Home প্রবন্ধ আমাদের ঈদ উৎসব -ড. এম এ সবুর

আমাদের ঈদ উৎসব -ড. এম এ সবুর

সুপ্রিয় বন্ধুরা, সবাইকে ঈদের শুভেচ্ছা! নিশ্চয়ই ভালো আছো তোমরা। আর ঈদের আনন্দে সবারই ভালো থাকার কথা। কারণ সবাইকে হাসি-খুশি ও আনন্দ দেয়ার জন্যই ঈদ আসে। ঈদের আনন্দের দরজা সবার জন্যই খোলা থাকে। ছোট-বড়, ধনী-দরিদ্র সবাই ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে পারে। তাই সারা বিশ্বের সব দেশের ও সব পেশার মুসলমানই ঈদে আনন্দ উৎসব করে। ঈদ বিশ্বমুসলিমের জাতীয় উৎসব হলেও এতে স্থানীয় সংস্কৃতিও যোগ হতে পারে। ঈদের উৎসবে স্থানীয় সংস্কৃতিরও গুরুত্ব আছে। তার মানে, ঈদের জামাত-নামাজ এক রকম হলেও খাওয়া-দাওয়া, রীতি-নীতি, উৎসব বিভিন্ন রকম হতে পারে। তাই দেখা যায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশ-জাতির লোকেরা নিজ নিজ সংস্কৃতিতে ঈদ উদযাপন করে। যেমন, আমাদের দেশের লোকজন সকালে সেমাই-পায়েস ও অন্যান্য মিষ্টান্ন জাতীয় খাবার খেয়ে ঈদগাহে নামাজ পড়েন। আর বিকেলে বা রাতে গোশত-খিচুড়ি, পোলাও-কোরমা ইত্যাদি মুখরোচক খাবার খেয়ে থাকেন। ঈদের দিন সাধারণত বাঙালি পুরুষ ও ছেলেরা পায়জামা-পাঞ্জাবি এবং নারীরা শাড়ি, সালোয়ার-কামিস পরেন। আর শিশুরা নতুন জামা-কাপড় পরে বড়দের সাথে ঈদগাহে যায় এবং ঈদের সেলামি নিয়ে বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজনদের সাথে আনন্দ-উল্লাস করে। অর্থাৎ বাংলাদেশে ঈদ উদযাপিত হয় বাঙালি সংস্কৃতিতে। এমনিভাবে সৌদি আরব, মালয়েশিয়া, ইউরোপ, আমেরিকা, আফ্রিকাসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশের মুসলমানরা ঈদ উদযাপন করেন তাদের নিজস্ব সংস্কৃতিতে। তবে উৎসবের সংস্কৃতি বা নিয়ম-নীতি ভিন্ন হলেও ঈদের উদ্দেশ্য ও আনন্দ অভিন্ন থাকে।
ঈদে আমাদের দেশে বেশ কিছু দিন ছুটি পাওয়া যায়। এ সময় দূরের আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ এবং গল্প করার সুযোগ হয়। এতে অনেক আনন্দ ও মজা পাওয়া যায়। তবে অনেকে ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলার পরিবর্তে মোবাইল-কম্পিউটারে গেম খেলে, ইন্টারনেটের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং রেডিও-টেলিভিশনের বিভিন্ন বিনোদনমূলক কর্মসূচি দেখে-শুনে ঈদের দিন কাটায়! অধিকন্তু শহরাঞ্চলের অনেক ঈদ উৎসবে পশ্চিমা ধাঁচের জমকালো অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এতে ঈদের প্রকৃত উদ্দেশ্য ও আনন্দ লোপ পায়। অথচ আগের দিনের ঈদ উৎসব হতো নির্মল ও আনন্দময়। তখন ঈদের দিনে বড়রা হা-ডু-ডু, ফুটবল, কুস্তি খেলা, সাঁতার কাটা, নৌকা বাইচ ইত্যাদি খেলার আয়োজন করতেন। এছাড়া তারা গান-গল্পের আসর বসিয়েও অনেক আনন্দ-উল্লাস করতেন। শিশুরা গোল্লাছুট, দাঁড়িয়াবান্ধা, ফুটবল, ঘুড়ি উড়ানো ইত্যদি খেলায় মেতে উঠতো। মা-দাদীরা মজাদার সব রান্নাবান্না ও অতিথি আপ্যায়নে ব্যস্ত থাকতেন। আর অবসরে তারা হাসি-আড্ডা, গল্প করে বেশ মজা করতেন। এভাবে ঈদের সারা দিন আনন্দ-উল্লাসে কাটতো।
