Home সায়েন্স ফিকশন মিশন টু আয়রনম্যান -মহিউদ্দিন আকবর

মিশন টু আয়রনম্যান -মহিউদ্দিন আকবর

(তৃতীয় পর্ব)

সুনসান নীরবতা আর চমৎকার নাতিশীতোষ্ণ পরিবেশে বেশ আয়েশ করেই নাক ডেকে ঘুমোচ্ছিলো মামা-ভাগনে। কিন্তু তাদের সে আরাম যেন পছন্দ করছিলো না একটা ভয়াল ঘটনা। একপাল রোবোম্যানের চিৎকার চেঁচামেচিতে ধড়মড় করে দুধেল ফেনায়িত ধবধবে বিছানায় উঠে বসে দু’জনা। চারপাশে ইতিউতি বিরক্তিমাখা দৃষ্টি ফেলে। এমনকি মাথা উপরের ছাদের দিকেও তাকায়।
কিন্তু না, চারপাশে প্রচণ্ডরকমের ধোঁয়াশার কারণে তেমন কিছুই নজরে আসে না। তবে রোবোম্যানদের চিৎকার চেঁচামেচিতে কান ঝালাপালা হবার দশা। চেঁচামেচির ধকল সইতে না পেরে ভাগনে সাদিত খান শুরু থেকেই দু’কানে আঙুল গুঁজে বসে আছে। মামা আসিফ আরমান খানিকটা ধাতস্থ হতেই বেশ দৃঢ়তার সাথে ধমকে ওঠেন- আহা, হয়েছেটা কী? অন্তত একজন সামনে এসে দাঁড়াও। খুলে বলো ঘটনাটা কী?
মামার ধমকের তোড়েই হোক আর যে কারণেই হোক এক দঙ্গল রোবোম্যানের চিৎকার চেঁচামেচির ঝড়ো হাওয়া খানিকটা দূরে সরে গেলো। মনে হলো কোনো বড় আকারের লরি বা ট্রাকে করে ওদের কোথাও নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এ মুহূর্তে কী করা যায় মামা ঠিক ভাবতে পারছেন না। অমনি সময় ধোঁয়াশা ফুঁড়ে একজন রোবোম্যান সামনে এসে দাঁড়িয়েই কাঁদো কাঁদো হয়ে বললো- হে মানববিজ্ঞানীরা! আমাদের এই মহাবিপদে আপনারা আমাদের সাহায্য না করলে আমাদের প্রজন্ম আজ ধ্বংস হয়ে যাবে।
রোবোম্যানের করুণ কণ্ঠ শুনে মামার মনে দয়া উথলে উঠলেও তিনি কেন সাহায্য করবেন? কিভাবে সাহায্য করবেন? কিছুই বুঝে উঠতে পারেন না।
রোবোম্যানের সাক্ষাৎ পেয়ে এরই মধ্যে ভাগনে সাদিত খান চোখের পলকে তার অনামিকা দুটি দু’কানের গহ্বর থেকে সরিয়ে নিয়েছিলো। ও এবার একটা গলাখাঁকারি দিয়ে জানতে চাইলো- আমরা কিন্তু এতোসব হৈ-হুল্লোড় কোনো মানেই বুঝতে পারছি না। তার ওপর তোমরা সাহায্য চাইছো। আগে তো ঘটনাটা খুলে বলো।
রোবোম্যান আরও ভীত-সন্ত্রস্ত কণ্ঠে বলে- এই যে ধোঁয়াশা, এটা আমাদের এখানকার কোনো ক্যারিশমা নয়। এই ধোঁয়াশা শুরু হয়েছে বিপুল পরিমাণ অক্সিরাইবোর অধিকারী ও দৈত্যকায় ব্ল্যাকহোল রাজ্যের সুপারকিং আয়রনম্যানের পাঠানো ইলেকট্রোনিক স্পাইডারনেট থেকে।
মামা এবার বিস্ময়ের সাথে জানতে চান- অক্সিরাইবো, দৈত্যকায় ব্ল্যাকহোল, সুপারকিং আয়রনম্যান, ইলেকট্রোনিক স্পাইডারনেট… এতোসব কী বলছো?
রোবোম্যান আবারও কাঁদো কাঁদো হয়ে বলে- সব শুনবেন, সবই জানতে পারবেন। আগে আমাদের বউ, ছেলে-মেয়েদের রক্ষা করুন। আপনারা তো অনেক মেধাবী বিজ্ঞানী।
– আহা! তোমাদের বউ, ছেলে-মেয়েদের কী হয়েছে তাই তো বলো।
– শয়তান সুপারকিং আয়রনম্যানের গোয়েন্দারা আমাদের প্রতিরক্ষা ব্যূহ ভেদ করে, সকল নজরদারি ফাঁকি দিয়ে, আমাদের ইগলুর চারপাশে সিলিকন ছড়িয়ে ধোঁয়াশা সৃষ্টি করেছে।
– তাই নাকি?
– তারপর ইগলু থেকে খানিক দূরে আমাদের পাহারাদারদের চোখ এড়িয়ে ওরা জাদুকরী ইলেকট্রোনিক স্পাইডারনেট বিছিয়ে রেখেছিলো।
– তাতে কী হয়েছে?
