Home সায়েন্স ফিকশন নীলনকশার মৃত্যু -মোস্তফা ইউনুস জাভেদ

নীলনকশার মৃত্যু -মোস্তফা ইউনুস জাভেদ

নাসার স্টাফ বিজ্ঞানী ড. সিফাত আজ সকালে নিজ অফিস কক্ষের দিকে যাচ্ছিলেন। পাশের রুমে তার বন্ধু ইহুদি বিজ্ঞানী ড. এডিন জোসেফের কক্ষে প্রবেশ করে তার সাথে সকলের কুশলাদি বিনিময় করলেন। হঠাৎ ড. এডিনের মোবাইল সাদা হয়ে গেলো। ড. এডিন ফোন ধরে ইশারায় ড. সিফাতকে গুড বাই জানিয়ে দিলেন। ড. সিফাত তার কক্ষ থেকে বের হয়ে আসার সময় হঠাৎ চাপাকণ্ঠে কিছু কথা শুনতে পেলেন। ভ্রু কুঁচকে গেলো তাঁর। নিজ রুমে গিয়েই ফোন দিলেন তার ছোটবেলার শিক্ষাগুরু ড. আব্দুর রহমানকে। বললেন, জরুরিভাবে দেখা করা আবশ্যক।
কিছুদিন আগেই দুই পৃথিবীখ্যাত বিজ্ঞানী ড. তারেক ও ড. আব্দুর রহমান প্রায় অসাধ্য সাধন করে এসেছেন। পরপর দু’বার পৃথিবীকে নিশ্চিত ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করেছেন। কিন্তু ষড়যন্ত্রকারীর ব্যাপারে কোনো ধারণা করতে পারছেন না তাঁরা। তাই নাসার প্রতিটা সদস্যকে মহাকাশে সার্বক্ষণিক দৃষ্টি রাখা এবং কোনো সন্দেহজনক কিছু পাওয়া মাত্রই তাদের জ্ঞাতার্থে আনার অনুরোধ জানিয়েছেন। হয়তো এরকম কিছু তথ্য দেয়ার জন্য আসছেন ড. সিফাত- এই আশায় তার আগমনের অপেক্ষা করতে লাগলেন ড. আব্দুর রহমান। ডেকে নিলেন তার বন্ধু ও সব সময়ের সাথী আরেক বিজ্ঞানী ড. তারেককে।

২.
মাত্রই এসেছেন ড. সিফাত। কুশলাদির আগেই কথা শুরু করলেন তিনি। ড. আব্দুর রহমানকে বললেন, “স্যার, ২ বছর আগে, অর্থাৎ ২০৫৩ সালে বেশ কয়েকজন বিজ্ঞানী নিয়ে ড. ডেভিডের একটি দল মহাশূন্যে নভোযানে ভ্রমণের পথে বিস্ফোরিত হয়েছিলো- ঘটনাটা মনে আছে আপনার?” আব্দুর রহমান বললেন,
“হ্যাঁ, থাকবে না কেন? ১৫ জন ইহুদি বিজ্ঞানী একসাথে এর আগে এমন অঘটন তো খুব বেশি হয়নি। হঠাৎ এ প্রসঙ্গ যে?” ড. সিফাত জবাব দিলেন-
“স্যার, পুরো ব্যাপারটাই ভুয়া। তাঁরা কেউই মারা যাননি।”
“মানে? কী বলছেন আপনি?” কথা বললেন ড. তারেক। তার মাথায় চিন্তার ঝড় শুরু হয়ে গেছে ততক্ষণে।
“জি স্যার, একটু আগে আমার এক ইহুদি বন্ধু ফোনে ড. ডেভিডের সাথে কথা বলছিলো। কলটা যে পৃথিবী থেকে আসেনি তা ওর স্ক্রিনে দেখেই বুঝেছি। পুরো স্ক্রিন সাদা হয়ে গিয়েছিলো। সাধারণত অন্য গ্রহ থেকে কল এলেই এমন হয়। আর ও যে সম্মান দিয়ে কথা বলছিলো, আমাদের শ্রেষ্ঠ মহাকাশ বিজ্ঞানী ড. স্টিফেন স্যারকেও সে এত গুরুত্ব কখনো দেয়নি। সাধারণত ও ড. ডেভিড ছাড়া কাউকে এত মূল্য দিতো না।”
বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলেন ড. আবদুর রহমান। ঘটনা শুনে কিছুক্ষণ কোনো কথা বের হলো না ড. তারেকের। যেন সম্বিত হারিয়ে ফেলেছেন তিনি। একটু পর সিফাতকে প্রশ্ন করলেন তিনি, “সেই বন্ধু কোথায় আছে এখন? কী নাম তার? এখুনি বলো।”
“স্যার, ওর নাম এডিন জোসেফ। নাসার সেন্ট্রাল শাখায় মহাকাশ বিজ্ঞানী হিসেবে কাজ করছে। এখনও হয়তো ও অফিসেই আছে।”
“ওর নাম্বার আছে?”
“জি স্যার। কল দেবো?”
“না।” বলেই ড. তারেক কল দিলেন নাসার গোয়েন্দা প্রধান, তাঁর খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু আদনানকে। কল ওপাশ থেকে রিসিভ হতেই বললেন, “দোস্ত, একটু অজ্ঞান পার্টির ভূমিকায় নামতে হবে তোকে।”

