Home গল্প রম্যগল্প তিন ভাই ও আগুনে পরী -মৃত্যুঞ্জয় রায়

তিন ভাই ও আগুনে পরী -মৃত্যুঞ্জয় রায়

অনেক দিন আগের কথা।
আরবে এক লোকের ছিল তিন ছেলে। একদিন সে তার তিন ছেলেকে ডেকে জিজ্ঞেস করল, তারা ভবিষ্যতে কে কী হতে চায়? তাদের প্রত্যেকেরই এমন কিছু হওয়া উচিত যাতে বিশ্ব ঘুরে তারা ভালো উপার্জন করতে পারে। এ কথা শুনে লোকটির বড় ছেলে আব্দুল প্রথমে বলল, ‘আব্বা, আমি একজন ভালো শিকারি হতে চাই। লোকটি বড় ছেলের কথায় সায় দিয়ে বলল, ‘ঠিক আছে। আমি তোমাকে এ দেশের সেরা শিকারির কাছে তালিম নেয়ার জন্য পাঠাব যাতে তুমি তার কাছে থেকে ভালোভাবে তীর-ধনুক চালানো শিখতে পার।’ এবার লোকটি দ্বিতীয় ছেলেকে জিজ্ঞেস করল, ‘বাবা আহমেদ, তুমি কী হতে চাও?’
আহমেদ বলল, ‘আব্বা, আমি জ্যোতির্বিদ হতে চাই। আকাশের গুপ্ত রহস্য বের করা আমার অনেক দিনের ইচ্ছে।’ লোকটি দ্বিতীয় ছেলের কথা শুনে দেশের একজন বিখ্যাত নক্ষত্রবিদের কাছে পাঠিয়ে দিল।
এবার এলো ছোট ছেলের পালা। লোকটি তার তৃতীয় ছেলেকে জিজ্ঞেস করল, ‘মাহমুদ, তুমি কী হতে চাও?’ ‘ছুতার। কাঠমিস্ত্রি হতে চাই আমি।’ ছোট ছেলে জবাব দিল। ছোট ছেলের কথা শুনে লোকটি খুব বিরক্ত হলো, ‘কি! আমার ছেলে হয়ে তুমি একজন সাধারণ কাঠমিস্ত্রি হতে চাও? তুমি কি শেষে আমার সব মানসম্মান ডোবাতে চাও?’ কিন্তু মাহমুদ তার সিদ্ধান্তে অনড়। শেষে লোকটি মাহমুদের ইচ্ছেতেই সম্মতি দিল এবং একজন কাঠমিস্ত্রির কাছে কাজ শেখার জন্য পাঠিয়ে দিল।
এরপর তিনটি বছর কেটে গেল। ছেলেরা যে যার পেশায় শিক্ষা লাভ করে বাড়ি ফিরে এলো। বড় ছেলে আব্দুল সত্যি সত্যিই একজন নিপুণ শিকারি হয়ে উঠল। দূর থেকে সে অনায়াসে মরুভূমির বালিতে জন্মানো কোন একটা খেজুর গাছের একদানা খেজুরকেও তাক করে তীর দিয়ে গেঁথে ফেলতে পারে। মেজো ছেলে দুরবিন চোখে লাগিয়ে অনায়াসে আকাশের সব নক্ষত্রের অবস্থা, অবস্থান আর সংকেত বুঝতে পারে। তার এই দক্ষতার কথা শুনে স্বয়ং বাদশাহ তাকে রাজসভার জ্যোতির্বিদ পদে চাকরির প্রস্তাব দিল। আর ছোট ছেলে মাহমুদ সম্পর্কে তার ওস্তাদ বলল, ‘মাহমুদ একজন সেরা কাঠমিস্ত্রি হয়েছে। এতো ভালো যে, ও রকম কাঠমিস্ত্রি আর কখনো আমার চোখে পড়েনি। বলা যায় সে-ই এখন দেশের সেরা কাঠমিস্ত্রি।’
