন শহরের জীবনের চেয়ে খারাপ নয়। যখন যুদ্ধ মিটে যাবে তখন গ্রীষ্মের ছুটিতে বাবাকে নিয়ে গ্রামে বেড়াতে আসবে সে।
হামেদ ভালো মানুষ ও দয়ালু। তাকে অনেক করে ধন্যবাদ জানিয়ে আবু সালিহর গ্রামের দিকে রওনা হয় রিহাল ও আলি। দু’টি ছোট ছেলেকে দেখে বাড়ির সবাই কৌতূহলী হয়ে ওঠে। সালিহ তার বাবার সাথে পরিচয় করিয়ে দেন তাদের। কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা বুঝতে পারে যে কেউ তাদেরকে কিছু বলেনি বটে, কিন্তু তাদের কেমন যেন সন্দেহ করছে। আলির মনে হয়, এ সন্দেহটা জিইয়ে রাখা ঠিক হবে না। আবু সালিহর কাছে গিয়ে আবু হাসান ও ওম হাসানের কথা বলে সে। তারপর শুরু থেকে এ পর্যন্ত গত ক’দিনে যা যা ঘটেছে সব জানায় তাকে। সব শুনে তিনি অবাক বিস্ময়ে চেয়ে থাকেন আলি ও রিহালের দিকে। এ দু’টি ছোট ছেলে এত কঠিন অবস্থা পাড়ি দিয়েছে? তারপর উঠে দাঁড়িয়ে হাত বাড়িয়ে কাছে টেনে নেন তাদের। তাদের সাহসের প্রশংসা করেন। উপস্থিত সবার মধ্যেও তাদের প্রতি সহানুভূতি জেগে ওঠে।
খেতে খেতে আলিকে জিজ্ঞেস করেন আবু সালিহ-
: তোমাদের বাবা-মা কোথায় গেছেন তা কি জানতে পেরেছো? তাদের কিভাবে খুঁজে পাবে?
আলি বলেÑ
: আমি শুনেছি দেশ থেকে যারা পালিয়ে যাচ্ছে তারা সবাই হয় ইরাক নয় তুরস্কে যাচ্ছে। আমরা আগে তুরস্কে তাদের খুঁজব। সেখানে না পেলে ইরাকে যাব।
: কিন্তু আমি শুনেছি বহু লোক অন্যান্য দেশেও চলে গেছে। তোমাদের পরিবারও যে যায়নি তা বুঝবে কি করে?
এবার রিহাল বলে-
: আগে তুরস্কে যাই। সেখানে খুঁজে দেখি। যেখানেই থাক না কেন, তাদের খুঁজে বের করব।
বৃদ্ধ আবু সালিহ বিচক্ষণ ও বড় মনের মানুষ। তিনি বলেন-
: আমি বলি কি, তোমরা দু’ জনই ছোট। দেশের এই গোলমেলে অবস্থার মধ্যে ঝুঁকি নেয়া ঠিক হবে না। তোমরা আমার কাছেই থাক। তারপর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আমি তোমাদের বাড়ি পাঠিয়ে দেব।
তার কথায় দু’জনই মাথা নাড়ে- তার সাথে একমত নয় তারা। তা দেখে তিনি বলেন-
: তোমাদের ইচ্ছা। তোমরা চলে যেতে চাইলে আটকাব না, যতটা পারি সাহায্য করব।
রিহাল বলে-
: কাল সকালেই আমরা রওনা হতে চাই। দয়া করে আপনি যাবার ব্যবস্থা করে দিন।
আবু সালিহ বলেনÑ
: তোমরা যাতে নিরাপদে পৌঁছাতে পার সেটা আমাকে দেখতে হবে। আমার চেনা একজন ট্রাক ড্রাইভার আছে। সে সবসময় এ পথে যাতায়াত করে। সে তোমাদের নিরাপদে নিয়ে যেতে পারবে। আমি দেখি, তাকে পাওয়া যায় কিনা।
উঠে বাইরে চলে গিয়েছিলেন আবু সালিহ। কিছুক্ষণ পরই ফিরে এলেন তিনি। খুশি দেখাচ্ছে তাকে। বললেনÑ
: ছেলেরা শোনো। ওই ড্রাইভারের সাথে দেখা হয়েছে আমার। কথা হয়েছে। কাল সকালে রওনা হবে তোমরা। সে তোমাদের কামেশলি নিয়ে যাবে। সেটা এমন এক জায়গা যেখান থেকে তোমরা ইরাক বা তুরস্ক যে দেশে খুশি যেতে পারবে। সে তোমাদের জন্য তার পক্ষে যা করা সম্ভব তার সবই করবে। এজন্য তাকে টাকা দিয়েছি। আল্লাহ চাইলে তোমরা শিগগিরই যার যার পরিবারকে খুঁজে পাবে।
আবু সালিহ আলির হাতে কিছু টাকা তুলে দেন। বলেন, এটা রাখো। পথে কাজে লাগতে পারে। আর সাবধানে থাকবে। খারাপ লোকজন পথে ঘুরছে। যদি প্রয়োজন মনে করো আমার এখানে ফিরে এসো। তোমাদের জন্য আমার দরজা সব সময় খোলা থাকবে।

চার.