– আমাদের পরিবারের বউ, ছেলে-মেয়েরা ওই জাদুকরী নেটের টানে দৌড়ে দৌড়ে ইগলু থেকে বেরিয়ে পড়ে। আর ধোঁয়াশার কারণে সবকিছু পরিষ্কার দেখতে না পেয়ে জালে জড়িয়ে যায়।
– তাতে কী হলো? তোমরাও তো ইলেকট্রনিক ক্ষমতার অধিকারী। নিশ্চয় তোমাদের পরিবারের সদস্যরাও তেমনি ক্ষমতা রাখে। তো তোমরা পারলে না নেটটাকে জ্বালিয়ে দিতে?
– সে কী বলছেন স্যার! আমরা জ্বালিয়ে দেবো আয়রনম্যানের স্পাইডারনেট!!
– কেন?
– আমাদের পাওয়ার হচ্ছে জিরো পয়েন্ট ওয়ান পিএমপি বাই ওয়ান ম্যাগাওয়াট। আর ওই নেটের ক্ষমতা কত তা বলা মুশকিল। প্রথমে কেউ কিছু বুঝেই উঠতে পারেনি। যখন ম্যাগনেটির আকর্ষণে আমাদের পরিবারের সদস্যরা কাবু হয়ে পড়ছিলো তখনই তারা চিৎকার শুরু করে।
– তো, তোমাদের সেফগার্ডরা তখন কোথায় ছিলো?
– সাথে সাথে আমাদের আল্ট্রাসনিক ক্ষমতাসম্পন্ন সেফগার্ডরা ছুটে যায়। রিমোট কন্ট্রোল লেজারগান চার্জ করে। মোটামুটি ঘণ্টাখানেক নেটটাকে আটকেও রাখে। কিন্তু তারাও সেখানে বেশিক্ষণ টিকতে পারেনি। নেটের ইলেকট্রোম্যাগনেটের সাথে বোঝাপড়া করতে করতেই রিমোটগুলো অচল হয়ে পড়ে। তখনই সবাই ভড়কে গিয়ে জীবন বাঁচানোর জন্য জোরে জোরে চিৎকার জুড়ে দেয়। হয়তো তাতেই আপনাদের ঘুম টুটে গিয়ে থাকবে।
– কথা ঠিক। কিন্তু আমরা তো এতো সব কাণ্ডকারখানার কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না।
– এখন আর বোঝার চেষ্টা করার সময় নেই। আগে তো নেটটাকে থামান।
– তার মানে!
– নেটটা আমাদের পরিবারের লোকজন নিয়ে মুভ করতে শুরু করেছে। বুঝতে পারছেন না, আমাদের পরিবারের সদস্যদের চিৎকার চেঁচামেচি ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে।
– সর্বনাশ! তাই নাকি? তাহলে এখন উপায়? এই নেট ওদের কোথায় নিয়ে চলেছে?
– বিগত এক হাজার বছর আগে একবার এমনিভাবে আমাদের পরিবারের প্রায় তিনশ সদস্যকে ওরা নিয়ে গিয়ে ব্ল্যাকহোলের মিরাজান প্রভিন্সে বন্দি করে রেখেছে।
– এ..ক……হা..জা..র   ব..ছ..র! এখনও বন্দি রেখেছে নাকি মেরে ফেলেছে?
– আমাদের গোয়েন্দাদের হাতে এখনও যে তথ্য আছে তাতে আয়রনম্যান এখনও ওদের কাউকে হত্যা করেনি। কেবল দিনের পর দিন ওদের ওপর এক্সপেরিমেন্ট চালিয়েই যাচ্ছে।
– তাজ্জব ব্যাপার! কিসের এক্সপেরিমেন্ট চালাচ্ছে?
– সে আমরা এখনও নিশ্চিত হতে পারিনি। তবে যতটুকু তথ্য-উপাত্ত আছে তাতে মনে হয় আমাদের ওপর এক্সপেরিমেন্ট চালিয়ে ওরা আমাদের মাঝ থেকে সুপারম্যান তৈরি করতে চাচ্ছে।
– যত্তসব আজগুবি! ইচ্ছা করলেই তো ওরা দুনিয়া থেকে মানুষ ধরে এনে ওই কাজটা করতে পারে।
– না। তা কক্ষনোই পারে না। আর পারবেও না।
– তার মানে?
– আমরা তবু তো আমাদের সুপার স্পেসশিপ নিয়ে আপনাদের পৃথিবীতে যেতে পারি। মানুষের চোখের আড়ালে থেকে কিছু কিছু গবেষণা চালাতে পারি। প্রয়োজনে আপনাদের মত জ্ঞানী-গুণী বিজ্ঞানীকে সম্মানের সাথে ধরে এনে বিভিন্ন প্ল্যান্টেশনে থিওরিটিক্যাল এবং প্রাক্টিক্যাল হেল্প নিতে পারি।
– হুম, বুঝেছি। এ জন্যই মাঝে মাঝে আমরা তোমাদের স্পেসশিপ পৃথিবীতে অবতরণ করতে দেখি। এমনকি তোমাদেরও মাঝে মাঝে দেখতে পাই।
– কিন্তু আমরা আপনাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকি বলে আপনারা আমাদের নাম দিয়েছেন ইউএফও। আসলে ইউএফও বলে যা বুঝায় তা আমাদেরই বিভিন্ন আকৃতির নভোযান। আর আমাদের দেখতে পেয়ে কোন কোনো বিজ্ঞানী আমাদের নাম দিয়েছে এলিয়ন। কিন্তু আয়রনম্যানের অনুসারীরা হচ্ছে মহাজাগতিক বিশ্বে একটি অভিশপ্ত জাতি। ওদের আকাশবলয় ভেদ করে নিচের জগতে যাবার কোনো সাধ্য নেই। যদিও ওদের একটি দল সারারাত চেষ্টা করে প্রতিদিনই আসমানের শেষ স্তর পর্যন্ত পৌঁছে যায়। কিন্তু সূর্যোদয়ের সাথে সাথে আবার ব্ল্যাকহোলে ফিরে আসতে বাধ্য হয়। এভাবেই ওদের মহাপ্রলয়ের দিন অবধি কষ্ট করে যেতে হবে। কিন্তু কখনোই পৃথিবীতে পৌঁছাতে পারবে না। ওরা আসলে….