কিন্তু তিন ভাইয়ের কেউই তাদের জন্মভূমি বা নিজ শহরে থাকতে চাইল না। মরার আগ পর্যন্ত তারা দুনিয়াটা ঘুরে দেখতে চায়। দুনিয়া ঘুরে ঘুরে তারা প্রচুর আয় করতে চায়। সুতরাং তারা তাদের পিতার কাছে গেল এবং প্রত্যেকে তার কাছে এক থলি মুদ্রা চাইল যাতে উপার্জন না করা পর্যন্ত তাদের চলতে কোনো অসুবিধা না হয়।
লোকটি ছেলেদের তিন থলি মুদ্রা দিয়ে বলল, ‘বেশ। এই নাও টাকা। ঠিক এক বছর পরে তোমরা ফিরে আসবে। ভাল থেকো সবাই।’ পিতা দোয়া করে বিদায় দিল ওদের।
তিন ভাই পোশাক পরে ঘোড়ায় চেপে বেরিয়ে পড়ল যে যার ভাগ্যের সন্ধানে। সারাদিন চলার পর তিন ভাই রাতে এক জায়গায় তাঁবু ফেলল। তাঁবুর পাশে তারা আগুন জ্বালালো। বড় ভাই আব্দুল তার দুরবিন চোখে লাগিয়ে আকাশের তারা দেখতে লাগল। হঠাৎ একটা তারা দেখে আব্দুল চিৎকার করে উঠল, ‘ভাইয়েরা। আমি আমাদের মাথার উপরে একটা অন্য রকম তারা দেখতে পাচ্ছি। অদ্ভুত আর উজ্জ্বল, মনে হচ্ছে আমাদের সামনে কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে।’
বলতে না বলতেই তারা হঠাৎ অদ্ভুত একটা আওয়াজ পেল। একটা আগুনের দলা এসে সামনে পড়ল দুম করে। সেই আগুনের ভেতর থেকে ধীরে ধীরে হেঁটে বেরিয়ে এলো এক পরী। মাথা থেকে পা পর্যন্ত তার আগুনের পোশাক পরা। পরী ওদের কাছে এসে বলল, ‘হে ভাল মানুষেরা। তোমরা কি আমাকে একটু সাহায্য করতে পার?’
‘কী সাহায্য করতে পারি?’
‘আমার বোনকে আমি হারিয়ে ফেলেছি। এক শয়তান ওকে ধরে নিয়ে বন্দী করে রেখেছে। একটা টাওয়ারের ওপর তাকে আটকে রেখেছে। আমার এমন কোন শক্তি নেই যা দিয়ে ওখানে যেতে পারি। ওই শয়তানের হাত থেকে তোমরা যদি আমার বোনকে উদ্ধার করে দিতে পার, আমি কথা দিচ্ছি তোমাদের অবশ্যই পুরস্কৃত করব।’
পরীর কথায় তিন ভাই সম্মতি দিল, কিন্তু কি করে উদ্ধার করবে পরীর বোনকে? পরী বলতে লাগল, ‘কাল সকালেই তোমরা এখান থেকে ঘোড়ায় চড়ে ঠিক দক্ষিণ দিকে রওনা হবে। মনে রাখবে, ঠিক দক্ষিণ দিকে ঘোড়া ছুটিয়ে সূর্যাস্তের সময় যেখানে তোমরা পৌঁছবে, দেখবে একটা টাওয়ার। অনেক উঁচু। ওই টাওয়ারের উপরেই আমার বোনকে আটকে রেখেছে। আব্দুল, আমার বিশ্বাস তুমিই পারবে আমার বোনকে মুক্ত করতে।’
‘কিন্তু কী করে?’
