Home সম্পূর্ণ কিশোর উপন্যাস চম্পক ও রঙবাহারি দিন -ঝর্ণা দাশ পুরকায়স্থ

চম্পক ও রঙবাহারি দিন -ঝর্ণা দাশ পুরকায়স্থ

মন খারাপের দিন

চমৎকার ঝকঝকে সকাল ছিল আজ। নীল আকাশে মুঠো মুঠো সাদা মেঘ। আম্মু ওগুলোকে বাহারি মেঘ বলে। শরৎকালের মেঘ তো, তাই অনেক রঙে বদলে যায়। মেহেদি রাঙা মেঘ, কোনটা বা বকের পালকের মতো ধবধবে সাদা। নীল আকাশে কাশফুলের মতো সাদা মেঘগুলো যখন ছুটোছুটি করে, বেশ লাগে চম্পকের।
নানার গাঁয়ের বাড়িতে গিয়ে দেখে এসেছে নদীর পারে অগণিত কাশফুল। ঢাকায় তো ওসব নেই। কাশফুল দেখেছে বলেই তো মেঘের তুলনাটা ঝট করে চলে এল মনে।
এমন আকাশের দিকে তাকিয়ে মনটা ফুরফুরে হয়ে গেছে ওর।
পাউরুটি-ডিম-কলা-দুধ খেয়ে রোজ সকালে আম্মুর হাত ধরে ইশকুলে যায় চম্পক। বড় বোন চুমকি যায় একটু পরে। রোজ রোজ একঘেয়ে নাশতা খেতে ওর একটুও ভাল্লাগে না। আজ রহিমা খালা টম্যাটো-গাজর-পেঁয়াজ কুঁচো দিয়ে চমৎকার ডিমের ওমলেট তৈরি করেছে।
রহিমা বলে, নেও, মামলেট খাও।
চুমকি বলে, তুমি মামলেট বলো কেন খালা? ওমলেট বলতে পারো না!
– ঐ হইলো, ঘাড়ের নামই গর্দান, টকের নামই চুহা।
ময়দানে নামেন ছোটচাচু,-এই সকাল বেলাতেই তোমার কথার ফুলঝুরি ঝরছে রহিমা বু? দাও, শিগগির এক পেয়ালা চা দাও।
ভোরবেলা থেকে বাড়িতে হুটোপুটি শুরু হয়। জাহিদ কিছু সময় পর ব্যাংকে যাবেন, ওটাই তার কাজের জায়গা। অফিস সকাল দশটায়, ধীরে-সুস্থে যাবেন তিনি। নীলোফার কলেজে পড়ান, উনি চম্পককে স্কুলে দিয়ে কলেজে যান। চুমকির স্কুল কিছুটা দেরিতে বলে জাহিদ ব্যাংকে যাবার সময় মেয়েকে নামিয়ে দিয়ে যাবেন। শুক্র-শনিবার ছাড়া পাঁচ দিন হৈ হৈ রৈ রৈ করে সকালের সময়টুকু ফুরিয়ে যায়।
চোখ বুজে চিবোতে থাকে চম্পক।
নীলো বলেন, হচ্ছে কি চম্পু? স্কুলে যেতে হবে না? বিনুনি বাঁধতে বাঁধতে চুমকি বলে, তুই কি ভেবেছিসরে? ছুটির দিন? মোটেও তা নয়। শিগগির খেয়ে রেডি হয়েনে, নয়তো মার খাবি।
– এই যে হয়ে গেছে আম্মু, আর দু’ মিনিট।
মায়ের মুখের মিষ্টি হাসি দেখে দু’চোখ জুড়িয়ে গিয়েছিল চম্পকের। সকাল বেলাটা এমনই চমৎকার ছিল। চুমকি আপু কখনো কিছু সহজে দিতে চায় না। আজ চাইতেই বলপেন আর রঙ পেনসিল ছোট ভাইটিকে দিয়ে দিল। বিপত্তি ঘটে স্কুলের ঘন্টা পড়ার সাথে সাথে।
ক্লাস টেস্টের খাতা দিচ্ছেন রিনি ম্যাডাম। একজন একজন করে খাতা নিচ্ছে, কেউ দাঁত বের করে হাসছে, কারো মুখ মলিন। বুকের ভেতরটা ধুক ধুক করছে চম্পকের। রিনি ম্যাম হাসিমুখে ডাকে, এসো এসো জিসান, ওয়েলকাম, খাতা নিয়ে যাও। ম্যাডাম হাসছেন কেন? অংকে কি ভালো নম্বর পেয়েছি? সাহস করে এগিয়ে যেতেই খাতার প্রথম পাতাটি জ¦ল জ¦ল করে ওর দু’চোখে। খাতার ওপরে লাল কালি দিয়ে আঁকা ইয়া বড় এক গোল্লা।
হঠাৎ করে সারা শরীর কেঁপে ওঠে চম্পুর। মন খারাপের ভেলা ভাসতে থাকে ওর ছোট্ট বুকের ভেতরে।
অনেকেই দশ-এ দশ পেয়েছে, কেউ আট, কেউ বা ছয় পেয়েছে কিন্তু দু’একজন ছাড়া কেউ অমন গোল্লা পায়নি। আলো ঝলোমলো সুন্দর সকাল মুহূর্তে ফিকে হয়ে আসে ওর চোখে।
ক্লাসে আর ওর মন পড়ে থাকে না, দূরে কোথাও হারিয়ে যায়। তেপান্তরের মাঠ, ময়ূরপক্সক্ষী নায়ের মাঝে মন ডুবসাঁতার দিতে থাকে।
এবার ও কি করবে? বাড়িতে খাতা নিয়ে ও কিভাবে যাবে? নিয়ে গেলেও দেখাবেই বা কি করে?
আব্বু সারাদিন ব্যস্ত থাকেন বলে ওর পড়াশোনার সবটুকু আম্মুই দেখেন। ছুটির দিন ছাড়া রোজ সন্ধ্যায় পাশের ফ্ল্যাটের নাফিসা আন্টি ওকে অংক বুঝিয়ে দিয়ে যান। যেদিন বাড়িতে কোনো মেহমান আসে না কিংবা রাঁধাবাড়ার ঝামেলা থাকে না সেদিন নীলোফার পাশে বসে বাংলা-ইংরেজি-অংক সব কিছু দেখিয়ে দেন, বুঝিয়ে দেন। এত কিছুর পর যদি এমন রেজাল্ট হয়, আম্মু-আব্বু মেনে নেবেনই বা কি করে?
স্কুলের এককোণে দাঁড়ানো চাঁপা গাছটির দিকে তাকিয়ে কত কিযে ভাবে চম্পক। আমি তো মোটে নাইন প্লাস। ছোটই তো। ক্লাস থ্রি-এর ছাত্র, এত বইয়ের বোঝা কি নেয়া যায়? পিঠে পেট মোটা ঢাউস ব্যাগ টেনে নিতে নিতে সামনের দিকে ঝুঁকে যায় ও।
বেড়াতে এসে নানী খুব মন খারাপ করে বলেন, আহারে রাজ্যির পড়া, এইটুকুন বাচ্চারা কি এত বই পড়তে পারে? এখন হলো খেলাধুলার বয়স। লুকোচুরি-গোল্লাছুট খেলবে।-