ঈদের আনন্দ সব পেশা ও সব বয়সীদের জন্য হলেও শিশু-কিশোরদের পরিমাণ একটু বেশি। ঈদ নিয়ে তারা অনেক আগে থেকেই পরিকল্পনা করে। ঈদের পোশাক কেমন হবে? কোন জামা পরে ঈদের নামাজ পড়বে? কোন জামা পরে ঘুরতে যাবে? জুতা কী ডিজাইনের হবে? কোথায় ঘুরতে যাবে? কাকে কী উপহার দিবে? কোন ফ্রেন্ডকে কী ধরনের ঈদকার্ড দিবে? কার নিকট থেকে কত সেলামি নিবে ইত্যাদি ভাবনা তাদের মনে বাসা বাঁধে! আর সবার আগে ঈদের চাঁদ দেখা, সবার আগে ঘুম থেকে জাগা, সবার আগে ঈদের মাঠে যাওয়া ইত্যাদি বিষয়ে তাদের প্রীতিপূর্ণ প্রতিযোগিতা চলে। এ ছাড়া বিভিন্ন ধরনের খেলাধুলা, দলবেঁধে ঘোরাফেরা-আড্ডায় তারা আনন্দ-উল্লাসে মেতে ওঠে। এমনিভাবে ঈদের উৎসব-আনন্দকে তারা দারুণভাবে উপভোগ করে।
প্রিয় বন্ধুরা! ঈদের যে এতো আনন্দ-মজা! কিভাবে ঈদ এলো জানতে ইচ্ছে করে না? তাহলে শোন, ঈদ মানেই খুশি-আনন্দ। ঈদ আসে ধনী-গরিব, ছোট-বড় সবাইকে আনন্দ দিতে। ‘ঈদ’ উৎসবের সূচনা হয়েছে হিজরি দ্বিতীয় সন অর্থাৎ ৬২৩ খ্রিস্টাব্দ থেকে। মানে, মহানবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মক্কা থেকে মদিনায় আগমনের দ্বিতীয় বছরে অর্থাৎ এখন থেকে প্রায় ১৪০০ বছর আগে। মহানবী (সা) মদিনায় এসে রাষ্ট্র গঠনের পর মুসলমানদের জন্য আনন্দ উৎসবের কথা চিন্তা করলেন। পরে মহান আল্লাহর নির্দেশে তিনি মুসলমানদের নির্মল আনন্দ উৎসব করতে বছরে দু’টি ঈদ চালু করেন। একটি ‘ঈদুল ফিতর’ বা রোজার ঈদ অন্যটি ‘ঈদুল আজহা’ বা কুরবানির ঈদ। রমজান মাসের দীর্ঘ এক মাস রোজার পর শাওয়াল মাসের পয়লা তারিখে ঈদুল ফিতর উদযাপন করা হয় এবং জিলহজ মাসের দশ তারিখে ঈদুল আজহা পালন করা হয়। এভাবেই মুসলিম সমাজে ঈদ উৎসবের প্রচলন হয়। আর ইসলামের বিস্তৃতির সাথে সাথে ঈদ উৎসবের পরিধিও বেড়ে যায়।
ঈদের আনন্দ-উল্লাস শুধু একার জন্য নয়। বরং সবাইকে নিয়ে ঈদের আনন্দ-উৎসব করতে হয়। ঈদে বন্ধু, প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজনকে সাধ্যমত উপহার দিতে হয়। কারো মনে দুঃখ-কষ্ট থাকলে তার দুঃখ দূর করে তাকে খুশি করতে হয়। কেউ মনে দুঃখ দিলে ঈদের দিনে তা ভুলে যেতে হয়। কাউকে কখনও দুঃখ-কষ্ট না দেয়ার প্রমিজ করতে হয়। কারো সাথে ঝগড়া-বিবাদ থাকলে তা মিটিয়ে ফেলতে হয়। গরিব বলে কাউকে অবহেলা-অবজ্ঞা নয়। বরং গরিব-দুঃখীদেরও ঈদের আনন্দে অংশীদার করতে হয়। তাদেরকে প্রয়োজনীয় পোশাক-খাবার উপহার দিতে হয়। যাতে তারা খুশি হয় এবং আনন্দ পায়।
ঈদে শুধু আনন্দ-উল্লাসই নয়। বরং এতে মহান আল্লাহর ইবাদাত পালনও হয়। ঈদে আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী, বন্ধু-বান্ধবের সাথে দেখা-সাক্ষাতে একদিকে অনেক আনন্দ পাওয়া যায়, অন্য দিকে অনেক সাওয়াব লাভ হয়। ঈদের বিশাল জামাতের নামাজ আদায়ে যেমন আনন্দ পাওয়া যায় তেমন মহান আল্লাহর সন্তুষ্টিও অর্জিত হয়। এমনিভাবে ঈদের দিনে মিষ্টান্ন দ্রব্য এবং উন্নত মানের খাবার খাওয়াতে একদিকে মজা পাওয়া যায় অন্যদিকে সুন্নাত আদায় হয়। তাই ঈদে এক ঢিলে দুই পাখি মারা যায়! অর্থাৎ আনন্দের সাথে পুণ্যও লাভ হয়। তবে এ জন্য গর্ব-অহঙ্কার ও হিংসা-বিদ্বেষ পরিহার করতে হয়।
প্রকৃতপক্ষে ঈদ প্রতি বছরই আনন্দ ও খুশির বার্তা নিয়ে আসে। বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন ভাষা-বর্ণের সব বয়সের লোকজন ঈদের আনন্দ উৎসব করে। এ দিনে ধনী-গরিব, রাজা-প্রজা সব মুসলমানই সমবেত হন ঈদের ময়দানে। হাতে হাত, বুকে বুক রেখে পরস্পর কোলাকুলি করে পরম মমতা নিয়ে। পুরনো দিনের হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে তারা পরস্পরে আবদ্ধ হন ভালোবাসার বন্ধনে। এতে মুসলিম সমাজের ঐক্য, সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্ববোধের আসল চিত্র ফুটে ওঠে। হ

SHARE

Leave a Reply