রোবোম্যান কথা শেষ করতে পারে না। ওর মুখের কথা কেড়ে নিয়ে সাদিত খান বেশ উৎসাহের সাথে বলে- হুম, বুঝতে পেরেছি। ওরা নিশ্চয় আমাদের পৃথিবীর সেই ইয়াযুজ মাযুজদের মতো অভিশপ্ত জাতি।
Ñ ইয়াযুজ মাযুজ! তারা আবার কারা? অবাক হয়ে জানতে চায় রোবোম্যান।
সাদিত বলেÑ ইয়াযুজ মাযুজরা মানবজাতিরই একটি অভিশপ্ত অংশ। ওরা ছিলো খুবই শক্তিশালী এবং প্রচণ্ডরকমের অহঙ্কারী। ওরা ওদের আশপাশের রাজ্যের মানুষদের ওপর যারপরনাই জুলুম অত্যাচার চালাতো। যখন তখন খুন-খারাবি, লুটতরাজ, ঘর-বাড়িতে আগুন লাগিয়ে মানুষজন এমনকি গৃহপালিত পশুরপালসহ জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে ফেলতো। হেন পাপ কাজ নেই যা ওরা করতো না।
– ওরে বাপরে! এযে দেখছি আমাদের আয়রনম্যানের জ্ঞাতি-গোষ্ঠীর মতোই আচার-আচরণ! খানিকটা অবাক হয়ে বললো রোবোম্যান।
সাদিত বললো- আহা শেষটা শোনোই না, তো সে সময়টা ছিলো আমাদের নবী হযরত সোলাইমান আলাইহি ওয়াসাল্লামের জামানা। তিনি এ খবরটা জেনে ইয়াযুজ মাযুজদের পাশের রাজ্যের বাদশাহ জুলকারনাইনকে আদেশ করলেন; সীসাঢালা প্রাচীর গড়ে ইয়াযুজ মাযুজদের বন্দি করে ফেলতে। কিন্তু তাদের হত্যা করতে নিষেধ করলেন।
– কেন, কেন? জাতগোষ্ঠীসহ মেরে ফেললেই তো ল্যাঠা চুকে যেত।
– তা হয় তো যেত। কিন্তু বুঝতেই তো পারছো, নবীর আদেশ। আর আমাদের কোনো নবী-রাসূল তো আল্লাহর ইচ্ছার বাইরে কোনো আদেশ দিতে পারেন না।
– তা অবশ্য ঠিক কথা।
– তো নবীর আদেশ পেয়ে বাদশা জুলকারনাইন হাজার হাজার টন লোহা, সীসা আর সোনা-রুপার ঢালাই দিয়ে পুরো ইয়াযুজ মাযুজ রাজ্যটাকে ঘেরাও করে দিলেন। তখন থেকে ইয়াযুজ মাযুজরা বন্দি আছে। তোমাদের আয়রনম্যানের জ্ঞাতি-গোষ্ঠীর মতোই ওরাও এমনি করে সারাটা দিন ধরে সেই সীসার ঢালাই দেয়া দেয়াল চাটতে চাটতে সন্ধ্যা অবধি ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে যায়। সকালে ঘুম ভাঙলে পর দেখতে পায়- ওরা গতকাল সারাদিনে চাটতে চাটতে দেয়ালটাকে যতটুকু ক্ষয় করে ফেলেছিলো, ততটুকু আবার পরিপূরণ হয়ে যেমন দেয়াল ঠিক তেমনই হয়ে আছে। তার মানে পুরু দেয়াল আবার সেই পুরুই হয়ে আছে। এমনি করেই ওরা আল্লাহ তায়ালার বেঁধে দেয়া একটা সময় পর্যন্ত বন্দি হয়ে থাকবে আর দেয়াল ভাঙার আশায় আশায় প্রতিদিনই দেয়াল চাটতে থাকবে।
এতোক্ষণ বেশ মনোযোগের সাথে মামা আসিফ আরমান ও তার ভাগনে খুদে বিজ্ঞানী সাদিত খান এবং রোবোম্যানের কথোপকথন শুনছিলেন। তিনি এবার একটু নড়েচড়ে বসে বললেন- তবে দুনিয়ার মানুষ কিন্তু হাজার হাজার বছর ধরে গবেষণা এবং অনুসন্ধান চালিয়েও ইয়াযুজ মাযুজদের কোথায় বন্দি রাখা হয়েছে তার সন্ধান করতে পারেনি।
রোবোম্যান অবাক হয়ে বলে- কেন! আপনাদের পৃথিবী এই একটুখানি ছোট্ট একটা গ্রহ মাত্র। আপনাদের তো রকেট আছে। শুনেছি আপনারাও আমাদের চেয়ে নিম্নমানের শাটেলস্পেস তৈরি করেছেন। আপনাদের নভোচারীরা নিয়মিত স্পেসশিপে পৃথিবী প্রদক্ষিণ করছে। অথচ সেই পাহাড়ি অঞ্চলটা আজও খুঁজে বের করতে পারলেন না!