সত্যিই তো- খেলতে চম্পুর মন চায় না? খুব চায়। গোল্লাছুট-লুকোচুরি-লুডো-ক্যারাম ছাড়াও স্কুলের মাঠে, বাড়ির ছাদে ফুটবল-ক্রিকেট খেলা। দারুণ হৈ চৈ। রান করা, গোল দেয়া- চেঁচামেচি-চিৎকারে হট্টমেলা হয়ে যায়। এই তো বেশ।
স্কুলে বেল পেটাবার আগে বাবু মিয়া বলে, যাও, যার যার ক্লাসে যাও, বেশি চিল্লাপাল্লা কইরো না।
বাড়িতে আম্মু বলেন, ইসস্-খেলা বন্ধ কর, কান ঝালাপালা করে দিচ্ছিস রে চম্পু।
আব্বু হেসে বলেন, ছেলে খেলতে গেলে বোঝা যায় নীলো, ওকে হরলিকস্-ওভালটিন খুব খাইয়েছ, পড়তে বসলে তোর এই আওয়াজটা কোথায় হারিয়ে যায়রে চম্পু? হারতে রাজি নয় সে, বলে- মোটেও নয়।
এই মুহূর্তে মনে হয়, কিছুই যেন পারে না সে। অন্যদের পেছনে ফেলে সামনের দিকে কিছুতেই এগোতে পারছে না। অঙ্কে পেছনে, দৌড় খেলায় পেছনে-সামনে তাহলে এগিয়ে কি করে যাবে চম্পক?
টিফিন আওয়ারে টিফিন বক্স খুলে হাঁ করে তাকিয়ে থাকে আকাশের দিকে। জেলি মাখানো পাউরুটি, ডিমের ডেভিল, সবুজ আপেল মা যতœ করে সাজিয়ে দিয়েছে। অঙ্কে গোল্লা পাওয়া ছেলের জন্য কেউ এমন করে টিফিন সাজায়? চোখে পানি টলমল করে।
এক সময় নিজের ওপর খুব রাগ হতে থাকে ওর। জিসান খুব বাজে ছেলে-আপনমনে আওড়াতে আওড়াতে দু’চোখের কোল ওর পানিতে ভরে যায়।
বিশাল মাঠে ওর বন্ধুরা ফুটবল নিয়ে ছুটোছুটি করছে। ক্রিকেট ব্যাট হাতে নিয়ে মুন্না, রুবাই রান করে যাচ্ছে। দুটো চার, দুটো ছক্কাও মারল রুবাই। চার পাশে কত আনন্দধ্বনি। শুধু চম্পকের বুকের ভেতরটা কালো মেঘে ভরে আছে। টিফিন খেতেও সে ভুলে যায়।
পিঠের মাঝে জোরসে চাপড় মেরে ঋতম বলে, কিরে জিসান, হাঁ করে আছিস কেন, মুখের ভেতর বাঘ-ভাল্লুক-হাতি-মাছি সব ঢুকে যাবে রে।
বিরক্ত হয়ে চম্পক বলে, শোন ঋতম, সব সময় ইয়ার্কি ভাল্লাগে না।
– বাব্বা : এত মেজাজ দেখাচ্ছিস কেন? আমারও তো মন খারাপ, তা আমি কি তোর মত গালে হাত দিয়ে হাঁ করে বসে আছি?
– তুইও কি অঙ্কে গোল্লা-
ঋতম এক গাল হেসে বলে, তোকে আর বলছি কি তাহলে? আমার কাছে এটি তো স্বভাবিক ব্যাপার।
অবাক হয়ে জিসান বলে, তোর ভয় লাগছে না?
– ভয়? কেন, ভয় কেন? কিসের ভয় রে? তুই খুব হাবলা।
– বা: রে, আব্বু-আম্মুকে দেখাতে হবে না?
-হু, দেখাব তো। বলব দশে দশ পেয়েছি।
-মিথ্যে বলবি? তাজ্জব জিসান।
জিসান অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে ঋতমের দিকে। মুচকি হেসেও বলে, মিথ্যে বললাম কোথায় রে? ঐ তো দশ। খাতার ওপর জ¦লজ¦ল করছে এক আর শূন্য, মানে ১০ নম্বর। কী করে হলো? ও কি ম্যাজিক জানে নাকি! ইয়া বড় গোল্লা দশ হয়ে যায় কি করে? এ কি জাগলারি নাকি। ঋতম ওর রাফ খাতায় শূন্য এঁকে বাঁয়ে এক বসিয়ে দেয়।
কি দশ হলো না? শূন্যের বাঁয়ে এক বসানো এক্কেবারে সোজা।
ঢঙ ঢঙ করে ঘন্টা পড়ে। ক্লাস শুরু হয় নতুন করে। কিন্তু চম্পকের কিছুতেই আজ মন নেই। দু’কানে ঝমঝম করে বাজতে থাকে একটি শব্দÑদশ দশ দশ।
সত্যিই কি ও বোকা?
ঋতম কী সহজ সুরে বলল, তুই একদম হাবলা, মিছেমিছিই ভয় পাচ্ছিস।
হঠাৎ করে ঝড়ো হাওয়ায় কোত্থেকে যেন মুঠো মুঠো সাহস এসে জমা হতে থাকে জিসানের বুকে। ঋতমের সাথে ওর তেমন ভাব নেই, আজ ও প্রিয়বন্ধু হয়ে কাছে এসেছে। কত কিছু জানে সে, ও যেন চম্পুর ফ্রেন্ড ও গাইড হয়ে গেছে।
আজ ড্রয়িং ক্লাস ছিল বলে রঙ পেন্সিলের ছড়াছড়ি। মন খুলে বন্ধুদের সাথে খুব হৈ হুল্লোড়ে মেতে থাকে সে। ছুটির ঘন্টা পড়ার সাথে সাথে ঋতমের কাছে ছুটে যায় জিসান।
বাড়ি ফেরার তাড়া সবার। ক্লাসের এক কোণে বসে ঋতম জিসানের খাতায় প্রায় পাকা হাতে শূন্যের সঙ্গে মিল রেখে বাঁয়ে এক সংখ্যাটি বসিয়ে দেয়।
যাহ-এবার আর কোনো ভয় নেই।
রহিমা খালা ক্লাসে ঢুকে বলে, তুমি এত দেরি কইর‌্যা বাইর হও ক্যান চম্পু? ছুটি হইলে তাড়াতাড়ি  বাইর হইয়া পড়বা। তা না খালি দেরি করো।
– ধাহ বুয়া, বন্ধুরা তোমার সব কথা শুনছে, তাকিয়ে দ্যাখো। চম্পু বলছ কেন?
জিসান তড়িঘড়ি করে রিকশায় চেপে চারপাশে তাকায়। বাড়ির নামটি কেউ শুনে ফেলল না তো।
বুকের ভেতরটা পাখির পালকের মতো হালকা লাগছে। শরতের ঝকঝকে নীল আকাশটাকে দেখতে দেখতে সব ভুলে যায় জিসান। এখন আর ওর কোনো ভয় নেই। মনে মনে বলে, থ্যাংক ইয়ু ঋতম, দারুণ এক বুদ্ধি বাতলে দেয়ার জন্য।

