Home চিত্র-বিচিত্র জোনাক জ্বলে কেমন করে -নুসাইবা মুমতাহিন

জোনাক জ্বলে কেমন করে -নুসাইবা মুমতাহিন

“জোনাক জ্বলা আলোর মেলা
ভাসিয়ে দিল খুশির ভেলা!”

জোনাকি পোকার আলো দেখে মুগ্ধ হননি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া ভার। রাতের অন্ধকারে তাদের মিটিমিটি আলো দেখলে মনে হবে পৃথিবীতে আকাশের তারা নেমে এসেছে!
জোনাকি পোকা সম্পর্কে আজ আমরা চমৎকার কিছু বিষয় জানবো।
জোনাকি এক ধরনের পোকা। বিটিল শ্রেণীর এই পোকাকে ইংরেজিতে বলে লাইটিং বাগ বা স্কয়ার ফ্লাই।
বিটিল পোকাদের আছে অনেক ভাগ। শুধু ল্যামপাইরিডি পরিবারের পোকাদেরই জোনাকি পোকা বলা হয়।
যদিও ফ্লাই মানে মাছি, তবে এরা কেউই আসলে মাছি নয়।
ছোট কালচে বাদামি রঙের পোকা, একটু লম্বাটে গড়নের। পোকার পেটের পেছনে থাকে সেই আলো জ্বলা অংশ।
আমাদের দেশ থেকে শুরু করে মালয়েশিয়াসহ আমেরিকা পর্যন্ত অনেক দেশেই জোনাকি পোকা আছে। পৃথিবীতে প্রায় ২০ হাজার প্রজাতির জোনাকি পোকা আছে। এরা একেবারেই সাদাসিধে পতঙ্গের মতো।
জোনাকি পোকা সাধারণত লম্বায় এক ইঞ্চিরও কম, দুই সেন্টিমিটার। পাখা আর মাথায় হলুদ লম্বা দাগ আছে। ছয়টা পা, দুটো অ্যান্টেনা, অক্ষিগোলক আর শরীরটা তিনভাগে বিভক্ত।
প্রতিটি জোনাকির শরীরের শেষ ভাগে একটা করে বাতি থাকে। শরীরের এই অংশে আলো জ্বলে।
প্রত্যেক প্রজাতির জোনাকি পোকার আলো কিন্তু একরকম নয়, আলাদা। কোনো কোনো জোনাকি পোকার আলোর রঙ সবুজ, কারো আলো হলুদ আবার কারো কমলা। শুধু রঙই আলাদা নয়, ওদের আলোর সঙ্কেতও ভিন্ন ভিন্ন।
নানা দেশে ইংরেজিতে এরা অনেক নামে প্রচলিত।
ফায়ার ফ্লাই, ফায়ার ফ্লাই বিটল, গ্লো ওয়ার্স, গ্লো ফ্লাই, মুন বাগ, লাইটেনিং বাগ, গোল্ডেন স্পার্কলার।
জাপানিজরা হোটারু, জ্যামাইকানরা বিৎলংকি, মালয়ালামরা মিন্না-মিন্না, স্প্যানিশরা লুইসিয়ের নাগা, পর্তুগিজরা লাগা লাম, মালয়রা কেলিপ-কেলিপ, কুনাং কুনাং, অ্যাপি-অ্যাপি, জার্মানিরা লুশেটক্যাকার, ফরাসিরা লুসিয়ল, ইতালিয়ানরা লুসিঅলা এবং থাইরা হিং হোয় বলে ডাকে।
তোমরা খেয়াল করে দেখবে জোনাকিরা অনবরত আলো জ্বালায় না। আলো জ্বলে এবং নিভে। জোনাকি পোকা অনেক প্রজাতির হয়। কিন্তু এক প্রজাতির পোকার সাথে অন্য প্রজাতির আলোক সঙ্কেত হুবহু মেলে না। তাই নির্দিষ্ট প্রজাতির জোনাকি পোকারাই সেসব আলোক সঙ্কেত চেনে। আলোক সঙ্কেত চিনতে না পারলেই বিপদ। এক প্রজাতির আলোক সংকেতকারী জোনাকি ভিন্ন প্রজাতির আলোক সংকেতকারী জোনাকির সাথে বন্ধুত্ব করতে পারে না। এটা তাদের জন্য ভয়াবহ অন্যায়। যদি এমনটা হয় তাহলে তারা অন্য প্রজাতির জোনাকিকে ফাঁদে ফেলে মেরে ফেলে।
আসলে জোনাকি পোকারা আলো জ্বেলে একে অপরের সঙ্গে সংকেত আদান প্রদানের মাধ্যমে কথা বলে। ভাব বিনিময় করে। আলো না জ্বললে এটা কখনো সম্ভব হতো না।
এতক্ষণ জেনেছি জোনাকির আলো তাদের কতটা গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু মনে মনে একটা কৌতূহল রয়েই যায়। তা হলো জোনাকির আলো কিভাবে জ্বলে।
