Home গল্প স্বপ্নের দেশে -আহসান হাবিব বুলবুল

স্বপ্নের দেশে -আহসান হাবিব বুলবুল

জাহিদ সাহেবের ঘরে ফ্রিজ থাকলেও প্রতিদিন বাজার করা তার অভ্যাস। এটা তার আনন্দও বটে। প্রতিবেশী দু-একজন এ নিয়ে কানাঘুষা করলেও তিনি কিছু মনে করেন না। তিনি বলেন, টাটকা শাক-সবজি, মাছ-গোশত খাওয়ার স্বাদই আলাদা। ফ্রিজে জমিয়ে রাখা সব জিনিস তার রুচিতে ধরে না। তার ঘরে ফ্রিজ ব্যবহার হয় শুধু রান্না করা খাবার সংরক্ষণের জন্য। তাও আবার তিন দিনের বেশি হলে খাওয়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন তিনি। ছেলেমেয়েরাও হয়েছে তেমন। তাদের ভাষায়, ফ্রিজে জমানো খাবার মানেই বাসি খাবার। ওভেনে গরম করে দিলেও রুচিতে ধরে না কারও। ওদের মা বিরক্ত হয়ে বলেন, ঠিক বাপের মত হয়েছিস্ তোরা- ‘বাপকা বেটা, সেপাইকা ঘোড়া!’
জাহিদ হাসান। সরকারি চাকরি করেন। সৎ অফিসার। তিনি সময়ের মূল্য দেন। নিয়ম-শৃঙ্খলা মেনে চলেন। স্বাস্থ্যের প্রতি যতœ নেন। গ্রামে বৃদ্ধ বাবা-মা’র খোঁজ-খবর রাখেন। দেখভাল করেন তাদের। তিনি চান তার সন্তানরাও সেভাবে গড়ে উঠুক। তার দুই ছেলে এক মেয়ে। মেয়ে সবার ছোট। ওদের নাম শাহীন, রাগিব ও প্রীতি। ঢাকা শহরে পড়াশোনা করে ওরা। শাহীন সবার বড়। কলেজে পড়ছে। এবার উচ্চমাধ্যমিক প্রথম বর্ষ।
জাহিদ সাহেবের খুব ইচ্ছা ছিল, ছেলেরা তার সাথে বাজারে যাবে, বাজার করা শিখবে। বড় ছেলেকে দিয়ে তা হয়নি। শাহীনের কথা : আব্বু বাজারে গেলে অনেক দেখেশুনে দরদাম করে কেনাকাটা করেন। তার এত ধৈর্য নেই। তাছাড়া বাজারের ব্যাগ ধরতে তার খুব লজ্জা করে। বন্ধুরা যদি কেউ দেখে ফেলে।
বাবা শেষ পর্যন্ত বড় ছেলের আশা ছেড়েছেন। ওকে দিয়ে বাজার করানো হবে না। একদিন বাসায় মেহমান এসেছেন। মেহমান আর কেউ নন। শাহীনের খালা। খালাম্মা। উনি চিংড়ি দিয়ে মিষ্টি কুমড়া ভাজি খুব পছন্দ করেন। ঘরে চিংড়ি মাছ থাকলেও মিষ্টি কুমড়া নেই। মা বললেন, ‘শাহীন! বাবা যাও তো বাজারে গিয়ে এক ফালি বিলাতি নিয়ে এসো।’
শাহীন খালাম্মার খাতিরেই বাজারে গেল। কিন্তু বিলাতি কী জিনিস ও জানে না। দু-একটি দোকানে জিজ্ঞেস করলো কিন্তু কেউ কিছু বলতে পারল না। শাহীনের মা সিরাজগঞ্জের মেয়ে। সিরাজগঞ্জের স্থানীয় ভাষায় মিষ্টি কুমড়াকে বিলাতি কুমড়া বলা হয়।