‘তুমি দেশের সেরা শিকারি। আমি জানি, তোমার তীরের নিশানা খুব নির্ভুল। তুমি নিচ থেকে শয়তানটার দিকে তীর ছুড়বে। তীরে বিদ্ধ হয়েই সে মারা যাবে আর আমার বোনও মুক্ত হবে।’
‘তুমি নিশ্চিত যে এতে তোমার বোন মুক্ত হবে?’ আব্দুল পরীকে জিজ্ঞেস করল। ‘জি। তোমার তীরের মাথায় আমি জাদুর মলম লাগিয়ে দেবো। বিষমাখা সেই জাদুর তীর বিদ্ধ করলেই সে তক্ষুনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়বে। সাথে সাথে টাওয়ারে উঠে তুমি আমার বোনকে মুক্ত করে নিয়ে আসবে। দেখবে, ঠিক তখনি আমি আবার তোমার সামনে হাজির হয়ে যাবো।’ একথা বলেই পরী অদৃশ্য হয়ে গেল।
তাঁবুতে ঘুমিয়ে কেটে গেল রাতটা। ভোর হতেই তিন ভাই জেগে উঠল। ঘোড়ার পিঠে জিন কষে চাবুক হাঁকিয়ে তিন ভাই ছুটে চলল সোজা দক্ষিণ দিকে। বন-জঙ্গল, নদী, মাঠ পেরিয়ে সারাদিন পর তারা এসে হাজির হলো একটা মরুভূমিতে। দিনের সূর্য তখন ডুবতে চলেছে। এমন সময় তারা দেখতে পেল মরুভূমির ঠিক মাঝখানে একটা লম্বা মস্তবড় সাদা টাওয়ার দাঁড়িয়ে রয়েছে। চারদিকে সব নীরব নিথর। শুধু ঘোড়ার খুরের ঠক্ ঠক্ আওয়াজ কানে আসে। তিন ভাই ঘোড়া থামিয়ে মরুভূমিতে দাঁড়িয়ে পড়ল। তারপর ঘোড়া থেকে নেমে তাঁবু ফেলার সিদ্ধান্ত নিল। টাওয়ার থেকে একটু দূরেই ওরা তাঁবু খাটালো।
সন্ধ্যে হলো। তারপর আকাশে কাসার থালার মত চাঁদ উঠল। চাঁদের আলোয় মরুভূমির বুক ফর্সা হয়ে উঠল। সাদা টাওয়ারটাও ঝলমল করে উঠল। মেজো ভাই এবার তার দুরবিনটা চোখে লাগালো। দুরবিন দিয়ে টাওয়ার লক্ষ্য করে পরীর বোনকে খুঁজতে লাগল। হঠাৎ টাওয়ারের ছাদে একটি মেয়েকে দেখতে পেল সে। ধবধবে রূপালি পোশাক পরা। ছাদের ওপর পায়চারি করছে সে। মনে হলো, ওই-ই তো পরীর বোন। হাঁটতে হাঁটতে কোথায় যেন চলে গেল সে। কিন্তু কিছুক্ষণ পরই তাকে আবার টাওয়ারের সবচেয়ে উপর তলার জানালায় দেখা গেল। পরীর বোনকে দেখতে পেয়ে তিন ভাই একসাথে চিৎকার করে বলে উঠল, ‘অপেক্ষা কর পরীভগ্নি, আমরা আসছি তোমাকে উদ্ধার করতে।’
কিন্তু পরীর বোন সে কথা শুনতেই পেল না। কিন্তু সে না শুনলে কি হবে? বুড়ি ডাইনিটা ঠিকই শুনতে পেল। তিন ভাইয়ের চিৎকার শুনে ডাইনিটা জানালায় এসে দাঁড়াল এবং দ্রুত পরীর বোনকে একটি খামের সাথে বেঁধে ফেলল। ডাইনিটা এরপর গর্জে উঠল, ‘কী! কী চাস তোরা? পরীর বোনকে নিয়ে যাবি? হা হা হা হাস্স্ ।’ বিশ্রী করে হাসল আর বিকট আওয়াজ করে বলতে লাগল, ‘হাউ মাউ খাউ, মানুষের গন্ধ পাউ- তোদের আমি কাবাব বানাব। আগুনে সেঁকে কাবাব করে খাব তোদের। দাঁড়া, আসছি তোদের ধরতে।’
কিন্তু ওই তর্জন গর্জনই সার হলো। ডাইনির কথা শেষ হতে না হতেই আব্দুল নিখুঁত নিশানা করে তার ধনুক থেকে তীরটা ছুড়ল ডাইনির দিকে। তীরটা সড়াৎ করে ধনুক থেকে বেরিয়ে তক্ষুনি গিয়ে বিঁধল ডাইনির বুকে। কাতরাতে কাতরাতে ডাইনিটা ধপাস করে উঁচু টাওয়ার থেকে মাটিতে পড়ে গেল। আর কি আশ্চর্য কান্ড। ডাইনির দেহটা মাটিতে লুটিয়ে পড়তেই সাথে সাথেই তা ধুলো হয়ে গেল এবং মরুভূমির বাতাস সেই ধুলোকে কোথায় যে উড়িয়ে নিয়ে গেল! ওরা ডাইনির কোন চিহ্নই আর খুঁজে পেল না।
মেজো ভাই মাহমুদ এবার আব্দুলকে জিজ্ঞেস করল, ‘ডাইনি তো মরল। কিন্তু এখন পরীর বোনকে কিভাবে উদ্ধার করব আমরা?’ তিন ভাই এ নিয়ে যখন আলোচনা করছিল তখন হঠাৎ তারা দেখতে পেল টাওয়ারের জানালা দিয়ে সেই সুন্দর মেয়েটা ওদের দিকে ডানা ঝাঁপটাতে ঝাঁপটাতে উড়ে আসছে। অবশেষে সে ওদের সামনে এসে দাঁড়াল। বলল, ‘ধন্যবাদ ভালো মানুষেরা। আমাকে রক্ষা করার জন্য তোমাদের অনেক ধন্যবাদ। কিন্তু বলো তো, কি করে তোমরা জানলে যে আমি এখানে বন্দী আছি?’
