Home ফিচার মাদার ফিশারিজ টাংগুয়ার হাওর -মনির হোসাইন

মাদার ফিশারিজ টাংগুয়ার হাওর -মনির হোসাইন

এইত সে দিনের কথা। শিংড়া তুলতে গিয়েছিলাম এক হাওরে। হ্যাঁ, টাংগুয়ার হাওরের কথায় বলছি। বাংলাদেশের বৃহত্তম হাওর।
সবচেয়ে মজার বিষয় হলো আমার বসবাস টাংগুয়ার হাওরের উত্তর প্রান্তে। অর্থাৎ হাওরের উত্তর কিনারায়। আমি এখানে বসবাস করি অথচ এ হাওর সম্পর্কে কিছুই জানতাম না। আমি তখন অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র। একদিন ওটঈঘ সংস্থার পক্ষ থেকে কিছু লোকজন এলো আমাদের বিদ্যালয়ে, যা টাংগুয়ার হাওরের পাড়েই অবস্থিত নাম বাগলী উচ্চবিদ্যালয়। ২০১৩ সাল। তারা এসেই শিক্ষকদের সাথে আলোচনায় বসল এবং তাদের কর্মসূচি বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিলো। শ্রেণিকক্ষে ঢুকেই অভিবাদন জানাল সবাইকে। প্রথমে কিছু শিক্ষার্থী বাছাই করে নিলো এবং ৫৪ জন সদস্যবিশিষ্ট একটি দল গঠন করল। যার নাম ছিল ‘টাংগুয়া প্রকৃতি সংঘ’। যেখানে আমি ছিলাম সাধারণ সম্পাদক। তারা আমাদেরকে টাংগুয়ার হাওর সম্পর্কে অবহিত করল এবং এর বিভিন্ন বিষয় ও গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরল। এরপর থেকেই প্রচুর আগ্রহ জন্মাল এ হাওর সম্পর্কে জানার।
২৪ জানুয়ারি ২০১৩। ওটঈঘ এর পক্ষ থেকে সিদ্ধান্ত এল উক্ত দলের ১০ জনকে নিয়ে টাংগুয়া ভ্রমণে বের হবে। মনে মনে খুশি আর ধরে না। ঐ দিনই সকাল ৯টায় আমরা রীতিমতো পৌঁছে গেলাম হাওরে। আমাদের সাথে আমাদের প্রধান শিক্ষকও ছিলেন। নাস্তার পর শুরু হলো মজার প্রতিযোগিতা। রচনা ও চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় আমি অংশগ্রহণ করি। উভয়ে আমি প্রথম স্থান অধিকার করি। আমার লেখা রচনা ও টাংগুয়ার হাওরের ধারণকৃত মানচিত্রটি প্রকাশ পেয়েছিল (ফেব্রুয়ারি ২০১৩) ওটঈঘ কর্তৃক প্রকাশিত ‘সবুজ সাথীর টাংগুয়া ভ্রমণ’ বইয়ে ।
যাহোক আজ আমি তোমাদেরকে পরিচয় করিয়ে দেব সেই টাংগুয়ার হাওরের সঙ্গে।
প্রথমে জেনে নেই হাওর কাকে বলে।
‘ছোট বড় অনেক বিলের সমন্বয়ে গঠিত মিঠা পানির বিশাল এলাকাকে হাওর বলে।
পৃথিবীর বৃহত্তম বদ্বীপ আমাদের এই বাংলাদেশ। ভৌগোলিক অবস্থান আর ঋতুবৈচিত্র্যের সমারোহ দেশটিকে করে তুলেছে অনন্য। আমাদের দেশ পৃথিবীর অন্যতম জলমগ্ন দেশ হিসেবে পরিচিত। এ দেশকে নদীমাতৃক দেশও বলা হয়। এদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত মেঘালয় পর্বতমালা। এখান থেকে বয়ে আসা মিঠা পানির অবিরাম প্রবাহে পাহাড়ের পাদদেশ থেকে সৃষ্টি হয়েছে হাওরের মত এক অনন্য জলাভূমি। যার অবিচ্ছেদ্য অংশ টাংগুয়ার হাওর। এটি সুনামগঞ্জ জেলায় অবস্থিত। এ হাওরের অধিকাংশ এলাকা তাহিরপুর উপজেলার অন্তর্ভুক্ত। ১৮টি