রোবোম্যানের কথা শুনে সাদিত একটু মাথা দোলাতে দোলাতে বলে- কথা ঠিক। আমার কী মনে হয় জানো মামা?
আসিফ মামা সাদিতের দিকে বাঁকা দৃষ্টি মেলে বলেন- তোর আবার কি মনে হয়রে পণ্ডিত?
– আমার মনে হয় আমাদের পৃথিবীর ওই বারমুডা ট্রায়েঙ্গেলটাই সেই ইয়াযুজ মাযুজদের বন্দিশালা। দেখছ না, ওখান দিয়ে কোনো জলযান এমনকি উড়োযানও পেরিয়ে যেতে পারে না।
সাদিতের মাথায় এবার আলতো করে একটা চাটি মেরে মামা বললেন- যত্তসব আজগুবি কথা। আল কুরআনের তাফসিরের তথ্য মতে ইয়াযুজ মাযুজদের ঘিরে রাখা হয়েছে একটা পাহাড়ি অঞ্চলে এবং তা তাদেরই এককালের রাজত্বের মাঝে। আর বারমুডা ট্রায়েঙ্গেল হচ্ছে সমুদ্রের মাঝে অবস্থিত অসংখ্য ডুবো পাহাড়ের এক আত্মঘাতী আস্তানা।
মামার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে সাদিত বলেÑ ওই তো পাহাড়ি অঞ্চল…।
মামা সাদিতকে আরও একটা চাটি মেরে বললেন- যাহ্ হাবাগোবার মতো কথা বলিস নাতো। ওসব কথা অবিশ্বাসীদের ব্যর্থতার একটা বাহানা মাত্র। আসলে ইয়াযুজ মাযুজদের কোথায় বন্দি রাখা আছে তা একমাত্র রাব্বুল আলামিনই ভালো জানেন। তবে আমার কী মনে হয় জানিস?
সাদিত বেশ আগ্রহের সাথে জানতে চায়- তোমার কী মনে হয় মামা?
এবার আসিফ মামা একটু নড়েচড়ে বেশ আয়েশ করে বসে মুখ খুললেন। তিনি বিজ্ঞের মতো বেশ ধীরে ধীরে বললেন- ওয়ার্ল্ডম্যাপের দিকে তাকালে দেখবি বারমুডা ট্রায়েঙ্গেলের অবস্থানটা ঠিক কোথায়। আসলে সাম্রাজ্যবাদীদের হাতের মুঠোয় অবস্থিত ওই বারমুডা ট্রায়েঙ্গেল মূলত সাম্রাজ্যবাদীদের একটা উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন গোপন সামরিক আস্তানা ছাড়া আর কিছুই নয়। সেখানে ওরা হাইপ্রফাইল প্রযুক্তির মাধ্যমে পথভোলা বিদেশী জলযান এবং উড়োযানের ওপর নির্বিঘেœ নাশকতা চালিয়ে যাচ্ছে। এই যে শত শত বছর যাবৎ বারমুডা ট্রায়েঙ্গেলে এতো যে বিদেশীদের ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে এবং হাজার হাজার নিরীহ বিদেশী নাগরিকের সলিলসমাধি ঘটে চলেছে, কোনোদিন শুনেছিস ওখানে কোনো সাম্রাজ্যবাদী শক্তির কোনো রকমের দুর্ঘটনা ঘটেছে বা কোনো রকমের ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছে?
– আরে! তাই তো মামা!! একথা তো কখনও ভেবে দেখিনি!!! হু, আমি তো হলাম পিচ্চি বিজ্ঞানী। বলি পৃথিবীর ঝানু ঝানু বিজ্ঞানীরাও তো এ ব্যাপারে কোনো দিন কোনো প্রশ্নই তোলেননি।
– তা তুলবেন কেন? তাতে তো তাদের হালুয়া-রুটির ওপর সাম্রাজ্যবাদী হুমকি এসে যাবে।
– তা বুঝলাম। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদবিরোধী বিজ্ঞানীরাও তো প্রশ্নটা তুলতে পারতেন।
– তা পারতেন। কিন্তু সে প্রশ্ন তুলতে গেলে তো তাদের দিকে সাম্রাজ্যবাদীরা দলিল-প্রমাণের চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে পারে।
– দিলো না হয় চ্যালেঞ্জ ছুড়ে।
– তুই কি ভাবছিস ওই বারমুডা ট্রায়েঙ্গেলের গোপন রহস্য তাদের কম-বেশি নখদর্পণে নেই? আমার মনে হয়, তারাও ঝামেলা এড়াতেই ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’ মার্কা ভূমিকা নিয়ে চুপসে আছেন।
– কথাটা তুমি খারাপ বলোনি মামা। আসলে যারা দুনিয়াজুড়ে রক্তপাত নিয়েই আনন্দিত আর জমজমাট মারণাস্ত্রের বাণিজ্য নিয়ে পেরেশান, তারা তো সবাই মিলে একপক্ষই। উপরন্তু বারমুডা ট্রায়েঙ্গেলের নাম ভাঙিয়ে একটা জুজুবুড়ির আস্তানা খুলে বেশ মৌজেই আছে তারা। মাঝখান থেকে ফাঁপরে পড়ে গেছে শান্তিকামী নিরীহ বিশ্বের গোটা মানবজাতি।
মামা এবার সাদিতের পিঠ চাপড়ে দিয়ে বেশ গর্বের সাথে বললেন- এই তো আমার পিচ্চি বিজ্ঞানীর ব্রেনটা খুলেছে।
মামা-ভাগনের আলাপগুলো বেশ অবাক হয়ে গিলে যাচ্ছিলো রোবোম্যান। এবার সে খানিকটা হতাশার সাথে বললোÑ তাহলে আর ইয়াযুজ মাজুযদের রাজ্যের সন্ধান দুনিয়াবাসী পাচ্ছেই না।
রোবোর কথায় সাদিত বললো- কিসের মাঝে কী, পান্তা ভাতে ঘি!