‘তোমার বোন, এক আগুনে পরী। সে কাল রাতে আমাদের কাছে এসেছিল।’ আব্দুল বলল, ‘এবং সে-ই বলেছিল, তোমাকে যদি মুক্ত করতে পারি তাহলে সে আবার আমাদের সামনে আসবে।’ এ কথা বলতে না বলতে জ্যোৎস্নালোকিত রাতের মধ্যে হঠাৎ উদয় হলো আগুনে পরী। বোনকে দেখতে পেয়ে দু’বোন একে অপরকে জড়িয়ে ধরে আনন্দে কাঁদতে লাগল। এ দৃশ্য দেখে ওরা তিন ভাইও খুব খুশি হলো।
এরপর আগুনে পরী ওদের কাছে এসে বলল, ‘ভালো মানুষেরা। তোমরা আমাদের অনেক উপকার করলে। আমি অবশ্যই তোমাদের এ কাজের জন্য পুরস্কার দেবো। এখন মন দিয়ে শোন। আমি যা বলব তা করতে পারলে তোমরা দুনিয়ার সেরা ধনীদের একজন হবে। আব্দুল, তুমি টাওয়ারটার কাছে গিয়ে গোড়ার মাটি খুঁড়বে। যতক্ষণ না একটা দরোজার দেখা পাও, মাটি খুঁড়তেই থাকবে। দরোজা পেলে সে দরোজায় টিং টিং টক বলে তিন টোকা দেবে। দেখবে, দরোজা খুলে যাবে। ওটাই টাওয়ারে ওঠার গুপ্ত দরোজা। দরোজা খুললে পাবে সিঁড়ি। সিঁড়ি দিয়ে সোজা উপরে উঠে যাবে। উপরে উঠলে পাবে একটা ভান্ডার ঘর। ভান্ডার ঘর পাহারা দিচ্ছে দুই দেওসাপ। টিং টিং টক বললেই দেখবে ওরা সেই ভান্ডার ঘরের দরোজা খুলে দিচ্ছে। দরোজা খুলবে, আবার একটা নির্দিষ্ট সময় পর আপনা আপনি বন্ধ হয়ে যাবে। তাই ওটুকু সময়ের মধ্যেই ভান্ডার ঘরে ঢুকে তোমাদের সব কাজ সারতে হবে।’
‘কী আছে ভান্ডার ঘরে?’ মাহমুদ জিজ্ঞেস করল আগুনে পরীকে।
‘ডাইনি তার সারা জীবনের সব ধনরতœ ওই ভান্ডার ঘরে লুকিয়ে রেখেছিল। ঘরে ঢুকেই যে সিন্দুকটা প্রথমে চোখে পড়বে সেটাই খুলে ফেলবে। তার ভেতরের ধনরতœ যা পারো তিনজনে নিয়ে নেবে। খবরদার, বেশি লোভ করবে না। শান্তি আর আশীর্বাদ তোমাদের সঙ্গী হোক। আর যদি কখনো তোমরা আমাদের এই সংকেত দিয়ে ডাকবে। তারা সংকেতটি শিখিয়ে দিলো। এ কথা বলেই পরী দু’জন চোখের পলকে অদৃশ্য হয়ে গেল।
রাত গভীর হলে তিন ভাই মিলে টাওয়ারের কাছে গেল এবং মাটি খুঁড়তে শুরু করল। বেরিয়ে পড়ল দরোজা। দরোজা খুলে পরীর কথামত সুড়ঙ্গ পথের সিঁড়ি বেয়ে ওরা তিন ভাই উঠে গেল টাওয়ারের চূড়ায়। গুপ্তধনের দেখা পেয়ে মনটা নেচে উঠল ওদের। ভান্ডার ঘরের মেঝে থেকে ছাদ পর্যন্ত সোনাদানা, হীরে জহরতে ঠাসা। সিন্দুকের আর দরকার কি?’ ওগুলো নিলেই তো হয়। কিন্তু ওরা তা না করে পরীর কথামত সিন্দুক খুলে ফেলল। চোখ একেবারে ছানাবড়া! বিশাল তিনটে হীরক খন্ড আর চুনি পান্নায় ঠাসা সিন্দুকটা। এত সব নেবে কেমন করে! দ্রুত ছোট ভাই তিনটে কাঠের বাক্স তৈরি করে ফেলল। বাক্স তিনটে ধন রতœ দিয়ে বোঝাই করে ফেলল। দামি দামি পোশাক পরে নিজেরা সেজে বাক্স কাঁধে করে ভান্ডার ঘর থেকে বেরিয়ে আসতে চাইল ওরা। কিন্তু এ কী! ভান্ডার ঘরের দরোজা কিছুতেই খুলছে না। অনেক চেষ্টা করেও খোলা গেল না। শেষে ছোট ভাই শেখানো সংকেতটি দিলো। সাথে সাথে ভান্ডার ঘরে এসে হাজির হলো একটা কালো বেড়াল। নাচতে লাগল। নাচ থামিয়ে শেষে বলল, ‘কী করতে হবে বলুন তো।’ ‘ভান্ডার ঘরের দরোজা খুলে দাও। আমরা বাইরে যাব।’ দরোজা খুলে গেল। ওরাও তিন ভাই বাক্স তিনটে বয়ে টাওয়ারের নিচে চলে এলো। রাত পোহাতে তখনো বাকি। বাক্স তিনটে মরুভূমির বালিতে পুঁতে রাখল। তারপর তাঁবুর মধ্যে ঘুমিয়ে পড়ল তিনজন আর রাতভর ধনী হওয়ার স্বপ্ন দেখতে লাগল।
কিন্তু শেষ রাতেই গোলমালটা বাধল। একদল মরুদস্যু এসে আক্রমণ করল ওদের। তাঁবু ছিঁড়ে তছনছ করে ফেলল। ওদের তিন ভাইকে শক্ত রশি দিয়ে বেঁধে ফেলল একসাথে, যেন বাজারের মুরগি ওরা, এক্ষুনি জবাই হবে। দস্যু সর্দার ওদের সব টাকা-পয়সা আর জিনিসপত্র, ঘোড়া কেড়ে নিল। এরপর গর্জন করে বলতে লাগল, ‘হো-হো-হো-হো। শালা বান্দির পুতেরা। এখন আমি তোদের গলা কাটব। টুকরো টুকরো করে কেটে মরুভূমির বালিতে তোদের দেহ ছিটিয়ে দেবো। শকুনে খাবে। ভালো চাস তো সব বের করে দে।’
‘সর্বনাশ! দস্যুরা কি টের পেয়ে গেছে যে ওদের কাছে গুপ্তধন আছে।’ আব্দুল এ কথা ভেবে মুষড়ে পড়ল। দস্যু সর্দারের চেহারাটা কি বিশ্রী! গালের একপাশে একটা কাটা ক্ষত, এক চোখে পট্টি বাঁধা, লাল দাড়ি।
দস্যুরা তাদের হাতের তলোয়ার শাণ দিতে লাগল আর ওদের ঘিরে নাচতে লাগল। ভয়ে তিন ভাই সিঁটিয়ে গেল, কিন্তু সাহস হারাল না। আবদুল এবার আবারো সংকেত দিলো। আমাদের রক্ষা করো আগুনে পরী!’ মৃত্যুর আশঙ্কায় কেঁদে উঠল। তার চোখের সামনে দস্যুরা তার ভাইদের খুন করবে, তারপর তাকেও!
