Home ধারাবাহিক উপন্যাস আল কেমিস্ট মূল : পাউলো কোয়েলহো -অনুবাদ : আসিফ...

আল কেমিস্ট মূল : পাউলো কোয়েলহো -অনুবাদ : আসিফ হাসান

পঞ্চম খন্ড

অনেক বাধা-বিপত্তির পর এক বিকেলে তারা এক উপাসনালয়ে হাজির হলো। আল কেমিস্ট নামলেন ঘোড়া থেকে।
তার পর তিনি বললেন, এখান থেকে পিরামিড তিন ঘণ্টার পথ। তুমি যাবে একাকী।
ধন্যবাদ, বলল ছেলেটি।
আল কেমিস্ট উপাসনালয়ের দরজায় নক করলেন। উপাসনালয়ের অধ্যক্ষ দরজা খুললেন। আল কেমিস্ট অধ্যক্ষকে রান্নাঘর দেখিয়ে দিতে বললেন। সেখানে আল কেমিস্ট আগুন জ্বালালেন। অধ্যক্ষ কিছু লোহা এনে দিলেন। আল কেমিস্ট সেটাকে একটা লোহার কড়াইয়ে রাখলেন। গরমে লোহাটা তরল হয়ে গেলে আল কেমিস্ট তার থলে থেকে একটা অদ্ভুত হলুদ ডিম বের করলেন। তিনি সেখান থেকে চুলের মতো পাতলা একটা ফালি নিলেন। সেটাকে মোমে জড়িয়ে গলিত লোহার মধ্যে মেশালেন। মিশ্রণটি লালাভ হয়ে উঠল, প্রায় রক্তের মতো লাল। আল কেমিস্ট তখন সেটাকে আগুন থেকে নামালেন। ঠান্ডা করলেন।
তখন অধ্যক্ষ আর ছেলে দুজনই চমকে গেল। কড়াইয়ে তখন লোহা বলে কিছু নেই, পুরোটাই সোনা।
‘আমি কি এটা শিখতে পারবো কোনো দিন?’ ছেলেটি জানতে চাইলো।
‘এটা আমার নিয়তি, তোমার নয়,’ জবাব দিলেন আল কেমিস্ট। ‘তবে আমি দেখাতে চাইলাম, এমনটা হওয়া সম্ভব।’
তিনি সোনার টুকরাটা চার ভাগ করলেন।
অধ্যক্ষকে এক টুকরা দিলেন। এটা মুসাফিরদের সেবার জন্য।
আরেক টুকরা দিলেন ছেলেটিকে। আল কেমিস্টের সাথে পিরামিডের দিকে যাওয়ার সময় দস্যুরা তার সব টাকা নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু যে সোনার টুকরাটি সে পেল, সেটার দাম হারানো টাকার চেয়ে অনেক অনেক বেশি।
‘আর এটা আমার জন্য,’ আল কেমিস্ট বললেন। তিনি এক টুকরা নিজের পকেটে রাখলেন।
তারপর অধ্যক্ষকে চতুর্থ টুকরাটি দিলেন।
‘এটা এই ছেলেটির জন্য, যদি তার কখনো দরকার হয়।’
‘কিন্তু আমি তো গুপ্তধন সন্ধানে যাচ্ছি,’ ছেলেটি বলল। ‘আমি এর খুব কাছে।’
‘আমি জানি, তুমি গুপ্তধন খুঁজে পাবে,’ আল কেমিস্ট বললেন।
‘তাহলে এটা কেন?’
‘কারণ তুমি এর মধ্যেই দুবার সব সঞ্চয় খুইয়েছ। একবার চোরের কাছে, একবার দস্যুদের কাছে। পুরনো একটা আরব প্রবাদ আছে, ‘একবার যা ঘটে, তা দ্বিতীয়বার ঘটে না। তবে দ্বিতীয়বার যদি ঘটে, তখন তৃতীয়বার ঘটবেই।’
তিনি ঘোড়ায় চড়লেন।

