Home দেশ-মহাদেশ মধ্যপ্রাচ্যের সমৃদ্ধশালী দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাত -মুহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম

মধ্যপ্রাচ্যের সমৃদ্ধশালী দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাত -মুহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম

সংযুক্ত আরব আমিরাত পারস্য উপসাগরের আরব উপদ্বীপের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে পশ্চিম এশিয়ার একটি চুক্তিবদ্ধ সার্বভৌম রাজতান্ত্রিক দেশ। আরবি নাম দওলত আল-ইমারাত আল-আরাবিয়াহ আল-মুত্তাহিদাহ। কখনও কখনও দেশটিকে সংক্ষেপে শুধুমাত্র আমিরাত (আল-ইমারাত) বা ইউএই বলা হয়। এদেশের সীমান্তে রয়েছে পূর্বে ওমান, দক্ষিণে সৌদি আরব, পশ্চিমে কাতারের সাথে সমুদ্রসীমা এবং উত্তরে ইরান। সংযুক্ত আরব আমিরাতের আয়তন ৮৩ হাজার ৬ শ’ বর্গ কিলোমিটার (৩২ হাজার ৩ শ’ বর্গমাইল)। জনসংখ্যা সিআইএর হিসাব অনুযায়ী, ২০১৬ সালের মাঝমাঝি পর্যন্ত ৫৯ লাখ ২৭ হাজার ৪৮২ জন। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, দেশটির মোট জনসংখ্যা ৯২ লাখ ৬৭ হাজার। তবে মোট জনসংখ্যার ৮৫ শতাংশই অভিবাসী। জাতিগত গ্রুপের মধ্যে রয়েছে আমিরাতি ১৯ শতাংশ, অন্যান্য আরব ও ইরানি ২৩ শতাংশ, দক্ষিণ এশীয় ৫০ শতাংশ, অন্যান্য প্রবাসী ৮ শতাংশ। প্রধান ভাষার মধ্যে রয়েছে আরবি (সরকারি), পারসি, ইংরেজি, হিন্দি ও উর্দু। প্রধান ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে রয়েছে মুসলিম ৭৬ শতাংশ, খ্রিষ্টান ৯ শতাংশ এবং অন্যান্য ১৫ শতাংশ।
মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা)-এর আমলেই আরব উপদ্বীপের উত্তর-পূর্ব প্রান্তের এই অঞ্চলে ইসলামের বিস্তার ঘটে বলে বিশ্বাস করা হয়ে থাকে। মহানবীর হিজরতের নয় বছর পর ৬৩০ খ্রিষ্টাব্দে ওমানের শাসকদের কাছে ইসলাম গ্রহণের আহবান জানিয়ে যে পত্র পাঠিয়েছিলেন তার পরপরই এ অঞ্চলে ইসলাম ছড়িয়ে পড়ে। ঐ চিঠির পর একদল শাসক মদিনা ভ্রমণে গিয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং পরবর্তীতে অজনপ্রিয় সাসানীয়দের বিরুদ্ধে সফল গণঅভ্যুত্থান ঘটান। এই অঞ্চল তখন সাসানীয়দের শাসনাধীন ছিল।
সংযুক্ত আরব আমিরাত মূলত সাতটি স্বাধীন রাষ্ট্র বা আমিরাতের একটি ফেডারেশন বা চুক্তিবদ্ধ রাষ্ট্র। এগুলো এক সময় ট্রুসিয়াল স্টেটস নামে পরিচিত ছিল। ১৯৭১ সালে দেশগুলো স্বাধীনতা লাভ করে এবং ২রা ডিসেম্বর আমিরাত প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিটি আমিরাত একটি উপকূলীয় জনবসতিকে কেন্দ্র করে আবর্তিত এবং ঐ লোকালয়ের নামেই এর নাম। আবুধাবি শহর ফেডারেশনের রাজধানী এবং দুবাই দেশের বৃহত্তম শহর। সংবিধিবদ্ধ আমিরাতগুলোর মধ্যে আবুধাবি দেশের মোট আয়তনের ৮৬.৭ শতাংশ, আজমান ০.৩ শতাংশ, দুবাই ৫ শতাংশ, ফুজাইরাহ ১.৫ শতাংশ, রাস আল-খাইমাহ ২.২ শতাংশ, শারজাহ ৩.৩ শতাংশ এবং উম্ম আল-কুওয়াইন ০.৯ শতাংশ। প্রত্যেক আমিরাতই সার্বভৌম আমির দ্বারা শাসিত হয়। একত্রে তারা যৌথভাবে ফেডারেল সুপ্রিম কাউন্সিল গঠন করেন। আমিরগণের মধ্যে একজন সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। সুপ্রিম কাউন্সিলের দ্বারা নির্বাচিত হলেও দেশটির প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর পদ অনেকটা উত্তরাধিকারমূলক। আবুধাবির আমির প্রেসিডেন্ট এবং দুবাইয়ের আমির প্রধানমন্ত্রী হন। সংযুক্ত আরব আমিরাতের বর্তমান প্রেসিডেন্ট হলেন খলিফা বিন জায়েদ আল-নাহিয়ান এবং প্রধানমন্ত্রী মুহাম্মদ বিন রশিদ আল-মাকতুম।