৩.
গোয়েন্দা বিভাগের বিশেষ কক্ষে বসে আছেন ড. তারেক, ড. আব্দুর রহমান, ড. সিফাত ও আদনান। ড. তারেকের নির্দেশে গোয়েন্দা আদনান অফিস থেকে বের হওয়ার সময় খুব দক্ষতার সাথেই পথে এডিন জোসেফকে অজ্ঞান করে তার দু’টি মোবাইল, মানিব্যাগ ও ল্যাপটপটি হাতিয়ে এনেছেন। তার মোবাইল চেক করে দেখা গেছে, প্রতিটা এরকম স্ক্রিন সাদা কলগুলো অন্য কোনো গ্রহ থেকে এসেছে। এবং সেটা সৌরজগতের বাইরের কোনো গ্রহ থেকে। এরপরই আলোচনায় বসেছেন তাঁরা ৪ জন। তারেক প্রথমেই মুখ খুললেন,
– আমি যতটুকু আঁচ করতে পেরেছি, পৃথিবী ধ্বংসের মহা ষড়যন্ত্র এরাই করছে। এত সংঘবদ্ধ ও পরিকল্পিতভাবে এরা ছাড়া আর কেউ কিছু করতে পারার কথা না। ওরা আমাদের দুর্বল দিকগুলো জানে। তাই আমাদের ধ্বংস করার সবরকম চেষ্টা করছে।
– ঠিক। কিন্তু ওরা, ওরা না ধ্বংস হয়ে গিয়েছিলো? ওদের জন্য আমরা ৩ দিন শোক পালন করলাম, আর ওরা কিনা আমাদের ধ্বংস করার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে? বললেন আদনান।
– ওদের টার্গেট শুধু পৃথিবী নয়। বললেন ড. তারেক।
– তার মানে? বললেন ড. সিফাত।
– মানে ওরা এর আগে সূর্যকে স্লো পয়জনিংয়ের মতো ধীরে ধীরে মারার পরিকল্পনা করেছিলো। আর সৌরজগতের যেকোনো গ্রহে আমরা পরিভ্রমণ করতে পারবো এটা ওরা জানে। তাই গোটা সৌরজগৎই শেষ করে দিতে চাইছে ওরা।
– কিন্তু ওরা তাহলে আছে কোথায়? ওরা কোথায় বাস করবে তাহলে?
– ওদের এখন থাকার একটাই জায়গা আছে। তা হলো পার্শ¦বর্তী সৌরজগৎ Epsilon Eridani এরEpsilon Eridani b। এই গ্রহে থাকার কৃত্রিম ব্যবস্থা ওরা করে রেখেছে কিছুদিন আগে। ওরা নিখোঁজ হওয়ার কিছুদিন আগে এমনটাই শুনেছিলাম আমি।
– স্যার, তাহলে এখন ওদের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হতে পারে? ড. সিফাত বললেন।
– আগে আমাদের নিশ্চিত হতে হবে ওরাEpsilon Eridani bগ্রহেই আছে কিনা। আদনান, পাশের সৌরজগৎ থেকে যদি ফোন আসে, তাহলে কি সেটা ট্র্যাক করা যাবে?
– যাওয়ার কথা। যদি পৃথিবীতে ফোন আসার মতো যোগাযোগ ব্যবস্থা থাকতে পারে তাহলে সেই লোকেশন চেনা অসম্ভব হওয়ার তো কথা না।
– তাহলে কাজে নেমে পড় দয়া করে। সিফাতের সেই ইহুদি কলিগের ফোনে ওরা আর যোগাযোগ করতে না পারলে সব বুঝে যেতে পারে। ওদের কিছু করার আগেই আমাদের কিছু করা দরকার।
– জো হুকুম মহারাজ। বলেই কম্পিউটারে বসে পড়লেন আদনান। বরাবরই রসিক তিনি, আর সেই সাথে গোয়েন্দাগিরিতেও সেরাদের সেরা। এই ট্র্যাকিং তার কাছে খুব কঠিন কিছু মনে হচ্ছে না।

