Home নিবন্ধ ছড়া কবিতায় বৈশাখ -সাকী মাহবুব

ছড়া কবিতায় বৈশাখ -সাকী মাহবুব

বৈশাখ বাংলা বছরের প্রথম মাস। বৈশাখকে ঘিরে গোটা বাংলায় চলে আনন্দ-উৎসব।
কবি সাহিত্যিক ছড়াকারগণ বৈশাখ বিষয়ে আন্দোলিত হন। তারা গদ্যে, কাব্যে ও ছড়ায় বৈশাখের প্রতি ভালোবাসা নিবেদন করেন। ধ্বংস-সৃষ্টি, বিরহ-আনন্দ, সুখ-দুঃখ, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি সব কিছু উঠে আসে শিল্পীদের বিভিন্ন প্রকার শিল্পের বাঁকে বাঁকে। সাহিত্যে বৈশাখের পদচারণা ব্যাপক। বৈশাখের পটভূমি নিয়ে বাংলা সাহিত্যে রচিত হয়েছে ছড়া, কবিতা, গল্প ইত্যাদি।
ঋতুর বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য সহজেই সাহিত্যিকদের আন্দোলিত করে, বিভিন্ন বিষয়ে লিখতে অনুপ্রেরণা জোগায়। সম্রাট আকবরের সময় থেকে খাজনা আদায়ের মাস বৈশাখ পালন শুরু হলেও বর্তমানে তা পরিবর্তিত হয়ে প্রাণের মেলার উৎসবে পরিণত হয়েছে। কবি-সাহিত্যিকগণ প্রাণের এ উৎসবকে শব্দে ধরে রাখতে বারবার প্রয়াসী হয়েছেন। বৈশাখকে নিয়ে কবি মুকুন্দরাম চক্রবতী লিখেছেন এভাবে-
“বৈশাখে অনলসম বসন্তে খারা।
তরুতল নাহি মোর করিতে পসরা।।
পায় পোড়ে খরতর রবির কিরণ।”

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ঋতুভিত্তিক লেখা লিখেছেন। বৈশাখের বারতা তাঁর ছড়ায় সুস্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। একদিকে বৈশাখের ধ্বংসরূপ, পাশাপাশি নতুন বছরের আগমন সৃষ্টিকে নতুনরূপে উৎসাহিত করে, এমন সত্য তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন তার বৈশাখ আবাহন কবিতায়-
“এসো, এসো, হে বৈশাখ
তাপস নিঃশ্বাস বয়ে মুমূর্ষরে দাও উড়ায়ে
বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক
যাক পুরাতন স্মৃতি যাক ভুলে যাওয়া গীতি
অশ্রু বাষ্প সুদূরে মিলাক
মুছে যাক সব গ্লানি। মুছে যাক জরা
অগ্নিবাণে দেহে-প্রাণে শুচি হোক ধরা।”

বৈশাখের মতোই রুদ্র, অশান্ত, বিপ্লবী, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম। বৈশাখের আগমনে মুক্তির উল্লাসে কবি মাতোয়ারা হয়ে ওঠেন।
নতুনের আহবানও সৃষ্টি সুখের উল্লাসে কবি উদ্দীপ্ত হন। কাব্যিক ব্যঞ্জনার মাধ্যমে দৃপ্তকন্ঠে তিনি উচ্চারণ করেন-
“ঐ নূতনের কেতন ওড়ে কাল বৈশাখীর ঝড়
তোরা সব জয় ধ¦নি কর
তোরা সব জয় ধ¦নি কর
ধ্বংস দেখে ভয় কেন তোর
প্রলয় নতুন সৃজন বেদন
আসছে নবীন জীবন ধারা অসুন্দরের করতে ছেদন।”
বাংলা সাহিত্যে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর বৈশাখী ঝড় সুর হাঁকায়, ছড়ায় বৈশাখ নিয়ে লিখেছেন এভাবে-
যায় প্রাচীন / চৈতি বায়, / আয় নবীন / শক্তি আয়। /
যায় পতিত / আয় অতিথ / আয়রে আয় / বৈশাখী ঝড় সুর হাঁকায় /
প্রবর্তকের ঘুর চাকায় – / প্রবর্তকে ঘুর চাকায়।
পল্লীকবি জসীমউদ্দীন বৈশাখকে নিয়ে অন্তরের সূক্ষ্মতম অনুভূতি প্রকাশ করেছেন এভাবে-
“বৈশাখ শেষে বালুচরের বোরো ধানের বান
সোনায় সোনায় মিলিয়ে দিয়ে নিয়েছে কেড়ে পান ।
বসন্ত সে বিদায় বেলায় বুকের আঁচল খানি,
গেয়ো নদীর দুপাশ দিয়ে রেখায় গেছে টানি।”