আমিরাতের তেল মজুদ বিশে^ সপ্তম এবং প্রাকৃতিক গ্যাস মজুদ বিশ্বে ১৭তম। দেশটি তার তেল ও গ্যাস থেকে অর্জিত রাজস্ব দিয়ে স্বাস্থ্য পরিচর্যা, শিক্ষা ও অবকাঠামোর পর্যাপ্ত উন্নতি সাধন করেছে। আমিরাতের সবচেয়ে জনবহুল নগরী দুবাই একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক নগরী এবং আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলের কেন্দ্র।
সংযুক্ত আরব আমিরাত মরুময় দেশ। ১৯৫০-এর দশকে পেট্রোলিয়াম আবিষ্কারের আগ পর্যন্ত সংযুক্ত আরব আমিরাত মূলত ব্রিটিশ সরকারের অধীন কতগুলো অনুন্নত এলাকার সমষ্টি ছিল। খনিজ তেল শিল্পের বিকাশের সাথে সাথে এগুলোর দ্রুত উন্নতি ও আধুনিকায়ন ঘটে, ফলে ১৯৭০-এর দশকের শুরুতে আমিরাতগুলো ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে আসতে সক্ষম হয়। দেশের খনিজ তেলের বেশির ভাগ আবুধাবিতে পাওয়া যায়, ফলে এটি সাতটি আমিরাতের মধ্যে সবচেয়ে ধনী ও শক্তিশালী। তেল শিল্পের কারণে এখানকার অর্থনীতি স্থিতিশীল এবং জীবনযাত্রার মান উন্নত। এদেশের মুদ্রার নাম দিরহাম।
সংযুক্ত আরব আমিরাতে প্রথম মানববসতির সন্ধান পাওয়া যায় খ্রিষ্টপূর্ব ৫৫০০ শতাব্দী থেকে। তৎকালে বহির্বিশ্বের সাথে যোগাযোগ বলতে উত্তর-পশ্চিমের মেসোপটেমিয়ার সভ্যতার সাথে যোগাযোগের প্রমাণ পাওয়া যায়। হাজর পর্বতে প্রাপ্ত তামা দিয়ে ব্যবসার মাধ্যমে ৩০০০ খ্রিষ্টপূর্ব থেকে মেসোপটেমিয়ার সাথে এই যোগাযোগ দীর্ঘস্থায়ী ও বিস্তৃত হয়। প্রথম শতাব্দী থেকে স্থলপথে সিরিয়া ও ইরানের দক্ষিণাংশের সাথে যোগাযোগ শুরু হয়। পরবর্তীতে ওমানা বন্দরের (বর্তমান ওম্ম-আল-কোয়াইন) এর মাধ্যমে সমুদ্রপথে ভারতের সাথে যোগাযোগ শুরু হয়।
দুবাই সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাতটি প্রদেশের মধ্যে দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রদেশ। ১৮৩৩ সাল থেকে দুবাই শাসন করে আসছে আল মাকতুম পরিবার। দুবাইয়ের বর্তমান শাসকের নাম মুহাম্মদ বিন রশিদ আল মাকতুম, পাশাপাশি তিনি সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রধানমন্ত্রী ও উপ-রাষ্ট্রপতির দায়িত্বও পালন করছেন। দুবাইয়ের প্রধান রাজস্ব আয় আসে পর্যটন, রিয়েল এস্টেট এবং অর্থনৈতিক সেবা খাত থেকে।
বুর্জ খলিফা : বর্তমানে পৃথিবীর গগনচুম্বী অট্টালিকা বা উচ্চতম ভবন এই বুর্জ আল খলিফা। সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই শহরে অবস্থিত এই ভবনটি ২০১০ সালের ৪ঠা জানুয়ারি উদ্বোধন করা হয়। এটি ‘দুবাই টাওয়ার’ নামেও পরিচিত। নির্মাণকালে এর বহুল প্রচারিত নাম বুর্জ দুবাই থাকলেও উদ্বোধনকালে নাম পরিবর্তন করে ‘বুর্জ খলিফা’ রাখা হয়।
এটির উচ্চতা ৮১৮ মিটার বা ২,৭১৭ ফুট (প্রায় আধা মাইল)। এটি তাইওয়ানের তাইপে ১০১ টাওয়ার থেকে ১,০০০ ফুটেরও বেশি উঁচু। ‘তাইপেই ১০১’ ভবনটির উচ্চতা ১,৬৬৭ ফুট। ২০০৪ থেকে ২০০৯ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত এটিই ছিল পৃথিবীর উচ্চতম স্থাপনা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে অবস্থিত উইলিস টাওয়ারটি ১,৪৫১ ফুট উঁচু। ‘বুর্জ খলিফা’ এতই উঁচু একটি ভবন যে নিচতলা আর সর্বোচ্চ তলার মধ্যে তাপমাত্রার পার্থক্য ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