সাদিতের কথায় মামা মুচকি হেসে রোবোম্যানকে উদ্দেশ করে বললেন- আরে বোকা! এ যে মহান রাব্বুল আলামিনের ইচ্ছা। তিনি ইয়াযুজ মাযুজদের পুরো এলাকাটাকে এমনভাবে মানুষের চোখের আড়ালে রেখে দিয়েছেন যে, সারা দুনিয়ার মানুষ কেন- তোমাদেরও যদি আমরা ফ্রি অনুসন্ধানের সুযোগ করে দেই তাহলেও আল্লাহ তায়ালার বেঁধে দেয়া সময়ের এক সেকেন্ড আগেও তোমরা সেই ইয়াযুজ মাযুজের রাজ্যটা খুঁজে পাবে না। কেন তোমরা পবিত্র কুরআন পড় না?
– আমরা কুরআন পড়ি না এ কথা ঠিক না। আমাদের মাঝে একদল পড়েন এবং কুরআন নিয়ে রিসার্চ করেন। তারা সংখ্যায় খুবই নগণ্য। তারা আমাদের মহা বাদশাহের রাজসভার সদস্য। কেন, আপনাদের যারা তুলে এনেছেন তারা দু’জনই তো সেই টিমের সদস্য। তাদের মুখে শোনেননি কুরআনের বাণী।
– তা শুনেছি বটে। তার মানে তোমরা পুরো জাতি কুরআন পাঠ করো না। বাদশাহ যাদের মনোনীত করেন তারাই পাঠ করে।
– ঠিক ধরেছেন। কারণ আমাদের জন্য তো আলাদা ঐশী কিতাব আছে। আর আমাদের বেশির ভাগ সদস্যই আপনাদের সোলায়মান নবীকে মান্য করি।
– আচ্ছা যাক সে কথা। এখন বলো আমরা তোমাদের কিভাবে সাহায্য করতে পারি? এখনও তো তোমাদের পরিবারের সদস্যদের ক্ষীণ কণ্ঠের আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি।
মামার কথায় রোবো যেন সন্বিত ফিরে পায়। সে মাথায় হাত দিয়ে বলে- এই যা! কথায় কথায় আমিও আমাদের মহা বিপদের কথা ভুলে গিয়েছিলাম।
– আমিও ঠিক বুঝতে পারছি না, তোমাদের এই বিপদের সময় কাজের কাজ না করে আমরাইবা এতো আলোচনায় মশগুল হয়ে পড়লাম কেন!
– অনেক সময় গড়িয়ে গেছে। আর এক মুহূর্তও দেরি করা ঠিক হবে না। তাহলে এই সংবাদ আমাদের মহা বাদশাহের কানে পৌঁছে যাবে। তাতে আমার ফায়ারিং স্কোয়াড হয়ে যেতে পারে।
– এখনও ওদের ক্ষীণ চিৎকার শোনা যাচ্ছে।
– তার মানে আমাদের সিকিউরিটিরা এখনও হাল ছাড়েননি। না হলে আয়রনম্যানের সেনারা এতক্ষণে ইলেকট্রো স্পাইডারনেটটা গুটিয়ে ফেলতো। আর নেটটা গুটিয়ে ফেললেই আমরা আর আমাদের পরিবারের কারও কণ্ঠ শুনতে পাবো না। মানববিজ্ঞানী বন্ধুরা এখনও সময় আছে আমাদের জন্য কিছু একটা করুন।
মামা বললেন- আমরা ওদের ধাওয়া করবো কেমন করে?
রোবো জানালো- আপনাদের জন্য আমাদের এই ল্যাবের বাইরে সূর্যের আল্ট্রাভায়োলেট রশ্মিপ্রুফ সুপার ডেস্ট্রয়ার লড়ি প্রস্তুত আছে। এগুলোই আমাদের এখানকার সিকিউরিটি টহল যান।
রোবোম্যানের তাড়ায় সাদিত খানিকটা অসহায়ের মতো মামার দিকে তাকায়। হাতের ইশারায় বুঝাতে চেষ্টা করে, এই মুহূর্তে আমরা কী করতে পারি?