ট্রাক ড্রাইভারের নাম আয়াশ। বয়স চল্লিশের উপরে হবে। খুব সকালে তাদের নিয়ে ট্রাক ছেড়েছেন তিনি। তার পাশের সিটে বসেছে তারা। আয়াশকে একটু পাগলাটে ধরনের মানুষ মনে হয় তাদের। কোনো কিছুরই যেন তোয়াক্কা করেন না। কখনো হা হা করে হাসিতে ফেটে পড়েন, কখনো গান গাইতে গাইতে গাড়ি চালান। আবার কখনো তার চোখ থেকে গড়িয়ে পড়তে থাকে পানি। দু’জনেই বুঝতে পারে এ মানুষটির ভিতরে ভীষণ কোনো কষ্ট লুকিয়ে আছে। আর সেটাকে চাপা দিতেই তার এমন খাপছাড়া আচরণ। তার জন্য মায়া হয় রিহালের। আস্তে করে জিজ্ঞেস করে সে-
: আংকেল! আচ্ছা, আপনার পরিবারে কে কে আছে?
রিহালের প্রশ্ন শুনে অবাক হন আয়াশ। একটু রূঢ় কণ্ঠে বলেন-
: তুমি তা জানতে চাইছ কেন?
ব্যস, আর কোনো কথা নেই। কিছুটা সময় পার হয়। হঠাৎ রিহালের দিকে তাকান আয়াশ। তার মনে হয়, এ রকম ব্যবহার ঠিক হয়নি। বলেন-
: আমার জীবনটা খুব দুঃখের। পাঁচ বছর আগে আমি সব কিছু হারিয়েছি। আমি ছিলাম একজন নতুন ব্যবসায়ী। স্ত্রী ও দশ বছরের একটি ছেলে ছিল আমার। একদিন রাতে একটু দূরের এক আত্মীয় বাড়ি থেকে গাড়িতে করে ফিরছিলাম আমরা। আমি গাড়ি চালাচ্ছিলাম। কিভাবে যে গাড়ির নিয়ন্ত্রণ হারালাম জানি না। গাড়ি রাস্তা থেকে গিয়ে পড়ল খাদে। মাথায় গুরুতর আঘাত পেয়ে জ্ঞান হারিয়েছিলাম। পরদিন যখন জ্ঞান ফিরে পেলাম, দেখলাম আমি হাসপাতালে। আমাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে আনা হয়েছে। তারপরই শুনলাম সেই দুঃসংবাদ। আমার স্ত্রী ও ছেলে নেই। ঘটনাস্থলেই মারা গিয়েছিল তারা। তাদের নিয়েই ছিল আমার পৃথিবী। এক মাস পর সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে চলে আসি। তারপর থেকে একটা যন্ত্রণা আমাকে কুরে কুরে খাচ্ছে। ওদের মৃত্যুর জন্য আমিই দায়ী। আসলে আমারই মৃত্যু হওয়া দরকার ছিল, বেঁচে থাকা উচিত ছিল তাদের। আমার সবচেয়ে প্রিয়জনদের আমি হারিয়েছি। এখন জীবনের প্রতি আর কোনো আগ্রহ নেই। অপেক্ষা করছি মৃত্যুর। যাতে তাদের সাথে মিলিত হতে পারি। এই হচ্ছে আমার কথা। এখন বল, তোমাদের ঘটনা কী?