শাহীন শেষ পর্যন্ত এক বন্ধুর দ্বারস্থ হলো। বন্ধু বললো, এটা কোনো ব্যাপার হলো। আয় আমরা ইন্টারনেটে সার্চ দিয়ে দেখি।
বেলা গড়িয়ে দ্বিপ্রহর। শাহীনের আর খবর নেই। মা চিন্তায় পড়ে গেলেন। খালা ফোন দিলেন: ‘হ্যালো! শাহীন কী করছ বাবা?’ ওপাশ থেকে ভেসে এলো, ‘খালামণি, বিলাতি কী জিনিস নেটে সার্চ দিয়ে দেখছি। কিছু পাচ্ছি না।’
মা-খালা হেসে কুটি কুটি। পরদিন বাবা বাজার থেকে তরতাজা একটা মিষ্টি কুমড়া কিনে এনে বললেন, শাহীন এই দেখ এইটা মিষ্টি কুমড়া। তোর মা’র বিলাতি। দিস ইজ এ পাম্পকিন। ছোট ছেলে রাগিবের ছোটবেলায় বাজারে যেতে বেশ আগ্রহ ছিল। এখন একটু বড় হচ্ছে আর আগের মত বাবার সাথে বাজারে যেতে চায় না। ওরও একই কথা-
– বাবা অনেক সময় নেন। দরদাম করেন। দেখে-শুনে কেনেন। তার ধৈর্যে কুলায় না। ও একা বাজারে যাবে। তাও ভালো যে, ওর একা বাজার করার আগ্রহ ও সাহস রয়েছে। কিন্তু ছোট বলে ওর হাতে টাকা দিয়ে বাজারে পাঠাতে সাহস করেন না বাবা-মা। তবে বাড়ির কাছের দোকানের কোনো কেনাকাটা হলে রাগিবই যায় কেনাকাটা করতে।
একদিন সকালে বিপত্তিটা রাগিবের ভাগ্যেই ঘটলো। মা নাস্তার জন্য পাউরুটি কিনে আনতে পাঠিয়েছেন। রাগিব যথারীতি একটি পাউরুটি কিনে নিয়ে এলো। কিন্তু পাউরুটিটি ছিল মেয়াদোত্তীর্ণ। নষ্ট হয়ে গেছে। আব্বু হতাশ হলেন। ছেলেকে ভর্ৎসনা করলেন, ‘ক্লাস সেভেনে পড়ছ, এতটুকু সচেতনতা নেই তোমার? ব্রেডের উৎপাদন ও মেয়াদের তারিখ দেখে আনবে না!’
: আমি তো দোকানদারকে বিশ্বাস করেছি। ও আমাকে এ রকম বাজে জিনিস দিয়ে দিল!
: বিশ্বাস কাউকে না কাউকে করতে হবে। তাই বলে তুমি সচেতন ও দায়িত্বশীল হবে না? অতীতে মুসলমানদের বিজয়ের কারণ কী ছিল জান? তারা নিজেরা ঠকতো না এবং অন্যকেও ঠকাতো না।
– আম্মু পাউরুটি ফেরত দিয়ে আসতে বললেন।
রাগিবের পা উঠছিল না। কিভাবে পাউরুটি ফেরত দেবে? সংকোচ! পাছে লোকে কিছু বলে অবস্থা! শেষে বাবা-ই রুটি ফেরত দিতে বের হলেন।
ছোট ভাইয়ার অবস্থা দেখে প্রীতির খুব খারাপ লাগছিল। ভাইয়াকে যে কি বলে সান্ত¡না  দেবে খুঁজে পাচ্ছিল না। বড় ভাইয়ার রুমের দিকে একবার তাকালো। ও রাত জেগে পড়াশুনা করে তাই এখনও ঘুমাচ্ছে। প্রীতি ভাবলো, বড় ভাইয়াকে বলবে ও যেন দোকানিকে বকা দিয়ে দেয়।
সন্ধ্যায় প্রীতি ছোট ভাইয়ার পড়ার টেবিলে এসে বসে।
: ভাইয়া তোমার মন খারাপ?
: মোটেই না। কেন?