মায়ের চোখে স্বপ্নের ভিড়

দুপুরবেলা বাড়িটা বেশ জমজমাট থাকে। রাঁধা খাওয়া-গোসল করা, কাপড় কাচাÑসব কাজ এক সঙ্গে চলে। ঝুম বৃষ্টির দিনে, গরম কালের সুনসান দুপুরেÑমাছ ভাজার ছ্যাঁক ছ্যাঁক আওয়াজে, কাপড় কাচার ঠুসঠাস আর ঝর ঝর পানি ঝরার শব্দে ভূতের ভয়টা তেমন আর থাকে না চম্পকের। তাই দুপুর বেলাটা ওর খুব প্রিয় সময়। আব্বু-আম্মু বাড়িতে থাকে না ঠিকই কিন্তু একবারও একা একা লাগে না ওর।
রহিমা খালা রোজকার মতো লেবুর শরবত বানিয়ে দেয়, প্লেটে ক্রিম মিষ্টি রাখে। আদুরে গলায় বলে, খাও খাও সোনা, মুখখান শুকায়া এইটুকুন হই গেছে, সন্দেশ খাবা?
আজ খালার ওপর ওর দারুণ রাগ।
– কেন তুমি আমাকে চম্পক, চম্পু বলে ডেকেছ বুয়া? গালে হাত দিয়ে রহিমা বলে, তোমারে নাম ধইরা ডাকুম না? কয় কি পোলায়?
– নাহ, বাড়ির নাম ধরে কক্ষনো স্কুলে ডাকবে না। বুয়া ফ্রিজ খুলে সন্দেশ বের করে বলে, ঠিক আছে জিসান মিয়া, মুখ শুকায় এতটুকুন হয়া গেছে, তাও পোলার বড় বড় কথা। এবার থাইকা জিসান বইলাই ডাকুম।
সন্দেশ কামড় দিয়ে হেসে ফেলে চম্পক। পর মুহূর্তে ভাবে-আমার মুখ কি শুকিয়ে গেছে? খালা তো অনেক কথা দিনে-রাতে-বলে সেকি বুঝতে পারবে কিছু একটা হয়েছে চম্পুর।
সত্যি-বুকের ভেতরে ওর কেমন এক ঝড় বইছে। তবে এখন আর ভয় নেই। ঋতম বেশ একটা ভালো বুদ্ধি বাতলে দিয়েছে। ক্লাস টেস্টের মার্কস যোগ হবে না ফাইনাল পরীক্ষায়-আব্বু-আম্মু কি এত তীক্ষ চোখে দেখবেন?
বাড়িতে যখন মেহমান আসবে কিংবা যখন দু’জনের বাইরে বোরোবার খুব তাড়া থাকে-তখনই এক ঝলক খাতাটা দেখিয়ে নেবে সে।
শেষ দুপুরে আম্মু-চুমকি আপু ফিরে আসে। খেতে বসে ওরা। এই সময়টুকু সবাই মন খুলে গল্প করে। টেবিলে মসুর ডাল, কই মাছের তরকারি, ঢেঁড়স ভাজি। খেতে বসে নীলোফার,-কি রে চম্পু, ক্লাস টেস্টের খাতা দিয়েছে রে?
বলার সাথে সাথে কাঁচা মরিচ মুখে পড়ায় আহা উঁ হুঁ করতে থাকে আম্মু।
চোখে পানি আসে, মুখ লাল হয়ে ওঠে।
– কতদিন তোমাকে বলেছি বুয়া ডালে এত কাঁচা মরিচ দিও না। চম্পু-চুমকি কি এত ঝাল খেতে পারে? আমিই তো পারছি না। ধ্যাৎ, তুমি এক্কেবারে কথা শোন না বুয়া।
খালা কাচুমাচু হয়ে বলে, ডাইলে কাঁচা মরিচ না দিলে কি সোয়াদ হয় আপা?
কই মাছের কাঁটা বেছে মুখে দিয়ে নীলোফার বলেন, বা: বেশ রেঁধেছ বুয়া। মাছটা দারুণ হয়েছে।
খেতে খেতে খাতার কথা বেমালুম ভুলে যায় আম্মু।
চুমকি আপু বলে, কাঁটার মাছ আমি বেছে খেতে পারি না, জান না বুয়া? চিকেন রাঁধতে পারো না?
নীলোফার বলে, মাছে-ভাতে বাঙালি-কথাটি শোননি চুমকি? ভাত আর মাছের ঝোল বাঙালিরা খাবেই। তাছাড়া কাঁটা বেছে মাছ খাওয়া শিখতে হবে না?
পরম আনন্দে চম্পক মাছের কাঁটা বেছে দিব্যি সোনামুখ করে খেতে থাকে। কই মাছ খাব না, ঢেঁড়স কি খেতে পারি-এসব বলে আজ মোটেও ঝামেলা করে না ও। চিকেন কোর্মা কেন হয়নি-বলে মোটেও চেঁচিয়ে উঠল না, একদম চুপ সে।
নীলোফার বলে, ব্যাপার কিরে চম্পক? আজ তুই চিকেন নেই চিকেন নেই বলে ঝামেলা করলি না তো। কি হয়েছে তোর? শরীর খারাপ?
এই রে, সেরেছে। চেয়ার সরিয়ে বেসিনে হাত ধুতে থাকে চম্পক। কী আবার হবে? তুমি না আম্মু-
সময় বয়ে যেতে থাকে একটু একটু করে। ভয়-ভাবনা আর কিছুটা আনন্দের মাঝে সে নিয়ম মতো বয়ে যায়।
বিকেলে জাহিদ সাহেব ফিরে এলে চা-নাশতা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে নীলোফার। চম্পক ভাবে, সবাই যদি সারাক্ষণ ঝুট ঝামেলায় ব্যস্ত থাকে তো বেশ হয়। ক্লাস টেস্টের খাতার কথা মনেই থাকবে না। ইসস্-সবাই যদি ভুলে যেত ওর পরীক্ষার খাতার কথা।
তবে চাইলেই কি সব কিছু ওর মনের মতো হবে? তা তো নয়। সন্ধ্যায় জাহিদের কাছে দু’তিনজন মেহমান এলেন। নীলোফার ফের ব্যস্ত হয়ে পড়ল চা-নাস্তা নিয়ে। চেঁচিয়ে বলল, চুমকি, এ্যাই চুমকি-শুনতে পাস না? চম্পুর দিকে খেয়াল রেখ, ও যেন হোমটাস্ক না করে টিভির সামনে গিয়ে না বসে।
আজ টিভি দেখার ইচ্ছে চম্পকের মোটেও নেই। মায়ের চোখকে ফাঁকি দিয়ে কার্টুনের বই পড়াÑটিভি দেখাÑওসব ওর কাছে কিছুই নয়, ওগুলো তো সে হরদম করেই থাকে।
নীলোফার সব সময় বলে চম্পু তুমি অমন করো কেন? আগে পড়া তারপর অন্য কিছু। লেখাপড়া শিখেতো মানুষ হতে হবে, সহবত শিখতে হবে।
হাতে-পায়ে দুষ্টুমি করতে করতে চম্পক বলছে সহবত কি আম্মু?
নীলোফার ভুরু কুঁচকে বলেছেন, বাবা: এত প্রশ্ন; করতে পারিস? সহবত মানে-সভ্যতা। এখন জিজ্ঞেস করবিÑসভ্যতা-ভব্যতা মানে কি-তাই তো? সবার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করবে, কারো সঙ্গে দেখা হলে সালাম দেবে, জিজ্ঞেস করবে- কেমন আছেন? কাউকে কটু কথা বলবে না। তুই যা দুষ্টু ছেলে চম্পু, এক্ষুনি জিজ্ঞেস করবি,-কটু কথা কি আম্মু?
বোকার মতো মুখ বানিয়ে চম্পক বলে, সত্যিই তো কটু কথা কি আম্মু। আমি তো এ শব্দটি আগে কখনো শুনিনি।
নীলোফার চোখ পাকিয়ে বলেছে, খুব ইয়ার্কি হচ্ছে-না? হি হি করে হেসেছে চম্পক, আম্মুও সেদিন কম হাসেনি।
চুমকি মন খারাপ করা সুরে বলে, আম্মু-এতক্ষণ ধরে চম্পু কী পাকামোটাই না করছেÑকই কিছু বলেছ তুমি! বলবে না তো। আদরের ছেলে যে! আমি এত কথা বললে তো চড়-থাপ্পড় লাগিয়ে দিতে, লাগাতে না বলো!
নীলোফার হাসিমুখে বলেছে, এত কথা বলতে হবে না। যে ভালো, সবাই সেই ছেলে- মেয়েকে আদর করে, ভালোবাসে। মানুষের সামনে যাকে নিয়ে গর্ব করা যায় তাকেই মা-বাবা ভালোবাসেন। তবে অন্যদেরও কোনো মা কম ভালোবাসেন না।
এসব তো কিছুদিন আগের কথা। তখন চম্পকের বুকের ভেতরে টইটম্বুর আনন্দ ছিল। এই মুহূর্তে অন্যরকম হয়ে গেছে সব। পরীক্ষার খাতার ভাবনাটা কিছুতেই মন থেকে উঠে যাচ্ছে না।
আম্মু বোধ হয় আংকেলদের জন্য নিমকি ভাজছেন। বাতাসে ভেসে আসছে ভাজা তেলের মনকাড়া গন্ধ, দুধ-সেমাইও বুঝি তৈরি হচ্ছে। ঘন দুধ আর এলাচির মিষ্টি মিষ্টি গন্ধে ভরে আছে সারা বাড়ি।
এই সুযোগ। হঠাৎ চম্পুর মগজে দুষ্টু বুদ্ধি গজিয়ে ওঠে। আম্মু ব্যস্ত থাকলে তেমন কিছু খেয়াল করে না। ঠান্ডায় এলার্জি বলে আইসক্রিম খাওয়া একদম বারণ ওর। আম্মু যখন কোনো কাজে ব্যস্ত থাকে কিংবা আন্টিদের সঙ্গে কথা বলতে ব্যস্ত, চম্পু ঠিক তক্ষনি বলে, আম্মু, আইসক্রিম খাব। শিগগির টাকাটা দাও না।
আন্টিরা চলে গেলে কিংবা ব্যস্ততা কমলে নীলোফার জিজ্ঞেস করে, কি রে চম্পু, আন্টিদের সঙ্গে কথা বলার সময় এমন ঝাঁপিয়ে পড়ে অস্থিরতা করে টাকা নিলি কেন? তাও আবার তিরিশ টাকা। কতদিন না বারণ করেছি এমন কক্ষনো করবে না। ব্যাড চম্পু, ভেরি ব্যাড।
আম্মু যে কলেজ করে, সাংসারিক ঝামেলার পর ছোটখাটো সব কথা মনে রাখবে-তা কি ও জানে, না বুঝতে পারে। তবু আজ একটু সাহস করে বলতেই হবে।
খুব স্বাভাবিকভাবে মায়ের কাছ ঘেঁষে বসে চম্পক বলে, আম্মু- এই যে দ্যাখো আজ ক্লাস টেস্টের অংক খাতা দিয়েছে। আরে বাবা দ্যাখো না।
নীলোফারের ময়দা মাখা হাত, চুলোতে দুধ উথলে উঠেছে, বিরক্ত হয়ে বলে, ভেরি ব্যাড চম্পু, দুপুরে খাবার সময় তোমাকে জিজ্ঞেস করিনি, তখন তো ভাল করে কিছু বললে না। আহা, এখন কি করে দেখব? কত পেয়েছ বলো তো!
খাতাটা তুলে ধরে চম্পক মায়ের চোখের সামনে। মায়ের মুখে বিন্দু বিন্দু ঘাম। সারাদিনের খাটুনির জন্য কিছুটা ক্লান্তির ছায়া নীলোফারের মুখে ছড়ানো। এরপরও সারা মুখে এক চিলতে হাসি ছড়িয়ে পড়ে।
-দশে দশ পেয়েছ চম্পু? অংক এখন শিখে ফেলেছ, তাই তো।
মায়ের টানা টানা কাজল মাখা দুটি চোখে অনেক স্বপ্ন এসে ভিড় করে।