হঠাৎ একটা আলো জ্বলে উঠল আব্দুলের সামনে। আলো থেকে আগুন। সে আগুনে দস্যুরা সব পুড়ে ছাই হয়ে গেল। এরপর আগুনে পরী ওদের দেখা দিল এবং ভাইদের উপর দিয়ে আগুনে পরী তার কোমল হাত বুলিয়ে যেতেই ওদের বাঁধন খুলে গেল। তিন ভাই মুক্ত হয়ে তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়ালো এবং লজ্জিতভাবে পরীকে দয়া করার জন্য ধন্যবাদ জানাল ওরা।
‘এসো, তোমাদের আজ একটা জিনিস শেখাই।’ পরী বলে যেতে লাগল, ‘সফরকালে কখনো দামি দামি পোশাক পরবে না। দামি দামি পোশাক দস্যু, ডাকাত আর ছিনতাইকারীদের আকৃষ্ট করে। তোমরা যে সম্পদ পেয়েছ তা শিগগিরই মাটির নিচ থেকে তুলে নাও। ঘোড়ার পিঠে চাপিয়ে দ্রুত এ স্থান ছেড়ে চলে যাও। তবে পোশাক বদলে ময়লা ছেঁড়া পোশাক পরে নাও। না হলে এখানে তোমাদের আরও বেশি ঝামেলায় পড়তে হতে পারে। বিপদে পড়লে আমাকে স্মরণ করো। কিন্তু সাবধান, আমাকে ডাকলে আর মাত্র একবারই কিন্তু আমি তোমাদের কাছে আসব!’ পরী অদৃশ্য হয়ে গেল।
তিন ভাই মরুভূমির বালি খুঁড়ে তাদের ধনসম্পদ বের করে ঘোড়ায় চেপে রওনা হলো উত্তর দিকে যেদিকে ওদের বাড়ি। মরুভূমির উপর দিয়ে ঘোড়ায় চড়ে চলতে লাগল তিন ভাই। এভাবে চলতে চলতে ওদের বেশ কিছুদিন কেটে গেল। একদিন ভাইয়েরা সবেমাত্র তাদের দুপুরের খাবার শেষ করেছে। এমন সময় এক ভয়ানক বালুঝড় উঠল। এমন ঝড় যে ঘোড়া মানুষ কেউই আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না। বালুঝড়ের হাত থেকে বাঁচার জন্য সবাই আশ্রয় খুঁজতে লাগল। শত দৈত্যের মত গর্জে উঠল বাতাস। ধূলোবালিতে আকাশ অন্ধকার হয়ে এলো। দিনেই যেন রাত নেমে এলো। কোথায় আশ্রয়? অগত্যা ঘোড়াগুলোকে নিয়ে মাটিতেই শুয়ে পড়ল ওরা। শেষে এক সময় বালুঝড় থামল, শান্ত হল সব। ঘোড়াগুলো আবার উঠে দাঁড়াল। তিন ভাই একদিন শেষে বুঝতে পারল যে তারা পথ হারিয়েছে। বাড়ি ফেরার পথ এটা নয়। বরং তারা অজানা এক বিপজ্জনক জায়গার দিকে এগিয়ে চলেছে। এ কথা ভাবতেই ওদের গলা শুকিয়ে এলো।
‘আমরা আমাদের সব সম্পদ দিয়ে দেব, শুধু আমাদের সেই তারাগুলো দেখতে দাও খোদা যেগুলো দেখে আমরা আমাদের বাড়ি ফেরার পথ চিনে নিতে পারি।’ মাহমুদ বলল।
আব্দুল বলল, ‘ভাইয়েরা, আমরা এখন খুব বিপদে আছি। মনে হয় আমরা এখন আবার আগুনে পরীর শরাণাপন্ন হতে পারি, তাকে ডাকতে পারি।’ সবাই সায় দিল আব্দুলের কথায়। একসাথে সবাই সংকেতটি এবার দিলো। মুহূর্তের মধ্যেই আগুনে পরী এসে হাজির হয়ে গেল, বলল ‘কী চাও এবার?’ ‘কোথায় আমরা আগুনে পরী? আমাদের বাড়ি ফেরার পথ দেখাও। সাহায্য কর দয়া করে।’