৪.
বিরাট নভোযান প্রস্তুত করা হয়েছে। গন্তব্য আমাদের এই সৌরজগৎ থেকে ১০.৫ আলোকবর্ষ দূরের এক গ্রহে, যার নাম Epsilon Eridani b। এই গ্রহে ওঁৎ পেতে আছে সৌরজগৎ ধ্বংসের নীলনকশাকারী চক্র, সেই শনি-যার কুদৃষ্টি পড়েছিলো এই পৃথিবীর দিকে, এই সূর্যের দিকে। যারা অর্জিত জ্ঞানের অপব্যবহার করে আল্লাহর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি মানুষকে শেষ করে দিতে চেয়েছিলো। আজ তাদের সা¤্রাজ্যের পতন ঘটাতে তৈরি হয়েছেন প্রায় ২০০ জন বিজ্ঞানী ও সেনা।
এর আগে সফলভাবে ট্র্যাকিং করে তাদের অবস্থান নিশ্চিত করেন গোয়েন্দা আদনান। এরপর বিশ্বস্ত কিছু বিজ্ঞানী ও সেনাকর্মকর্তাকে আলাদাভাবে ডাকা হয়। পরিস্থিতি সম্পর্কে তাদের বিস্তারিত জানানো হয়। খুবই তড়িৎগতিতে সিদ্ধান্ত নেয়া হয় যে, যেকোনোভাবে এদের আটকাতে হবে। সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১ মাস পরই অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নেয়া শুরু হয়।
২ ডিসেম্বর সকাল ১১টা। বিসমিল্লাহ বলে রওনা হলেন বিজ্ঞানী ড. তারেকের নেতৃত্বে ২০০ জন নভোযাত্রী। ১০.৫ আলোকবর্ষ অতিক্রম করতে সময় লাগলো ৭ দিন। Epsilon Eridani b  গ্রহে পৌঁছে তাঁরা অবাক হয়ে গেলেন।

৫.
প্রায় হলরুমের মতো একটা ঘর, সে ঘরে কাজ করছে ৬ জন রোবট, আর ১৫ জন বিজ্ঞানী নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছে। তাদের প্রোজেক্ট একটি নভোযান, যার গায়ে লেখা আছে- ONLY WE EXIST. তাদের নাম, কাজ দেখেই বুঝা যাচ্ছে কোনো ভালো উদ্দেশ্যে এটি তৈরি নয়।
ওদেরকে আর এগুতে দেয়া ঠিক হবে না, ভাবলেন ড. তারেক। নিজস্ব নভোযান থেকে বেরিয়ে এলেন ২০০ জন সেনা। অস্ত্র তাক করে আলো দিয়ে ইহুদি বিজ্ঞানী ড. ডেভিডের বাহিনীর দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন তারা। পূর্বেই হাইডিং ট্র্যাকার লাগিয়ে নিজেদের নভোযানকে ড. ডেভিড বাহিনীর চোখের আড়াল করে নিয়েছিলেন ড. তারেকের কলিগ ড. কৃষ্ণেন্দু। তাই তাদের কাছে এই ২০০ সেনার আগমন পুরোই অজানা ছিলো। তারা হকচকিত হয়ে গেলো। ড. তারেক কল দিলেন ড. ডেভিডের ফোনে। বললেন,
– ডেভিড, তোমাদের সব কৌশলই আমরা জেনে গেছি। তোমাদের এখন পালানোর কোনো উপায় নেই। তোমরা আত্মসমর্পণ করো।
ডেভিড শুনে হাসলো, বললো,
– কে বললো আমরা পালাতে চাচ্ছি? আমরা চাই পৃথিবীর মানুষ নামক জন্তুগুলোকে নিশ্চিহ্ন করে দিয়ে রোবটের রাজত্ব তৈরি করতে। আমরা কেন পালাবো?
– কেন? মানুষ তোমার কী ক্ষতি করেছে?
– মানুষ খুবই বোকা। তারা না দেখা প্রভুকে বিশ্বাস করে, তাকেই মানে। তার অস্তিত্ব নেই এটা তারা মানতে চায় না। তাদের ভুল তাদের স্বাধীনতা থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে। পৃথিবীকে তারা কলুষিত করছে। আমি বিশ্বে স্বাধীন প্রাণীর অস্তিত্ব চাই, কোনো স্রষ্টার দখল চাই না।
– কিন্তু তুমি ভুল ভেবেছো। বিশ্বের প্রভু একজনই- সেই না দেখা আল্লাহই। তোমার সব ষড়যন্ত্র আমরা রুখে দিয়েছি তারই দেয়া বিধান গবেষণা করেই। প্রভু তো দূরের কথা, তুমি মানুষের মধ্যেই একজন ছাড়া আর কিছুই নও। তার প্রমাণ তো তোমার প্রতিটা ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করেই আমরা দিয়েছি। এবার মানুষের কাছে আত্মসমর্পণ করো।
– আমি? আমি আত্মসমর্পণ করবো তোমাদের কাছে? এর চেয়ে মৃত্যুকে বেছে নেয়াই আমি শ্রেয় মনে করছি। আর মনে রেখো, আমার উত্তরসূরি তোমাদের মাঝেই আছে। আমি না পারলেও সে ঠিকই একদিন তোমাদের ধ্বংস করবে। বিশ্বে স্বাধীনতা থাকবে। কোনো ¯্রষ্টার গোলামি কেউ করবে না। ততদিন যা পারো করে নাও।
ড. তারেক প্রমাদ গুনলেন। ড. ডেভিডের এ ধরনের পাগলামির মানে অন্যান্যরাও আঁচ করতে পারলো। কোনো আত্মঘাতী বোমা হয়তো এখুনি বিস্ফোরিত হবে এই গবেষণাগারে। তারপর সত্যিকার অর্থেই ধ্বংস হবে ড. ডেভিড আর তার সাথীরা। কিন্তু এই বোমা কতদূর ক্ষতি করবে? তারা কি আক্রান্ত হবেন?
ভাবছেন ড. তারেক, এর মধ্যেই তার কানে ছোট্ট দুপ করে একটা শব্দ হলো। তার চোখের সামনেই ঢলে পড়তে লাগলো ড. ডেভিড ও তার সাথীরা। রোবটগুলো নিষ্ক্রিয় হয়ে গেলো। এরপর হঠাৎ বিস্ফোরণ। ধ্বংস হয়ে যেতে লাগলো ড. ডেভিডদের ল্যাব। ২০০ জন সেনা দ্রুত তাদের নভোযানে ফিরে এসে নভোযান স্টার্ট দিলেন। দূরে সরে যেতে লাগলো তাদের নভোযান ড. ডেভিডদের থেকে। সেদিকে তাকিয়ে আপন মনে বলে উঠলেন ড. তারেক- “মানুষ বোকা নয়, বোকা তুমিই ডেভিড। যে স্রষ্টাকে মানতে চায় না সেই বোকা। তার জায়গা পৃথিবী কেন, এই মহাবিশ্বের কোথাও হয় না। কোনো দিন হবেও না।”