দুঃখী রাত ও মলিন সকাল

আম্মুকে বলা হয়ে গেছে, যাক, সব ঝুট-ঝামেলা শেষ। অগুনতি কার্টুন আঁকা আকাশ-নীল রঙ বিছানার চাদরে চিৎপাত হয়ে শুয়ে পড়ে চম্পক। দু’চোখ জুড়ে রাজ্যের ঘুম নেমে আসছে। আহ!- বুকের ভার এখন আর এতটুকুও নেই। পাখির পালকের মত হালকা লাগছে নিজেকে।
ভাই-বোনের সিঙ্গেল খাট কামরার দু’পাশে দেয়াল ঘেঁষে রাখা। চুমকি আপু গুন গুন করে পড়ছে, ও ক্লাস নাইনে। চম্পকের চেয়ে অনেক বেশি পড়া ওর। আপু নিজে নিজেই ওর প্রয়োজন মতো পড়া তৈরি করে নেয়।
-এ্যাই চুমকি, পড়ার আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি না কেন?
এমন কথা কখনো বলতে হয় না ওকে। শুধু ওর নিজের পড়া কেন, সব কিছু ও খেয়াল করে।
চম্পক বিছানায় টান টান হয়ে শুয়ে পড়তেই জিজ্ঞেস করেÑকি রে, শুয়ে পড়লি যে? দাঁত ব্রাশ করবি না। যা দাঁত ব্রাশ করে আয়।
-আহ আপু, একটা রাতে শোবার আগে দাঁত ব্রাশ না করলে কি হয় শুনি? এত ডিসিপ্লিন আমার ভাল্লাগে না। সব সময় নিয়ম মেনে চলতে হবে? একদিন নিয়ম ভাংগতে দাও, প্লিজ।
ছোট ভাইটির বড় বড় পাপড়ি ঘেরা ডাগর চোখের দিকে তাকিয়ে চুমকি হেসে ফেলে।
-ইশশ্-পাকা বুড়ো একেবারে, নিয়ম মেনে চলতে ভালো লাগে না-তাইতো? নদী-সমুদ্র-খাল-বিল সব কিছুইতো নিয়মের মাঝে চলে। সময়ের কথা শুনবি? সে তো অবিরত চলতেই থাকে। তুমি রাগ করলে না খুশি হলে, ঝড় হলো না বৃষ্টি হলো, রোদে সব কিছু পুড়ে গেলেও সে চলতেই থাকে। কথায় বলে নাÑসময় ও ¯্রােত কারো জন্য অপেক্ষা করে না।
চুমকির কথা কেউ শুনছে না। বিছানার দিকে তাকিয়ে দেখে ঘুমিয়ে কাদা হয়ে আছে চম্পু। খুব শান্তিতে ঘুমোচ্ছে সে। আম্মুকে কথাটি বলার পর ছোট্ট বুকের ভেতরের ভার ওর একেবারেই কমে গেছে। সে কথা অবশ্য কেউ জানে না, এমনকি চুমকি আপুও না। তাইতো চম্পক অঘোরে ঘুমোচ্ছে।
ভীষণ মশা ঘরে, ভন ভন করে উড়ছে। রোজই পড়া শেষ করে চুমকি মশারি টাঙিয়ে দেয়। ঘুমন্ত ছোট্ট ভাইটির মুখের দিকে তাকিয়ে ভীষণ মায়া হয় ওর। ভাই খুব দুষ্টু আর পাজি। কী পাকা বুড়োর মত বলল, -ডিসিপ্লিন আমার ভাল্লাগে না।
সত্যি, কোনো কোনো দিন এমন হয়-খুব মজার বই পড়ছে চুমকি। ভীষণ ইন্টারেস্টিং। ছুটির দিন, কোনো তাড়া নেই। পড়ছে তো পড়ছেই। এক সময় বইয়ের ভেতর ঢুকে যায় ও।
আম্মু এসে বার বার তাড়া দেয়, দেড়টা বাজে, এখনও গোসল করোনি? যাও যাও, এক্ষুনি বাথরুমে ঢুকো।
একদিন গোসল না করলে কি হয় শুনি। বই-এ ডুবে থাকার মজাটা কি পরে থাকবে! একদিন যদি শুক্রবার বিকেলে নাচের ক্লাসে না যাই-তাহলে কি একে ফাঁকিবাজি বলে? মোটেও নয়। কিন্তু বড়রা তা বুঝতেই চায় না। খুব মন খারাপ করে মুচকি ভাবে,-ছোটদের মনের কথা বড়রা একেবারেই জানতে চায় না, বুঝতেও চায় না।
কেমন পাকা বুড়োর মতো বলল নিয়ম মেনে চলতে আমার ভাল্লাগে না।
ভাইয়ের খাটের ওপর মশারি টাঙিয়ে দিতে দিতে ও ফিসফিস করে বলে, আমারও অনেক সময় অনেক কিছু ভালো লাগে না রে চম্পু। বড় হচ্ছি যে, তাই বুঝি-অনেক সময় অনেক কিছু মেনে নিতে হয়।
ঝুপ করে ঘুম ভেঙে যায় চম্পুর। মধ্যরাত, কোথাও কারো সাড়া নেই। ওপর তলার ট্যাপের পানির ঝরঝর করে ঝরে পড়ার আওয়াজ, দু’ একটা রিকশা ক্রিং ক্রিং করে ঘন্টি বাজিয়ে যাচ্ছে, হুঁশ হুঁশ আওয়াজ করে দু’ একটি গাড়ি ছুটছে-এমন শব্দ ছাড়া চারপাশে কোথাও কারো কোনো সাড়া নেই।
হালকা নীল রঙ বাড়ি ঘরে জ¦লছে। এক সময় চম্পকের ঘুম ভেঙে যায়। আপু ঘুমোচ্ছে, এবার কি করবে সে? আম্মুকে খাতার কথা বলার পর পাখির পালকের মতো হালকা লেগেছিল নিজেকে, এখন আবার নতুন করে একরাশ ভয় জাপটে ধরেছে ওকে।
আমি কেন অংকগুলো ঠিকঠাক মতো করতে পারিনি, কেন এত তাড়াহুড়ো করতে গেলাম? তা না হলে তো এমন ভয় পেতে আমার হতো না। স্কুলের ম্যাম আর বন্ধুদের সামনে এমন করে মাথা হেঁট হতো না। শিরশিরে এক ভয় আমাকে জাপটে ধরত না।
চম্পকের সারা শরীর ঘামতে থাকে। বাইরে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি নেমেছে। বাতাসে গরম ভাপ আর নেই, তারপরও ঘামতে থাকে সে। মোলায়েম কাঁথাটি সরিয়ে রাখে একপাশে। নতুন করে আবার ঘুম না এলে সারারাত কেমন করে কাটবে? কষ্টের এই রাতে বালিশে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে এক সময় ঘুমিয়ে পড়ে ও।
-এ্যাই চম্পু ওঠ ওঠ-স্কুলে যাবি না? দ্যাখ তো কটা বাজে? চেনা পৃথিবীতে আবার ফিরে আসে ও। নিয়মবাঁধা জীবনে চলতে শুরু করে। দাঁত ব্রাশ করে, স্কুল ড্রেস পরে তৈরি হয়ে খাবার টেবিলে আসে।
কংগ্রাটস মাস্টার জিসান।
আব্বু-আম্মু, চুমকি আপু, তুবড়ি চাচু আনন্দে হৈ হৈ করে ওঠে, দারুণ খুশি সবাই।
চাচু বলে, ভাবী, এবার কিন্তু  সেলিব্রেট করতে হবে, তোমার ছেলে বেশ প্রগ্রেস করেছে ম্যাথসে। কার ভাতিজা দেখতে হবে তো?
চুমকি বলে, জমিয়ে খাব আমরা। এখন আর অঙ্ক কষতে ভাই ভুল করে না। কংগ্রাটস চম্পু। হাত বাড়িয়ে দেয় চুমকি।
জাহিদ সেমাইয়ের বাটিতে চামচ ডুবিয়ে বলেন, যাও চম্পু, খাতাটা নিয়ে এসো হারি আপ।
নিজের ঘরের দিকে পা বাড়ায় চম্পক। দু’টি পা যেন পাথরের মতো হয়ে আছে। শিরদাঁড়া বেয়ে ঘাম ঝরতে থাকে। কেমন হয়ে গেল ব্যাপারটি?
শুনতে পায়, খুশি মাখা গলায় আব্বু বলছেন, ক্লাস টেস্ট-এ ফুল মার্কস পেলে দশের ভেতরে থাকার চান্স থাকে। যোগ হয় তো মার্কস। বিশেষ করে ম্যাথস-এ ফুল মার্কস পাওয়া খুব জরুরি।
চম্পক খাতা নিয়ে এল।
খাতাটা হাতে নিয়ে দশ নম্বর দেখে জাহিদ ওয়াও বলে চেঁচিয়ে ওঠেন।
অংকে বরাবরই কাঁচা চম্পক। দারুণ ভয় পায় সে এই সাবজেক্টকে। প্র্যাকটিসও করতে চায় না সেভাবে।
স্কুলের ম্যাম, আব্বু-আম্মু, চাচু সবাই বলে, ভয় পাওয়ার কি আছে? অংককে ভয় পেলে তো কাছে ঘেঁষতে পারবি না, ভালো নম্বর পাবি কি করে?
নাহ, এত কিছু বলার পরও কিছুতেই না- বলা এই ভয়কে কাটিয়ে উঠতে পারল না সে।
আব্বু যেন বোমা ফাটালেন, তিনটে অংকই তো ভুল রে। কি করে নম্বর দিলেন ম্যাম? দুটো অংকে তিন তিন করে ছয়, যোগ অংকে চার। ভুল হলো সব অংক অথচ তুই দশ পেলি? ব্যাপারটা কি রে? তোর তো জিরো পাবার কথা। ও? বুঝতে পেরেছি। জিরো ছিল, এর পাশে তুমি এক বসিয়ে দিয়েছ-তাই তো? হোয়াট ইজ দিস? গম্ভীর মুখে জাহিদ বলেন, এমন দুষ্টুমি বুদ্ধি কোত্থেকে শিখেছ? চম্পক তুমি এই? এই আমার সন্তান? এই আমার উত্তরাধিকারী? হাঁ করে বাবুর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে ও।
নীলোফার বলেন, ছি: ছি: চম্পু, তুমি মিথ্যে কথা বলতে শিখেছ? আমার তো মরে যেতে ইচ্ছে করছে। চুমকি ছোট ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি গলায় বলে, তুমি এমন করলে কেন ভাই?
স্নেহের ছোঁয়া পেয়ে ডুকরে কেঁদে ওঠে চম্পক।
– আমি করিনি চুমকি আপু। ঋতম আমাকে বলল এমন করতে।
তুবড়ি চাচুও গম্ভীর।
– হ্যাঁ-ভালই বলেছ চম্পু সাহেব। ঋতম যদি তোমাকে চুরি করতে বলে তুমি তাই করবে?
নীলোফার চেঁচিয়ে ওঠেন।
– তোমার নিজের কোনো বুদ্ধি নেই? তোমাকে না হয় আমরা বকতাম, হয়তো কান মলে দিতাম কিন্তু তুমি এমন কান্ড করলে?
আমি কিছু ভাবতেই পারছি না। জানো, এবার থেকে তোমাকে কেউ আর বিশ^াস করবে না চম্পু। তুমি কেন এমন করলে বলো তো।
জাহিদ উঠে দাঁড়ান, এবার তাকে অফিসের জন্য তৈরি হতে হবে। আম্মুর হাতে শাড়ি-ব্লাউজ তাকেও তৈরি হয়ে কলেজ যেতে হবে।
জাহিদ তাকে বলেন, শোনো নীলো, চম্পক আর স্কুলে যাবে না, ওর পড়াশোনার দরকার নেই। দিজ ইজ মাই অর্ডার। আমার ছেলে লায়ারÑএ কথা ভাবতেই পারছি না।
সবাই চুপ। হীরের টুকরোর মত আলো ঝলোমলো সকালটিতে কে যেন কালি মাখিয়ে দিয়ে গেল।
জাহিদ খুব এক রোখা মানুষ। উনি একবার যা বলেন তাই করেন। বুকের ভেতরটা তার হাহাকার করে। ছেলেকে এত ভালবাসেন, সেই ছেলে এমন লজ্জার কাজ করল! কত আশা তার দু’টি ছেলে-মেয়েকে ঘিরে।
ফোলিও ব্যাগ নিয়ে জাহিদ সিঁড়ি ভাংতে থাকেন। জুতোর ঠক ঠক আওয়াজ শুনতে পায় চম্পক।
ফাঁকা ময়দানে এবার নামে তুবড়ি চাচু।
– তুমি তিন তিনটে অন্যায় করেছ চম্পক। এক. তুমি নিয়মিত অংক কষো না, ফাঁকি দাও- সে আমি জানি। দুই. মেইন সাবজেক্ট অংকতে তুমি ফেল করেছ। তিন. শূন্যের পাশে এক বসিয়ে দশ বানিয়েছ। ঠিক বলেছি? গ্রিলের ফাঁক দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে চম্পক। চোখে কান্না নেই, চোখ ওর খর খরে।

