Home প্রচ্ছদ রচনা মধুর রসে ভরা জ্যৈষ্ঠ মাস -আবু নূন

মধুর রসে ভরা জ্যৈষ্ঠ মাস -আবু নূন

আমাদের প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশ। এই দেশে আছে সবুজ ফসলের মাঠ, পাখির কলকাকলি ভরা বন-বনানী, নদ-নদীর কলতান। আল্লাহর দেয়া আরো কত শত বাহারি উপহার!
বারো মাস আর ছয় ঋতুচক্রের বিবর্তনে আমাদের জন্য উপহারের ডালি মেলে ধরে জন্মভূমির সোনাফলা মাটি। ছোট্ট বন্ধুরা এই যে দেখ, কত শত মজার ফলের সম্ভার নিয়ে এখন আমাদের সামনে হাজির জ্যৈষ্ঠ মাস। ফলের রস আর মৌ মৌ গন্ধে এদেশের মানুষ অভিধানের ভাষা হারিয়ে ফেলে এই মাসে। তারা ভুলে যায়, বাংলা অভিধানে মধুমাস শব্দের অর্থ হলো, চৈত্রমাস। দেশের পত্রপত্রিকায় জ্যৈষ্ঠ মাস নিয়ে কোনো কিছু লিখতে গিয়ে লেখা হয় মিষ্টি ফলের রসে ভরা মধুমাস। এ ভাবেই জ্যৈষ্ঠ মাসের সাথে মধুমাস বিশেষণটি জড়িয়ে গেছে। অভিধানের সত্য যেন হারিয়ে গেছে। লেখকের মনভূমিতে যে সত্যের উদয় হয়েছে তাকেই সবাই মেনে নিয়েছে। অভিধানের মধুমাস অভিধানেই আছে। কিন্তু লোকমুখে এখন জ্যৈষ্ঠই যেন আসল মধুমাস। যদিও এ কথা কারো অজানা নয়, মধু থাকে ফুলেÑ ফলে নয়। ফাল্গুন-চৈত্র বসন্ত কাল। এ সময় ফুলে ফুলে ছেয়ে যায় বাংলার প্রকৃতি। বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ গ্রীষ্মকাল। বসন্তের ফুল ফলে পরিণত হয় গ্রীষ্মে এসে। ছয় ঋতুর বাংলাদেশের প্রকৃতির এ রূপের বদল সত্যি বড় বৈচিত্র্যময়! গ্রীষ্মের শেষ মাস জ্যৈষ্ঠ, এ মাসে ফল পেকে রসের ভারে টইট¤ু^র হয়।
জ্যৈষ্ঠ মাসের প্রধান ফল আম, জাম, কাঁঠাল ও লিচু। ফলের রাজা আম। কাঁঠাল আমাদের জাতীয় ফল। বর্তমান সরকার আম গাছকে দিয়েছে জাতীয় গাছের মর্যাদা। আমের কদর আজকের নয়। পারস্যের কবি আমির খসরু চতুর্দশ শতাব্দীতে আমকে ‘হিন্দুস্থানের সেরা ফল’ রূপে উল্লেখ করেছেন। আধুনিককালে বিখ্যাত উদ্যানবিদ পোপেনো আমকে ‘প্রাচ্যের ফলের রাজা’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। সংস্কৃতে আম্র, বাংলায় আম। সংস্কৃতে আরো একটি নাম রয়েছে আমেরথরসাল। তবে রসাল বলতে শুধু আমই নয়, আমগাছটিও বোঝায়। আম অর্থ সাধারণ। সাধারণের ফল আম। আমের আদি নিবাস কোথায় তা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও এ জনপদই আমের আদিবাস, এ সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা একমত।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, খ্রিস্টপূর্ব ৩২৭-এ আলেকজান্ডার সিন্ধু উপত্যকায় আম দেখে এবং খেয়ে মুগ্ধ হয়েছিলেন। এ সময়ই আম ছড়িয়ে পড়ে মালয় উপদ্বীপ, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন দ্বীপপুঞ্জ এবং মাদাগাস্কারে। ১৩৩১ খ্রিস্টাব্দ থেকে আম চাষ হচ্ছে আফ্রিকায়। ১৬ শতাব্দীতে আম পৌঁছে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে। ১৬৯০ সালে ইংল্যান্ডে কাচের ঘরে আমচাষের খবর শোনা যায়। সপ্তদশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে ইয়েমেনে পৌঁছে আম। ঊনবিংশ শতাব্দীতে ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জে। ১৮৬৫ খ্রিস্টাব্দে ইতালিতে আমচাষের খবর জানা যায়।
অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথম দিকে পর্তুগিজদের হাত ধরে জাহাজে চেপে আম যায় আমেরিকা ও ব্রাজিলে। ১৭৭৪ খ্রিস্টাব্দে স্পেনীয় ব্যবসায়ীদের বগলদাবা হয়ে আম যায় মেক্সিকো। ১৮৬৫ খ্রিস্টাব্দে হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের মাটিতে প্রথম আমের আঁটি থেকে গাছ হয়।