‘বুর্জ খলিফার’ নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০০৪ খ্রিষ্টাব্দে, আর কাজ শেষ হয় ২০০৯ খ্রিষ্টাব্দে। এটি তৈরিতে প্রায় ১.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় হয়। এর বহিঃপ্রাঙ্গণে অবস্থিত ফোয়ারা নির্মাণেই ব্যয় হয় ১৩৩ মিলিয়ন ব্রিটিশ পাউন্ড। এই ভবনে ১,০৪৪টি বাসা (অ্যাপার্টমেন্ট) আছে; ১৫৮তলায় আছে একটি মসজিদ; ৪৩তম এবং ৭৬তম তলায় আছে দু’টি সুইমিং পুল। আরো আছে ১৬০ কক্ষবিশিষ্ট একটি হোটেল। ১২৪তম তলায় দর্শকদের জন্য প্রকৃতি দর্শনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ ভবনে সংস্থাপিত কোনো কোনো লিফটের গতিবেগ ঘণ্টায় ৪০ মাইল। ২০০৪ খ্রিষ্টাব্দে শিলান্যাসের পর থেকে অতি দ্রুত নির্মাণকাজ অগ্রসর হয়। এমনও দিন গেছে যে দিন ১২ হাজার নির্মাণকর্মী একযোগে নির্মাণপ্রক্রিয়া নিযুক্ত ছিলেন। সে সময় প্রতি তিন দিন পর পর একটি ছাদ তৈরি করা হয়।
দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর যাত্রী চলাচলের ক্ষেত্রে বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত বিমানবন্দর। ২০১৪ সালে দুবাই বিমানবন্দর যাত্রী চলাচলে লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দরকেও ছাড়িয়ে যায়। সংযুক্ত আরব আমিরাতে দেশব্যাপী ১,২০০ কিলোমিটার রানওয়ে রয়েছে। এর মাধ্যমে সকল প্রধান নগরী ও বন্দর যুক্ত। দুবাই মেট্রো আরব উপদ্বীপে প্রথম শহুরে ট্রেন নেটওয়ার্ক। আমিরাতের প্রধান সমুদ্রবন্দরগুলোর মধ্যে রয়েছে খলিফা বন্দর, জায়েদ বন্দর, পোর্ট জেবেল আলি, পোর্ট রশিদ, পোর্ট খালিদ, পোর্ট সাঈদ ও পোর্ট খর ফাক্কান।
সংযুক্ত আরব আমিরাতে গাড়ি দৌড়, ক্রিকেট, ফুটবল, টেনিস, গলফ, বাজপাখি দিয়ে পাখি শিকার, এক আসনের গাড়িদৌড় ইত্যাদি নানা ধরনের খেলা জনপ্রিয়। তবে উটের শিশুজকি নিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে সমালোচনা হওয়ায় উট দৌড়ের খেলাটি বলা চলে প্রায় বন্ধই হয়ে গেছে। এছাড়া অন্যান্য খেলার জন্য আমিরাতে নানা চমৎকার স্থাপনা রয়েছে। গাড়িদৌড়ের জন্য রয়েছে সুদৃশ্য ইয়াস মারিনা সার্কিট। এই খেলাটি সন্ধ্যায় অনুষ্ঠিত হয়। দুবাই আমিরাতে রয়েছে দু’টি গলফ কোর্স : দুবাই গলফ ক্লাব ও আমিরাত গলফ ক্লাব।
ফুটবল : ফুটবল সংযুক্ত আরব আমিরাতের জনপ্রিয় খেলা। এদেশে সাত-আটটি নামকরা ফুটবল টিম আছে এবং এগুলোর আঞ্চলিক চ্যাম্পিয়ন হওয়ার ইতিহাস আছে। আমিরাতের জাতীয় ফুটবল দল ১৯৯০ সালে ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবলে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে। আমিরাত ২০০৭ ও ২০১৩ সালে গালফ কাপ চ্যাম্পিয়ন হয়। ২০১৯ সালে এদেশে এএফসি এশিয়ান কাপ ফুটবল অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা।
ক্রিকেট : সার্কভুক্ত দেশসমূহ, যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়ার প্রবাসী জনসংখ্যার কারণে সংযুক্ত আরব আমিরাতে ক্রিকেট অন্যতম জনপ্রিয় খেলা। এদেশে প্রায়ই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ম্যাচ হয়ে থাকে। শারজাহ ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন স্টেডিয়াম, আবুধাবির শেখ জায়েদ ক্রিকেট স্টেডিয়াম, দুবাইয়ের দু’টি ক্রিকেট স্টেডিয়াম ও ডিএসসি ক্রিকেট স্টেডিয়াম এদেশের উল্লেখযোগ্য স্টেডিয়াম। তাছাড়া আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল দুবাইয়ে অবস্থিত। আমিরাতের জাতীয় ক্রিকেট টিম ১৯৯৬ ও ২০১৫ সালে বিশ্বকাপ ক্রিকেটে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে। নিরাপত্তাজনিত কারণে পাকিস্তানে এখন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলা বন্ধ থাকায় শারজাহ এখন পাকিস্তানের হোমগ্রাউন্ড হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

SHARE

Leave a Reply