ছেলেটি মরুভূমি দিয়ে কয়েক ঘণ্টা চলল। একটার পর একটা বালিয়াড়িতে উঠছে-নামছে। আরেকটা বালিয়াড়ি পড়ল সামনে। ধীরে ধীরে একটা বালিয়াড়িতে চড়তে লাগল। তখনই তার হৃদয় বলে উঠল, এখানেই আছে সেই সম্পদ, যার খোঁজে তুমি বের হয়েছ।
তখন পূর্ণিমা। ভরাট চাঁদের আলোয় মরুভূমিকে মনে হলো সাগর। বালিয়াড়িতে ওঠার সাথে সাথে তার চোখে পড়ল রাজকীয় পিরামিড। শান্ত, সৌম্য মূর্তিতে দাঁড়িয়ে আছে পিরামিড।
হাঁটু গেড়ে কান্নায় ভেঙে পড়ল। খোদা তাকে তার গন্তব্যে এনে দিয়েছেন। লক্ষ্যে অটলভাবে এগিয়ে গেলে কেউই বিফল হয় না।
তবে তার কাজ এখনো শেষ হয়নি। তাকে গুপ্তধন বের করতে হবে। বালিতে নজর দিয়ে মনে হলো, এই জায়গাটাতেই পোঁতা আছে সেই গুপ্তধন। খুঁড়তে শুরু করল জায়গাটি। খুঁড়ছে তো খুঁড়ছে। আর শেষ হয় না। মনে হলো পিরামিড নির্মাণের দিন থেকে সে খুঁড়ে চলেছে। অনেক গভীর গর্তের ভেতরে এখন সে। ক্লান্তিতে দেহ-মন ভেঙে যাচ্ছে। কিন্তু সে থামছে না। হঠাৎ পায়ের আওয়াজ শুনতে পেল।
কয়েকটা লোক তার সামনে এগিয়ে এলো। তারা ছিল চাঁদের ওল্টা দিকে। ছেলেটা তাদের চোখ বা মুখ কিছুই দেখতে পেল না।
‘এখানে কী করছো?’ একজন জিজ্ঞাসা করল।
ভয় পেয়ে গিয়েছিল ছেলেটা। কোনো জবাব দিল না। সে তার গুপ্তধন পেয়েছে, সে কথা বলবে কী করে! কিন্তু যা ঘটছে, তা ভীতিকর।
‘আমরা যুদ্ধের শিকার, আমাদের টাকার দরকার,’ আরেকজন বলল।
‘আমার কাছে কিছুই নেই,’ ছেলেটি জবাব দিল।
‘কিন্তু তাদের একজন ছেলেটাকে বের করে আনল। আরেকজন তল্লাশি করে তার ব্যাগ থেকে আল কেমিস্টের দেওয়া সোনার টুকরাটি বের করে নিল। লোকটির চোখে তখন যেন মৃত্যুর পরোয়ানা।
তারা ভাবল, ছেলেটা মাটি খুঁড়ে সোনাটি পেয়েছে। তারা ছেলেটিকে আরো খুঁড়তে বললো। ছেলেটি খুঁড়তে লাগল। কিন্তু কিছুই পাওয়া গেল না। এদিকে দিনের আলো ফুটতে শুরু করেছে। তারা ভাবল, ছেলেটা হয়তো মাটির নিচে সোনা লুকিয়ে রেখেছে।
তখন তারা ছেলেটাকে পেটাতে শুরু করল। আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হলো সে। জায়গা জায়গা দিয়ে রক্ত বের হচ্ছে। জামা ছিঁড়ে গেছে।
‘কী হবে টাকা দিয়ে, যদি তুমি মরে যাও? টাকা তো সবসময় মানুষকে বাঁচায় না,’ আল কেমিস্ট একদিন বলেছিলেন। শেষ পর্যন্ত ছেলেটি তাদের বলল, সে গুপ্তধনের জন্য খুঁড়ছে। সে গুন্ডাদের বলল, সে দুবার স্বপ্ন দেখেছে, পিরামিডের কাছে গুপ্তধন আছে। সে তার সন্ধানে এসেছে।
একটা লোক, সম্ভবত তাদের দলপতি হবে, এসে বলল, ‘ওকে ছেড়ে দাও। মনে হচ্ছে, তার কাছে আর কিছুই নেই। সে এই সোনাটা সম্ভবত কোথাও থেকে চুরি করেছিল।’
ছেলেটা বালিতে পড়ে রইল, প্রায় অচেতন অবস্থায়। দলপতি তাকে ধরে বলল, ‘আমরা চলে যাচ্ছি।’
তবে যাওয়ার আগে সে ছেলেটির কাছে আবার ফিরে এসে বলল, ‘তুমি মরছ না। তুমি বাঁচবে। তুমি বুঝতে পারবে, এত বোকা হওয়া উচিত নয় কারোরই। দুই বছর আগে, ঠিক এই স্থানটি নিয়ে আমিও বারবার স্বপ্ন দেখেছিলাম। আমি স্বপ্ন দেখেছিলাম, আমি স্পেনের মাঠগুলো দিয়ে ঘুরছি, একটা ভাঙা চার্চ দেখেছিলাম, যেখানে রাখালরা তাদের ভেড়া নিয়ে ঘুমায়। আমার স্বপ্নে ছিল, ওই চার্চের পোশাক রাখার জায়গায় যে ডুমুর গাছটি গজিয়েছে, সেটার শেকড় খুঁড়লে আমি গুপ্তধন পাবো। আমি এত বোকা নই, একটা স্বপ্ন দেখেই পুরো মরুভূমি পাড়ি দেব!’
তারপর তারা অদৃশ্য হয়ে গেল।
ছেলেটি কোনোমতে উঠে দাঁড়াল। আবারো পিরামিডের দিকে তাকালো। মনে হলো, পিরামিডেরা তার দিকে তাকিয়ে হাসছে। আর সে-ও হাসল। তার হৃদয়-মন খুশিতে ভরে উঠেছে। কারণ এখন সে জানে, কোথায় আছে সেই গুপ্তধন।