আলি সংক্ষেপে তাদের কথা বলে। শুনে আয়াশ বলেন-
: তোমাদের মত অনেকেরই একই অবস্থা। জানি না, তোমাদের বাবা-মাদের খুঁজে পাবে কি না। আমি যতটা পারি, তোমাদের সাহায্য করব।
হঠাৎ ট্রাকের গতি কমিয়ে আনেন আয়াশ। আলি তার দিকে চেয়ে বলে-
: আপনি কি এখানে থামতে চাইছেন?
আয়াশ বলেন-
: না, আমি যা বলি শোনো। আগে তোমাদের বলা হয়নি। সামনে কিছু দূরে একটি চেক পোস্ট আছে। সেখানে যারা আছে তারা সেনাবাহিনী বা সরকার বিরোধী বাহিনীর কেউ নয়। আসলে তারা দস্যু। তারা ট্রাক থামাতে বলবে। কিন্তু থামলেই আমাদের মেরে ফেলে ট্রাক নিয়ে নেবে তারা। তাই আমি দ্রুত গতিতে ট্রাক চালিয়ে ঐ চেক পোস্ট পার হয়ে যাব। তারা আমাকে গুলি করতে পারে। যদি আমার খারাপ কিছু ঘটে যায় তাহলে তোমরা গাড়ির দরজা খুলে নেমে দৌড়ে পালিয়ে যাবে। কোনোক্রমেই আমার অপেক্ষা করবে না। এখন দু’ জন মাথা নিচু করে রাখো।
চেক পোস্ট দেখা যাচ্ছে। এখনো শ’ দুয়েক গজ দূরে। রাস্তার ওপর দু’জন সশস্ত্র লোক দাঁড়িয়ে। এ সময় ট্রাকের স্পিড বাড়তে শুরু করে। গতি বেড়ে একেবারে ঝড়ের মত চেক পোস্ট পেরিয়ে যায় ট্রাক। রাস্তার অস্ত্রধারীরা ছিটকে সরে যায় প্রাণ বাঁচাতে। কিন্তু চেক পোস্টে থাকা অন্য দস্যুরা দু’পাশ থেকে গুলি ছুঁড়তে শুরু করে ট্রাকের দিকে। মাথা নিচু করে রাখেন আয়াশ। অল্প সময়েই বেশ খানিকটা দূরে চলে আসে ট্রাক। ভাগ্য ভালো যে দস্যুরা ট্রাকটিকে পিছু ধাওয়া করেনি। তারা এখন নিরাপদ।
আলি জিজ্ঞেস করে-
: আংকেল, আপনি খুব সাহসী। ওদেরকে টেক্কা দিয়ে চেক পোস্ট পার হয়ে এলেন। কিন্তু ওদের গুলি যদি আপনার গায়ে লাগত?
আয়াশ হাসতে হাসতে বলেন-
: মৃত্যুকে আমি ভয় পাই না।
হঠাৎ তার মধ্যে কেমন যেন পরিবর্তন লক্ষ করে আলি। তারপরই দেখতে পায়, আয়াশের সাদা পোশাক পেটের কাছে রক্তে লাল হয়ে উঠেছে। তার বুঝতে দেরি হয় না যে আয়াশের পেটে গুলি লেগেছে। কিন্তু তিনি তাদের কাছে কিছু বলেননি। আলি বলে-
: আপনি এখুনি গাড়ি থামান আংকেল। আপনার রক্তপাত বন্ধ করতে হবে।
আয়াশ বলেন-
: না, থামা যাবে না। আমি যতক্ষণ সম্ভব গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছি। তোমাদেরকে কামেশলির যতটা সম্ভব কাছাকাছি পৌঁছে দেব। ট্রাক থেমে গেলে তোমরা নেমে এ রাস্তা ধরে হাঁটতে থাকবে। কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করতে যেয়ো না। সন্দেহ করতে পারে। ঘন্টা দুয়েক হেঁটে গেলে কামেশলি শহর পেয়ে যাবে। সেখান থেকে তুরস্ক বা ইরাক যেখানে খুশি যেতে পারবে। কোনো সমস্যা হবে না। আর আমাকে এ ট্রাকেই রেখে যেও। চিন্তা করো না, আমার ব্যবস্থা আল্লাহই করবেন।
ট্রাক চালাতে থাকেন আয়াশ। আরো কিছুদূর এগিয়ে এক হাতে স্টিয়ারিং ধরে রেখে আরেক হাতে পকেট থেকে সব টাকা বের করেন আয়াশ। আলির হাতে দিয়ে বলেন-