অন্য রকম ভোর

কমলাপুর রেলস্টেশন। অগুণতি ঝকঝকে আলোর মাঝে পদ্মের পাপড়ির মত ঠায় দাঁড়িয়ে আছে স্টেশনটি।
এ এক অদ্ভুত জায়গা। কেক-বিস্কিট-নুন মাখানো আমড়া, বাদাম-চানাচুর-রঙচঙে ম্যাগাজিন নিয়ে বিচিত্র সুরে ফেরিওয়ালারা হাঁক দিচ্ছে। এই সন্ধ্যা রাতে গমগম করছে স্টেশনটি।
সামান্য একটি ভুলের জন্য আব্বু আমাকে দূরে পাঠিয়ে দিচ্ছেন। কি এমন করেছি আমি? দুষ্টু ঋতমটা এই বাজে বুদ্ধিটা বাতলে না দিলে তো আমি এসব জানতেও পারতাম না। স্টেশনের একপাশে দাঁড়িয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে ও। একটি ভুলের জন্য কত কী হয়ে গেল!
নীলোফার কেঁদে বুক ভাসিয়েছেন।
-এইটুকুন একটা ছেলে, ওকে তুমি পাঠিয়ে দিচ্ছ দাদির কাছে? ছোটবেলায় ছেলেরা কত কিছু করে, কত অন্যায় করে। শোনো মাত্র ন’বছর বয়স ওর, ক্লাস থ্রিতে পড়েÑওর বুদ্ধি আর কতটুকু আমিও টিচার। তুমি কিন্তু লঘু পাপে গুরুদন্ড দিচ্ছ। অন্যায় হয়েছে, ওকে বুঝতে দেয়ার সময় দাও।
অঝোর ধারায় চোখের পানি ঝরেছে নীলোফারের দু’গাল বেয়ে।
– চম্পু কি আমাকে ছেড়ে কোনদিনও থেকেছে? তোমার জেদটাই বড় হলো? এত কঠিন কি করে হলে তুমি? চাচু মলিন মুখে বলেছে, তুমি কিন্তু ভালো কাজ করছ না বড় ভাইয়া। ছোটরা কত কিছু করে, একটুতেই তুমি রিঅ্যাক্ট করছ কেন? আমি ওকে রেখে আসব আম্মার কাছে। শাস্তি কিন্তু আমারও কম হচ্ছে না ভাইয়া।
কেঁদে কেঁদে চোখ ফুলেছে চুমকির।
-কি এমন করেছে ভাই, আমি একা ঘরে কি করে থাকবো আব্বু? ওকে মাফ করে দাও না। এমন আর করবে না চম্পু।
নীলোফার চোখ-নাক মুছতে মুছতে বলেÑতুমি বছরে একবার রাগ করো, রোজ করো নাÑ তাইতো? এর চেয়ে রোজ রোজ রাগ করা ভালো, তাহলে এমন ডিসিশন তুমি নিতে পারতে না।
তুবড়ি চাচু গলা নামিয়ে বলে, ভাইয়া দুবার বাড়ি থেকে পালায়নি? আম্মা তো এখনও সেসব দুষ্টুমির কথা বলেন।
রহিমা খালা মুরগির গোশত রাঁধতে গিয়ে আদা-হলুদ মাখা আঁচল দিয়ে চোখ মোছে।
বলে পোলাপাইনে কত কিছু করে। চম্পু বাবা বুইড়া মানুষনি যে বুইঝা-মুইন্যা কাম করব? জাহিদ যে ডিসিশিন নিয়েছেন তাই ঠিক। অন্যায় করলে তার শাস্তি পেতেই হবে। ঢাকার নামি-দামি স্কুলে পড়ার যোগ্য তুমি নও। মা-বাবাকে ছেড়ে তোমাকে সিলেটে গিয়ে পড়াশোনা করতে হবে।
এক সময় চম্পকের বুক এফাঁড়-ওফোঁড় করে হুইসেল বেজে ওঠে। ট্রেনের ধাতব শিকল বেজে উঠে ঝনঝন করে। জাহিদ ক্রিকেট বলের মত শক্ত মুখ করে প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে হাত নাড়েন।
তুবড়ি চাচুর খুব মন খারাপ। চুপচাপ চম্পুর পিঠে হাত রেখে বসে আছে। ঝিকির ঝিক ঝিকির ঝিক আওয়াজে ট্রেন চলতে শুরু করে। অচেনা পথে যাত্রা চম্পকের। দু’চোখ ভেসে যায় ওর চোখের পানিতে।
পিঠে আদুরে হাত বুলিয়ে চাচু বলে, মন খারাপ করিস না রে, মনে কর পিকনিক করতে যাচ্ছিস। চড়–ইভাতি রে চড়–ইভাতিÑবুঝতে পারছিস? বড় ভাইয়ার রাগ পড়লে তোকে ঠিক ঢাকায় ফিরিয়ে নিয়ে যাবে।
-আমি আর ফিরব না চাচু, আব্বুর কাছে কক্ষনো ফিরব না। আমি একা একা থাকব, একদিন দ্যাখো আমি ঠিক হারিয়ে যাব। এমন করে বলে না-চাচুর আদরে ভালবাসায় দু’চোখ থেকে ঝরঝর করে পানি ঝরে। আসার সময় আম্মু চিকেন স্যান্ডুউইচ-নুডলস আর সন্দেশ দিয়েছেন, চম্পু কিছুই মুখে দিল না। মাথা গুঁজে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে। এক সময় ঘুমিয়ে পড়ে।
মা-বাবা-চুমকি আপু সবাই মিলে ছুটি ছাটায় কতবার সিলেটের তালতলার বাড়িতে গেছে। ভাই-বোন মিলে গান গাইতÑকী আনন্দ আকাশে-বাতাসে। দু’জনে মিলে ট্রেনের কামরায় কত ছুটোছুটি করেছে, খুনসুটি করেছে।
আজ চম্পুর ছোট্ট বুকে কোনো আনন্দ নেই। এই মুহূর্তে খুব বেশি করে মনে পড়ছে দাদীর কথা। চালের গুঁড়ো-নারকেল আর ক্ষীর দিয়ে কত মজাদার পিঠে করত দাদী। পিঠে খেয়ে খেয়ে ভাত খেতে ভুলে যেত। ট্রেনের ঝিকির ঝিকির আওয়াজের সুরে পুরনো ছবিগুলো মিছিলের মত ভেসে আসে।
সারা রাত ছেঁড়া ছেঁড়া আবছা স্বপ্ন দেখে কেটে যায়। ভোর বেলা তুবড়ি চাচু ডেকে তোলে,-ও চম্পু ওঠ ওঠ, উপবন সিলেট পৌঁছে গেছে। এবার নামতে হবে।
ঘুম ভাংগা চোখে বাইরের দিকে তাকায় চম্পক। রেলস্টেশনটি ভীষণ পরিচিত ওর। ছুটি হলেই আম্মু-আব্বুর সঙ্গে সিলেটে এসেছে। কিন্তু আজকের এই আসা একেবারেই অন্যরকম। বুকের ভেতরে ওর অনেক কষ্ট, চোখে অনেক পানি।
আঁধার এখনও ভালো করে কাটেনি। ভোরের আলো একটু একটু করে ফুটছে। নীলোফার বলতো, জানো চম্পু, এ সময়টাকে ঊষা বলে।
বুকের ভেতরটা করুণ কান্নায় মোচড় দিয়ে ওঠে।
তালতলার বাড়িতে আনন্দের হই চই। দাদীমা দারুণ খুশি। কিন্তু কই, চম্পুর তো একটুও আনন্দ হচ্ছে না।
হেমন্ত আসছে, একটু একটু করে ঠান্ডা পড়তে শুরু করেছে। বাড়ির সামনের সবুজ দূর্বাঘাসে, মানিপ্ল্যান্টের হলুদ-সবুজ পাতায়, স্থলপদ্ম ফুলে মুক্তোর মতো শিশিরবিন্দু। চম্পকের বুকের ভেতরের চিনচিনে কষ্ট, সূক্ষ্ম অপমানবোধ কিছুটা মিইয়ে আসে দাদীমার আদরে।
জুঁই ফুলের মতো ঝরঝরে কাটারিভোগ চালের ভাত, মাছের ফ্রাই, মুরগির কোরমা খুব এঞ্জয় করে খায় চম্পু। মুঠো মুঠো দুঃখগুলো কোথায় যেন পালিয়ে যায়, দাদীর হাতের ঘন দুধের সেমাই, ফিরনি আর হালুয়া খেতে খেতে।
দাদীমা হঠাৎ করে জিজ্ঞেস করে, তোরা আইছিস খুব ভালো হইছে। ঘরে একা একা লাগে। চম্পুর স্কুল ছুটি নাকি রে এখন? লেখাপড়ার ক্ষতি হইব না তো?
চাচু সহজ সুরে বলে, না না, ছুটি আর কোথায়? চম্পুটা স্কুলে দুষ্টুমি করেছে, বড় ভাইয়া রগচটা জানো তো আম্মা, তাই রাগ করে এখানে পাঠিয়েছে। শাস্তি আর কি?
দাদী রেগে আগুন হয়ে যান,
-কী আমার শাস্তি দেনেওয়ালা রে। পোলাপান দুষ্টুমি করবে, এজন্য রাগ কইরা একলা পাঠাইব? কস কি তুবড়ি? মা-বাপ ছাইড়া স্কুল বাদ দিয়ে এ কেমুন শাস্তি রে? আমার বড় পোলারে তো চিনি, রাগের ডিপো একটা, ঐ রাগখানই আছে, বেক্কল কোন খানকার। না বুইঝাই হকল কাম করে।
আব্বুকে বকছে দাদী, মুড়ির মোয়া খেতে খেতে হা হা হি হি করে হাসতে থাকে চম্পক।
বড়রা কি মনে করে? ওদেরকে বকুনি দেয়ার কেউ নেই? আছে আছে, বড়দের মাথার ওপর কেউ না কেউ থাকে।
সন্ধ্যে ঘনিয়ে এসেছে। ইলেকট্রিক বাতির দিকে তাকিয়ে চম্পুর দুচোখ পানিতে ভরে যায়। না হয় অংকে ও শূন্য পেয়েছে, ভয়ে না হয় শূন্যের বাঁয়ে এক বসিয়ে দিয়েছে-এটা কি সাংঘাতিক কোনো অপরাধ? মনে মনে চম্পু কত লজ্জা পেয়েছে সে খবর কি আব্বু রাখেন? সবার সামনে আব্বু ছেলেকে নিয়ে কমলাপুর রেলস্টেশনে এসেছেন, ওকে ‘উপবন’ ট্রেনে তুলে দিয়েছেন, এতে কত অপমান হয়েছে সে কথা আব্বু একবারও ভাবল না?
দাদী রাতের বেলা চম্পকের গায়ে মাথায় আদুরে হাত বুলিয়ে পোলাও-গোশত বেড়ে দেন। আদর করে খাওয়ান। বলেন, দাঁড়া তোর বাপের সাথে কথা কই। পরশু দিন- আমি তরে লইয়া ঢাকা যাইমু। পোলারে ক্যামনে দূরে পাঠায় এই কথা জিগামু। বেক্কলের বেক্কল-শয়তানি করছে দেইখা পোলারে ক্যামুন পাঠায়া দিল।
চারদিন হয়ে গেল আব্বু একবারও ফোন করেননি। আম্মু-চুমকি আপু কথা বলেছে। এখনও রেগে আছেন জাহিদ। আব্বুর রাগ আছে, ছোট বলে বুঝি চম্পুর রাগ নেই?
কী যেন ভেবে মুচকি হাসে, দাদী সঙ্গে গেলে ওর আর কোনো ভয় নেই।