উপসংহার
রাত ঘনিয়ে আসার সময়টাতে ছেলেটা ছোট্ট পরিত্যক্ত চার্চে পৌঁছাল। পোশাক রাখার জায়গাটিতে ডুমুর গাছটা দাঁড়িয়ে আছে, ভাঙা ছাদ দিয়ে তখনো ঝিকমিক তারা দেখা যায়। ভেড়া নিয়ে সেখানে রাত কাটানোর কথা মনে পড়ল। সুন্দর রাত ছিল… কেবল স্বপ্নটি ছাড়া।
এখন তার কাছে একটা ভেড়াও নেই। তবে আছে একটা কোদাল।
অনেকক্ষণ সময় নিয়ে সে আকাশের দিকে তাকাল। তারপর গলা ভেজাল। মরুভূমিতে আল কেমিস্টের কথা মনে পড়ল। তার সাথে তার খাবার খাওয়ার কথাও মনে এলো। কত পথ পাড়ি দেওয়ার কথাও স্মৃতিতে ভাসল। খোদা তাকে কোন আশ্চর্য পথে গুপ্তধনের সন্ধান দিলেন! তার যদি স্বপ্নটিকে বিশ্বাস না হতো, তবে সে ওই জিপসি নারীর সাথে দেখা হতো না, কথা হতো না বুড়ো রাজার সাথে, চোর, … তালিকাটি অনেক লম্বা। কিন্তু সবই নিদর্শনের ব্যাপার, সবই একই সুতোয় বাঁধা।
ছেলেটি ঘুমিয়ে পড়ল। সূর্য যখন মাথার ওপর, তখন সে জাগল। সে কোদাল দিয়ে ডুমুরগাছের শিকড় খুঁড়তে শুরু করল।
‘তুমি বুড়ো জাদুকর,’ আকাশের দিকে তাকিয়ে ছেলেটি বলল। ‘তুমি পুরো গল্প জানতে। তুমি এমনকি আমার জন্য এক টুকরা সোনা রেখেছিল, যাতে আমি এই চার্চে ফিরতে পারি। আমাকে ছিন্নবস্ত্রে আসতে দেখে অধ্যক্ষ হেসেছিলেন। তুমি কি আমাকে তা থেকে রক্ষা করতে পারতে না?’
‘না,’ সে শুনতে পেল, মনে হলো বাতাস বলছে। ‘আমি তোমাকে বলে দিলে তোমার পিরামিড দেখা হতো না। ওগুলো খুবই সুন্দর, তা-ই না?’
ছেলেটি হাসল। খুুঁড়তেই থাকল। আধা ঘণ্টা পর তার কোদাল শক্ত কিছুকে আঘাত করল। এক ঘণ্টা পর স্প্যানিশ সোনায় ভরা একটা সিন্ধুক পেল। তাতে মূল্যবান পাথর, সোনার মুখোশ, নানা অলঙ্কারও ছিল। কোনো দেশ জয়ের পর সেখানকার সব সোনা সম্ভবত এখানে জড়ো করা হয়েছিল। তারপর তারা হয়তো ভুলে গিয়েছিল। সম্ভবত বিজয়ীরা তাদের সন্তানদের এসব সম্পদের কথা বলেওনি।
হ্যাঁ, সত্যি। যারা তাদের লক্ষ্যের দিকে ছুটে চলে, তাদের জন্য জীবন আসলেই উদার, ছেলেটি ভাবল। তারপর তার মনে হলো, তাকে তারিফায় যেতে হবে জিপসি নারীকে দশ ভাগের এক ভাগ সম্পদ দেওয়ার জন্য। সে ওয়াদা করেছিল। জিপসিরা তো আসলেই স্মার্ট, সে ভাবল। হয়তো তারা নানা দেশ ঘোরে বলে।
আবার বাতাস বইতে শুরু করল। এই বাতাস আসছে ভূমধ্যসাগরের আফ্রিকা থেকে। এটা তার জন্য মরুভূমির ঘ্রাণ নয়, বরং একটা সুগন্ধি বয়ে এনেছে। সে ধীরে ধীরে একটা স্পর্শ টের পেল।
ছেলেটি হাসল। এই প্রথম সে মরুচারিণীর ছোঁয়া অনুভব করল।
‘আসছি, আমি আসছি…’ সে বলল।

SHARE

Leave a Reply