মামাও চোখের ইশারায় বলেন, কিছু পারি বা না পারি ওর সাথে বেরিয়ে পড়াই ভালো।
তাই আর মুহূর্ত সময় অপচয় না করে মামা উঠে দাঁড়ান দ্রুত হাতে এন্টি মিথিলিন মাস্ক পরে নেন। সাদিতও ঝটপট তাই করে। তারপর মামা সাদিতের হাত ধরে দ্রুত চলে আসেন ল্যাবের বাইরে। একটা জাম্প করে উঠে বসেন অদ্ভুত আকৃতির সূর্যের আল্ট্রাভায়োলেট রশ্মিপ্রুফ সুপার ডেস্ট্রয়ার লরিতে। চালক বায়োনিক স্পিডে ডেস্ট্রয়ার চালাতে চালাতে একসময় ইলেকট্রিক স্পাইডারনেটের কাছে পৌঁছে যায়। কিন্তু নেটের আকার-আকৃতি দেখে মামার মুখটা বিস্ময়ে হাঁ হয়ে যায়। একি নেট নাকি অন্য কিছু! এযে রীতিমত কয়েদখানার দৈত্যাকার প্রিজনভ্যান!! কিন্তু তার চারপাশে ধোঁয়াশায় পরিপূর্ণ। ফলে ভেতরকার রোবো সদস্যদের আবছা আবছা নজরে আসছে। তবে এখন আর কারো চিৎকার চেঁচামেচি শোনা যাচ্ছে না।
সাথে থাকা রোবোম্যান রীতিমত কেঁদেই ফেললো- স্যার! আপনারা কথায় কথায় অনেক বিলম্ব করে ফেলেছেন। ওরা তো নেট গুটিয়ে ফেলেছে। এখন এই নেট মহাশূন্যে হারিয়ে যাবে।
মামা এবার রীতিমত ধমকে ওঠেন- আরে ধ্যাৎ! রাখো তো তোমার কান্নাকাটি। মহাশূন্যে যাক না হারিয়ে। হারিয়ে আর যাবে কোথায়। তোমরা তো জানোই ওটা আয়রনম্যানের রাজ্যে যাবে। দৈত্যকায় ব্ল্যাকহোলের মিরাজান প্রভিন্সের মাকড়সা বিজ্ঞানীর ল্যাবে নিয়ে আটকে রাখবে এই তো?
মামার কথায় রোবোম্যান খানিকটা লজ্জা পেয়ে কান্না থামিয়ে বলে- হ্যাঁ, তাই।
– তাহলে আর এখন হায় আফসোস করে কোনো লাভ নেই।
– মানে?
– মানে খুব সোজা। ব্যাক টু দ্য প্যাভিলিয়ন। মানে সোজা ফিরে চলো। আগে তো তোমাদের মহা বাদশাহের সাথে মোলাকাত করে নেই।
– সর্বনাশ! অমনিই তিনি আমার ব্যর্থতার কথা জেনে যাবেন।
– আরে রাখো তোমার ব্যর্থতা। তোমাদের সেনা, গোয়েন্দা, কমান্ডো আর সিকিউরিটির গোষ্ঠীসহ যার সাথে পেরে উঠলো না, তাকে তুমি একা ঠেকাবে কেমন করে? এজন্য তোমাদের বাদশাহ মোটেই তোমাকে দোষারোপ করতে পারবেন না। তাছাড়া আমরা আছি না তোমার সাথে। বাদশাহকে সব বুঝিয়ে বলবো।
– বাদশাহর কাছে গিয়ে আপনারা আসলে কী করতে চাচ্ছেন?
– প্রথমত আমাদের পৃথিবী থেকে তুলে আনার কারণ জানতে চাইবো।
– সে তো আমার আগের রোবোম্যানরা আপনাদের বলেছেন।
– বলেছেন। তবে তা ভাসা ভাসা। আসল উদ্দেশ্যটা কী তা কিন্তু খোলাসা করে বলেননি।
– আসল উদ্দেশ্য অবশ্য আমিও জানি না। শুনেছি একটা বিশাল প্ল্যান্টেশনের থিওরি নাকি আপনারা জানেন, সেই থিওরিটা বাস্তবায়নের কলাকৌশল নিয়েই আপনাদের কাছ থেকে হাতে কলমে প্রশিক্ষণ নিয়ে আপনাদের ছেড়ে দেবেন।
– ধুত্তুরি। এ যে দেখছি একেবারেই ছেলেখেলা। তা আমাদের তুলে না এনে থিওরিটা চেয়ে নিলেই হতো।
– থিওরিতো সেই কবেই এনেছেন। আর আমাদের প্রায় ত্রিশটি টিম পৃথিবীতে পাঠিয়ে বার বার আপনাদের ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড ম্যানার সম্পর্কে অভিজ্ঞতাও অর্জন করিয়েছেন। আমরা আপনাদের প্রাইমারি টিমওয়ার্কও পর্যবেক্ষণ করে এসেছি।
– এতো দূর! কিন্তু থিওরি এনেছেন মানে!
– হ্যাঁ, আলবত এনেছেন। কেন আপনারা টের পাননি?
– না তো!
— হা: হা: হা: হা:। টের পাবে কেমন করে। আমরা কি আপনাদের কাছ থেকে চেয়েচিল্লে ওটা পাবো নাকি? তাই কৌশলে সংগ্রহ করেছি।
– সেটা আবার কেমন?
– মনে করে দেখুন, একদিন আপনি প্রচণ্ড ঘূর্ণিঝড়ের রাতে পবিত্র কুরআন পাঠ করছিলেন। যখন….
হঠাৎ একটা ঝড়ো হাওয়া এসে দেয়ালের মত শক্ত হয়ে দাঁড়ায়। আর তাতে ওদের বহন করা ডেস্ট্রয়ারটা একটা প্রচণ্ড ধাক্কা খেয়ে থেমে যায়।
রোবোম্যান স্বাভাবিক কণ্ঠে ঝড়ো দেয়ালকে প্রশ্ন করে- তুমি আবার বাধা হয়ে দাঁড়ালে কেন?