মৌজা, ৮৮টি গ্রাম এবং ৪টি ইউনিয়ন নিয়ে বিস্তৃত এ হাওর। এর আয়তন প্রায় ১০০০০ হেক্টর। এতে রয়েছে ৫৪টি বিল, ১২০টি কান্দা। এদের মধ্যে চটাইন্নার বিল, লেচুয়া মারা বিল, তারখাল, রোয়া বিল, হাতির গাতা বিল, রুপাবই, বেরবেরিয়া বিল, বাইল্লার ডুবি, তেকুন্না ও আন্না বিল উল্লেখযোগ্য। এই হাওর সম্পর্কে এর প্রত্যন্ত অঞ্চলের লোকমুখে শুনে আসছি একটি প্রবাদবাক্য ‘নয় কুড়ি কান্দা ছয়কুড়ি বিল’। বর্ষাকালে এ হাওরের পানি অন্যান্য হাওরের সাথে মিশে এক বিশাল আকার সাগরের রূপ ধারণ করে। হাওরের গাছপালাগুলো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকে পানির উপর। কিন্তু শীতকালে এটি দিগন্ত বিস্তৃত রূপ লাভ করে। এই হাওর বিশ্বব্যাপী জলজ জীববৈচিত্র্যের অন্যতম আধার হিসেবে খ্যাত। একে ‘মাদার ফিশারিজ’ হিসেবেও আখ্যা দেয়া হয়। অন্যান্য হাওরের তুলনায় এখানে জীববৈচিত্র্যের প্রাচুর্য ঘটার অন্যতম কারণ হচ্ছে এখানে সারা বছরই কম বেশি জলপ্রবাহ থাকে। নদী এবং খালের মাধ্যমে এ জলপ্রবাহ সম্পন্ন হয়। এখানে হিজল ও করচ গাছে জলাভূমির বনে পরিণত হয়। উজান থেকে বয়ে আসা পলির আস্তরণে হাওরের মাটি উর্বর হয়ে ওঠে। ফলে নানা প্রকার জলজ উদ্ভিদ জন্মে। এই জলজ উদ্ভিদের কিছু উদ্ভিদ পানিতে ভাসমান আর কিছু উদ্ভিদ পানিতে নিমজ্জিত। টাংগুয়াতে প্রাপ্ত জলজ উদ্ভিদের মধ্যে রয়েছে শাপলা, পদ্ম, চাঁদমালা, শিংড়া, কলমী, হাইড্রিলা অন্যতম। বড় বড় পাতা ও প্রস্ফুটিত পদ্মের অনবদ্য সৌন্দর্য ঢেউ খেলে যায় হাওরের জলে। চাঁদমালা ও শিংড়া যেন সবুজের আবরণ সৃষ্টি করে জলের উপর। শীতল সমীরে সবুজ ঘাসের উপর যেন উর্মিমালা ঢেউ খেলে যায়। সৌন্দর্য ছড়ায় রঙবেরঙের ফুলে। ফুলে ফুলে পাতায় পাতায় উড়ে বেড়ায় নানা প্রকার ফড়িং ও কীটপতঙ্গ। ঋতুর পালা বদলে পরিবর্তন হয়ে যায় টাংগুয়ার হাওরের পরিবেশ। ফলে জলজ উদ্ভিদগুলো পচে গিয়ে মাটির উর্বরতা আরো বৃদ্ধি করে। হাওরের বৃক্ষ জাতীয় উদ্ভিদের মধ্যে হিজল, করচ ও বরুণ অন্যতম। এগুলো জলাধারে কিংবা উঁচু কান্দার উপর জন্মে। এখানকার জলজ উদ্ভিদের খাদ্য ও আশ্রয়ে বেড়ে ওঠে অসংখ্য প্রাণী। উদ্ভিদের ফাঁকে ফাঁকে ঘুরে বেড়ায় নানা প্রজাতির মাছ। এদের মধ্যে দেখা যায় চিংড়ি, শামুক, ছোট ছোট ঝিনুক ও বিভিন্ন জাতের অমেরুদণ্ডী প্রাণী যা হাঁস বা পাখিদের খাদ্যের জোগান দিয়ে থাকে। তাই প্রতি বছর শীতকালে অসংখ্য পরিযায়ী পাখি টাংগুয়ার হাওরে এসে ভিড় জমায়। এদের সাথে গড়ে ওঠে দেশি পাখিদের গভীর মিতালি। লক্ষ লক্ষ পাখির কলকাকলিতে প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে টাংগুয়ার হাওর। সুদূর সাইবেরিয়া, চীন, মঙ্গোলিয়া, নেপালসহ অনেক দেশ থেকে আসে এসব অতিথি