৬.
আবারো ড. তারেক এসেছেন। ড. ডেভিডের আস্তানায় অভিযানে নিয়ে যাওয়া হয়নি বলে আব্দুর রহমান প্রচন্ড অভিমান করেছেন। কিন্তু তারেকের কিছু করার ছিলো না। ঝুঁকিপূর্ণ এই মিশনে ড. তারেক মারা গেলে পৃথিবীতে যেন আব্দুর রহমান থেকে আবারো চেষ্টা করেন এইটাই তার যুক্তি ছিলো। আব্দুর রহমান মানতে না পারলেও তারেকের জেদের কাছে হার মানতে হয়েছে তাকে। কিন্তু অভিযান শেষে ড. তারেক দুইদিন বাসায় এলেও কথা বলেননি ড. আব্দুর রহমান। আজ আবার তারেক এসেছেন। অনেক কষ্টে অভিমান ভাঙালেন আব্দুর রহমানের। এরপর দু’জনে মিলে অভিযানের গল্প করতে লাগলেন। গল্পের মাঝে নীরব হয়ে ভাবতে লাগলেন ড. তারেক- এডিন জোসেফকে তো গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আর কেউ ডেভিডের অনুসারী নেই তো? আর কেউ আবার আল্লাহর এই নেয়ামত ধ্বংসের চেষ্টা করছে না তো?
আল্লাহ আছেন। তার ওপর ভরসা করেই এতদূর আসা, তিনিই সমাধানের মালিক।
নাহ, আর ভাবতে পারছেন না ড. তারেক। দুই বন্ধু মনোযোগ দিয়ে ক্বারী আব্দুল বাসিতের কণ্ঠে অমিয় গ্রন্থের তেলাওয়াত শুনতে লাগলেন- “তারা মুখের ফুৎকারে আল্লাহর দ্বীনকে নিভিয়ে দিতে চায়, কিন্তু আল্লাহ তা প্রজ্বলিত রাখবেন তা কাফেরদের যতই অপছন্দের হোক না কেন…।” (সূরা আস সফ : ৮)

SHARE

Leave a Reply