অমনি ঝড়ো দেয়ালটা ধূলি হয়ে ঝরে পড়ে। তার মাঝ থেকে অনেক বড় আকারে একজন রোবোম্যান আত্মপ্রকাশ করে গমগমে কণ্ঠে বলে- শুধুমাত্র তোমার জন্য আজ আমাদের পরিবারের সদস্যদের ধরে নিয়ে যেতে পারলো আয়রনম্যানের চ্যালারা। না হলে…
– কী সব যা তা বলছো? প্রতিবাদ জানায় রোবোম্যান।
বিশাল রোবোম্যান দৃঢ়কণ্ঠে বলে- হ্যাঁ, যা বলছি ঠিকই বলছি। আমি এখন তোমাকে গ্রেফতার করতে এসেছি।
– কিন্তু আমার অপরাধটা তো বলবে।
– তুমি আমাদের ভাষা ছেড়ে মানববিজ্ঞানীদের সুবিধার জন্য তাদের ভাষা ব্যবহার করে ওনাদের সাথে বেশি বেশি কথা বলে অনেক সময় নষ্ট করেছো। তা ছাড়া তুমি থিওরি হাতানোর আগে বিজ্ঞানী আসিফ আরমানের কুরআন  তেলাওয়াতের প্রসঙ্গটা শুরু করতে যাচ্ছিলে। এটা তোমার কাজ নয়। তুমি তো আল কুরআন রিসার্স টিমের সদস্য নও। তোমার কাজ বাইবেল নিয়ে থাকা।
Ñ সরি স্যার। এক্সস্ট্রিমলি সরি।
Ñ তুমি গ্রেফতার এড়াতে হলে এক্ষণি কোহেকাফে চলে যাও। সেখানে দু’শ বছর বাগান পরিচর্যা করে তবে আবার ল্যাবরেটরি টিমে যোগ দেবে।
বিশালদেহী রোবোম্যানের লাল টকটকে চোখ থেকে ঠিকরে পড়া চোখ ধাঁধানো লাইটিং দৃষ্টির কাছে কেমন যেন অসহায় হয়ে পড়ে ল্যাব সিকিউরিটির রোবোম্যান। সে তার আইডি কার্ড এবং প্রফিসিয়েন্সি ব্যাজ খুলে বিশালকায় রোবোম্যানের হাতে জমা রেখে চোখের পলকেই উধাও হয়ে যায়।
চোখের সামনে এমন অদ্ভুত অভাবনীয় ঘটনা দেখে মামা-ভাগনে বলতে গেলে তাজ্জব বনে যায়। তাদের কারোর মুখেই কোনো কথা সরছে না। এই দেখে বিশালকায় রোবোম্যানই মুখ খোলে। সে বলে- ডোন্ট ওরি ডিয়ার সায়েন্টিস্টস্ট। আমার কাছেও সেই সফটওয়্যার আছে যা দিয়ে আমিও তোমাদের সাথে বিশুদ্ধ বাংলা ভাষায় কথা বলতে পারেবো।
রোবোর কথায় এতক্ষণে মামার যেন ঘাম দিয়ে জ্বর নেমে যায়। তিনি তারপরও সহজ হতে পারেন না। অনেকটা ফ্যাকাশে মুখে বললেন- এখানে এতোসব হচ্ছেটা কী? ওউফ! একেবারে পাগল হয়ে যাবো।
সাথে সাথে সবিতও বলে ওঠে- আমিও বিরক্ত হয়ে যাচ্ছি। কেমন আজগুবি রাজ্যেই না এসে পড়লাম।
রোবো এবার গনগনে কণ্ঠে বললো- আসলে সৃষ্টির সেরা জীব মানুষকে কাছে পেলে আমরা অনেক সময় বাচাল হয়ে যাই। ভুলে যাই আমাদের শপথ। ভুলে যাই নিজ নিজ ডিউটি। ফলে দু’একটা শাস্তিমূলক ঘটনাও তোমাদের সামনে ঘটে যাচ্ছে। এজন্য আমরা সত্যি দুঃখিত। আমি মূলত এখানের সার্জেন্ট অ্যাট আর্মস। আমার একটা নির্ধারিত কোটা আছে কথা বলার। এটা স্বয়ং আমাদের মহা বাদশাহর অনুকম্পা বলতে পারো। আমাদের রাজ্যে নির্ধারিত কোড মেনে কোটা অনুযায়ী কথা বলার বিধান। কেউ তা লঙ্ঘন করলেই পানিশমেন্ট হয়ে যায়। সেখানে আমার আবার বাড়তি সুবিধা। অপরাধীকে গ্রেফতার করতে পারি। আবার অনুকম্পা দেখিয়ে ছেড়েও দিতে পারি। তবে ছেড়ে দেবার আগে অবশ্যই তার ডিউটিটা বদল করে দেই। যা তোমরা নিজের চোখে দেখলে।
এখন কথা হলো তোমরা যে আলাপ করছিলে, আড়াল থেকে সবই আমি শুনেছি। সে সূত্র ধরেই বলছি, আসলে আমরা তোমাদের থিওরিটা চুরি করে নিয়ে আসতে পারতাম। কিন্তু আমাদের মহা বাদশাহের কড়া হুকুম আছে মানবরাজ্যের মানে পৃথিবীর কোনো সম্পদ বা দলিলাদি আত্মসাৎ না করার। এজন্য আমাদের রাজ্যের নিরাপত্তা ও উন্নয়নের স্বার্থে আমরা তোমাদের ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড থিওরিটার একটা কপি করে এনেছি মাত্র। আর তা এনেছি  তোমার কুরআন পাঠের অবকাশে। কারণ সে সময়টিতে তুমি খুবই আবেগপ্রবণ ও একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ধ্যানে মগ্ন ছিলে। বুঝে বুঝে প্রতিটি আয়াত তেলাওয়াত করছিলে এবং আয়াতের অর্থ ও তাফসির গবেষণা-বিশ্লেষণে নিমগ্ন ছিলে। এটাই আমাদের জন্য মুখ্য সময়। যাক সে কথা, এখানেও আমাদের মহামান্য মহা বাদশাহের হুকুমের বাইরে কিছু ঘটানো হয়নি।
কিন্তু আমরা যখনই এসব নিয়ে আমাদের এখানে কাজ শুরু করতে যাই অমনি কোনো না কোনোভাবে আয়রনম্যান সে খবর পেয়ে একটা না একটা অঘটন ঘটিয়ে সব পণ্ড করে দেয়।
বিশালকায় রোবোম্যানের কথা শুনতে শুনতে মামা অনেকটা গর্বের সাথেই বলে ওঠেন- তাহলে তো কিয়ামত পর্যন্ত চেষ্টা করেও তোমরা আমাদের থিওরি কাজে লাগাতে পারবে না।
– আমিও তাই ভাবছি।
– তাহলে আর আমাদের ধরে এনে তোমাদের লাভ কী হলো?