পাখি। বালিহাঁস, পানকৌড়ি, ডাহুক, কানা বক, লেন্জা হাঁস, সরালি, মাছরাঙ্গা ও গাংচিলের পাখার ঝাপটায় জলাশয়ে ঢেউয়ের দৃশ্য মনোমুগ্ধকর। চারিদিকে যেন শোর আওয়াজ দেশি পাখিদের কিচিরমিচির শব্দ। এই পাখিগুলোই হচ্ছে হাওর ব্যবস্থাপনার অন্যতম উপাদান। এখানে পানকৌড়ি, বালিহাঁস, কালেম ও বকের সংখ্যা অন্য যেকোন স্থানের চেয়ে তুলনামূলক বেশি। অনিন্দ সুন্দর এই কালেম পাখিগুলো দল বেঁধে জলজ উদ্ভিদে খাবারের সন্ধানে ঘুরে বেড়ায়। এদের বেগুনি পরশে হাওর সাজে নতুন রঙে। বেশির ভাগ সময়ে পানকৌড়িকে দেখা যায় রোদ পোহাতে। এরা পানিতে ডুবে ডুবে খাবার সন্ধান করে। এদের মত ডুবুরিকেও দেখা যায় ডুব দিয়ে খাবার খেতে। ডুব দিয়ে মাছ ধরতে এরা বেশ পটু। এখানে সহজেই দেখা মেলে নানা প্রজাতির বক। বড় বক, গো-বক, ছোট বক, ধূসর বক, কানিবক এদের মধ্যে অন্যতম। এরা পানিতে জলজ উদ্ভিদের উপর দাঁড়িয়ে শিকারের উপর তীক্ষè নজর রাখে আর সুযোগ পেলেই খপ করে ধরে ঢক ঢক করে গিলে ফেলে আস্ত মাছ। টাংগুয়ার হাওরের অন্যতম বাসিন্দা বিভিন্ন প্রজাতির হাঁস। এদের মধ্যে পাতিকুট, বালিহাঁস, লেন্জা হাঁস, মরচে রঙ্গের ভূতি হাঁস, পিয়াং হাঁস, পুরুষ জাতীয় গাডুয়াল, গিড়িয়া ও চখাচখি অন্যতম। এরা ঝাঁক বেঁধে খাবারের সন্ধানে উড়ে বেড়ায় টাংগুয়ার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। কখনো কখনো একাকী বা জোড়ায় জোড়ায় বিচরণ করতেও দেখা যায়। তবে বেশির ভাগ সময় এরা দলবদ্ধভাবে খাবার সংগ্রহ করে। হাইড্রিলা, পোকামাকড়, ছোট মাছ, শামুক, জলে নিমজ্জিত উদ্ভিদের বিভিন্ন অংশ এদের প্রধান খাবার। এদের কোন কোন ঝাঁকে হাজার হাজার সদস্য দেখা যায়। হাওরের অধিকাংশ অঞ্চল জুড়ে সরালির দল বিচরণ করতে দেখা যায়। কোন প্রকার ভয় পেলে আবার দল বেঁধে উড়ে যায়। টাংগুয়ার নল বন বন্য প্রাণীদের জন্য এক নিরাপদ আবাসস্থল। নলখাগড়ার ভেতরে প্রচুর পরিমাণে কীটপতঙ্গ থাকায় এখানে বাসা বাঁধে কালেম, বক, ফুটকি, সুইচুড়া, গুড়গুড়ি, ঘাস পাখি প্রভৃতি। মাঝে মধ্যে বন মোরগ বা মুরগি নল বনের ভেতর বিচরণ করতে দেখা যায়। খাদ্য গ্রহণের জন্য নল বনের বাইরেও বিচরণ করে। এখানে প্রচুর পরিমাণে নলখাগড়া থাকায় আগে মেছো বাঘ দেখা যেত কিন্তু এখন বিলুপ্ত প্রায়। তবে খেঁকশেয়ালের দল এখনো ঘুরে বেড়ায়। রাতের আঁধারে এদের হুক্কা হুয়া ডাকে হাওর মুখরিত হয়ে ওঠে। টাংগুয়ার হাওরে এখনো দেখা মেলে দেশের মহা বিপন্ন পালাসিকুরাইকল। গ্রাম্য ভাষায় যাকে কুড়া ঈগল নামে ডাকা হয়। এরা হিজল গাছের মগডালে বাসা বাঁধে। বড় গাছের মগডালই হলো এদের বিশ্রামের উপযুক্ত স্থান। বিস্তীর্ণ হাওরজুড়ে হাঁস-পাখিদের বিচরণ ছাড়াও এখানে বিভিন্ন প্রজাতির উভচর ও সরীসৃপ প্রাণীদের দেখা পাওয়া