: ওই যে সকালে আব্বু তোমাকে বকা দিলেন।
: আব্বু তো ঠিকই বলেছেন। ভুল তো আমারই।
: ভাইয়া! মানুষ খাদ্যে ভেজাল মেশায় কেন?
ফলমূল পাকাতে বিষ দেয় কেন? সেদিন মামা আম নিয়ে এলেন কত শখ করে, তা খাওয়াই গেল না!
: লোভ, লোভ বুঝলি। সবাই বেশি মুনাফা করতে চায়। লোভ মানুষকে পাপাচারে লিপ্ত করে। প্রীতি জানিস! আমি ওষুধের দোকানে ফরমালিন পরীক্ষার কিট বক্স দেখেছি। কিনবো ভাবছি। এখন আমরা নিজেরাই খাদ্যে, ফলমূলে ফরমালিন আছে কিনা তা পরীক্ষা করতে পারবো। বাজারে যখন যাবো কিট বক্সটা নিয়ে যাবো।
: সে সাহস তোমার আছে? দোকানিরা যদি তোমার সাথে ঝগড়া লাগিয়ে দেয়!
: কেন, আব্বুর সাথে যাবো।
: আচ্ছা ভাইয়া চারদিকে এত খারাপ খবর! কোনো ভালো খবর নেই?
: আপাতত একটা ভালো খবর আছে। আম গবেষণা কেন্দ্র আমের ক্যালেন্ডার তৈরি করেছে। ক্যালেন্ডারে কোন আম কোন মাসের কত তারিখে পাকবে এবং বাজারজাত করা যাবে তা বলা আছে। মাস ক্ষণ দেখে আম কিনলে ঠকার ঝুঁকি কমে যাবে। যারা আগাম আম পাকাতে বিষ ব্যবহার করবে তারা জব্দ হবে।
– মা আড়াল থেকে ছেলে-মেয়ের কথা শোনেন। গর্বে তার বুকটা ভরে ওঠে। উনি ভাবেন, ওদের বাবাকে বলবেন, কে বলে আমাদের রাগিব কম বোঝে! ও অনেক খবর রাখে। ভালো-মন্দের বিচার করতে জানে।’
মাকে এগিয়ে আসতে দেখে ওরা কথা থামায়।
: কথা বন্ধ করতে হবে না। আমি সব শুনেছি। তোমরা খুব ভালো বলছিলে। লোভ-লালসার ঊর্ধ্বে উঠে আমাদের জীবন গড়তে হবে। অপরের কল্যাণ ও মঙ্গল চিন্তা করতে হবে।
: কিন্তু আম্মু তা হচ্ছে কই? সবাই তো নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত। সবাই পেতে চায়। রাতারাতি বড়লোক হতে চায়।
: এই তোমরা যেমন ভালো চিন্তা করছ, তোমাদের দ্বারা তোমাদের বন্ধুরা প্রভাবিত হবে। তখন ওরাও কল্যাণ চিন্তা করবে। এভাবে একদিন সবাই একে অপরের জন্য কাজ করবে। সেদিন দেখবে শান্তি নেমে আসবে।
গ্রীষ্মের দাবদাহ চলছে। হঠাৎ লোডশেডিংয়ে অন্ধকার নেমে আসে। আইপিএস কাজ করছে না। ব্যাটারি ডাউন। গরমে জীবন ওষ্ঠাগত। দখিনা বাতায়ন পাশে হাসানাহেনার পাঁপড়িগুলো দুলে দুলে উঠছে। আহ, কী আনন্দ! স্নিগ্ধ বাতাস। গা-টা জুড়িয়ে যায়। ঝিঁ ঝি পোকার একটানা শব্দ রাতের নীরবতা ভাঙছে। না, কিছুতেই ঘুম আসছে না।
বেরিয়ে পড়া যাক। তারেক, আলো, তপন ওদেরও আসার কথা। হয়তো এতক্ষণে এসে গেছে। ওরা ক’বন্ধু মিলে অনেকটা পথ হাঁটলো। ধীরে ধীরে চিরচেনা শহরটা অচেনা হয়ে গেল। তারপরও মনে হলো কত না আপন এ জনপদ। মনে হলো কোনো গ্রামীণ শহর। ইট পাথরের বাড়িঘর দালানকোঠা সবুজে সবুজে ঢাকা। ফুলে ফুলে সাজানো। ছায়া সুনিবিড়। শপিংমল, শিশুপার্ক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রেস্তোরাঁ সবই আছে এখানে। পিচঢালা মেঠো পথের বাঁকে গাছের নিচে বসার জায়গা। সব যেন মনের মাধুরী মিশিয়ে তৈরি করেছেন কোনো এক শিল্পী। হঠাৎ দূর থেকে প্রীতিকে দেখে চিৎকার করে ডাকতে থাকে রাগিব। ও বন্ধুদের থেকে আলাদা হয়ে পড়ে। প্রীতি দৌড়ে এসে ভাইয়ার হাত ধরে।
: প্রীতি! তুই এখানে কিভাবে এলি!