জোনাকির এই আলো জ্বলার একটি রহস্য আছে। ওদের পেছনে বা লেজে দুটো রাসায়নিক পদার্থ থাকে। লুসিফেরাজ ও লুসিফেরিন।
লুসিফেরাজ একটি এনজাইম যা আলো ছড়ায়। আর লুসিফেরিন তাপ প্রতিরোধী যা আলোকে ঠাণ্ডা রাখে। জোনাকি পোকারা তার শক্তির শতভাগই আলোতে পরিণত করতে পারে। অন্যদিকে একটি সাধারণ বৈদ্যুতিক বাতি তার শক্তির মাত্র দশ ভাগ আলোতে পরিণত করতে পারে, বাকি নব্বই ভাগ শক্তিই তাপে পরিণত হয়। সে জন্য জোনাকির আলোতে কোনো তাপ হয় না।
জোনাকি সাধারণত ভেজা জায়গা পছন্দ করে। তাই পানির কাছে তারা বাসা বানায়। পুকুর, ডোবা, নালা, খাল-বিল এগুলোর পাশে বেড়ে ওঠা ঝোপে-ঝাড়ে জোনাকি বাসা বাঁধে। লম্বা ঘাস ওদের পছন্দ। সেসব ঘাস বা ঝোপের গাছেই ওরা থাকে। গাছই ওদের ঘরবাড়ি। তবে ওদের সবসময় গাছে দেখা যায় না। দিনের বেলায় লুকিয়ে থাকে গাছের বাকলের তলে, গাছের ফাটলে বা গর্তে, শুকনো পাতার নিচে, ঘাসে। রাত হলেই এরা বেরিয়ে আসে। শীতেও জোনাকিদের তেমন দেখা যায় না।
জোনাকিরা স্যাঁতস্যাঁতে জায়গা পছন্দ করে। কোনো কোনো প্রজাতির জোনাকি পোকার বাচ্চারা পানিতে থাকে এবং সেখানে মাছের মতোই তারা প্রায় বছরখানেক বেঁচে থাকে।
অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশ ছাড়া পৃথিবীর আর সব মহাদেশেই জোনাকি দেখা যায়।
জোনাকি পোকার খাবারেও বৈচিত্র্য দেখা যায়। বাচ্চা জোনাকিরা কেঁচো, শামুকের বাচ্চা ও পচা জায়গায় থাকা অন্যান্য পোকার বাচ্চা খায়। বাচ্চারা দেখতে অনেকটা শুকনো পাতার মতো হয়। তবে খুবই ছোট। বাচ্চাদের মুখে কাঁচির মতো সূক্ষ্ম ধারালো অঙ্গ রয়েছে। সেটা দিয়ে তারা শত্রুকে ঘায়েল করে।
বড় হবার পর বাচ্চাদের চেহারা বদলে যায়। তখন তারা আলো জ্বালাতে শুরু করে। কোনো কোনো প্রজাতির জোনাকির বাচ্চা এমনকি ডিম থেকেও আলো বের হয়। বড় হয়ে তারা গাছে গাছে পরাগরেণু ও মধু খায়। বড় হবার পর জোনাকিরা কয়েক মাস বাঁচে। স্ত্রী জোনাকি ডিম দেয়ার সাথে সাথে মারা যায়। পুরুষ জোনাকি তারও আগে মারা যায়।
জোনাকিদেরও শত্রু আছে। ওদের কেউ শিকার করতে এলে জোনাকিরা এক ফোঁটা রক্ত ছেড়ে দেয়। সেই রক্তবিন্দু যেমন তিতা তেমনি বিষাক্ত! তাই ওদের কেউ শিকার করতে আগ্রহ দেখায় না। এমনকি টিকটিকি সাপও ওদের শিকার করতে সাহস পায় না।
গবেষকরা বলছেন, পৃথিবীতে জোনাকির সংখ্যা কমে যাচ্ছে। এর প্রধান কারণ আলো দূষণ। আলো দূষণ বিষয়টা তোমাদের কাছে অদ্ভুত লাগতে পারে। রাতের বেলা ঝলমলে আলোর কারণে নিশাচর প্রাণীসহ নানা রকম পোকা ও প্রাণীর অসুবিধা হয়। আর এটিই হচ্ছে আলো দূষণ। এই আলো দূষণের কারণেই নিশাচর প্রাণীর সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে।
তাই আমাদের উচিত আলো দূষণ কমিয়ে ফেলা। আল্লাহর এই বৈচিত্র্যময় সৃষ্টিকে রক্ষা করা। তবেই তো আমরা বিস্ময়কর আলোক পোকা জোনাকির সৌন্দর্য উপলব্ধি করতে পারব! মহান রবের শুকরিয়া আদায় করতে পারব!

SHARE

Leave a Reply