প্রিয় তানভীর স্যার

ঢাকার ফ্ল্যাটে পা দিয়ে দাদী ঘোষণা দেন, চম্পককে কেউ বকতে পারবে না। অংক পরীক্ষায় সবাই খারাপ করে, অংককে সব ছাত্ররাই ভয় পায়। ক্যান, জাদু খারাপ করে নাই? ছোট পোলা পানরে এত শাসন কিসের? নীলোফার হা হা করে ওঠে।
-আম্মা, আপনার ছেলের কথা চম্পুর সামনে বলবেন না, ও আশকারা পেয়ে যাবে। ও জানে আব্বু খুব ভালো ছাত্র ছিলেন।
গরম চায়ের পেয়ালায় চুমুক দিয়ে পানের বাটা পাশে নিয়ে মনোয়ারা বেগম বলেন, হুনো বউমা, আমারে এত শিখায়ো না। জাদু ভালো ছাত্র ছিল না ছাই।
চম্পক যে নম্বর নিয়ে কারিকুরি করেছে তা তিনি জানেন না, জানলে হয়তো বলতেন, কী হইছে, হাজার লাখ তো করে নাই, দশ-ই করেছে।
দাদীর অদ্ভুত এক ম্যাজিকে আবার আগের জীবনের মাঝে ঢুকে গেল চম্পক।
এখানে ঝিঁ ঝিঁ পোকার জ¦লা- নেভা নেই, ফুল-পাখি তেমন নেই, মুঠো মুঠো সাদা মেঘ নেই, প্রজাপতি-ফড়িং নেই-আছে শুধু রুটিন মেনে চলার জীবন, হোমওয়ার্ক আর স্কুলের বৃত্তে ঢুকে যাওয়া।
পাঁচদিন স্কুলে যায়নি চম্পক, আম্মু চমৎকার এক অ্যাপ্লিকেশন লিখে দিলেন। এটি দিতে হয়, স্কুলের নিয়ম-কানুন খুব কড়া।
বাসায় খুব আনন্দ এখন। চুমকি ভাইকে ফিরে পেয়ে দারুণ লাফাচ্ছে। দাদী আসার পর আব্বু রাগ করা একদম ভুলে গেছেন। এক ফাঁকে চম্পককে ডেকে বলেন, খবরদার চম্পু ঋতম- সেই স্কাউন্ডেলটার সাথে একদম মিশবে না, কথা বলবে না। ফ্রেন্ডশিপ কাট অফ করবে। কখনো মিশবে না। ঋতমের সঙ্গে-প্রমিস করো।
আব্বুর মুখের দিকে বোকার মত তাকিয়ে থাকে চম্পক। জাহিদ বলেন, বোঝোনি? তাই না চম্পু? ঐ নটোরিয়াস বয় ঋতমের সঙ্গে একদম কথা বলবে না।
নাহ, কোনদিনও মিশবে না। ও বড্ড খারাপ, ভীষণ খারাপ। এমন এক বুদ্ধি বাতলে দিল, এরপর কত কান্ডই না হলো বাড়িতে। ও তো এসবের কিছুই জানে না।
ঋতম রোজই ওকে বলে, তুই সবার সঙ্গে কথা বলিস, আমার সঙ্গে কথা বলিস না কেন? কী করেছি আমি? এ্যাই জিসান-বল।
কী অদ্ভুত এক অবস্থা ওর, সামনাসামনি বন্ধুদের কি ওভাবে পাশ কাটানো যায়?
আব্বু আর আম্মুকে রেড সিগন্যালের মতো মনে হয়। এটা করো না, ওটা করো না, ও বাজে ছেলে, ওর সঙ্গে মেলামেশা করবে না, ও ভীষণ বখাটে। কিন্তু সব ব্যাপারে মুখোমুখি হতে হবে তো ওকেই। চম্পক বড্ড বিব্রতবোধ করে। কে বাজে আর কে ভালো ও কি করে বুঝবে?
তুবড়ি চাচু কিছুদিন আগেও যখন-তখন বকুনি দিত। বলত কিরে মি: পড়–য়া, সারাদিন মুখে বই গুঁজে রাখলে কি চলে? রেজাল্ট চাই রেজাল্ট। দাদী আসার পর চাচু আর ও ধরনের কথা বলে না। নীলোফার মাঝে মাঝে মন খারাপ করে বলে, আমি ভাবতে পারি না চম্পু আমাকে এসে এমন মিথ্যে কথা বলবে।
কথাগুলো কানে এলে বুকের ভেতরটা মেঘলা হয়ে যায় ওর। একটি ভুলের জন্য এত খেসারত দিতে হয় বুঝি! কেন এই তো সেদিন চাচু বলেছে, চম্পু এমন করেছে কেন জানো। তোমাদের ভয়ে। সাহস করে বলতে কি পারত-আম্মু, আমি জিরো পেয়েছি। কারণ ও জানে, তুমি ওকে সাহস দিয়ে বলতে না, ওকে চম্পু-তাতে কি হয়েছে? এখন থেকে রেগুলার অংক কষবে কিন্তু। তুমি কি ওকে আদর করে বলতে-ট্রাই ট্রাই ট্রাই অ্যাগেইন। ভাইয়া কি কখনও বলত,-একবার না পারিলে দেখ শতবার। বলতে না তো, তোমরা পরীক্ষায় ফুল মার্কস চাও, ও তাই করেছে। মন খারাপ করা সুরে নীলোফার বলে, তুমি কী যে বলো ছোটভাই। যতই বলো, ও তো মিথ্যে বলে আমাদের ঠকিয়েছে।
-সত্যি বলছি ভাবী, তুমি আর ভাইয়া সব সময় বলোÑসবাই পারে তুমি, পারো না কেন? তোমার ক্লাসমেটরা আশি, নব্বই, একশ পর্যন্ত পায়, তুমি ওদের ধারে কাছেও যেতে পারো না। ভাইয়াকে এজন্যই তো বাঘের মতো ভয় পায় চম্পু। ভাবী, ওর বন্ধুদের সঙ্গে তুমি যে ছেলের তুলনা করো, খুব খারাপ ওসব। কমপারিজন করা খুব খারাপ-সে তো তুমি জানো ভাবী।
আম্মু চাচুর কথার কোনো জবাব দিতে পারেনি। কিন্তু কথাগুলো শুনে বুকের ভেতর ওর অভিমানের পাহাড় গলে যেতে থাকে। সত্যি তুবড়ি চাচু দারুণ এক মানুষ। ইউনিভার্সিটিতে পড়া চাচু কি বন্ধু হতে পারে?
এই মুহূর্তে মনে হয়-চাচু বন্ধু হতে পারে, কারণ ওর মনের কথাগুলো তুবড়ি চাচু কী চমৎকার ভাবেই না বলল। হ্যাঁ-চাচু বেস্ট ফ্রেন্ড আমার।
মনে মনে বলে চম্পক।
সত্যি আব্বু-আম্মু সব সময় তুলনা করে। তোমার বন্ধু রুবাই পারে, অনন্য পারে-তুমি পারো না কেন?
লুকিয়ে লুকিয়ে কাঁদে চম্পক। বাথরুমে ঢুকে শাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে গোসল করতে করতে ফুঁপিয়ে কাঁদে সে। কুঁকড়ে যায়। চেনাজানা সবাই যেন মুখিয়ে আছে জিজ্ঞেস করার জন্য,-এ্যাই জিসান, তুমি নাকি বন্ধুদের সঙ্গে কম্পিটিশনে পেরে উঠছো না? অংকে নাকি খুব কম নম্বর পাচ্ছ। ব্যাড, ভেরি ব্যাড। এমন হলে কি চলে?