যায়। উদ্ভিদ ও প্রাণীর এমন সমাহারে সত্যিই টাংগুয়ার হাওর জীববৈচিত্র্যের এক অনন্য জলাভূমি। এছাড়া এটি মৎস্যসম্পদের এক বিশাল ভান্ডার। রুই, কাতলা, চিতল, কৈ, টাকি, শোল, কালি বাউস, পুঁটি, সরপুঁটি, রাজপুঁটি, চাপিলা, লইটকা, বাইল্লারা, টেংড়া, শিং, মাগুর, বোয়াল, আইড়, চিংড়ি, পাবদা, লাক্ষ্যা, ঘৈন্না, বাইন, সিলভার ও ঘাসকার্প ইত্যাদি মাছ অন্যতম। এ সবগুলোই টাংগুয়ার মিঠা পানির মাছ। এই হাওরের ৪টি বিলকে মৎস অভয়ারণ্য এবং ২টি বিলকে পাখির অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এই হাওরে ১৪১ প্রজাতির মাছ, ১১ প্রজাতির উভচর, ২৯ প্রজাতির সরীসৃপ, ২১৯ প্রজাতির পাখি এবং ১৯ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী রয়েছে। এসব অনন্য বৈশিষ্ট্যের জন্য ২০০০ সালের ২০ জানুয়ারি এটি পেয়েছে বাংলাদেশের ২য় রামসার সাইট ও পৃথিবীর ১০৩১তম রামসার সাইটের মর্যাদা। এই বিশাল প্রতিবেশ ব্যবস্থার জন্য এ অঞ্চলের মানবজীবনও টাংগুয়ার হাওরের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। টাংগুয়া মিশে আছে এ অঞ্চলের মানুষের জীবন ও ঐতিহ্যে। চাষাভুষা ও জেলে, মাঝিদের জীবনমান অনেকাংশেই নির্ভর করে এই টাংগুয়ার হাওরের উপর। বিশেষ করে শিংড়া ফল এ অঞ্চলের গরিব মানুষের অর্থ জোগায়। সুতরাং কথাটি যথার্থই যে, ‘আমার টাংগুয়া আমার জীবন’।

১৯৯৯ সালে এটিকে পরিবেশ সঙ্কটাপন্ন এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। তবে গত শতকের মধ্যভাগ থেকেই হাওরের চারপাশে গড়ে উঠতে থাকে জনবসতি। এই বাড়তি চাহিদা মেটাতে আল্লাহ প্রদত্ত মৎস্যসম্পদ, বৃক্ষ ও জলজ উদ্ভিদের অপরিকল্পিত আহরণ দিন দিন বাড়তেই থাকে। ফলে প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে আস্তে আস্তে কমে যাচ্ছে অতিথি পাখি ও বন্য প্রাণী। অবৈধ শিকারের জন্য হুমকির মুখে আমাদের দেশীয় প্রজাতির পাখি। কারেন্ট জালে আটকা পড়ছে মা মাছ ও পরিযায়ী পাখি। এর প্রভাব পড়ছে আমাদের সামগ্রিক প্রতিবেশ ব্যবস্থার উপর। তাই টাংগুয়ার হাওরের বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ সুরক্ষায় সচেতন হতে হবে আমাদের সবাইকে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ এ অঞ্চলটির জীববৈচিত্র্য রক্ষায় যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিতে হবে রাষ্ট্র ও আমাদের। ফলে পরিবেশ ও অর্থনৈতিকভাবে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র লাভবান হতে পারবে বলে আশা করা যায়।
বন্ধুরা আজ এই পর্যন্তই থাকল। যদি ঘুরে আসতে চাও তাহলে আর দেরি নয় চলে এসো টাংগুয়ার হাওর পাড়ে। মেতে উঠ আল্লাহর দেয়া প্রাকৃতিক সীমাহীন সৌন্দর্যে।

SHARE

Leave a Reply