আগুনে পরী ওদের দিকে তাকিয়ে হাসল, বলল ‘এখান থেকে উত্তর দিকে আধা মাইল গেলেই একটা উপত্যকা পাবে। উপত্যকার নিচেই দেখবে একটা নদী বয়ে চলেছে। ভীষণ স্রোত। ওই নদী তোমাদের পার হতে হবে। তবে সে নদী থেকে তোমরা পানি খেয়ে তোমাদের তৃষ্ণা মেটাতে পার, ঘোড়াদেরও পানি খাওয়াতে পার। নদী পার হয়ে ওপারে গিয়ে এক রাত ওখানে বিশ্রাম নেবে। রাতে আকাশে ভালো করে লক্ষ করলে তোমাদের সেই চেনা তারাগুলোকে দেখতে পারবে। সেসব তারা দেখেই তোমরা তোমাদের যাওয়ার দিক ঠিক করে নিতে পারবে এবং সেভাবে গেলে একদিন বাড়ি পৌঁছতে পারবে। এখন চিরদিনের জন্য বিদায় ভাইয়েরা, আর কখনো ডাকলে আমার দেখা পাবে না।’ এই বলেই আগুনে পরী অদৃশ্য হয়ে গেল।
তিন ভাই ওখান থেকে উত্তরে আধা মাইল হাঁটল। একটা উপত্যকা ও উপত্যকার নিচে একটা নদীও দেখতে পেল। নদীর পাড়ে বিরাট বিরাট গাছের বন। চওড়া সে নদীটা স্রোতের সাথেই বয়ে চলেছে। কি করে তিন বাক্স ধনরতœ আর তিনটে ঘোড়া নিয়ে সেই খরস্রোতা নদী পার হবে ওরা? বেশ ভাবনায় পড়ে গেল। ছোট ভাই মাহমুদ বলল, ‘চিন্তা কোর না ভাইয়েরা। আমি এই বড় গাছগুলোকে কেটে এক্ষুনি একটা বড় ভেলা বানিয়ে দিচ্ছি। এক দিনেই মাহমুদ বিরাট বিরাট গাছ কেটে তিনটে ভেলা বানিয়ে ফেলল। তিন ভাই তিনটে ভেলায় চড়ে নিরাপদে নদী পার হয়ে গেল। ওপারে উঠে ওরা নদীর পাড়ে একটা খোলা মাঠে আশ্রয় নিলো। এমন সময় আব্দুল দেখল, মাথার উপর দিয়ে এক ঝাঁক বুনো হাঁস উড়ে যাচ্ছে। সাথে সাথে ধনুক থেকে তীর ছুড়ে কয়েকটাকে ঘায়েল করে ফেলল।
শিকার করা বুনো হাঁস আগুনে সেঁকে খাবার তৈরি হলো। খেয়ে দেয়ে সবাই রাতের জন্য অপেক্ষা করতে লাগল। রাত এলেই আহমেদ নিশ্চয়ই সেই তারাটিকে খুঁজে পাবে আর ওরাও বাড়ি ফিরতে পারবে।
‘না ভাই, আমি আর দুনিয়া দেখতে চাই না। এখন ভালোয় ভালোয় যদি বাড়ি ফিরতে পারি তাহলে সারাটা জীবন আমি বাড়িতেই কাটিয়ে দেব। জন্মভূমিতে থাকার মত সুখ আর আছে নাকি?’ আহমেদ বলল।
‘অন্যদের শিকার শেখাব। আর যে ধনসম্পদ পেলাম ওতেই তো সারাজীবন চলে যাবে।’ ‘হ্যাঁ, আমিও খুব খুশি হবো যদি বাকি জীবনটা বাবা-মায়ের সাথে বাড়িতেই কাটিয়ে দিতে পারি। ভাবছি যন্ত্রপাতি কিনে আমিও একটা কাঠের আসবাবপত্র বানানোর দোকান দেব।’ ছোট ভাই মাহমুদ বলল।
গল্প করতে করতেই আঁধার ঘনিয়ে এলো। রাতের আকাশে একে একে জেগে উঠতে লাগল তারা। আহমেদ চোখে দুরবিন লাগিয়ে খুঁজতে শুরু করল সেই চেনা তারাটিকে। সেটা পেয়ে সে আনন্দে চিৎকার করে উঠল। তারা ধরে ধরে তিন ভাই সারারাত ঘোড়া ছুটিয়ে চলল। ভোরের আলো ফুটতেই চোখের সামনে ওরা ওদের জন্ম শহরকে দেখতে পেয়ে আনন্দে লাফিয়ে উঠল।
‘আল্লাহকে হাজার শুকরিয়া যে অবশেষে আমরা আমাদের বাড়িতে ফিরে আসতে পেরেছি।’ আব্দুল বলে উঠল।
‘হ্যাঁ, আর আমরা কখনো এভাবে রোজগারের জন্য দুনিয়া ঘুরতে যাবো না। যে কদিন বাঁচি এখানেই থাকব।’ সবাই বলল এবং তারা তাই-ই করেছিল। কেউ কখনো আর কোথাও যায়নি। মাতৃভূমির চেয়ে ভালো জায়গা পৃথিবীতে আর আছে না কি? হ

SHARE

Leave a Reply