এটা কি কোনো ব্যাপার হলো? মোটেও নয়-এটি চম্পুর ভাবনা। সবাই যার যার কাজে ব্যস্ত। বড়রা তুলনা করে করে ওর মনটাকেই ওরা ছোট করে দিয়েছে-সে কথাটি কেউ খেয়াল করে দেখছে না।
আজকাল অবশ্য ও খুব আনন্দে আছে। দাদী রয়েছেন-এর চেয়ে মজার ঘটনা আর কিছু হতেই পারে না। আর একটি ব্যাপারও রয়েছে। ভালো করে অংক বুঝিয়ে দেবার জন্য একজন টিচার রেখেছেন আব্বু। মানুষটিকে ভীষণ পছন্দ চম্পকের। ভার্সিটির ছাত্র, তানভীর-তানভীর স্যার।
স্যার আসার সময় হলে ব্যালকনির গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে থাকে চম্পু। স্যার আসবেন তো আজকে?
নীলোফারকে বলে, আম্মু তুমি যে ড্রাই ফ্রুটস দিয়ে ছানার পুডিং করো, স্যারকে কিন্তু তাই দিয়ো, প্লিজ। তানভীর পড়াতে আসবেন-দারুণ খুশি চম্পক। এ এক অদ্ভুত ব্যাপার। স্যার আসছেন, একটুও ভয় নেই। আনন্দের ব্যাপার। তিনি আদর করেন চম্পুকে। মিষ্টি করে বুঝিয়ে দেন পড়া। এর আগে একজন এসে কিছুদিন পড়িয়েছেন, স্যার আসার আগে আগে চম্পক বলত, আম্মু আজ আমার পেট ব্যথা করছে, গায়ে হাত দিয়ে দ্যাখো, আমার জ¦র।
পড়তে বসলেও দুদন্ড চেয়ারে বসত না চম্পক। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সময় কাটানোই ছিল ওর কাজ।
– স্যার ওয়াশরুম থেকে আসি, স্যার, পানি খেতে যাই। বলপেনের কালি ফুরিয়ে গেছে স্যারÑএই চলত সারাক্ষণ।
আমাকে বলত, তাড়াতাড়ি চা-নাশতা দিয়ে দাও আম্মু। স্যার চলে যাক।
এবারে কিন্তু এরকম হয়নি। স্যারের খুব প্রিয় হয়ে উঠেছে চম্পক। একটুও বকুনি দেন না, কিছু ভুল করলে মিষ্টি করে হেসে বলেন, এবারেও মিসটেক করলে জিসান?
কী চমৎকার করে বার বার বুঝিয়ে দেন। কোনো ক্লান্তি নেই স্যারের; এতটুকু বিরক্তি নেই। বুঝিয়ে দেন কেন ভুল হলো।
তানভীর স্যার নরম সুরে বলেন, চুপচাপ বসে মাথা ঠান্ডা করে সংখ্যা লেখার কাজ হলো অংক। তুমি যদি ছটফট করো, রেস্টলেস হও জিসান-তাহলে কিন্তু আর যাই হোক, অংক হবে না। তুমি শুয়ে শুয়ে গান গাইতে পারবে, হেঁটে হেঁটে কবিতা আবৃত্তি করতে পারবে, কিন্তু অংক হলো এক ঠায় বসে করার কাজ। মগজ থেকে খেলা, দুষ্টুমি সব বের করে দিয়ে চুপচাপ বসে মনোযোগ দিয়ে ভেবে ভেবে অংক কষতে হয়।
তানভীর স্যারের এ কথাটি দারুণ প্রভাব ফেলেছে দুষ্টু আর মিষ্টি চম্পকের ওপর। চেয়ারে ঠায় বসে অংক বই খাতা নিয়ে কার্টুন ফিল্ম, ভিডিও গেম, ক্রিকেট খেলা সব কিছু ভুলে গিয়ে চম্পু  অংক কষে। এখন ভুল হয় ওর অনেক কম। পড়াশুনায় ও বেশ ইমপ্রুভ করেছে, বিশেষ করে অংকে।
কী চমৎকার গল্প বলেন তানভীর স্যার!
– জানো জিসান, কোনো এক দেশের রাজপুত্রের নাম ছিল টলেমি।
– দারুণ নাম স্যার, এ নাম তো কখনো শুনিনি। আনকমন নাম।
– হ্যাঁ তাই, আনকমন। আর কারো শুনিনি। গল্পটা মন দিয়ে শোনো জিসান।
– হ্যাঁ স্যার শুনছি, বলুন, আচ্ছা স্যার। এটা কি মিকি মাউস, আলাদীন, কমিকসের গল্পÑঐ ধরনের কিছু?
-না না। এটা শিক্ষামূলক গল্প, মন দিয়ে শোনো।
-রাজপুত্র বোঝো তো ‘কিংসগ্রান’ মানে প্রিন্স, রাজার ছেলে, ওদের সব শিক্ষায় শিক্ষিত হতে হয়। অস্ত্রবিদ্যা যুদ্ধের কলাকৌশল সব শিখতে হয়। শিখতে হয় অনেক কিছু, নাহলে রাজ্য চালাবে কি করে?
– হোয়াট নেকসট স্যার?
– রাজপুত্র টলেমির সব কিছুতে উৎসাহ কিন্তু পড়াশোনা ওর ভালো লাগে না। পড়ালেখাতে ওর কোনো উৎসাহ নেই। রাজার ছেলে, ভালো করে পড়াশোনা না করলে ও রাজ্য চালাবে কি করে? লেখাপড়া তাকে করতেই হবে। এসব ভেবে টলেমি গুরুকে জিজ্ঞেস করে-
– গুরু কি স্যার?
-টিচার, এই যেমন আমি তোমাকে পড়াই। টিচারকে জিজ্ঞাস করলÑজানো! গুরুজি, পড়াশোনা করার কি সহজ উপায় আছে? সহজ উপায় মানে ইজি ওয়ে।
চম্পক কৌতূহলে ফেটে পড়ে।
– পড়ালেখার কোনো সহজ উপায় আছে স্যার? ইসস্ কী ফ্যানটাসটিক ব্যাপার?
তানভীর স্যার হাসতে থাকেন।
– মাস্টার জিসান, খুশিতে ফেটে পড়ার কিছু নেই।
মন খারাপ করা সুরে চম্পু বলে, টিচার টলেমিকে কোনো সহজ উপায় বলে দিলেন না?
মিটিমিটি হেসে স্যার বলেন, গুরুজি জবাব দেন, নো প্রিন্স, সব কিছুর সহজ পথ আছে কিন্তু বিদ্যা অর্জনের কোনো সহজ উপায় নেই।
তাইতো, মাথা নাড়ায় চম্পক। সত্যিই, স্যার ছোট্ট ছোট্ট গল্প বলে তার খুদে ছাত্রের মন কেড়ে নিয়েছেন।
চম্পকের তাই এখন সবচেয়ে প্রিয় মানুষ-তানভীর স্যার।