বাহারি নামের প্রায় হাজার জাতের আম রয়েছে আমাদের দেশে। আমাদের দেশে পাওয়া যায় এমন কয়েক প্রজাতির আমের পরিচয় তুলে ধরা হলো।
ফজলি : বৃহদাকৃতি সুস্বাদু আম। শাঁস কমলা বর্ণের বা লাল হয়। গাছ বৃহদাকারের। নাবী জাতীয় আম। মধ্য জুলাই-মধ্য সেপ্টেম্বরে পাকে।
ল্যাংড়া : পাতলা বাকল ও হালকা বীজবিশিষ্ট জাত। শাঁস হালকা কমলাভ; মিষ্ট, রসাল ও আঁশবিহীন। আম ঋতুর মাঝামাঝিতে (জুনের  শেষাংশ থেকে জুলাই) পাকে।
গোপালভোগ : শাঁস গভীর কমলাভ। ওজন ২৫০ গ্রাম থেকে ৩২৫ গ্রাম। এটা আশু জাতীয় এবং জুন মাসে পাকে।
কিষাণভোগ : জুন-মধ্য জুলাইতে পাকে (মধ্য মৌসুমি)।
খির্সাপাতি : গোপালভোগ অপেক্ষা সামান্য ছোট। মিষ্টি ও ছোট আঁটিবিশিষ্ট। শাঁস হলুদাভ বাদামি। আশু জাত (জুন); থোকা থোকা ফল। ঘরে রাখা চলে।
হিমসাগর : মাঝারি আকারের এ ফল ওজনে ৩৭৫ থেকে ৫০০ গ্রাম হয়। জুন-জুলাই মাসে পাকে। ফল রসালো, মিষ্টি ও আঁশবিহীন এবং আঁটি ক্ষুদ্রকায়। ত্বক মাঝারি পুরু। মিষ্টতা ও সংরক্ষণশীলতার দিক থেকে অপূর্ব বলা চলে।
কোহিতুর : মাঝারি আকারের এ ফল প্রায় ২৫০ গ্রাম ওজনের হয়। রাজশাহীর আম। শাঁস রসালো, সুমিষ্ট, কোমল; জুন-জুলাই (মধ্য-মৌসুমি)।
মোহনভোগ : ২৭৫-৬২৫ গ্রাম হয়। গোলাকার ধরনের ফল। মাঝারি-নাবী জাত।
গোলাপ খাস : ২৫০ থেকে ৩৭৫ গ্রাম ওজন। আশু জাত; মে-জুন মাসে পাকে।
সামার বাহিশত চৌসা : মাঝারি আকারের, কাঁধ সমান, ঠোঁট স্পষ্ট; শাঁস হলুদ ও খুব মিষ্টি; নাবী জাত, জুলাই-আগস্টে পাকে।
আশ্বিনা : সবচেয়ে নাবী জাত; মৌসুম জুলাই-আগস্ট।