কবি গোলাম মোস্তফার ছড়ায় বৈশাখের প্রতিফলন দেখতে পাই এমনভাবে-
ওই এলোরে ওই এলো / নতুন বর্ষ ওই এলো / তরুণ তপন উঠলোরে /
ধ্বস্ত তিমির ছুটলোরে / নওরোজের এই উৎসকে / ওঠ জেগে আজ ওঠ সবে।

ছড়ার যাদুকর সুকুমার রায়ের ছড়ায় বৈশাখের দোলা লক্ষ করা যায়-
আম পাকে বৈশাখে / কুল পাকে ফাগুনে/
কাঁচা ইট পাকা হয় / পোড়ালে তা আগুনে।

বর্তমান বাংলা সাহিত্যের আধুনিক কবি আল মাহমুদ বৈশাখ নিয়ে লিখেছেন-
ঋতুর রাজা বোশেখ এসো / খোলা স্রোতের মুখ /
তৃষ্ণা কাতর হাজার বুকে / লাগুক পানির সুখ।

ফয়েজ আহম্মদের ছড়ায় বৈশাখের তীব্রতা লক্ষ করা যায়-
বোশেখে কি ভাবে কাঁচা আম কেটে খাই?
পেটানো লোহার ছোট ছুরিটা চাই।
চলোনা এখন নাগর দোলায় চড়ি
উত্তেজনায় এই উড়ি এই পড়ি।
ওই যে ওখানে লাঠি খেলা জোড়ে জোড়ে
লাঠিতে লাঠিতে টক্কর লাগে জোড়ে।
ওদিকে চলোতো চলো চলো তাড়াতাড়ি
মোরগে মোরগে চলছে লড়াই ভারি।
রঙিন ঘুড়ির খেলাটা দেখনা চেয়ে
ঘুড়িতে ঘুড়িতে আকাশ গিয়েছে ছেয়ে।

সৌম্য কান্তি চক্রবর্তীর ভাষায়-
“পয়লা বৈশাখ আসছে / মন খুশিতে ভাসছে।/
নতুন ইচ্ছা, নতুন আশার / স্বপ্নগুলো ভাসছে”

উৎপল কান্তি বড়–য়া তার কবিতায় লিখেছেন-
বোশেখের পয়লা নব সুর তুলবার/ এই দিন গ্লানি দুখ অপমান ভুলবার/
মনে মনে/ সচেতনে/ এই দিন আলোকিত দরোজাটা খুলবার /
বোশেখের পয়লা, আজ কিছু করবার / এক সাথে সকলেই এক হাত ধরবার /
মন মতো / অনাগত / সুখী সমৃদ্ধিতে পৃথিবীটা গড়বার।

প্রখ্যাত কবি মোশাররফ হোসেন খানের ‘বোশেখ’ কবিতায় নিটোল উচ্চারণ আমরা এভাবে দেখি-
“বোশেখ আসে ঘোড়ার খুরে / তপ্ত বালি কুলায় ঝেড়ে
বোশেখ আসে ভর দুপুরে / দে দোল দোলা পেখম নেড়ে।
বোশেখ আসে বিজলী হাতে / ক্ষ্যাপা মেঘের দুলকি চালে
বোশেখ আসে ঝড়ের সাথে / ঝরা পাতায় উদোম ডালে।

বোশেখ এলে থর-থরিয়ে / কেউবা কাঁপে ভয়ের চোটে
কেউবা কাঁপে ভয়ের চোটে / কেউবা হাসে খিলখিলিয়ে
বুকে যাদের সাহস ছোটে।

বোশেখ মানে দস্যি ছেলে / ভয় ভাবনা নেইকো যার
বোশেখ মানে দস্যি ছেলে / ভয় ভাবনা নেইকো যার
বোশেখ মানে ভয়কে ঠেলে / ভেঙ্গে ফেলা রুদ্ধ দ্বার ॥”
এমনিভাবে বৈশাখ নিয়ে বহু কবি-সাহিত্যিক ছড়াকারগণ ছড়ায় ছড়ায় তাদের মনের নিবিড় মনোভাব প্রকাশ করেছেন। চমৎকারভাবে সাবলীল ভঙ্গিতে তারা বৈশাখের জয়গান গেয়েছেন। এর মাধ্যমে, সুপ্রতিষ্ঠিত করেছেন। নববর্ষে এই চেতনা সমগ্র জাতি  সত্তাকে নতুন করে বেঁচে থাকার সাহস জাগাবে, প্রেরণা জোগাবে।

SHARE

Leave a Reply