প্রিয় গল্পের দিন

ক’দিন থেকে দাদী বলছেন সিলেট চলে যাবেন।
-নেও বাপ-পুতেরে মিলায়া দিছি, এখন আমার ছুটি। বেশ কিছুদিন হয়ে গেছে ঢাকায় এসেছেন। তালতলার বাড়িটা একেবারেই ফাঁকা। বাড়িটি দেখাশোনার জন্য করিম মিয়াকে রেখে এসেছেন দাদী। সে তো শুধুই ঘুমোবে।
দাদী বলেন, আইলসা কুনখানকার।
মোনোয়ারা বেগম মজার মজার কথা বলে চুমকি-চম্পুকে  মাতিয়ে রাখেন। তিনিও নাতি-নাতনীর সঙ্গ উপভোগ করছেন দারুণভাবে। তবে বাড়িতে যাবার জন্য কিছুটা পাগল হয়েছেন দাদী এটি সত্যি, সেই যে হেমন্তের এক সকালে ঢাকা এসেছিলেন-সে তো বেশ কিছুদিন হয়ে গেল।
ভাইবোন দু’জন শাসায়,- খবরদার দাদী, বাড়ি যাবার কথা তুমি কখনো বলবে না। এখানে আমাদের কাছে তুমি থাকবে।
দাদীও কম যান না। মনের আনন্দে চালের গুঁড়োর মালপো ভাজেন, পাটিসাপটাÑফিরনি তৈরি করেন। খিচুড়ি-ডিম-ভুনা রাঁধেন আর বিরক্তিতে গজ গজ করেন।
না না বউমা, এইবার বাড়ি যামু। এ্যাই তুবড়ি, ট্রেনের টিকেট কাইট্যা আমারে সিলহট পৌঁছায়া দে। কই রে জাদু, আমার যাইবার কথা হুনলেই তরা কিছু কস না। বোবায় ধরে নাকি তোগোরে? দুই মাস বাড়ি ফালায়ি আইছি। জাদু মানে চম্পুর আব্বু।
হা হা করে জাহিদ হাসতে থাকেন। যা ওর স্বভাবে নেই। -আম্মা, তুমি চলে গেলে মজার খাবার রেঁধে কে আমাদের খেতে দেবে?
-ক্যান, বউমা আছে, রহিমা আছে।
জাহিদ ভেজা ভেজা স্বরে বলেন, অফিসে গেলে মনে হয় কখন বাড়ি ফিরব। জানি তো আম্মা তুমি টেবিল ভরে কত পদ রেঁধে সাজিয়ে বসে আছ। দ্যাখো না, আজকাল আমি অফিস থেকে তাড়াতাড়ি চলে আসি-তাই না নীলো।
-হ্যাঁ আম্মা, আপনার ছেলে ঠিক বলেছেন।
চুমকি বলে, রোজ বিকেলে নতুন নতুন নাশতা-ওয়াও কি বলিস চম্পু? তুমি না থাকলে কে আমাদের আদর করে খেতে দেবে?
-হ্যাঁ হ্যাঁ আপু ইয়ামী ইয়ামী। দাদী জানো তো রোজ রোজ শুধু পাউরুটি-ডিম-বাটার-মেয়োনিজ খাই। তাই না রে আপু? তুমি এসেছ বলেই না কত পিঠে-ফিরনি-হালুয়া খেতে পাচ্ছি। তুমি খুন্তি দিয়ে কী প্যাঁচ কষো গো দাদী-সব কিছু মজাদার হয়ে যায়।
তুবড়ি হা হা করে হাসতে হাসতে বলে, দাদী আসায় চড়-থাপ্পড় আর বকুনি যে খাস না, তাও বল।
হাসির রোল ওঠে ডাইনিং স্পেসে।
জাহিদ বলেন, চম্পু যদি তোমাকে যেতে দেয়, তুমি চলে যেও আম্মা, আমি বাধা দেব না।
তালতলার বাড়িটি খালি পড়ে আছে। করিম মিয়া যা উড়নচন্ডী আর আলসে, ও কি আর বাড়িটি ভালো করে দেখা শোনা করবে?
চম্পক শুনতে পায়, সারা বাড়ি জুড়ে বাজছে ‘দাদী চলে যাবে, দাদী চলে

SHARE

Leave a Reply