অন্যান্য দেশি জাতের অন্যতম সটিয়ার করা (আশু), সূর্যপুরী, মাধ্যমিকা, কুয়া পাহাড়ি (নাবী), বোম্বাই (নাবী), মোহনভোগ (মাধ্যমিক), লতা-বোম্বাই (গাছ ক্ষুদ্রাকার, ফলও ক্ষুদ্রাকার, মধ্য- মৌসুমি)। বারি কর্তৃক মুক্তায়িত আম-জাতগুলো হচ্ছে আশুজাতীয় বারি আম-১ (মহানন্দা) মধ্য মৌসুমি, বারি আম-২ (আম্রপালি) যা কিছুটা নাবী, বারি আম-৩ এবং নাবী জাতীয় বারি আম-৪। ওপরে উল্লিখিত আমগুলোর পাশাপাশি বাংলাদেশের সুফলা মাটিতে সম্প্রতি আরেকটি উন্নত জাতের আমের আত্মপ্রকাশ ঘটেছে। এর নাম ‘হাড়ভাঙ্গা’। রংপুরের আবদুস সালাম সরকার নামে এক ব্যক্তি বিখ্যাত আম হাড়িভাঙ্গার সম্প্রসারক। কর্মজীবনে ছিলেন সরকারের সমবায় অধিদপ্তরের কর্মকর্তা।
আম খাওয়ার বিভিন্ন পদ্ধতি আমাদের অনেক আগে থেকেই জানা। কাঁচা আমে কাঁচা মরিচ, আচার, চাটনি, আমদুধ, আমসত্ত্ব আর দুধ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায়
‘আমসত্ত্ব দুধে ফেলি,
তাহাতে কদলী দলি,
সন্দেশ মাখিয়া দিয়া তাতে
হাপুস হুপুস শব্দ
চারিদিক নিস্তব্ধ
পিঁপিড়া কাঁদিয়া যায় পাতে।’

জ্যৈষ্ঠ মাসের একটি ফল কাঁঠাল। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আকারের মজার ফল এটি। কাঁঠাল শুধু জাতীয় ফল নয়, গরিবের ফল নামেও পরিচিত। কাঁঠাল কাঁচা অবস্থায় সবজিরূপেও মজা করে খায় এদেশের মানুষ। পাকা ফল আম দুধ দিয়ে খেতে খুব মজা। কাঁঠাল দুধ-ভাত ছাড়াও খাওয়া যায়। শুকনা বীজ সেঁকে, সিদ্ধ করে কিংবা সবজিরূপে তরকারি হিসেবে খাওয়া হয় ।
জামের কথা এলেই মনে পড়ে পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের কবিতা, ‘পাকা জামের মধুর রসে রঙিন করি মুখ’। জাম সাধারণভাবে দুই প্রকার। যথা : (১) কালো জাম (২) বুনো জাম। কালো জাম বড় আকারের এবং বুনো জাম ক্ষুদ্র। কুমিল্লা, নোয়াখালী, সিলেট, দিনাজপুর ও পাবনা এলাকায় জাম বেশি পাওয়া যায়।
এ মাসের আরেকটি রসানো ফল লিচু। দিনাজপুরের মাছুমপুর এ লিচুর জন্য বিখ্যাত। মাদ্রাজি ও বোম্বাই লিচু প্রায় সারা দেশে পাওয়া যায়। জ্যৈষ্ঠ মাসের রকমারি ফলের মধ্যে আরো রয়েছে তরমুজ, বাঙ্গি, জামরুল। বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসের ফল খাওয়ার সুখের ছবি পল্লীকবি জসীমউদ্দীন কবিতার ভাষায় সুন্দর করে এঁকেছেন,
‘ঝড়ের দিনে মামার দেশে
আম কুড়াতে সুখ
পাকা জামের শাখায় উঠি
রঙিন করি মুখ।
কাঁদি-ভরা খেজুর গাছে
পাকা খেজুর দোলে
ছেলেমেয়ে, আয় ছুটে যাই
মামার দেশে চলে। হ

SHARE

Leave a Reply