: আমারও ভালো লাগছিল না। তাই তোমার পিছু নিয়েছি।
: যদি হারিয়ে যেতিস!
: জায়গাটা কত সুন্দর তাই না ভাইয়া! এখানে হারিয়ে যেতে নেই মানা।
: প্রীতি হঠাৎ চিৎকার করে ওঠে, ‘ভাইয়া দ্যাখো দ্যাখো এই গ্যালারি শপটা কত সুন্দর! চলো না ভেতরে যাই।’
: ওরা সামনে এগিয়ে যায়। নিয়নবাতির আলোয় সাইনবোর্ডের লেখা দ্যুতি ছড়াচ্ছে।
‘গিফট গ্যালারি-
শুধু শিশুরা প্রবেশ করতে পারবে…’
রাগিব প্রীতির হাত ধরে ভেতরে প্রবেশ করে। দারোয়ান কোনো বাধা দেয় না, এ কি এ দোকানের ক্রেতারা সবাই শিশু! কোনো সেলসম্যান নেই। কোনো ম্যানেজার নেই। শিশুরা নিজেদের পছন্দমতো জিনিস সংগ্রহ করে পণ্যের গায়ে মুদ্রিত মূল্য দেখে ক্যাশ বাক্সে টাকা রেখে যাচ্ছে। রাগিব ভাবে, এও কি সম্ভব! হ্যাঁ, সম্ভব। শিশুরা পবিত্র। ওরা ফুলের মত। ওরা অন্যকে ঠকাতে পারে না। তাই তো ওরা যথারীতি মূল্য পরিশোধ করছে ক্যাশ বাক্সে। এই শিশুরা যেদিন বড় হবে সেদিন ওরাও কাউকে ঠকাবে না। ওরা যেন সেই ট্রেনিংই পাচ্ছে এখানে। কার এই বিজনেস আইডিয়া! কোন সে মহান ব্যক্তি! তার নাম জানতে ইচ্ছে করে রাগিবের।
প্রীতি পছন্দের কিছু জিনিস হাতে তুলে নেয়।
: ভাইয়া এগুলো আমি কিনতে চাই।
: রাগিব ওগুলোর দাম দেখে অন্যদের মতো টাকা বাক্সে প্রদান করে।
এবার বিদায়ের পালা। দোকানের স্বয়ংক্রিয় লাউড স্পিকারে শিশুদের ধন্যবাদ জানানো হয় কেনাকাটার জন্য। খুশি হয়ে যায় ওরা। ততক্ষণে পত্রিকা হকারের কলিংবেলের শব্দে ঘুম ভেঙে যায় রাগিবের। দেখে ভোর হয়ে গেছে। হলুদ বরণ আলোর আভা জানালার সিক গলিয়ে ভেতরে প্রবেশ করছে। ভেনটিলেটারে দু’টি চড়ুই পাখি কিচিরমিচির শব্দ তুলছে!

SHARE

Leave a Reply