– লাভটা তো এখানেই।
– মানে?
– মানে খুব সোজা। আমাদের মহা বাদশাহ এবং আমাদের প্রধান বিজ্ঞানী পরামর্শ করে দেখেছেন। তোমরাই পারবে আমাদের নিরাপত্তা আর উন্নয়ন বিধানে সাহায্য করতে।
– সেটা কী রকম?
– সে আমি পরিষ্কার বলতে পারবো না। আমাদের পরিবারে বেশ কিছু সদস্যকে তো আয়রনম্যান কিডন্যাপ করে নিয়েই গেলো। এখন আর ওর পেছনে ছুটে লাভ নেই। আমি তোমাদের আমাদের স্কাইল্যাবে নিয়ে যাচ্ছি। সেখানে আমাদের চিফ সায়েন্টিস্ট আছেন। তিনিই বিস্তারিত বলবেন। আমার কোড অনুযায়ী এর চেয়ে বেশি কিছু বলতে পারবো না। ওহ্ স্যরি, সকাল হয়েছে সেই কখন। তোমাদের তো আবার ব্রেকফাস্ট করা হয়নি। আগে আমাদের ডাউনিং ল্যাবে চলো। যেখানে তোমরা ছিলে। সেখানে ফ্রেশ হয়ে নাস্তা সেরে স্কাইল্যাবে যাবো।
– স্কাই ল্যাবটা আবার কোথায়?
– খুব দূরে নয়। এখান থেকে তিন হাজার ন্যানোমিটার ঊর্ধ্বে।
– তিন হাজার ন্যানোমিটার!
– ওহ্ স্যরি, তোমরা তো আবার মাইল, কিলোমিটার আর নটিক্যাল মাইল বোঝ। ন্যানোমিটার বুঝবে না। আমাদের এখানকার ন্যানোমিটার হলো নিচের থেকে মহাশূন্যের যে কোনো দিকে দূরত্বের পরিমাপের একক। সহজ কথায় তোমাদের এক লাখ কিলোমিটার সমান আমাদের এক ন্যানোমিটার।
– ওরে বাপ রে! আমাদের এতো দূরে নিয়ে যাবে? সে তো অনেক সময় লেগে যাবে।
– না। যা ভাবছো, তা নয়। আমরা সুপার শাটেল স্পেসে মাত্র ত্রিশ মিনিটেই পৌঁছে যাবো।
– আচ্ছা, তুমি তো সার্জেন্ট অ্যাট আর্মস। আমাদের সাথে যে গ্যালভানাইজিং লোহার দু’টি বার ছিলো, সেগুলো তো আর দেখছি না। সেগুলো কে নিলো?
– তোমাদের ঘুমের সময় ডিস্টার্ব না করে সেগুলো আমরা স্কাইল্যাবে পাঠিয়ে দিয়েছি।
– আসলে ওগুলো কি লোহার বার?
– হ্যাঁ, লোহার বার। তবে বিশেষ গ্যালভানাইজিং। সাধারণ লোহা থেকে এর আলাদা বিশেষত্ব আছে। জানো তো আমাদের মহাজগতে এখন আর লোহার অস্তিত্ব নেই। যা আছে সবই বিভিন্ন গ্যাসীয় পদার্থ এবং বিভিন্ন পদার্থের টগবগে ফুটন্ত অথবা পাথরের মতো কঠিন হয়ে যাওয়া আকরিক মাত্র।
– এজন্যই বুঝি লোহার সন্ধানে তোমরা পৃথিবীর লোহার খনিগুলোতে অনুসন্ধান চালাও।
– তা ঠিক বলেছো। শুধু অনুসন্ধান নয়, এখন প্রয়োজনের খাতিরে আমরা সবচেয়ে উন্নতমানের লোহার বারও সংগ্রহ শুরু করেছি।
– সেই প্রয়োজনটা কী?
– সেটাই জানবে আমাদের চিফ সায়েন্টিস্টস্টের কাছ থেকে। তো আর কথা নয়, চলো ডাউনিং ল্যাবে ফিরে যাওয়া যাক।
– ওকে, চলো।
(চলবে)

SHARE

Leave a Reply