: আমার অবস্থা খারাপ হয়ে আসছে। এ টাকা তোমরা রেখে দাও। কাজে লাগবে। আমার জন্য পারলে একটু দোয়া করো। ঐ যে আমার স্ত্রী ও ছেলে আমাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে। আর ট্রাক চালাতে পারছি না।
গাড়ি ফুল ব্রেক করেন আয়াশ। পর মুহূর্তে তার দেহটি স্টিয়ারিংয়ের উপর এলিয়ে পড়ে।
কামেশলি ছোট শহর। তবে এখন এ শহর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যেখানে ট্রাক থেমেছিল সেখান থেকে হেঁটেই শহরে এসেছে তারা। এ অঞ্চলে কুর্দিদের বাস। কুর্দিদের দল পিকেকে। অনেকদিন ধরে স্বায়ত্তশাসন পাওয়ার জন্য আন্দোলন করে আসছে তারা। তবে কামেশলিতে কোনো লড়াই নেই। এখানে পিকেকে সরকার ও বিদ্রোহী বাহিনী দু’পক্ষের সাথেই সমঝোতা করে চলে। আর এ শহর থেকে ইরাক ও তুরস্ক দু’দেশেই যাওয়া যায়। তাই সিরিয়ার নানা জায়গার লোক কামেশলিতে এসে ভিড় করছে। তারপর যার যার সুবিধামত দু’দেশের সীমান্তে চলে যাচ্ছে।
শহরে পথে হাঁটতে থাকে তারা। কেউ তাদের দিকে খেয়াল করে দেখে না। হয়ত ছোট বলেই। কোনদিকে যাবে বুঝতে পারে না তারা। সমস্যা হতে পারে ভেবে কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করারও সাহস পায় না। শেষে আলি বলে-
: চল, একটা দোকানে গিয়ে তোর জন্য একটি টি-শার্ট আর জুতো আগে কিনে ফেলি। কারণ, তোর আর কোনো জামা-কাপড় নেই। তারপর কোনো খাবার হোটেলে গিয়ে কিছু খেয়ে নেব দু’জন।
কাপড় কিনে ও খাওয়া সেরে খুঁজতে খুঁজতে শহরের বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছে দু’জন। ভেবেছিল সেখানে লোকজনের ভিড় দেখবে। কিন্তু না, তেমন ভিড় নেই সেখানে। বাস আসছে, ছেড়ে যাচ্ছে। কারো মধ্যে ভয় বা শংকা দেখা যায় না। কয়েকজনের কাছে তুরস্ক সীমান্তে যাওয়ার বাসের কথা জানতে চায় আলি। কিন্তু কেউই কিছু বলে না তাকে। কেউই যেন কিছুই জানে না।
কি করা যায়! ভাবতে থাকে দু’জন। এ সময় আয়াশের ট্রাকটিকে আসতে দেখা যায়। ভীষণ অবাক হয় তারা। দু’জন এক সাথে বলে ওঠে- আরে, এ তো আয়াশের সেই ট্রাক! ট্রাকে বেশ কয়েকজন মানুষ দাঁড়ানো। ধীরে ধীরে ট্রাকটি একটু দূরের একটি মসজিদের সামনে থামে। তারা দু’জন ব্যাপারটা কি তা দেখার জন্য সেখানে হাজির হয়। একটি খাটিয়ায় আয়াশের লাশ নিয়ে মসজিদের বারান্দায় রাখা হয়। খবর দেয়া হয় ইমামকে। তিনি এলে গোসল করিয়ে জানাযার পর তাকে দাফন করা হবে। লোকজনের কথাবার্তা থেকে বোঝা যায়, এরা সবাই আয়াশকে চেনেন। এ সময় রিহাল লক্ষ করে, মৃত আয়াশের মুখে স্মিত হাসি লেগে আছে। এ সময় পাশে দাঁড়ানো দু’ ব্যক্তির কথা শুনতে পায় তারা। একজন বলেন-
: দেখেছেন, মৃত আয়াশের মুখে কি রকম মিষ্টি হাসি দেখা যাচ্ছে?
অন্যজন গম্ভীর কণ্ঠে বলেন-
: তার অর্থ সে শান্তিতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছে। এই শান্তিই আমাদের দরকার।
আলি ও রিহাল আগের জায়গায় ফিরে এসে রাস্তার পাশে বসে। বিকেল নেমে এসেছে। আর কিছুক্ষণ পর সন্ধ্যা হবে। দিনশেষে ধনী-গরিব সব

SHARE

Leave a Reply